Skip to main content

Full text of "Chandanrekha"

See other formats


-যাট টাকা-_ 


প্রচ্ছদপট 
অগুকন- কৃষেন্দু চাকী 
মুদ্রণ ইম্প্রেশান হাউস 


0০77/19/৯1২751-7 4 


4৯ 0০011906101) 01 91101 5101165 05 910, /৯17109 /৯111100011, 
1১001151760 05 71108, & 010051) ১০011517915 12, 100, 
10 51092709 0108181) 109$ ১০:০০, 08100118-700 073 


[9109 ₹২5, 60/- 


1১9 : 81-793-395-9 


ত্র ও ঘোষ পাবাঁলশার্স প্রাঃ লিঃ, ১০ শ্যামাচরণ দে স্ট্রীট, কালকাতা-৭ 
হইতে এস. এন. রায় কর্তৃক প্রকাশিত ও নিউ 'নিরালা প্রেস, ৪, কৈল।”। 
মুখার্জ লেন, কলিকাতা-৬ হইতে শ্রীধীরেন্দ্রনাথ বাগ কর্তৃক মবাদ্রুত 


উৎসর্গ 


ীমত নাঁমতা চট্রোপাধ্যায় 
শ্রাীআীনল কুমার চট্টোপাধ্যায় 
মা ও বাবাকে, 
মানুষ ও সাহত্যকে ভালোবাসতে 
যাঁদের কাছে শখোছি । 


এই লেখকের অন্যান্য বই 


চন্দন গাছ (€ কাঁবতা ) 

বৃণ্টি আসবে ( কাঁবতা ) 

চক্রুব্তহ ( গলপণ্রন্হ ) 

আকম ও পরশকন্যে - ( গল্পণ্রন্হ ) 
আণাকম ও দ্বীপের মানুষ (উপন্যাস ) 
সাঁজোয়া বাহিনী যায় €(কাঁণতা ) 


মহুলাঁডহার দন (উপন্যাস ) 


সা পল 


ন্দনরেখা ১ 

ঠনবুদ্েদেশ যাত্া ৪৬ 
সুখখ-দুওখের ছাব ৬৯ 
ফানুস ১ 

প্রত্বীববাদ ও জলা ৮৩ 
অন্ত্রাণের স্বর ১৯১৯১ 

অলীক বসন্তাঁদন ১৯০৩ 
বুপনগারের কোক্কাগিরন ১১৯ 
সুদেআঙসলো ১২০ 

বন পাহাড়ের রাজা ১৯৩০ 
গদাীতক ১৩৭, 

তা'ম কবে আসবে ১৪৬ 
দেহরম্ষী ১৬৪ 


চন্দনরেখ| 


০ত্প্রহা। 


পারিজাত 


নয়ানজুলির এ পারে 

আম আজ এক সকালকে কুঁড়য়ে পেয়োছ 

চুমো খেয়োছ তার ভিজে চোখের পাতায় 

নখল পাথরের মতো ঠাণ্ডা তার দুই ঠোঁট 

জাগেনি। 

বুকের খাঁচায় কান রেখে শুনোছি 

নঃস্তত্ধ | 

চুলে তার রন্তের পছল গন্ধ 

বাহুতে রক্তের উল্কি 

স্পন্দহীন শন্যতা তার দুই চোখের মাঁণতে 

লিখে রেখেছে 

গত রান্রের যুদ্ধের কাঁহনী 

সাইরেন***পাতা পোড়ার গন্ধ"*শসপ্‌লনটার 

নয়ানজ:ীলর ধারে 

আমার দুই পা গেথে গেছে আজান দুঃস্বপ্নে 

আকাশ থেকে দ্রুত নেমে আসছে 

বষাঁর মতন খরা, খররোদ ও বোমার বিমানের তলপেট । 

ধানের দুধের গন্ধে, হায়, সকাল জাগবে না আর! 

এই কাঁবতাটা কবে লিখোছলাম এখন আর মনে নেই । বোধহয় জাজমেণ্ট 
লিখতে লিখতে ক্লান্ত হয়ে কোনও এক মাঝরাতে । কিছুদিন পর ১৪৫-এর 
একটা কেস-এর অডাঁরের নকল বার করতে গিয়ে আমার পেশকার শিবু ওটা 
পায়। অবশ্য পড়তে পারেনি, ভেবেছে ব্যান্তগত চিঠি হবে কোনও । সকালে 
উঠে দেখ বাইরের বারান্দায় উদ্ভাঁসত মুখে দাঁড়য়ে । “আপকা এক বহোং 
জরহার কাগজ ফাইলওয়াকে আন্দর রহ গয়া থা । হমনে 'নকাল য়া ।; ওকে 
থ্যাংকু বলে বদায় করে আবার কাঁবতাটা পড়লাম । 

আমাদের এই সারাণ্ডাঘাটে সকাল বড় সুন্দর । দ'চোখের সামনে 
বেতোয়ার বাঁধের সবুজ জল সকালের রোদ লেগে ঝালিক 'দয়ে উঠছে। 
যতদুর চোখ যায় নিবিড় ময়্‌রকণ্ঠী জল- মাঝে মাঝে 'িঙ্গল ডুবো পাথর 
মন্্মুগ্ধের মতো বসে। তিরিশ বছর আগে এখানে গ্রাম ছিল, গোপালপুর, 
হায়াগঞ্জ, মোঁতয়া""মানুষ জন ছিল, তাদের ঘরদয়ার, সুখদুঃখ । বেতোয়ার 


১ 
চনদনালখা-_-১ 


খর জলস্রোতে জীবনের উত্তাপে ভরা সেই সভ্যতার ছবি কোথায় তাঁলয়ে 
গেছে। সরকার ক্ষাতপূরণের টাকা গুনে নিয়ে ম্লান মুখে পাঁরবারকে 
পাঁরবার বাস্তুগ্যত হয়ে চলে গেছে অন্য গাঁয়ে বসত করতে । কেই বা জানে 
তারা আজ কোথায় ? এখন চাঁরধারে শুধু গাছেদের অস্পম্ট বাতালাপ। 
আকাশের ঘননশীল, জলের গন্ধ হাওয়ায় । দারাং পাহাড়ের ওপরের জঙ্গলে 
অজন্ত্র বন্য পাঁখর কোলাহল- ঝাপসা সুগন্ধের মতন সেই শব্দ এই বারান্দা 
পর্যন্ত ভেসে আসছে । বাঁধকে আদরের মতো ঘিরে আছে নাশ্চন্ত দারাং 
পাহাড় । গলা পর্যন্ত শরীর জলে ডুবিয়ে । নীচের জঙ্গলে পোড়াপাতার স্তৃপে 
কেউ আগুন দিয়ে থাকবে- গন্ধটা ঘুরে ঘুরে ওপরে উঠে আসছে-_সমশ্ত 
আবহাওয়ায় একটা গা-শিরাশরানভাব, মন-কেমন করা দন । 

এই জল আর জঙ্গল যেন রমশই আমাকে টেনে 1নয়ে চলে যাচ্ছে আমার 
স্বপ্নের শহরের থেকে দূরে । কলকাতা আজকাল কেবল স্বপ্নেই আসে । যে 
সময়ের স্মাতিতে কাঁবতাটা িখোছলাম-_-সেই সময়ও জলরঙের ছাবর মন 
গফকে হয়ে এসেছে ৷ কাঁবতাটা এখন পালকের মতন হালকা '"*ওর কোনও দায় 
নেই-.*উীঁড়য়ে দিই ? ডীঁড়য়ে দিতে ইচ্ছে করল । বাঁধের জল পর্যন্ত পৌছতে 
পারবে না***নীচের গাছগাছালর ঝোপে আটকে থাকবে । 

জগ্নু িওন নীচের ঘোরানো রান্তা ধ'রে সাইকেলটা ঠেলতে ঠেলতে ডঠে 
আসছে । বেগাঁন গামছায় কপালের ঘাম মুছে গুনে গুনে সাতটা চিঠি দিল । 
আর একটা টেলিগ্রামের কাগজ | টেলিগ্রামটা সন্তু সই করে টোবলের ওপর 
রেখেছে । বেরবার আগে দেখে নিলাম । হিন্দিতে পাঠিয়েছে টোলগ্রামটা । 
পড়তে পড়তে নিজের অজান্তেই ভূরুদুটো কুচকে উঠল- শব্দগুলো মাথার 
মধ্যে নড়েচড়ে বেড়াচ্ছে__ 

“রতন ঘাঁসির মৃত্যু চাই' 
মুন্না যাদব ॥। 

ফোনরুম থেকে বোঁরয়ে ক্লান্ত হরদয়ালবাবু বললেন, ডি এস পি টাউনে 
নেই । কোথায় গেছেন তাও কোন ডিউটি বলতে পারছে না। কাকে লাগাব ? 

ঘণ্টাখানেক পর, কোর্টে চুকব» ইন্সপেকটর রামদাহনবাবু দেখলাম ওর 
পুরনো রাজদৃতে গাঁক গাঁক করতে করতে আসছেন । শাল দেহ, পুরুজ্টু 
সাদা পাকানো গোঁফ, মাথার চুল বিরল ও সাদা, মুখ পাঁরচ্কার কামানো, আত 
শান্ত । ভুরু না কুচকেই টোলগ্রামের কাগজটা দেখলেন । তারপর বললেন-_- 
স্যার, মনে পড়ছে না। বাঁড়ডর ও 'স কিছ ?িরপোর্ট করেনি িসেন্টলি । 
কোনও ক্লাশ বা কচ্ছু। আপাঁন চিন্তা করবেন না। আম এখান খোঁজ 
নাচ্ছ। 

তিনটে বাজতে চলল । শেষ কেসটায় ক্রস এগজামিনেশন লম্বা হতে হতে 
অবান্তর হয়ে উঠেছে । দু'বার উাঁকলকে তাড়া দিলাম । হরদয়ালবাবু 
টোবলের ওপর গতানুগতিক চিরকুট পাঠালেন-_-সার, অব থোড়া জলাঁদ উঠা 
যায়। 


ছ 


আঁফসে হরদয়ালবাবু ররীতমতন আঁভভাবক । ওঁকে কে যেন সম্প্রতি 
বলেছে 'িনটের পর লাণ্ খেলে আমাকে পেপটিক আলসার ধরতে পারে । 
দোঁর হলেই চিরকুট পাঠিয়ে দেন এবং মানা করলেও শোনেন না। উস্কো- 
খুস্কো চুলে ভদ্রলোক বৌরয়ে এলেন । কপালে বন্দু বন্দ? ঘাম । ফোনরমের 
পাখাটা ভাল চলে না। আঠাশ বছর হল । এবার বদলাতে হবে গ্রীষ্মের 
আগে। 

“ামন্তপূর থেকে জি এম ফোন করছেন। 1তনবার ট্রাই করে লাইন 
গদল':*ঃ 

ফোনের মধ্যে প্রচুর শব্দ, শোঁ শোঁ আওয়াজ । ম্যান-য়াল এক্সচেজঃ ফোন 
করা এবং পাওয়া নরকষন্ত্রণার মতন দীর্ঘ ও কম্টকর। গজ এম বোধহয় 
কপালের ?ির ফলয়ে চেচাচ্ছেন ৷ গুড আফটারনুন_নমন্তে জজ! স্যার! 
প্রভু 1সংএর ইউীনয়ন পরশু থেকে স্ট্রাইকের কল দয়েছে- হ্যা, আবার 
ওপেন কাস্টএ, স্যাবোটেজ নট রুলড্‌ আউট-দয়া করে ফোর্স পাঠিয়ে 
দেবেন, উইথ ম্যাজস্ট্রেট-_মরে যাব না হলে। 

চাঁব্বশ ঘণ্টার নোটিশে ফোর্স চাইছেন । পুরো দুপ্লাটুন লেগে যাবে 
ওপেন কাস্টে। আগে জানান না কেন? 

“হ্যালো ? হাঁ িজ। আজই ওদের ক্লোজড ডোর গমাটংএ ঠিক হল। 
আজই ॥ আম এস পিকে ট্রাই করাছ একঘণ্টা হল। আপান একট, কাই"ডাল 
বলবেন । রাখাঁছ | নমন্তে । 

বেদপ্রকাশের কোনও খবর নেই । আর একটা ব্যপ্ত দিন শেষ হল । পাঁখরা 
উড়ে চলেছে দারাং পাহাড়ের জঙ্গলের দিকে-'তাদের বাসায়। কালচে সবন্জ 
জলরাশতে ভেঙে চুরমার হতে থাকে উড়ন্ত ছায়ারা ৷ সূর্ধ ডুববে । লাল 
আলোয় মায়াবী হয়ে উঠছে পাঁথবী । বেতোয়ার ব্যারেজের ওপর সোডিয়াম 
আলোগুলো জলে উঠল । চেকপোস্টের একট নীচে একটা খাল ড্রেজার 
ভূতের মতো দাঁড়য়ে। জপটা ণটলার ওপর চড়ছে আন্তে আন্তে। আমার 
আঁফসঘরের খাল আলো জবলছে-_বাঁক সারা বাঁডিটা অন্ধকার । বারান্দায় 
বসে লখন 'নাবষ্টাচত্তে হ্যাঁরকেনের কাচ পাঁরকার করে চলেছে । পিধানে 
শুধুই একটা লাীঙ্গ। ভাবোঁন আম এত তাড়াতাঁড় এসে যাব, ভ্যাবাচ্যাকা 
খেয়ে উঠে দাঁড়য়েছে। 

'সন্ধেবেলা আলো জবালাও না কেন ঘরে ? 

আজ ক অসময়ে বাঁষ্ট হবে ? লাইন করে পিপড়েরা চলেছে দেওয়াল 
জুড়ে কোণাকুণ। বাথর*মের চৌকাঠের সামনে 'িনটে ব্যাঙ বসে। শোওয়ার 
ঘরে শ্্ীকের ছাবি। স্নান সেরে রোজ প্রণাম করার কথা এখানে । মা নিজেই 
টাঁওয়ে ধদয়ে গেছেন গতবার । প্রথমাঁদকে অনেক বেনামী চিঠিপত্র আসত । 
অপাঠ্য হাতের লেখা । ভুলভাল ভাষা । বোৌশর ভাগই থে2টীনং। রানে 
ব্যারেজের ওপর গেলে বোমা মারা হবে। কোর্টরূমে অদৃশ্য আততায়ী 
লুকয়ে থাকবে । চার নম্বর মাইনস-এ গেলে লাশ ফেলে দেব ইত্যাঁদ। 


৩ 


অবশ্য আমি কখনও বাবা-মাকে জানাইনি এসব কথা । মনে হয় বেদপ্রকাশের 
বউ হীর্গত 'দয়ে থাকবে মা-কে । বেদপ্রকাশ দেখতে চেয়েছিল চিঠিগুলো 
একসময় । 

ঠাকুরের ছবিতে প্রণাম করাঁব রোজ । সকাঙ্ষে বেরবার সময় একবার আর 
একবার সমন্ধেবেলা ঘরে এসে ।? ক একটা ভ্ভবও কয়তে বলেছিল, মা-র হাতের 
লেখা কাগজটা হারয়ে ফেলেছি। 

খাবার টেবিলের কাছে ব্রত লখন দাঁড়য়ে । আজ কা বানাব ? ওঃ, রোজ 
রোজ এই এক ঝামেলা ! ওকে সব বলে দতে হবে । আল না বেগুন, িঙে 
না পটল । কিসের সঙ্গে কী চলে আর কঈ চলে না আঁম ক জান ? লখনের 
রাল্লাটা বেশ প্রাগোতিহাঁসক ধাঁচের । একবার প*ইশাক রেখধোছল ঢেক্ড়স 
দিয়ে । লখন একট কুশ্ঠিতভাবে বলল--“দুপুরে মাঈজি এসেছিল | দুটো 
ক বেধে রেখেছে ।, 

শনয়ে আয় দোখ ! রোজ রোজ মাঈঁজকে "দিয়ে বাঁধাস কেন ? 

“আমি মানা করেছিলাম |” লখন দুটো ছোটো বাট টোবলের ওপর 
রাখে । ঝিঙে আলু পোস্ত ॥ কুমড়োর তরকারি । "শুনল না মাঈজি।, 

“তবে আর কাঁ, ব্যস ! তুমি খালি রুট বানাও, তাহলেই হবে 1, 

জ্যোৎস্নাদেবী তা হলে আজও এসেছিলেন । 'বছানার চাদর টান-টান। 
আলনার জামাকাপড়গুলো 'নভাঁজ 'নাশ্চন্ত। টোবলে ধুলো নেই । মাঝে 
মাঝে দুতনাদন একটানাও আসেন । আম থাকলে পারতপক্ষে আসেন না। 
তবু মাঝে মাঝে দেখা হয়েই যায় । জিনিসটা কলোনির সবাই ভাল চোখে নেয় 
না। কেউ কেউ বলে, তেল লাগাতে আসে । বেদপ্রকাশের বউ সঈমা বলে 
ওদের সঙ্গে আমাদের আবার মেশামেশি কা, হেডক্লাকের বউ ! আকাশের চাঁদ 
চায় নাঁক ! 

চারটে ছেলেমেয়ে নিয়ে কম্টেসৃস্টে আছেন ভদ্রমাহলা । অথচ ট১শব্দাট 
নেই মুখে, মাসের শেষ কটা দিন কী করে কাটান প্রতিবেশশরাও জানতে পারে 
না। এসব হল সন্তুরা'নউজ সাভস। আমায় কখনও নিজের সংসারের 
বৃত্তান্ত বলেন না জ্যোৎস্নাদেবী । আঁমই দু-একবার ওঁকে বলেছি, কেন কম্ট 
করেন রোজ রোজ ! লখন তো মন্দ রাঁধে না, আমার ভালই লাগে! 

শুনে উন অবাক চোখে আমার 1দকে তাঁকয়েছেন। কম্ট! কম্ট ক 
বাবা । এই তো আমাদের কাজ ! ছেলেমেয়েদের জন্যও তো রাঁধি। তবে হ্যাঁ, 
তোমার জন্যে বাড়ি থেকে রেধে আনতে পার না, গঙ্গাজলেই গঙ্গাপুজো 
সেরে নিই । হাসতে হাসতে বলেছেন, কাল আঁফস যাবার সময় লখনকে দশটা 
টাকা দিয়ে যেও তো, মাংস রাঁধব একট] । 

বাড়তে ভাল জিনিস বোশ করে আ'নয়েছি, ভেবোছি রান্না হয়ে গেলে 
গুর সঙ্গে পাঠিয়ে দেব। উনি নিয়ে যাননি । বুঝতে পেয়েছি গুদের আত্ম- 
সম্মানজ্ঞান আত টননে। প্রতিদান দেবার কোনও রান্তা নেই । একাদন 
দেখি, ঝারাঁঝার বাঁষ্ট মাথায় বাগানে । 


৪ 


আপা ন এখানে কী করছেন ?, 

'এই ঢেড়সের বীজ এনেছিলাম, লা'গয়ে দিয়ে যাই । তোমার মালি তো 
বসে বসে ঘনাময়ে পড়ার জোগাড় হল । বাঁড়তে গান্ন নেই আর সাহেব বাঁড় 
থাকেন না। এইসব আগাছা কেটে সাফ কাঁরয়েছি ওকে দিয়ে |, 

আমাদের দামোদর মাল কেন যে আজকাল এত মনমরা এবার বোঝা 
গেল। 

শীতকালে আল িয়াজের বহন আঁনও, লাগয়ে দেব। ছ'মাস আল: 
পেয়াজের বাজারমুখো হতে হবে না। হাসছ যে, পেঁয়াজের কোঁজ কত করে 
জানো 2, 

লখন ও পাশ থেকে বলে উঠল, হুজুর, সাড়ে চার টাকা ।” 

ব্যাটা নিজ্কমার ঢেঁক, তরজার ধুয়ো দিতে আছেন ।” বললাম, "যাও 
মাসকে ছাতা নিয়ে বাঁড় পর্ন্ত দিয়ে এসো । বর্ষা বাড়ছে, 

মাঁস শুনে মুখ টিপে হেসে চলে গেলেন । কালোপাড় শাড় পরা রোগা 
শরীরটা ছায়াটাকে সঙ্গে টানতে টানতে ঘোরানো পথ দিয়ে অদৃশ্য হয়ে গেল। 

খেয়ে উঠে কণ্ট্রোল রুমে ফোন করলাম | তারপর বেদপ্রকাশের বাঁড়তে। 
প্রায় সাড়ে ন*টা বাজতে চলল । এখনও ফেরোন । আশ্চয তো ! সীমা, ওর 
বউ বলে, গুর তো ঘরে ঢুকতে ইচ্ছেই করে না, নেহাত আমাদের এই সারাণ্ডা- 
ঘাটে সরাইখানা নেই তাই ফিরে আসে । সীমা ভার ঠোঁটকাটা মেয়ে, বাইরের 
লোকের সামনেই মাঝে মাঝে কথা শুনিয়ে দিতে ছাড়ে না। বেদপ্রকাশ অজ্প 
অন্প হাসে-_একেবারেই দুঃখেষু অন্যাদ্বিগ্রমনা, সুখেষু বিগতস্পৃহ টাইপ । 
বড় বড় দুই চোখের মধ্যে কত কী যে ভাবনা চিন্তা খেলা করে হাঁদশ পাওয়া 
মুশকিল । তবে দারুণ স্মার্ট, কাজকর্মে আত চৌকশ । প্রথম প্রথম এসে ওকে 
প্রায়ই সরকার চিঠি লিখতাম । মাইনস-এ স্ট্রাইক । অজয়পুরে ঝাড়খাঁণ্ড 
সমাবেশ । এক্সপ্লোসিভ । এ এম ডি ঘেরাও । আমরা আবার একটু লেখালাঁখ 
করতে ভালবাস, যাকে বলে 'ব্রনাঁগং-অন রেকর্ড । সব ঘটনাতেই বেদপ্রকাশ 
দ্রুত ও 'নাশ্ছদ্র ?সদ্ধান্ত নয়েছে এবং আকশন, "তবে চিঠির কোনও জবাব 
আমোন । বরং আমার প্রশ্নের উত্তরে বলেছে, স্যার, আপাঁন “ডেকোরাম” চান 
না কাজ? আমি কাজ করে দেব, কাগজ চালাচালি করে সময় নষ্ট করতে 
পারব না। জবাবটা সরল ও অসঙ্তকোচ । এর ওপর আর কথাই চলে না। 

এখানকার এই মাফিয়া-বোষ্টত পাঁরমণ্ডলেও বেদপ্রকাশ টিকে আছে, এবং 
মন্দ করছে না। ওকে একবার 'নর্বাসনে পাঠাল তারণগঞ্জ। লোকে ভাবল 
ও পৈরবী নিয়ে পানা দৌড়বে, এস্টাবাঁলশমেন্ট ক্লাককে ওবেরয় হোটেলে 
লাণ্ে নিয়ে যাবে । সীমা আর বাচ্চাদের মুঙ্গেরে পাঠিয়ে হাড়কাঁপানো শীতে 
আম স্টাইলে ওভারকোর্ট চাঁপয়ে একটা ট্রাক ও হোলডল নিয়ে বেদপ্রকাশ 
এসে হাজর তারণগঞ্জ। টিকে গেল বছর দুয়েক, দুঃসহ শীত, দবার্ববহ গরম। 
বেদপ্রকাশের আর নড়ার নামগন্ধ নেই ৷ তারণগঞ্জের মাফিয়া আবার দৌড়ল 
রাজধানশ । ঘাড় থেকে ভূত ক নামে সহজে ! দুই নেতার ঝগড়া লেগে গেল 


ডে 


শেষে । ব্যাটাকে ওখানে পাঠাতে কে বলোছল ! এবার তাড়াবে কী করে, 
তাড়াও ! কালো কুচকুচে গোঁফের নীচে ধারালো হাঁসাট শানিয়ে বেদপ্রকাশ 
এসে লাভ করল সারাণ্ডাঘাটে । 

আজ ফিরতে বদ্ড দোর করছে বেদপ্রকাশ । 

পরশু সামন্তপুরে স্ট্রাইক । ফোর্সএর জন্য জয়েন্ট মেসেজ যাবে 
জেলায় । আর সকালের সেই টোলগ্রামটার জন্য তো ওকে কখন থেকে 
খংজছি। 

রতন ঘাঁসর মৃত্যু চায় মুন্না যাদব । কে রতন ঘাস ? রতন ঘাস একজন 
হাঁরজন। নেতা কি? কী ওর আ্যাকাঁটাভাঁট? ইণ্টেলিজেন্স-এর কোনও 
িরপোর্টে তো ওর নাম সম্প্রাত দোৌখাঁন ? 

হু হু করে ঝোড়ো হাওয়া ছুটে আসছে বাঁধের বুক থেকে | ঝড় আসছে। 
আকাশটা গন গন করছে লাল । চৈত্র মাসে বৃম্ট ! উথ্থাল পাথাল হয়ে যাচ্ছে 
নীচের জঙ্গল-_-কত পাখি যে বাসা ভেঙে মরে 'পন্ট হয়ে থাকবে ঘাসের ওপর 
_কত বক্ষাঁশশু মুখ থুবড়ে পড়ে থাকবে সোঁদা মাঁটর ওপর ! তোলপাড় 
করা হাওয়া । লখন জানলাগুলো বন্ধ করতে আসাঁছিল, ওকে মানা করলাম-_ 
[ভিজুক, কীই বা ভিজবে এই ঘরে! 

এগারোটা নাগাদ শুতে ঘাঁচ্ছ, নীচের রাগ্ভার জিপের শব্দ । লখনটা 
ঘুময়ে কাদা হয়ে গেছে রান্নাঘরের সামনে । দূরে ফটকের কাছে এসে জিপের 
লাল আলোটা দপ্‌দপ্‌ করছে । জিপ থেকে নেমে একজন গেট খুলল- বেদ- 
প্রকাশ । বারান্দায় দাঁড়য়ে দেখছি, হাঁটতে হাঁটতে আসছে । ওর সারা শরণরে 
জল, রগ বেয়ে জলের ফোঁটা, বারান্দার বা৮-এর নশচে স্যালুট করে এসে 
দাঁড়াল । 

“আমার মেসেজটা পেয়োছিলেন সকালে 7” আম ওকে আশ্চর্থ হয়ে 
দেখাঁছ। 

হ্যাঁ। হাসল বেদপ্রকাশ । হাতের রুমালটা ?দয়ে বেশ করে মুছে নল 
কপাল, ঘাড় । 

“দেরি হয়ে গেল একট, আপাঁন বোধহয় শুয়ে পড়েছিলেন । রতন থাঁসর 
বাঁডটা একেবারে পোস্টমরেমে পাঠিয়ে এলাম 1, 


জ্যোৎস্না 


সন্ধেবেলা বাঁড় চুকছি, দেখি বড় মেয়ে লম্বা হয়ে খাটের ওপর শুয়ে, 
বুক পর্যন্ত চাদরটানা । জবরটর হ'ল নাকি? কপালে গলায় হাত ছোঁয়াতেই 
[িদ্যেধরী ফোঁস করে উঠলেন-আবার গোঁছলে ওখানে ? 
গোঁছলাম তো, তোর কোনও আপাঁত্ব আছে ? 
£ বলে মেয়ে আমার বালিশের পাশ থেকে বই তুলে নিয়ে পড়তে 
আরম্ভ করলেন, লোকে তোমাকে নিয়ে হাসাহাসি করে, আমায় না। 


৬ 


আঁফস যায় বলে তনুর কাছ থেকে আমি কোনও কাজ পাই না। সকাল 
আটটা সাড়ে আটটায় ঘুম থেকে ওঠে, কোনও মতে দাঁতি মেজে মুখ ধুয়ে এক 
কাপ চা খেয়েই সোজা আঁফস। এক একাঁদন চান করে সন্ধেবেলা এসে । 
দুপুরে খোকনকে 'দিয়ে ডেকে পাঠাই তাবে এসে খায় । চুলে তেল নেই, চিরু?ীন 
নেই । ওর বাবা ওর নাম আদর করে মুকুট রেখোঁছলেন । কেমন সুন্দর মেয়ে 
কাঁ হয়ে গেল 'তনচার বছরে । ওর কাকারা বলোছল, ঢাকার করাচ্ছ কেন, 
মেয়ের বিয়ে দয়ে দাও । ওদের কথা শুনব, তেমন অবস্থাই ছল না তখন। 
উন মারা গেলেন, একটিও গরনা বাঁক ছিল না আমার, চারটে ছেলেপুলে 
নিয়ে এই বিদেশ 'বভূঁষে কী সনয় গেছে ! তবু সরকারের আইনটা ছিল । 
মেয়েটাকে চাকরিতে ঢোকাতে পারা গোছল । বয়স সবে আগ্েরো হয়োছিল-__ 
ওর কি চাকার করার নয়েস ? ফ্যাঁমাল পেনশনের মাত্র চারশো পণ্টাশাঁটি টাকা 
_-তনুর মাইনেটা না থাকলে আমরা না খেয়ে মরতাম ! 

তাই বলে, ষারা বলে মেয়ের টাকায় খাঁক্ষি বলে মেয়ের সুখ দুঃখের কথা 
ভাবি না, তারা মিথ্যেবাদশী । আমরা উপোস করে মব্ললে তারা ফিরেও দেখবে 
নাক? আমি কি বলেছি তনুর বিয়ে দেব না ? ও ছেলেমানুষ, বোঝার বয়স 
হয়নি, ওর কান ভাঙাচ্ছে কারা সে আম জান । ওকে এই রাষ্তায় ক করে 
যেতে দিই । শুধৃ কি ধর্মটা আলাদা, ছোকরার পশ্মান্রশের ওপর বরস হয়ে 
গেছে, চেহারা নাহয় দড়কচা নারা 1 "দলও তো হয়ে গোছল, কী ক'রে রয়ে 
গেল এখানে ? শত্বরের অভার্প নেই আমাদের । সেবার যখন তনু জেলায় 
গেল আকাউ্টস পরীক্ষা দিতে, বাড়তে ডেকে ছোঁড়াকে বলোছলাম, তুমি 
নিজের জাতেধর্মে বিয়ে করে নাও, আমার মেয়েটাকে ডুবিও না। নলে কিনা, 
আপাঁন খাল ওর চাকারটাই দেখছেন, আম ওর ভবিষ্যতের কথা ভাবাঁছ। 
ওর সুখদঙখের দায়িত্ব আমাকেই নিতে দিন । মরুক গে । ফিরে এসে তনুও 
দূণ্চার কথা শোনাল। ওকে কেন ডেকে অপমান করোছ ! শান্ত বলে, মা 
তুম কেন সেধে এসব গায়ে নিতে যাও ! যা ক'রে করুক না 'দাঁদ। কশদন 
গেলে ওর মাথা আপনা থেকেই চাণ্ডা হয়ে আসবে । 

শান্তি ওর বাধার ঠাণ্ডা মাথা পেয়েছে । তনুর মতো ধারালো অবশ্য ও-ও 
না, মনীষাও না । তবে দু'জনেই ভারী থুঝদার মেয়ে । সকালের সব কাজকর্ম 
করে, আম খাল রান্বাটা, একাদশশীর দন ওরাই রাধে । সন্ধেবেলা খোকনকে 
পড়াটা দোখয়ে দিতে হয়, সেটাতে তেমন সাবধে করতে পারছে না, হয়তো 
মাস্টার একটা রাখতেই হবে। হপ্তায় একাদন পড়ানোর জন্য বি এস সি 
মাস্টার চাইছে একশো টাকা । মাস্টার রাখলে 1ক পেটে গামছা বেধে থাকব ? 

এই পাথরের দেশে পারিজাত কোথা থেকে এল, কেন এল ? প্রথম যখন 
তনু আঁফস থেকে এসে বলল, মা জানো আমাদের নতুন সাহেব আসছে, 
বাঙালি ছেলে । তখনই বুকের ভেতরটা কেমন করে উঠোছল আমার ! তারপর 
ক্যাশিয়ার বাবুর বউ এসে বলল, শুনছেন তো "দাদ, 'বিয়েথা করেনাঁন নাক, 
আপাঁন একট: চেম্টাচারত্ত করুন না। 


এদের কী করে বোঝাব £ আকাশের চাঁদ ধরার স্বপ্ন ছেড়ে দিয়োছি কবেই । 
অনেক কিছু ছিল আমাদের । অনেক কিছু এক এক করে গেল। এখন 
ছেলেমেয়েগুলোকে বাঁচিয়ে রাখতে পারলেই হয় কোনও মতে । কালোকোলো 
রোগা ছিলাম, 'াঁস বলত বর জুটলে হয়, গর মতো রূপবান কন্দর্পকান্তি 
স্বামী পেলাম, সেই স্বামী আবার কংকালসার রন্তশূন্য হয়ে আমারই চোখের 
সামনে বিছানায় মিশে গেল। ছেলে হয় না করেও খোকন এল । ওকে তো 
পেট ভরে দহু'বেলা খেতেই দিতে পার না মাসের শেষ কটা "দন । স্কুলে ওর 
বয়সী ছেলেরা আইসাক্রম খায়, আলকাবলি খায়, ও দাঁড়য়ে দাঁড়য়ে দেখে। 
তনুটা ফাস্ট ডাঁভশনে পাস করল, সেও লেগে গেল সংসারের থান টানায়। 
কোনাদন যে মনের আক্রোশে কী করে ফেলবে, লোকের কাছে মুখ দেখাতে 
পারব না। 

তব তো আমি কখনও ভাবান পারজাত এ দেশে আসবে, বাড়তে 
আসবে ডাকতে না ডাকতে । গতবার দহুগ্গা অজ্টমশীর দিন, তখন ওর সঙ্গে 
আমাদের ভাল করে আলাপও হয়নি, ওকে খেতে ডেকোছিলাম ৷ মনীষা আর 
খোকাকে পাঠালাম, ওরা গিয়ে ডেকে নিয়ে এল । পারিজাত এল, গল্প করল 
কত ব'সে, লুডো খেলল ওদের সঙ্গে ৷ খাওয়া দাওরার পর আমরা সবাই 
পায়ে হেটে ওকে এগিয়ে দিতে গোঁছলাম । মনে হচ্ছিল খোকার বাবা চলে 
যাবার পর এই প্রথম যেন আমাদের বাঁড়টা সব ভাঙাচোরা জোড়া লেগে 
ভরভরন্ত হয়ে উঠেছে । 

সারাদিন কাজে কাজে ঘোরে ছেলেটা । িওনগুলো 'দিনেরবেলা নাক 
ডাঁকিয়ে ঘুমোয় । শোবার ঘরটা মাগো কী অগোছালো ! বইয়ের তাকে পুরু 
ধুলো । কি না, সাহেব ছু বলে যাননি । আরে, মানুষের নুন খেলে 
এইটুকু তো করে মানুষ । আর কণ যে ওদের রান্না। এই লখনটা দু'বছর 
ধরে রাঁধছে, এখনও কিসে ফোড়ন দিতে হয় জানে না। 

আমি ওখানে যাই বলে তনু রাগ করে। আঁফসে নাক লোকেরা 
হাসাহাঁস করে । হেড টাইপিস্টের বউ নাক ওকে বলেছে__তোমরা এই ছোট 
কোয়ার্টারে গাদাগাঁদ করে না থেকে টিলায় গিয়ে ওঠো না-_অতগনুলো ঘর 
খালি ! দেখ কথা । 

বুড়ো মেয়েমানুষ, মেয়ের বয়সী তনুকে অমন খারাপ কথাটা বলতে মুখে 
বাধল না। অর্ধেক লোকই এই রকম এখানে- নোংরা, স্ছুল কথাবার্তা, খারাপ 
রুচি । উনি যতাঁদন ছিলেন, বাইরে বোরয়েছি খালি শখের কেনাকাটা করতে, 
কী সিনেমায় গেলাম । কোনওদিন নিজের আঁনচ্ছেয় দরজার বাইরে পা 
রাখিনি । মানুষের মুখের পালিশ করা দিকটাই খাল দেখোছ। এখন তো 
সবই একা হাতে করতে হচ্ছে, সবরকম মানুষ সইতে হচ্ছে প্রাতাঁদন । 

খিড়কর দরজার পাল্লাটা কব্জা থেকে ভেঙে পড়ে ঝুলছে । রাত্তরে 
শোবার সময় চিন্তা হয় ৷ মানুষ না হোক শেয়াল টেয়াল ঢুকলেই 'াত্তর ! 
আমি তো মাঝরাতের পুর থেকেই উঠে চরূর মারতে থাঁকি-_দরজাটা দেখে 


৮ 


নেই । ছুতোর 'মাক্ত্রকে ডেকেছিলাম, সে চারশো টাকা হেকে চলে গেল । এ 
বছরটা চেপেচুপে রয়ে যেতে হবে । সরকার রপেয়ারের টাকা শেষ হয়ে গেছে 
গত বছরেই । বড়বাবু বলছে এ বছরকার টাকা 'দয়ে আমাদের দরজাটাও 
কাঁরয়ে দেবে। 

হ্যাঁ, টান বেচে থাকতে সাঁত্য বলব ছেলেমেয়েদের জন্য এতটা কখনও 
কারিনি। ওরা যখন ছোট ছিল, উন মেয়েদের একপাতে খাইয়ে নিজে খেয়ে 
অফিস গিয়েছেন । আমার মনটা ওর চারদিকে ঘুরে ঘুরে বেড়াত । পাঁচটা 
বাজল 1ক না বাজল, গা ধুয়ে সাবানে মুখ ধুয়ে খোঁপা বেখধে আম দরজায় 
চার ছেলের মা ! সন্ধেবেলা ছুতোনাতায় ছেলেমেয়েদের এঁদক ওদিক পাগিয়ে 
ওর কাছে ঘেষে বসতাম। ডান হেসে বলতেন- শুরু হ'ল তো পাগলের 
পাগলামি ! পাগলামিই বটে । পাগল না হলে কণ অমন করতে পারতাম ! 

মহকুমা হাসপাতাল যখন জানিয়েই দিল গুর চাকৎংসা এখানে আর হতে 
পারবে না, ঘর খোলা রেখে তনু আর শান্তিকে জিম্মা দিয়ে দুটো সুউকেস 
গুছিয়ে গুঁকে নিয়ে কলকাতা চলে গেলাম । ওদের কাকা-কাঁকমারা কেউ 
আসতে রাজি হল না। বলে, মেয়েদের এখানে পাঁঠয়ে দাও । আমাদের কাছে 
থাকবে । আমি না ক'রে দিয়েছিলাম । বড় দেওরের স্বভাবচারন্র ভাল নয়। 
তারপর বারোয়াঁর বাঁড়, একা মেয়েদের পেয়ে ভূতের মতো খাটাবে। নতুন 
বিয়ের পর আমার অমন হয়েছে কতবার | এই ধাঁড় ধাঁড় মস্কো মুনিষগুলো 
খেত থেকে আসবে, তাদের ভাত রাঁধো হাঁড়ি হাঁড়ি, তাদের চা দাও। তারপর 
গোরুর জাবনা, ধানসেদ্ধ । দম ফেটে মরার জোগাড় । 

এখানে কলোনর লোকেরা তবু দেখবে দরকারে-আর যদি ভগবান নাই 
দেখেন, তবে মানুষ কি করতে পারে কিছু । সাঞ্জানো সংসার পড়ে রইল__ 
ছ'মাস আম রয়ে গেলাম কলকাতায় । এখানকার ডাকঘরের মাস্টারমশাই 
একজনের ঠিকানা 'দিয়োছলেন-_তাঁর ঘরে পৌঁয়ংগেস্ট হয়ে আম, আর উীন 
পি'জ হাসপাতালে । এই ছণ্টা মাস আমার দিনরাতের খেয়াল থাকত না, 
তারিখের হিসেব থাকত না । সকালে ঘুম থেকে উঠে হাসপাতালে যাবার জন্য 
তোর, দুপুরে কোনওমতে দুটো খেয়ে আবার বিকেলে হাসপাতাল-_ 
সন্ধেবেলা যতক্ষণ না সবাইকে বার করে দিত ততক্ষণ ওর বেড়ের পাশে চেয়ার 
নিয়ে বসে থাকতাম | 

গর অবস্থা খারাপের দিকে যাচ্ছিল ক্রমশ, শেষাঁদকে মুখের দিকে একদন্টে 
তাঁকয়ে রইতেন, চোখ দিয়ে জল গাঁড়য়ে গাঁড়য়ে পড়ত । আঁচল দিয়ে চোখ 
মুছিয়ে ঠোঁট চেপে বসে থাকতাম । ওঁর সামনে কখনও চোখের জল ফেলতে 
পাঁরানি উন বেচে থাকতে । 

তনু আর শান্তি খুব খেটেছে এই ছটা মাস । ঘরের কাজকম”, রান্নাবান্না 
সব করে স্কুলে গেছে, খোকাকে দেখেছে । ওদের লেখা পোস্টকার্ড আসত 
সপ্তাহে একটা, ওকে হাসপাতালে পড়ে শোনাতাম | দ:ঃসময়ে ভগবানই কাউকে 
না কাউকে জুটিয়ে দেন। ওর ভাইয়েরা তো এল মাঝে দু'বার, কোনও মতে 


টে 


দায়সারা চোখের দেখা দেখে পরের দিন পুরুলিয়া চলে গেল । একবারও 
শৃধাল না হাতে টাকা পয়সা আছে কনা, কোনও সাহায্য দরকার কিনা । 
অথচ যাঁদের বাড়তে আম থাকতাম, এক বধবা বাঁড় আর তাঁর ছেলে, মাসে 
সাড়ে তিনশো করে নিত, আগে জানাশুনো নেই, অথচ কা মায়মমতা | 
সকাল ন'টায় হাসপাতালে বেরতাম, ভোর ভোর ছেলেকে বাজারে পাঠিয়ে মাছ 
আ'নয়ে কুটে ঝোলভাত রাঁধতেন। আমার ভার খারাপ লাগত । গুর ছেলে 
দুপুরে আফসের ক্যাণ্টনে খায়, 'নজে একবেলা নিরামষ খান । কতবার 
বলোছ, মাঁসমা, কেন 'মাছিাছি সকালবেলা আঁশ হাত করবেন, আমার দুটো 
ভাত হলেই চলে যায়, আর ক ভালমন্দ খাওয়ার ইচ্ছে আছে, মানুষটা 
হাসপাতালে পড়ে । উাঁন বলতেন, না মা, এখন তুম পুরো সংসারটা দেখছ, 
শরীরটা ঠিক রাখা দরকার, আমার মেয়ে থাকলে তাঁর জন্যেও তো রাঁধতাম। 
রাত্তরে আম ফেরা পঞন্ত জেগে থাকতেন, খুটখাট কাজ করে বেড়াতেন। 
শোবার সময় কাছে এসে বলতেন-_অ মেয়ে, জামাই কেমন আছে ? এটটু ভাল 
বলল তো ডাক্তার? শাঁনবার শানবার পুজো দিচ্ছি কালীঘাটে । 

আর একজন ছিল। এলাগনের মোড়ে এক বুড়ো স্যাকরা । কলকাতায় 
আসার সময় সবকটা গয়না নিয়ে এসোঁছলাম । আমার 'বয়ের সময়ের গয়না 
সব- কানপাশা, মফচেন, নাকের নথ, ?টিকাঁল, হাতের আধাঁট, পুরনো খাঁটি 
সোনার জিনিস । অর্ধেকই আমার মায়ের গায়ের। একাঁট একটি করো বাক 
করেছি গুকে লুকিয়ে, ওষুধ গীাকনোছ, রন্ত, অপারেশনের খরচ, বাঁড়তে মান 
অর্ডার। প্রথম দিন দোকানের ছোকরাটা ভেতরে গিয়ে বুড়োকে ডেকে 
এনোছিল। আমার আধময়লা কাপড়, প্রায় খালি গলা, খাল হাত, অবশ্য 
কাচের চুর ছিল- দেখে বুড়ো অপলক আমাকে জারপ করল । গয়না বেচতে 
এসেছ ! ঘাড় নাড়লাম । কানপাশাটা হাতে নিয়ে ওজন আন্দাজ করল । খাঁটি 
সোনা । হাতে টাকাট্ায এনে দিতে দতে বলেছিল, খুব দরকার না পড়লে আর 
এসো না। অথচ ওর কাছেই যেতে হয়েছে বার বার । যোঁদন াবছেহারটা ওজন 
হল, গলায় পধাতর মালা পরে গেছিলাম, বললাম, দাদু আস, আর বোধহয় 
আসার দরকার হবে না। চশমার ফাঁক দিয়ে চোখ তুলে বুড়ো বলোছল, 
[চাকচ্ছা হয়ে গেল ? 

চিকংসা এখনও শেষ হয়ান দাদু, আমার আর কিছ? নেই । তারপর 
অবশ্য আঁফস থেকে টাকা ওরা পাঠিয়োছিল_ ছুটি বিক্রি, জমা টি এ নাহলে 
ভারী আতান্তরে পড়তে হত । 

বারোই মে। সোৌঁদনও সকালে গোঁছ । কেমন আচ্ছন্ন মতন, অনেক ডাকলে 
যেন দূর থেকে একটু উ* বলে আওয়াজ আসে । সিস্টারকে ডাকলাম ৷ এসে 
ব্লাডপ্রেসার নিয়ে ইনজেকশন ?দয়ে গেল । অমন সুন্দর শরীরটা কুঁকড়ে ছোট্র 
হয়ে গোছল, মুখটায় খাল হাড়ের কাঠামো, তার মধ্যে চোখ দুটো আর 
নাকটা জেগে । মাথায় বুকে হাত বুলিয়ে দাঁচ্ছলাম । চোখ খুলে হাঁপিয়ে 
হাঁপিয়ে বললেন, 'খো-কা, তনু ওরা আসবে? বুকটা ছ্যাঁৎ করে উঠল । 


১০ 


নিজেকে সামলে নিয়ে বললাম, তোমার দেখতে ইচ্ছে করছে ? ওদের লিখে 
দিই-_এখানে থাকার জায়গা নেই বলে আনান । 

উত্তর নেই । 

আবার মনে হল যেন ঘুমিয়ে পড়েছেন, ভার নঃবাস । চোখের পাতা 
দুটোর ফাঁক দিয়ে বাদাম মাঁণ দুটোযে কত কণ দেখছে। অনেকক্ষণ বসে 
বসে উঠলাম । বই এনোছলাম, পড়লাম । আজ আর দুপুরে খেতে যাওয়া 
নেই। বিকেলের ছায়া ঘন হয়ে আসছে চারদিকে, ঘুলঘুলতে পায়রাদের 
ডাকাডাঁক। এরই মধ্যে ঝকুলমাখা লম্বা লম্বা বাতির ছায়া দুলতে লেগেছে, 
হাসপাতালে বিকেলের চা-্দুধ শদচ্ছে। ডানাঁদকের বেডে দুই পা ভাঙা 
একজন গুণ্ডানতন লোক, চাউীনটা কেমন যেন। বলে উঠল, এরই মধ্যে 
চললেন ? সাঁড় দিয়ে নেমে তলায় 'এসোঁছ, সামনে দিয়ে মনে হল ছিয়াত্তর 
নম্বর চলে গেল, বেজায় ভিড় । 

হঠাং দোঁখি পেছনে ওয়ার্ডবয়টা দৌড়তে দৌড়তে আসছে । বলল-_উনন্রিশ 
নম্বর ! ওপরে যান। ওপরে যান । পেশেন্ট খংজছে আপনাকে । 

খ*জছেন £ ঘুমিয়ে ছিলেন তো ? 

দোতলা পর্যন্ত পৌছতে বুকের ভেতরটা ধক: ধক: করে বাজছে, পা 
যেন আর চলে না। 

1হমের মতো ঠাণ্ডা কপাল, বরফের মতন দুই পা, ঘাড়টা একাঁদকে হেলে 
আছে, আমার সব টানাপোড়েন শেষ হয়ে গেল । প্রাণবায়ু বেরতে বেবতে শেষ 
মৃহূর্তে ডেকে গোঁছলেন ক আমায়? কেন শুনতে পাইনি, কেন চলে গেলাম ? 
বারান্দার রোলঙে মাথা রেখে অনেকক্ষণ চেষ্টা করলাম, চোখের জল বেরল 
না। ঘাড় পিঠ ফেটে যাচ্ছিল দারুণ ব্যথায় । 

রাঁচ-হাতিয়া প্যাসেঞ্জারে একা একা ফিরে এলাম । গরমে ধুলোর ঘার্ণি 
উঠেছে খোলা মাঠে, চারপাশের জঙ্গলে ধু ধু রোদ্দুর । বাংলাদেশ পোঁরয়ে 
এলে খাঁলই থাকে ট্রেনটা, দেহাতি কাঠুরেরা ভার ধনয়ে মাঝে মাঝে উঠছে 
নামছে । গুর সুটকেসটার দিকে তাকাচ্ছি আর মনে হচ্ছে মানুষটা কতদ্‌রে 
চলে গেল কোথায় ! ফাঁকা থাকে বলে গুকে এই ট্রেনে কলকাতা 'নয়ে 
এসোঁছলাম ; আমার কোলে মাথা রেখে শয়ে শুয়ে দেখাছদ্লন শশীতশেষের 
আকাশ, মাঠবন। বলাছলেন-_যেন নতুন বিয়ের পর বেড়াতে যাচ্ছি, কি গো! 

দোতলার মাসিমা শাঁখা ভাঙতে রাজি হলেন না, শেষকালে পাশের বাঁড়র 
এক বাঁড় এসে নিয়ে গেল। এই দুটো সুটকেস বছানা কলর মাথায় চাপিয়ে 
ওভারব্রিজ পোৌঁরয়ে হাঁটতে হাঁটতে বাসস্টেশন। সারাণ্ডা ঘাটের বাস । ঝরঝরে 
বাসটার মাথায় বোঝাই 'বাঁড় আর কঠাল পাতার গাঁঠার । সূষ" ডুবে যাচ্ছিল 
খালপাড়ে । বুকের ভেতরটা একদম খ্যাল। মাথাটা পাথরের মতো ভারী । 
খালের ?চকাঁচিকে ঠাণ্ডা জল দেখে চিরতরে হারয়ে যাবার ইচ্ছে ক আর 
হয়ান? মনে হচ্ছিল, বাড়ীতি একাট দিনও বোধহয় বেচে থাকতে পারব না! 
মানুষ কি নিজেকেই চেনে £ 


৯১৯ 


পেনশন, সাকশেসন সাটিণফকেট, ব্যাঙ্কের লকার, মেয়ের চাকার,***কন 
হাঁটা! সারাণ্ডাঘাট থেকে সাহেবগঞ্জ, বাস থেকে কাছার, কাছার থেকে 
ট্রেজার ৷ কালোপাড় শাঁড়, খাল হাত, দুপুর রোদ্দুরে, কাকভেজা বায়" 
হেঞটেই চলোছি সেদিন থেকে । দেওয়ালের ছবিতে তনুর বাবার ডাগর দুই 
চোখ । যেন ভেতর পর্যন্ত আমায় দেখে নেন । না, আমার কোনও কল্ট নেই । 
তোমাকে নিজের মধ্যে নিয়ে আম চলে বেড়াঁচ্ছ । কাচের ওপর খালি পায়ে 
হেটে যাদের থাকতেই হয় আমি আজ তাদের ভিড়ে মিশে গোছ। 


বেদপ্রকাশ 


রাত সাড়ে এগারোটা বাজে এখন । 1জপটা গ্যারেজে রেখে আমায় চাঁব 
দিয়ে জয়রাম সিং এইমান্র চলে গেল। ডাইনিং হলে আলোটা জহলছে। 
আমার রান্রের খাবার টোবলের ওপর ঢাকা দেওয়া । শোবার ঘরে তুমুল শব্দে 
পাখা চলছে, সীমা ঘুমিয়ে আছে পুতাঁল আর বাবুয়াকে নিয়ে । ভরদ্বাজ 
আজ আমার বিছানাটা করতে ভূলে গেছে । বিছানাটা পাতলাম, মশার 
টাঙালাম, আজকে আর কিছু খাওয়া সম্ভব নয় । থালাটা সামনে নিয়ে বসেও 
ছিলাম, একটা বশ্ত্রী বিতৃষ্ণার ভাব ভেতর থেকে উঠে এল, একটু চা খেতে 
পারলে হত-_কিন্তু 'নিজে বাঁনয়ে খেতে ইচ্ছে করছে না। একটা সগারেট 
ধাঁরয়ে চেয়ারটা বাইরে এনে বসলাম । অনেকক্ষণ বৃম্ট হয়ে গেছে, আজ 
ভিজে মাঁট থেকে সুগন্ধ উঠছে, আর্র হাওয়া এসে আমাদের গেটের কাছের 
বোগেনোভলিয়া গাছটাকে নাঁড়য়ে দিচ্ছে-টপ টপ করে চোখের জল ঝরে 
পড়ল গাছটার । 

আমাদের এই শরীর, যার এত ঘষামাজা, পালিশ, তাদ্বর তদারক--কা 
বীভৎস তার পাঁরণ?ত ! রতন ঘাসির ডেডবাঁড আমাকে পালাতে দিচ্ছে না। 
মাথাটা ধড় থেকে কেটে আলাদা করে পুতে 'দিয়োছল | হাতপাগনলোকেও 
টুকরো টুকরো করে কেটেছে, যেন ছাগল ভেড়ার মাংস। আর বাঁডটা না পেলে 
ভান সিংহের পুরো জ্ঞাঁতগুষ্টিকে টেম্পোরার জেল বানয়ে রাতভর রেখে 
[দিতাম । বদমাশ । সবকটা জোয়ান ছেলে গাঁ ছেড়ে ফেরার । রামদীহনবাবুকে 
বলে এসেছি, সারারাত যেন বুড়োকে স্কু টাইট দিয়ে ছেলেগুলোর হাদিস বার 
করে। বুড়োর হাত পা কাঁপাছল, নাহলে স্পটেই ওকে আড়ংধোলাই দিতাম । 
ইয়েস, আজ আম রাগে অন্ধ হয়ে গোছলাম । আপাদমস্তক কাঁপাঁছলাম । 
আমার 1দকে তাঁকয়ে আজ বারাঁডর ও 'স ভয় পেয়ে গোছল । আমাদের 
অবশ্য কোনও ব্যান্তগত ইমোশন থাকতে নেই-_সরকার চাকার যে । সমভাব, 
িস-প্যাশনেট, নাবকজ্প মনোভাব । একটা জোয়ান ছেলেকে সাত-আটজন 
গুণ্ডা মিলে ছাগলের মতো জবাই করে দিল । দিন থাকতে থাকতে । আইনের 
মুখে এরা থুতু দেয়, পরম শ্বাস ও অবজ্ঞায় । ভানু সংহের ঘরের পেছনে 
গোয়ালের মাঁটর নীচে যখন রতনের ধড়টা পাওয়া গেল, হাত পা কাটা, চটে 


৯৭২ 


সেলাই করে বাঁধা, তখনও জান না রতনের ঘরের দাওয়ায় দাঁড়য়ে কী আগ্ন- 
পরাক্ষা দেবে আমার পোকায় কাটা আত্মসম্মানবোধ, আমার 'বাক্রিত ?ববেক ! 

[নিচু আটপোরে মাটির ঘর, খড়ের চাল, বাইরে খাটিয়ায় শুয়ে আশি 
বছরের বুড়ো রতনের বাপ, অন্ধ, তেলাঁচটে কাঁথা-বালিশে মিশে আছে। 
উলঙ্গ একটা দুধের বাচ্ছা নীচে ধুলোয় গড়াগাঁড় যাচ্ছে । চার-পাঁচটা বিবর্ণ 
নোংরা শুয়োর আ'ঙনায় ইতস্তত চরে বেড়াচ্ছে । বুড়োর খাঁটিয়ার নীচে 
আযালহুমানয়মের সানাকতে শুকনো ভাত, বোধহয় গতরান্রের। আমাদের 
আসার খবর পেয়ে রতনের বউ বোঁরয়ে এল--ময়লা একটা সাদা শাঁড়, লাল 
লাল 'ক্রিম্ট চুলগুলো হাওয়ায় উড়ছে এলোমেলো, বাঁঘনীর মতো জবলন্ত দুই 
চোখে সে আমাদের দেখল কয়েক সেকেন্ড । আমার সামনে থানাবাবু গল, 
1তনজন কনস্টেবল আর এ এস আই । তারপর সোজা ছুটে এসে দুমদাম 
িলচড় মারতে লাগল আমার বুকের ওপর ওর শরীর থেকে উঠে আসা ঘাম 
ও ময়লার জটপাকানো গন্ধটা গা গুলিয়ে তুলাছল আমার- আমার বৃদ্ধি 
ভোঁতা হয়ে গোছল কয়েক লহ্‌মার জন্য। উপাস্থিত চার-পাঁচজন মেয়েবউ 
ভেতর থেকে দ্ুুত এসে হাত দুটো চেপে ধরেছে ওর । ভয় পেয়ে বাচ্চাটা 
কাঁদতে আরম্ভ করেছে । বুড়ো *বশুর হতবুদ্ধি হয়ে উঠে বসেছে খাটয়ায়, 
চোখে দেখতে পাচ্ছে না বুড়ো কিন্তু বুঝতে পারছে ভীষণ কণ একটা 
গণ্ডগোল হতে যাচ্ছে। কাঁদতে কাঁদতেই পড়শীদের হাত ছাঁড়য়ে নিয়ে দূর 
থেকে চেঁচিয়ে উঠোছল রতনের বউ-_বাহ্‌ রে পুীলশওয়ালা । দনদহারে 
মেরে মরদ কো বকাঁরকে তরহ- কাট দিয়া, ওর তুমলোক বৈঠ-কর তামাশা 
দেখতে রহ গয়ে ! 

প্রাতবেশর এক বউ এবার ওকে ধাক্কা মেরে ঢুঁকয়ে দিল ঘরের ভেতর, 
গা থেকে আঁচিল খসে পড়ে যাচ্ছিল। ঘরের ভেতর বসে গ্াাঁওয়ে গওয়ে 
কাঁদাঁছল রতনের বউ । আর আমার মনে হাঁচ্ছিল আমরা শালা সব নপুংসক 
ক্লীব হয়ে গোছ। খানিকক্ষণ পর বাঁরাঁডর ও স একটা কাচের গ্লাসে জল 
এনে ভয়ে ভয়ে বলোছল, স্যার, হাতটা ধুয়ে 1নন- উীর্ঘটা, আম 
বলেছিলাম, থাক । 

আমি চেয়োছলাম, রতনের বউয়ের কান্নার দাগ, ঘেল্নার ছেটানো থুতু, 
ওর শরীরের ময়লা, বাস গাঁরবির গন্ধ আমার ইউনিফম্্র ওপর চিরতরে 
লেগে থাক । শুতে বসতে খেতে যেন আম এর থেকে পারন্রাণ না পাই। 

পোস্টমটেমি রিপোর্ট পরশ; পেয়ে যাব । কেস চাজশীশট হতেও দোর হবে 
না। 'কন্তু এখনও দশজনের আটজনই ফেরার-_আ্যারেস্ট না করতে পারলে 
এস ডি ও সাহেবকে মুখ দেখাতে পারব না। তার চেয়ে বড় কথা, নিজের 
কাছে আর মানসম্মান রইবে না। এরা ফেরার থাকতে থাকতেই জেলা থেকে, 
পাটনা থেকে ফোন আসতে থাকবে । 

সোঁদন বস ডেকে বললেন, আমার সঙ্গে পাঁরজাত সাহেবের মেলামেশা 
লোকে ভাল চোখে নিচ্ছে না। আম নাক আনুগত্যের 'লামট ছাড়িয়ে বোশ 


১৩ 


মাখামাখ করাছ মিঃ মুখাঁজর সঙ্গে । কারা এই লোকেরা ? 

রামসরণ আর শৃন্রলোচন পাণ্ডে ঘন ঘন জেলা সদরে যাচ্ছে আজকাল । 
কোলয়ারগুলোতে দুশতনটে রেইড লাগাতার হয়ে যাবার পর আজকাল 
এ*দের ব্যবসাতে মন্দা পড়ে গেছে । চার নম্বর আর সারং ওয়াশারর পেমেন্ট 
কাউন্টারে গত একমাস কোনও মহাজন আসোন । এখানকার হিসেবে এটা 
একটা এীতিহাসিক ঘটনা, যুগান্তকারী । কোলকাটারদের কাছ থেকেই 
আজকাল কিছ ফ্রেশ ইণ্টোলজেন্স পাচ্ছ মহাজনদের গাঁতাবাধ 'নয়ে- ওরা 
বলছে আমরাই আপনাদের খবর সাপ্লাই দেব, বশর্তে কি আপলোগ 
হমলোগোঁকে সাথ ন ছোড় দে! হীঙ্গতটা ভারী স্পম্ট । আম বদাল হয়ে 
গেলে ওদের ওপর ডবল মার পড়বে-_-পেটেও, পঠেও । খাদানে মেরেও ফেলে 
রেখে দিতে পারে সাহুকারের লোক-_টিকাটাকর তো অভাব নেই । 

না, আম মনাস্থির করে নিয়োৌছ, আম পালাব না। যাঁদ ওরা বদল করে, 
জবরদাঁস্ত করুক, আমি সারাণ্ডা ঘাট ছেড়ে যাব না নিজের মাঁজণতে । কিন্তু 
সীমা এখানে থাকতে চায় না। ওর বাবাকে এরই মধ্যে লিখে বসে আছে 
আমার জন্য অন্যত্র পোস্টংএর চেষ্টা করছে । অবশ্য চন্দ্রমোহনাঁজ, আমার 
*শবশুরকে আম সঙ্গে সঙ্গে চিঠি লিখে জানিয়ে দিয়েছি যেন বিনা কারণে 
আমার চাকাঁরর ব্যাপারে মাথা না ঘামান। সীমার আসলে এখানে ভাল 
লাগছে না। এখানে কোনও 'িকছুই নেই ওর মনে ধরার মতো । সিনেমা 
হল সাত কিলোমিটার রান্তা। কে নিয়ে যায় ওকে, আমি তো সারাঁদনই 
বাইরে । এটা কণ দরের মহকুমা শহর- ইংরোজ মিডিয়াম স্কুল নেই । ঘরে ষে 
রান্না করে বুড়ো রাবণ মাহাতো সে নাকি এক নম্বরের জংলি অসভ্য । আর 
সবচেয়ে বড় কথা, এখানে আমার চিকংসার কোনও সুবিধে নেই, স্পেশালিস্ট 
নেই । আজকাল ও জবরদীন্ভ আমাকে দিয়ে বনা-নূনে রাঁববার করায়, 
সূর্যপুজো করায় । নিজেও করে। সব দেবতার মান্দরে মাথা ঠোকে, খঃ 
খ*ং করে, সবার ভুল ধরে । কথায় কথায় বলে, ওর জীবনটা নাক জহলে পুড়ে 
শেষ হয়ে গেল। 

ঘরের ভেতর ফিরে এসে অন্ধকার বেডরুমের দিকে তাকিয়ে খাঁনকক্ষণ 
দাঁড়য়ে রইলাম । বাবুয়া পাশ ফিরছে ঘুমের ঘোরে, মুখের মধ্যে আঙুল 
ভরে চক চক্‌ শব্দ করছে । রোজই শৃতে যাবার আগে অভ্যেসবশে এই 
দরজার সামনে দাঁড়াই । এই ব্যবস্থাটা ঠিক কবে থেকে চালু হল মনে নেই । 
তবে বছরখানেক তো নিশ্চয়ই হয়ে গেছে । আমাকে নিজের মুখে কিছু বলোন 
সীমা, একাঁদন দেখলাম পুরনো ছোট খাটটা ঝেড়েমুছে ফিট কারয়ে তাতে 
ছানা পাতাচ্ছে ভরদ্বাজকে 'দয়ে। আমি ভেবোছিলাম, বোধহয় বাচ্চাদের 
আলাদা করে দিচ্ছে । বাবুয়া তো এখন বড়ই ছোট, মাকে ছাড়া শোবে কী করে 
__এই সব ভাবনাচন্তা আমার মাথায় এসোছল । ও যখন ভরদ্বাজকে ডেকে 
বলল- বাবুর ইউনিফর্ম ও-ঘরের হুকে টাঙিয়ে রেখে এসো, ভোরে উঠে বাবুর 
অসাৃবিধে হবে। তখনই আমি ব্যাপারটা বুঝতে পারলাম । পরে দু'একবার 


৪ 


আমার মনে হয়েছে আম কি নিতান্ত কাপুরুষ? আমাদের দেশ মুঙ্গের, 
যেখানকার গ্রামদেশে পুরুষরা এখনও জ:তোর জোরে বউকে 'সিধে করার গর্ব 
করে গোঁফে তা দেয়, শহরেও উঠতে বসতে 'পট:ন খায়, এমন মেয়ে খংজলে 
ঢের পাওয়া যাবে । 1নঃশব্দে, বিনা উচ্চবাচ্যে সীমার এই অনৈতিক ব্যবস্থা 
মেনে নেওয়ার ভেতর আমার সাহসের অভাব সাব্যস্ত করে শ*বশুর-শাশুড়ী 
শালারা নিশ্চয়ই মনে মনে নিজেদের পিঠ চাপড়োছিল । আমার বাড়ির কেউ 
অবশ্য ব্যাপারটা জানে না। বাইরের লোকে কণ ভাবল না ভাবল তা নিয়ে 
মাথা ঘামানোর মতো সময় আমার হয়ে ওঠেনি, দুঃসময়ে নিজের ছায়াই 
যখন মানুষকে পাঁরত্যাগ করে, সে আর কোথায় গিয়ে নালিশ করবে, কাকে 
সাক্ষী মানবে? 

হ্যাঁ, সীমা ভয় পেয়োছিল। ছোঁরাচ লাগার ভয় । আমার ছোঁয়া লেগে 
বাচ্চাদের এই রোগ হবার ভয় । আগুন লেগে পুড়ে যাওয়া চেহারা নিয়ে 
বেচে থাকার আনিশ্চয়তা ওকে গ্রাস করেছিল । আমার শাশড়ীর যে এতে 
সায় ছিল তাও আমি নিশ্চিত করে বলতে পাঁর। আসলে মেয়েদের বাাদ্ধ 
দারুণ প্র্যাকটিক্যাল হয় সাংসারক ব্যাপারে । 

আমার জন্য ও জপতপ করবে, উপোস করবে, ডাক্তারের কাছে আযাপয়েণ্ট- 
মেণ্ট নেবে, কিন্তু যে রিস্ক না নিলেই নয়, তা নেবে কেন? আমি বহুবার 
ভেবেছি, যাঁদ আমার না হয়ে এই অসুখটা সীমার হত, আম ক করতাম ? 
সীমাকে পাশের ঘরে আলাদা করে দিতাম ? ভাবতে ভাবতে শিউরে উঠেছি 
_যাঁদ সীমার হোঁয়াচ লেগে আমার কুষ্ঠ হত, তাহালেও এক বাড়ির মধ্যে 
ওকে অস্পৃশ্য করে দেবার মতো দুঃসহ আঘাত আমি কোনওাঁদন ওকে দিতে 
পারতাম না। এর চেয়ে ওকে ডিভোর্স করে দেওয়া সোজা হত । 

আমাদের বিয়ে হয়েছিল গোপালগঞ্জে, শুরু দশমীর রাতে, বৈশাখ মাস 
ছিল সেটা । আমার মবশুর চন্দ্রমোহন তখন গোপালগঞ্জের উকিল। খজে 
গুরাই বার করোছলেন আমায়, সীমার বয়স তখন উাঁনশ, আরও কিছুদিন 
অপেক্ষা করলে চলত । আম তখন মায়ের অসুখ আর ছোট ভাই ওমপ্রকাশের 
চাকারর সুলুকসন্ধান নিয়ে হিমসিম খাচ্ছি। নিজের কাজেও দারুণ 
টেনশান। সব মিলিয়ে নর সাজার মতন মনোবলের একান্ত অভাব । সীমাকে 
আম বিয়ের আগে দোখান। কৌতুহল নিশ্চয়ই ছিল, তবে বাবা মা মত 'দিয়ে 
ফেলোছিলেন, আবার গিয়ে দেখাটা মনে হল অবান্তর । আমার *বশুর- 
শাশুড়ী অবশ্য আমায় দেখতে এসোছিলেন, আম তখন রাঁচিতে । বাড়তে 
এসোছ ছাট নিয়ে । বিয়ের রাতে সীমাকে যখন প্রথম দোঁখ, জয়মালা হাতে 
1বয়ের বোদতে দাঁড়য়ে সাঁত্য বলতে কী, চোখ ধাঁধিয়ে গোছল আমার । 

আমরা তিনভাই, বোন নেই, মা সারাজীবন ছোটখাটো অসুখে শফ্যাশায়ণ, 
অজ্পবয়সী কোনও তরূুণন মেয়েকে সাজসজ্জায় অপর্‌পা-কাছ থেকে দেখার 
সুযোগ হয়নি । সীমা তখন গোলগাল ছল না আজকের মতো, ছিপাঁছপে, 
গায়ের রঙ.দুধের মতো সাদা, টানা ভূরুর নীচে ঈষৎ দীর্ঘ দুই চোখের বড় 


১৮ 


বড় পক্ষরাজ, আর নাকের ওপর মস্ত একটি হিরে। সব মিলিয়ে মনে 
হয়েছিল রূপকথার দেশ থেকে কোনও পরী যেন নেমে এসেছে মাটতে। 
এক পলকের জন্য মনে হয়েছিল এই তো সেই-_আমার না-দেখা কনে ! অন্য 
কেউ না তো! আমার এই বিম্‌ঢ অবস্থা দেখে বরযাত্রীর দল লজ্জা 
পেয়োছিলেন। শুরুতেই হার, আমার পিসতুতো ভাই 'মাথলেশ আমাকে 
পেছন থেকে একটু ঠেলে দিয়োছল-_-এগো, হাঁদা কোথাকার ! মাত্র দশবারো 
সেকেন্ডের দোর সব মিলিয়ে, তারই মধ্যে লঙ্জা ও অস্বাঁস্ততে বিন্দু বিন্দু 
ঘাম ফুটে উঠেছিল সীমার মুখে । জয়মালা বদলের সময় দেখলাম, ওর 
চোখের পাতায় চন্দনের নিবিড় কারুকাষ+ আমার মনে হচ্ছিল, যেন আমার 
হৃৎপিণ্ডের ওপর কেউ হাত রেখেছে । সীমাকে সবাক দিয়ে ভালবাসব, 
কোনওাঁদন ওকে অসুখী হতে দেব না এইরকম একটা বিশাল প্রাতিজ্ঞার ঢেউ 
আমাকে আকণ্ঠ ডুবিয়ে দিয়ে গোছল সেই 'বয়ের বোদতে দাঁড়য়েই। 

হায়, তখনও আম জান না, আমার জীবনের বাস্তবের সঙ্গে সীমার 
প্রত্যাশার কী আকাশপাতাল তফাৎ! ওর বাবা উাঁকল, পুীলশ আঁফসারদের 
জীবনযান্রার সঙ্গে ওদের পাঁরচয় আছে ভালরকম । চাকাঁরতে যে িশীড়- 
ভাঙার একটা অঙ্ক আছে সেটা ওর মাথায় কখনও ঢোকোঁন। ও বোধহয় 
ভেবোঁছল চকামলানো বাঁড়, অজম্ত্র চাকরবাকর, শহরের নাগাঁরক সুখ- 
স্বাচ্ছন্দ্য, স্বামীর সঙ্গে খাওয়া দাওয়া বেডাঁট, ইভাঁনং-ওয়াক-যা নিয়ম 
বেধে কোনওাদনই আমাদের হয়ে ওঠোন । আমার বাড়তে ভার ভার 'মান্ট, 
তাঁরতরকাঁর, ফলফুলুরি আসে না, এলেও গেটের ওপার থেকে ফিরে যায়। 
তাদ্বর করতে বড় বড় পার্টিরা আসে না, কক্ট্রাক্টর এসে ীবনা প্ররোচনায় 
বাঁড়তে ডিস্‌টেমপার করে দেয় না, আম ফাইভ িফঁট ফাইভ, স্কচ খাই 
না, কয়েক মাসের মধ্যেই আমার অকীন্রম পুলশত্ব সম্বন্ধে আমার শাশুড়ী 
সান্দহান হয়ে পড়লেন, যার কিছু কিছু অংশ নিয়মিতভাবে গুর মেয়ের কানে 
পেশছতে আরম্ভ করল । তাও আমাদের জীবন একরকম ভালমন্দ ?মাঁশয়ে 
চলছিল-_হঠাৎ একাদন সুতো ছিড়ে গেল। 

খাবার ভেবে যন্ত্রণার বঠ্ডাঁশ গলায় আটকে যাওয়া মাছের মতো চিৎকার 
করে উঠেছিল সীমা, একাঁদন সম্ধেবেলা ! আমার কপালে ডানাঁদকে, চুলের 
তলায় প্রায় লুকানো এক সেশ্টামটারের মতো একটা [িনকোণা সাদা দাগ । 
এটা কী? আমি নিজে ওটা লক্ষ করোছিলাম 'দিনদুয়েক আগে । কাজের 
টানাটাশনতে সশমাকে আর বলে ওঠা হয়াঁন। সীমা আমার গলার টাই বেধে 
ধদচ্ছল- রেডি হয়ে আমরা ভুবন কোণলয়ার এরয়ায় যাব সিনেমা দেখতে। 
ওর মুখ কাগজের মতো সাদা হয়ে গেল । যাওয়া তো মাথায় উঠল সোঁদিন, 
রানে খাওয়া দাওয়া হল না, পরের দনও উপোস, মড়াকান্না । 'তিনাঁদনের 
মাথায় *বশুর-শাশুড়ী দৌড়ে এলেন, মেয়ের টোলগ্রাম পেয়েই খুব সম্ভব-- 
তুলকালাম কাণ্ড করলেন, খাটিয়ে খাটিয়ে আমার বংশের 'ঠিকাঁজ কুলাঁজ 
বার করতে লাগলেন, জানা গেল আমার এক দুর-সম্পর্কের দাদুর নার এটা 


৯৬ 


ছিল। আমরা জেনেশুনে বিয়ের সময় লুফকিয়োছ। বাতশ্রদ্ধ হয়ে আমি 
বোরিয়ে পড়লাম টন্যরে ৷ ফিরে এসে দোঁখ এরা তখনও যানাঁন। স্পেশালিস্ট 
ডাক্তারকে বাঁড়তে ডাঁকয়ে অপেক্ষা করছেন । ডান্তার সীমার মাসতুতো ভাই 
হত সম্পকে । গত পাঁচ বছরে 'ন্রকোণ ছোট্ট দাগটা আকারে বেড়েছে, 
সংখ্যায়ও। বাড়তে বাড়তে চোখের নীচে, ঠোঁটে, কনুইয়ে ছড়িয়েছে__ 
[চাকৎসায় বশেষ সুরাহা হয়ান। সেই সঙ্গে আগুনের মতো ছাঁড়য়েছে আমার 
আর সীমার মধ্যেকার দূরত্ব, শীতল বৈরাগ্য ! 

সীমা আমাকে একেবারে আলাদা করে দেবার পর প্রথম প্রথম খুব কম্ট 
পেয়েছি, মনের চেয়েও শরীরে- ফ্রাসট্রেশনে কে*দোছ, রাতের পর রাত। 
তবুও ওর কাছে 'গয়ে দাঁড়াতে সাহস কাঁরাঁন-_যাঁদ প্রত্যাখ্যান করে ! আমার 
আগে যান এখানে পোস্টেড ছিলেন, সুশঈলকুমার, পণ্চাশ বছর বয়সে, 
দু'জন রক্ষিতা ছিল গর নিজস্ব । আমার কাপুর্ষতা আমার জন্য কোনও 
রাস্তাই খোলা রাখোন। বি এতে ইংরেজ আর দর্শন পড়ে স্কুল মাস্টারের 
জীবনদশ“নে মানুষ হয়ে আম প্রাতীনয়ত জের নবশর্য স্পধাহীশীনতাকে 
ঘৃণা করোছি কিন্তু এই চক্রব্যহ থেকে বেরুবার কোনও রাস্তা খ*জে পাইনি । 
অন্ধকার বেডরুমের বাইরে দাঁড়য়ে জের স্ত্রীর ন*বাসের ওঠাপড়ার শব্দ 
শুনতে শুনতেই জীবনের বাঁক দনগুলো কেটে যাবে বোধহয় । বাইরের 
লনে এসে দাঁড়ালাম আবার । আঃ, এখানে হাওয়া কত ঠাণ্ডা ! আকাশ তারায় 
তারায় টইটুম্বুর হয়ে আছে । ওই শনঃসীম নক্ষত্রমণ্ডলে কোথাও আঁকা হয়ে 
গেছে বড় বড় গভশর দুটি কালো চোখ, চোখের পাতার ওপর চন্দনের 'নাবিড় 
কারুকাজ | সীমা, কী অনায়াসে তুমি দুহাতে মুছে দিলে অতীতের সমগ্ত 
চন্দনরেখা ! 


পারিজাত 


তাঁরশ বছর আগেও কে ভেবোছল সারাণ্ডাঘাট মহকুমা শহর হবে 
একাদিন ! জনবসাঁত হাজার দশেক, তার একের তিন সরকার আঁফসের 
লোকেদের পাঁরবার | ?িকছু ক্ট্রান্র, ব্যবসায়ী, দোকানদার ৷ দুই সার 
দোকান গান্ধী চকের মাথায় । সন্ধেবেলা টিম টিম করে আলো জবলে। 
বেতোয়ার ব্যারেজ তোর হয়ে সারাণ্ডাঘাটের নাম ম্যাপে উঠে গেল। নদীর 
মুখ ঘুরে গেল, শুকনো নদীখাত বয়ে গেল অন্যাঁদকে, এ পাহাড় থেকে ও 
পাহাড় বাঁধা পড়ে গেল ব্যারেজের রাস্তা ও স্লুইসে । 'রজাভাঁরের থেকে 
বেরিয়ে জ্যামিতিক চ্যানেলের নকশা সোজা গেছে পাশ্চমে, ওটা মেন চ্যানেল । 
সত্তপুরা স্টিল প্ল্যাণ্টের ওয়াটার পয়েন্টে ?গয়ে পড়েছে । উত্তরে দাঁক্ষণে গেছে 
ইণিরগেশন চ্যানেল, ধিশাল না হলেও মোটামহাট সবল, গ্রামে গ্রামে বেতোয়ার 
জল নিয়ে । মেন চ্যানেল থেকে সরু সরু সাবাঁসাঁডয়ার খাল 'নয়ন্নিত জল 
দেয় চাষের জন্য ৷ খাঁরফের শেষে প্রাতবছর জল নিয়ে লাঠালাঠি, রস্তগঙ্গা হয় 


৩ 
চন্দনরেখা- * 


চ্যানেল পাড়ের গাঁগুলোতে, রাতারাতি স্লইস ভেঙে 'নয়ে যায় সমাজ- 
বিরোধীরা । এই মহকুণা যেন এক রাক্ষস যার প্রাণ সারাণ্ডাঘাটে নেই, আছে 
কোটায় ভোমরার মতন বশাল বিশাল তিন কোলিয়ার এ'রয়ায় সামন্তপুর, 
জারডিহ, ভুবন। কোলিয়ার হেড অফিসে গড়ে উঠেছে পাঁরপণ জনপদ, 
মদভাট, বন্তি, বেশ্যাপল্ল । ইডীনয়ন আঁফস, সাহুকারের দোকানপাট । 
সকাল-সন্ধে খনিশ্রীমক, দালাল, বাবু আর গাঁগঞ্জের লোভাতুর মেয়েপুরূষের 
ভিড় চলে এখানকার হোটেলে, দোকানপাটে | সামন্তপুর আর জাঁরাঁডহ্‌ 
ওপেন কাস্ট মাইনস, এছাড়া আছে ওয়াশার । 

বিধৌত কয়লা চলেছে, ওভারহেড ট্রলি লাইন দিয়ে থামাল পাওয়ার 
প্ল্যাণ্টে । এই মহকুমায় আধা লোকই খাঁনশ্রীমক ও কারগর । ওদের ওপর 
এবং বাণ্তাঁবক ওদেরই কাঁদে বন্দুক রেখে রাজত্ব করে সাহুকার ও ইউীনয়ন। 
ইউনিয়ন নেতা ও সাহুকার গোষ্ঠী মোটামুটি একই ঘরানার লোক, জোঁকের 
মতো কোলকাটারদের শরীরে জেঁকে বসে আছে । মহকুমা অণলের হৃদয়স্থল 
জোড়া এই তিন কোিয়াঁর এঁরয়া ছাড়িয়ে বৃত্তের কেন্দ্র থেকে বলয়ের দিকে 
চলে গেছে নানা রান্তা । প্রথমে পিচ, পরে পিচ উঠে খোওয়া, শেষের দিকে 
শুধুই কাঁচামাঁটর আঁকাবাঁকা পথ । সেখানে আছে ছোট ছোট গ্রাম, 
আঁধকাংশই বিদন্যুৎ-বার্তকার প্রসাদাঁবহীন, রাজপুত ও ভূঁমহাররা ও তাদের 
সেনাবাহনী এইসব ম্যালোরয়ায় আস্থিসার গ্রামা্লের নেতা ও জমির 
1সংহভাগের আবসম্বাদত মালক। আর আছে গ্রাম ছেড়ে চলে যাওয়া 
আঁদবাসী খানশ্রীমক, গাঁ আঁকড়ে পড়ে থাকা আ'দবাসী হারিজন ছোট 
চাষী, প্রান্তিক চাষী ও খেতমজ-র । গ্রামের নাম যা-ই হোক, ভূমিহনের ঘর 
দেখতে একইরকম । তাদের বউ ছেলেমেয়েদের গায়ে সেই একই রকম ট্যানা, 
চোখে 'পচু'টি, মাথার চুল পন্ট ও তেলের অভাবে আগালো ও লাল এবং 
শশনুমৃত্যুর হার সম্ত পরিবারে গড় নিলে যে কোনও গাঁয়েই এক । রতন 
ঘাঁসর জীবনে কোনও বৌঁচন্র্য ছিল না, চমক ছিল রতন ঘাঁসর মৃত্যু ও তার 
অব্যবহিত পরব ঘটনাগুলোর মধ্যে-আমার ও বেদপ্রকাশের দু'জনেরই 
শকছু বিশ্বাস ও আইনের প্রাতি সহজ আস্থা প্রবল ঝাঁকুনি খেয়েছে । 

সামন্তপুর ওপেন কাস্ট-এর স্ট্রাইক তিনদিনের মাথায় কল্‌ড অফ হয়ে 
গেল । হাঁফ ছেড়ে বাঁচলাম । ওখানে দন পনেরো ধরে অত ফোর্স আটকে 
রাখার কোনও ইচ্ছে ছিল না আমাদের । বিশাল এ'রয়ায় রাতে পেপ্রীলং-এর 
অস্বাবধে, তাছাড়া আছে অন্তর্থাতের ভয়। হেভি মেশিনারি, ডাম্পার, 
লোডার এখানে ওখানে ছাঁড়য়ে রয়ে যাবে, ম্যানেজমেন্ট যতই সাবধান হোক । 
দ”তনটে স্ট্রে ঘটনা ছেড়ে দিলে 'তনাঁদনে [বিশেষ ?কছুই হল না। তনাদনের 
দন সকালে প্রভু সং টোলফোনে ধাতাঁন খেল, ইউনিয়নের সেপ্ট্রাল আঁফসকে 
সম্যক অবাঁহত না রাখার জন্য, স্ট্রাইক কল্‌ড অফ । 

ডাকের গোলযোগ কিনা বুঝতে পারাছি না, বাঁড় থেকে কোনও চিঠিই 
পাইনি গত পনেরো দিন। কাল একটা চিঠি দিলাম, অনেকদিন পর সময় 


৯৮ 


করে। একটা সপ্তাহ কেটে গেল দারুণ ব্যন্ততায়_ঘোরের মধ্যে । রাত্রে চার- 
পাঁচ ঘণ্টার বোশ ঘুমোনোর সময় পাচ্ছিলাম না, লখন বেচারা খাবার গরম 
করে করে হয়রান । মাঝখানে একাঁদন চানও করতে পাঁরাঁন- সকালে উঠেই 
বাঁরড চলে গোঁছলাম। রতন ঘাঁসর পাঁরবার দশহাজার টাকা পাবে 
সরকারের কাছ থেকে । রাজপহতের হাতে হারজনের খুন বলে কথা ! দ্রুত 
জয়েণ্ট এনকোয়ার সেরে দিয়েছিলাম, যাতে ওরা তাড়াতাঁড় টাকাটা পায়। 
বেদপ্রকাশ চেয়ৌছল আম গিিজে উপস্থিত থেকে ওর বউকে দিই । 

রতন ঘাঁসর বউকে ধরে ধরে ব্যাঙ্কে নয়ে গেল ওদের এক দূর-সম্পকের 
ভাগ্নে আর ওদের সরপণ, ঝাঁটানয়ার মোড়ে সরকার ব্যাঙ্কে টাকাটা জমা 
কারয়ে আসতে । কাঁচা টাকা ঘরে রাখলে দশদনেই সাফ হয়ে যেত। আ মই 
বলেছিলাম ব্যাঙ্কে আযকাউণ্ট খুলতে ওর নামে । ভূতগ্রন্তের মতো টলে টলে 
হাঁটাছল রতনের বউ । কোলের ছেলেটা একেবারে শাঁকয়ে গেছে এই চার- 
পাঁচাদনে ৷ গতকাল থেকে অনেক সাধ্যসাধনার পর ছেলেটাকে কোলে তুলে 
[নিয়েছে । ইতিমধ্যে অবশ্য অনেক জল গাঁড়য়েছে। 

ভানু িংএর চার ছেলে, ওর সম্বন্ধীর দুই ছেলে আর রাম অবতারের 
ছেলেরা বাঁরাঁড থানায় সারেণ্ডার করেছে । আগাম জামন পেয়ে গেলে 
আমাদের মুখরক্ষে হত না। এটা পুরোপ-াঁর বেদপ্রকাশের টেরর ট্যাকটিকস- 
এর ফল । তিন সেকশন ফোস নিয়ে রাজপুত মহল্লার গালতে গাঁলতে টহল 
1দইয়েছিল বেদপ্রকাশ, শাঁসয়োছল যাঁদ আসামীরা পুলিশের কাছে আত্ম- 
সমর্পণ না করে বুলডোজার 'দিয়ে সব ঘর সমান করে দেবে । শাসানিতে কাজ 
হয়োছল-। আমাদের ইনফরমেশন ঠিকই ছিল, ওরা নিজের আত্মীয় বন্ধুদের 
ঘরে গিয়েই লুকিয়েছে আশপাশের গাঁয়ে । প্ীলশকে বোশি খোঁজাখংাঁজ 
করতে হয়াঁন। সোনাবড়া এমন ছু বনোঁদ গাঁ নয়, বার্ধুও না। সরু 
কাঁচা রান্তা, এ মহল্লা থেকে ও মহল্লায় গেছে । ছোট ছোট ?নচু ঘর, নরক- 
কুণ্ডের মতো গোয়াল, লনর খালের ওপর কধীক্লটের সাঁকোটা মেরামতের 
অভাবে কংকালসার হয়ে ঝুলছে । আঁউনার বোশির ৬।গই থেথর খ:টর 
বেড়া। রোগা ডিগাঁডগে ছাগলের পাল এখানে ওখানে মুখ দয়ে বেড়াচ্ছে । 
আ'দবাসণ গাঁয়ে যেমন লাল-কালো রঙে রাঙানো মাটির ঘর, গোবরলেপা 
আঙন, নধর গাইগোরু মোরগমুরাঁগ দেখা যায়, তেমন ছারছাঁদের 
গেরম্তপনার চিহ্ন এ গাঁয়ের যাদব হারজনদের ঘরে নেই । রাজপুতদের 
ঘরগুলো অবশ্য বড়সড়, টালির ছাদ । ওদের সাত-আটটা পাঁরবার মিলে 
এ গাঁয়ের রেশন দোকান, হোলসেলের চিনি ও কয়লা, মুদিদোকান আর 
এক নম্বার ধানজমি সব ?িছুর ওপর কব্জা জাঁময়ে রেখেছে । 

রতন ঘাস সম্প্রীত দিত খেতমজুর মো5 বলে এক সংগঠন খুলোছিল। 
জ্যালজেলে কাগজে ছাপানো কয়েকটা ইশতেহার এনে দেখাল সরপণ্চ | এই 
গাঁয়েরই পাঠশালা থেকে হাইস্কুল পর্যন্ত গোছল রতন, তার ওপরে আর 
উঠতে পারোন । রতনের ন্যনতম মজুরি, সংগ্রামের কাঁধে কাঁধ মালয়ে ধানের 


১৪১ 


মরসমে খেতের কাজ চলতেই থাকল-_মজ.রকে দিনে পাঁচ টাকা, তার বউকে. 
চার টাকা চার আনা ও এক কাস পান্তা । মোর্চার তরফ থেকে রতন, গঞ্জ? 
ও গণেশ কেস করে 'দিয়োছল চার-পাঁচটা । লেবার ইন্সপেক্টর আসতে দ:'মাস 
নিল, ততাঁদন ওরা তিনজন ও বাঁক পাঁচজন যাদের পক্ষ থেকে কেস হয়োছিল 
পুরোপুরি বেকার। কোনও রাজপুত, ভূঁমিহার, যাদব কড়েআঙুল তৃলেও 
ওদের কাজ দেবে না। 

লেবার ইন্সপেক্টর যোঁদন এল, ভানু সিংহের বাড়তে দুপুরের খাওয়া 
দাওয়া হল। খেয়েদেয়ে চার প্যাকেট সিগারেট 'নয়ে চলে গেল ইন্সপেক্টর, 
রতন ঘাসর দালত মেণচা ভেঙে টুকরো টুকরো হয়ে গেল । গণেশরা ফিরে 
গেল সেই পুরনো রেটে কাজ করতে--রতন গলা ফাঁটয়ে গালাগাল দিল 
ওদের | মাঁরয়া হয়ে গেছিল রতন, না হলে আর কাঁটানয়ার উকলের পাল্লায় 
পড়ে । ভানু সিংহের ছেলের রানা দোকানের ভেজাল তেল খেয়ে ওরা 
বড় হয়েছে সেই মায়ের দুধ খাওয়ার বয়স থেকে । তেল কেনেই বা কই ওরা !' 
মাসে দুশতন টাকার বড় জোর । আল বা ঝিঙে পাড়িয়ে নিয়ে একটু তেলে 
ছ*ইয়ে খায়, নাহলে পায়রাও পোড়ায়, চুনো মাছ বাঁটতে সেদ্ধ করে নেয় । 
রতনকে ওরা সন্দেহ করবে ভাবোন । ভেজালের কেস-এ বুড়ো প্রভূ সিংহের' 
লাইসেন্স ক্যানসেল হয়ে গেল র্যাশন দোকানের, হাতে হাতকড়া পড়ে । 
শেষে জেলায় দৌড়ে সাতঘাটের জল খেয়ে তবে রক্ষা । প্রভূ সিংহের ছেলেরা, 
ভোলোন 'কিছুই-_অচ্ছুৎপুত্রের এই আকাশছোঁওয়া দুঃসাহস, রাজপুতের 
ঘরে পুলিশ ডাকার 'হম্মৎ। 

হাজামদের ছোট ছেলেটা বলাছিল, কারণ সোঁদন দুপুরে ও পিছ পিছু 
যাঁচ্ছল রতনের, বগলে কাগজপন্র রতন যাচ্ছিল কোথাও কাজে । প্রভূ সিংহের 
নাতাঁন কচি গলায় ওকে ডেকেছিল, ওদের নতুন বাছুরটার গলায় দঁড় জাঁড়য়ে 
গেছে, খুলে দেবার জন্য-_বাবুলের বেড়ায় ঘেরা উচু সবুজ পাঁচিলের পেছনে 
সেই ষে রতন মোড় নিল, আর ফেরোন। 

চারজাঁশট দ্রুত করতে হবে। মাঝখানের দুশতনাঁদন ছেড়ে সোনা'বিড়ায় 
আবার গিয়ে বেদপ্রকাশ অবাক । বাঁবাঁড থানার লকআপে সাতজন হারজন 
যুবক । থানাবাবু ভ্রিদব সিংহ নতুন এফ আই আরগুলো খাতা খুলে 
দৌখয়োছল ওকে । আশ্চর্য কথা, গতরাতের মধ্যে রাজপুতদের একাঁন্রশ 
একর ধানজাম আলে ও ভেতরে পোঁতা অন্তত পণ্তাশটা বিশাল বিশাল 
তে*তুল, শিরীষ ও শাল গাছ গঠাঁড়র ওপর থেকে নির্মমভাবে কাটা হয়ে গেছে 
-_ পণ্ঠাশ-ষাট বছরের পুরনো এক-একটা গাছ ৷ অপরাধী গণেশ, ভরত, গণু 
ঘাঁস প্রমুখ সাতজন । এদের ঘরের 'পিছওয়াড়ায় পাওয়া গেছে কুড়ুল, করাত, 
দা ও কাঠ কাটার যাবতীয় সরঞ্জাম, কাটা কাঠের টুকরোটাকরা । 

বড়বাবু তদন্ত সেরে ফিরেছেন সকালে । াবকেলের মধ্যেই গ্রেপ্তার । 
বেদপ্রকাশ সোনাঁবড়ায় ফিরে এল আবার ত্রিদিব সংহকে নিয়ে । সরেজমিন 
তদন্ত । ধানের জাঁমর আগাপাশতলা ঘরে লুনির খাল পোঁরয়ে, আবার, 


০ 


'রাজপুত পাড়ায় । সারা গাঁ শুনশান। হারজন টোলার মেরে বউ আতঙ্কে 
ভিতরে সেঁধয়েছে। রঘু িসং-এর ঘরের সামনে গোরু মোষ বাঁধা । রঘু 
বাইরে বোরয়ে এসেছে । বেদপ্রকাশ থমকে দাঁড়াল- আমরা ভেতরে যাব ! 
আজে, রঘু মিনামন করে নাত জানায়, গোয়ালে ঘরের বউরা গো-পুজনের 
জন্য মাটি লেপছে। ওদের সরে যেতে বলো ! বেদপ্রকাশ গম্ভীর ৷ গোয়ালের 
কোণায় দুই 1ীবশাল মহারুহ তিনটুকরো হয়ে পড়ে। তার ওপর পোয়াল 
চাঁপয়ে ঢাকাঢুকি 'দচ্ছিল তিনজন মজুর । লগন? িং-এর শোবার ঘরে 
ইয়াবড় এক শালের গড় । ভীমাসংহ, তারাসংহ, মন্নসংহ-_দ:ণ্ঘপ্টার 
মধ্যে পনেরোটা রাজপুতের ঘর থেকে অন্তত চল্লিশটা কাটা গাছ টেনে এনে 
ফেলল বেদপ্রকাশ । বাঁক সব চালান হয়ে গেছে ট্রাকে আজ ভোরেই 1 
মাটিতে ট্রাক টায়ারের দাগ দেখলেন ধানখেতে, না চোখ বুজে ছিলেন ? 

'ন্রাদব সিংহ ঘ।মতে আরম্ভ করেছে। 

আম 'কন্তু সাঁত্যই অবাক হয়োছলাম । পুরো ঘটনাটা বেদপ্রকাশ 
বণনা করার পর বললাম, হরিজনদের জড়াবার জন্য এরা নিজেদের জাঁমর 
এতগুলো গাছ কেটে দিল ? 

বেদপ্রকাশ হাসল, ফোরেনাঁসক মোডণসন-এর কেস রেকড-এ পড়োছ 
প্রতিবেশীকে ফাঁপাবার জন্য নিজের িশুকন্যাকে রেপ কাঁরয়েছে বাপ, এও 
তো হয়! কটা গাছ তো তুচ্ছ! 

সোনাবিড়ার আড়ালে আবডালে রাজনোতিক দলগুলো উীকবঝ্ীক 
মারতে লেগেছে । শান্ত যে সবুজ পুকুরে ঢেলাট পড়ে না, সেখানে কুমির 
ভেসে উঠেছে । সময়ে এই ইসত্যর থেকে ফায়দা ওঠাতে চায় সবাই । চৈত্র শেষ 
হয়ে এল । খরায় পোড়া সোনা'বিড়া থেকে সন্ধেবেলা 'ফিরাছি, পাঁশ্চমের 
আকাশ টকটকে লাল, কাঁচা রাগ্ভা থেকে ওঠা ধুলোর গন্ধে মুখের ভিতরটা 
ভার হয়ে আছে । মাঠের ধরে একটা টিউবওরেল | বংশীকে বললাম একট 
রাখ, চোখেমুখে একট জলের ছিটে শ্দয়ে ই । রুমালে মুখ মন্ছাছি, দোৌথ 
রতনের বউ । জল আনতে এসোঁছল । কাঁখে মাটির খঠ৬া, আর এক কাঁখে 
বাচ্চাটা । আমাদের দেখে দু'এক মৃহূত“ ইতঃগ্ভত করল, মুখটা শীর্ণ, রুক্ষ 
চুলগুলো ঘোমটার ফাঁক 'দয়ে বোরয়ে আছে, চোখের কোলে কাল । তারপর 
মাথা নিচু করে আস্তে আস্তে চলে গেল । পাঁশ্চমের লাল আকাশের দিকে মুখ 
করে ওর ক্লান্ত আশাহশন একাক এই চলে যাওয়া হঠাংই যেন *মশানের 
দেওয়ালে আঁকা কাঠকয়লার ছাঁবর মতন বসে গেল আমার অন্তরাত্মার ভিতরে। 

চাঁদপুরের পেট্রোল পাম্পে ঢুকাঁছ তেল নিতে, দোখ বেদপ্রকাশের জিপ। 

থামলি হয়ে আসাঁছ । বেদপ্রকাশ আমাকে নমস্কার করল । আজ সাদা 
পোশাকে । 

আবার স্ট্রাইক নাঁক ? 

নাঃ! ওর গোঁফজোড়া কৌতুকে নাচছে । গভর্নর আসছেন এ মাসের 
শেষে ৷ রুটটা একটু দেখে দিয়ে এলাম এয়ার স্ট্রিপ থেকে । বংশীর কাছ থেকে 


৯ 


ইশারায় গাঁড়র চাবিটা চেয়ে নিল বেদপ্রকাশ । আমাকে বলল" য়; মাইপ্ড। 
ইফ আই ড্রাইভ ? 

যু আর মোস্ট ওয়েলকাম । 

প্রখর নিশ্তষ্ধতা। জিপের যেটুকু আওয়াজ আর চারপাশে পাখপাখালির ৷ 
শহর ছাড়িয়ে রাষ্তাটা নেমে গেছে উঠ্চুনিচ ন্যাড়া জমির ভিতর "দিয়ে । রান্তার 
দুপাশে বনো ঘাস ও আকন্দর ঝোপ, আর অজন্্র পলাশগাছ। সূর্য অগ্ত 
গিয়ে নীলাভ অন্ধকারে ঢেকে গেছে আঁদগন্ত পাঁথবী, নাহলে দিনের বেলা 
হলে দেখা যেত পলাশের আগুনরঙা ডানার স্পন্দমান রং রোদ্দুরে । নিবকি 
জিপ চালিয়ে যাচ্ছে বেদপ্রকাশ । আবছা অন্ধকারে যতটুকু দেখা যায়-_-ওর 
কপালে উদ্বেগ, চোখের মাঁণতে গভীর ব্যথার কাঁপন । 

মুখার্জসাহেব--অনেকক্ষণ পরে বেদপ্রকাশ গজজ্ঞেস করল, একটা কথা 
জানতে চাই । বে-হিচক- উত্তর দেবেন । 

বলুন না। 

যাঁদ দরকার পড়ে পুতাল আর বাবুয়াকে আপনার কাছে কশদন রাখতে 
পার? আমাদের বড়বাবূর বউ দেখে যেতে পারেন মাঝে মাঝে । 

দরকার পড়লে নিশ্চয়ই থাকবে ওরা । লখনই দেখাশুনো করবে ওদের। 
কিন্তু কী এমন দরকার পড়ল, বেদপ্রকাশাঁজ ? ভাবী ভাল আছেন তো? 

হ্যাঁ? হ্যাঁ, সে সব ঠিক আছে । সকলেই ভাল আছে । শুধু আম ভাল 
নেই । আমার দিকে আবার মুখ ফেরায়, আপাঁন এবার একটা বিয়ে করুন 
না, আপনার ভূতবাংলোয় একটু জান আসুক । 

তাড়া কি ভাই? আপাঁন ল্যাজ কেটেছেন বলে 'ি সবাই তাঁড়ঘাঁড় ল্যাজ 
কাটতে দৌড়বে ? 

হাঃ হাঃ করে হাসে বেদপ্রকাশ । হাসিতে কপালের রগ ফুলে ওঠে ওর। 

পরশ সন্ধেবেলা বড়বাবর স্ত্রী এসোছিলেন আমার বাড়তে ! 

কে, জ্যোৎস্নাদেবী ? 

হ্যাঁ। শুর একটা অসবধে আছে, জানেন নিশ্চয়ই । আজিজকে বদলি করে 
দেবার একটা কথা উঠেছে । উীন চান সেটা একট. তাড়াতাঁড় হোক । কিন্তু 
ডশসকে একট বলতে হবে । ইনটোলিজেন্স গিরপোর্ট একটা এসেছে গত মাসে 
_ুর মেয়ের সঙ্গে আজজের ব্যাপারটা নিয়ে এখানে টেনশন হওয়া পিছ: 
বাঁচত্র না। ঝুমারয়ার মসাঁজদের আশপাশের কলোনগুলোতে কয়েকটা 
গোপন মাঁটং হয়ে গেছে। সারাণ্ডাঘাটের 'হন্দু আঁধকার সাঁমাতও 
ব্যাপারটাতে নাক গলাচ্ছে। কলোনর িছু লোক আবার আঁফসের মধ্যে 
ব্যারারটাকে উস্কাঁন দিচ্ছে, অথচ বাইরে ধর্ম ধর্ম করে নাকে কাঁদছে । আমিও 
খোঁজ নিয়েছি, জেনেছি ওর কোনও গ্রুপ টুপ নেই নিজস্ব । কিন্তু ফিলহাল 
ওকে সাঁরয়ে দেওয়াই ভাল । আপনাকে বলতে বোধহয় দ্বিধা হচ্ছে জ্যোৎস্না- 
দেবীর, আপাঁন তো গুদের সঙ্গে ঘাঁনম্ঠ, একট: বলুন গড সকে। ওদের 
আযফেয়ারটা এভাবে শড়াতে থাকলে কে ওকে এখানে বিয়ে করবে, ওদের 


৬ 


বোনেদেরই বা বিয়ে হবে কী করে? 

চিন্তায় আমার ভুরু কুঁচকে উঠেছে বুঝতে পারাছি। আজজ ক শেষ 
পরযন্তি বিয়ে করবে মুকুটকে ? যাঁদ ওরা বিয়ে না করে, তাহলে এই সম্বম্ধ 
অকারণ পাঁক ঘুলিয়ে তুলবে এই সংকীর্ণ শহরে । আর যাঁদ করেও বয়ে, 
তার ভবিষ্যৎ চেহারাটা রখীতমত অনিশ্চিত । 

আঁজজের নীচে তিনটে বোন আছে, কারও বিয়ে হয়নি তাদের ৷ ওর 
বাবার একটা ছোট দোকান আছে জামলায়, সেখান থেকে রোজ সাত-আট 
কিলোমিটার সাইকেল চালিয়ে ও আঁফসে আসে । এ সবই আমার আঁফসে 
শোনা । হারহরবাবু, শিয়ারামবাবু- যাঁরা জীবদ্দশায় গর বাবার বন্ধু ছিলেন 
তাঁদের মুখে শোনা । আজজকে দেখলে মনে হয় বয়স 'ন্রশের ওপর গেছে, 
শুকনো রোগা চেহারা, বয়স আর বাড়লে ধরা পড়বে না, ঠোঁটে যে হাঁসটা 
খেলে সেটা বাঁকা মনে হয়। ওদের নম্বম্ধটাকে সহজ বা আন্তাঁরক ভাবতে 
সবর্দা আমার মন সন্দেহের চড়ায় আটকে যায় । 

মূকুটের গোল শ্যামবর্ণ মুখাঁট, তাতে দুই গভীর কালো চোখ । মাঝখানে 
সরু পথ কাটা ঘনকালো চুল ও সবোপাঁর ছোট ছোট ভুট্টার দানার মতো 
দাঁতে নিষ্পাপ হাঁসিটি, যতবারই শোবার আগে ঘরের আবছা অন্ধকারে বা 
ট্যুরের রাস্তায় সবুজ দিগন্তের কাছাকাছি ভেসে উঠেছে, আম ভেবোছ 
মুকুটের হৃদয়মন বোধহয় কোনও ছেলেমানুষী আক্লোশে আজজকে সমন্ত 
[কিছ দিয়ে জাঁড়য়ে ধরতে চাইছে, এর মধ্যে ষে অন্ধতা আছে তার থেকে ওকে 
বাঁচানো দরকার | বেচাঁর ! কীই বা করবে ও? যখন ওর বয়সী তরুণণ 
মেয়েরা আই এ পড়ার ফর্ম আনতে দৌঁড়চ্ছে কিম্বা শখের জানিস 'কনছে 
বাজারে, ওকে জুড়ে দেওয়া হযেছে জুনিয়র ক্লাকেরে চাকরির ঘাঁনিতে । 

অন্ধকার কারডর, মাকড়সার জালে ঢাকা আলমারি, পদয়ি পানের ছাপ । 
ধুলোমাখা টেবিলের একদকে বসে যদুনাথ, একাঁদকে মকুট-_দশটা থেকে ছটা, 
কোনওঁদন সাতটাও বেজে যায়। ওর কোনও স্বপ্ন নেই, কোনও আকাক্ক্ষা 
নেই, ভবিষ্যৎ নেই । ও চাকার না করলে মনীযা আর শান্তির পড়া হবে না, 
খোকনের স্কুলে যাওয়া বন্ধ হয়ে যাবে । যাঁদবা চাকার ছেড়ে দেবার ইচ্ছে 
প্রবল হয়ে ওঠে মনে, এইসব পাঁরণাঁতর অন্ধকার মুখ ওকে নিশ্চয়ই সম্মন্ত 
করে তোলে । ওর নিজেকে মনে হয় অপরাধগ্রন্ত। আজজের সঙ্গ ওকে এই 
হাঁপধরা ভবিষ্যতের হাত থেকে 'রাঁলফ দেয় । ওকে যে একজন চায়, ভালবাসে 
_-এই বোধ ওর মধ্যেকার ছোট হয়ে হেরে যাবার দুঃখকে নিম্ল করে দেয় । 
আঁফিস ছহটির পর দহএকবার ওদের দেখোছ, মেন হলের বাইরে দাঁড়িয়ে গঞ্প 
করতে । আজজের সাইকেলের বেলটা বাজাচ্ছে মুকুট আর ছেলেমানুষী 
হাঁসতে ভেঙে যাচ্ছে । কচি 'নমগাছের ডালের মতো মনে হয়েছে ওকে 
বিকেলের মায়াবী আলোয় । বাঁড় ফিরেই নাক ও বিষাদের মুখোশ পরে 
নেয় মুখে। 

[নরন, স্বপ্নহখন আমার ঘরের দিকে এাঁগয়ে চলোছ । বোঁশ রাত হলেই 


২৩ 


দেওয়ালগলো যেন কাছে এসে আম্টেপৃন্ঠে জাঁড়য়ে ধরতে চায়। পেপারওয়াক 
শেষ হতে হতে মধ্যরাত, তারপরেও অনেকক্ষণ বসে বসে বই পাঁড়। দারাং 
পাহাড়ে পাখির কলরবে সকাল হয়ে যায়। 


বেদপ্রকাশ 


যহ্‌ তেরা নূর হৈ যো 
চেহরে পে পড়্‌ রহা মেরে 
বরনা কৌন পুছতা মুঝে 
অন্ধেরে মে*। 
এ তোমারই আভা আমার ওপর পড়ে আমার মুখ আলোকিত করে 
তুলেছে । নাহলে এই অন্ধকারে আমাকে কেই বা দেখত ! 
আজ থেকে পাঁচ বছর আগে এক দারুণ শীতের রাতে খাগাঁড়য়ার 
ডাকবাংলো থেকে এই কাঁবিতাঁট উদ্ধৃত করে এক দীর্ঘ_ দীর্ঘ চিঠির সঙ্গে 
সীমাকে পাঠিয়েছিলাম । কাগজটা সাদা হ্যাশ্ডমেড পেপার লালচে হয়ে 
এসেছে, কাঁবতাটা অবশ্য শদাব্য জহলজহল করছে আমার চেতনায় । আমাদের 
বুকর্যাকে একটা উপন্যাসের ভেতর থেকে চিঠিটা বোঁরয়ে এসেছে । বইগুলো 
বার করে ঝেড়ে মুছে আবার সাজাচ্ছিলাম । সীমা রান্নাঘর থেকে একবার 
বোঁরয়ে দেখে চলে গেল । 
খানিকপরে বাবন এসে বলল, দিন সাহেব, আম করে দিচ্ছি । 
বললাম, না, তুমি যাও । 
আসলে আজ আমার খুব কাজ করতে ইচ্ছে করছে । আঁফসের সঙ্গে যার 
কোনও সম্পর্ক নেই, এমন স্াম্টছাড়া কাজ । আজ সকালে উঠে পৃতাঁলির 
নখগুলো কেটে দিয়েছি, বাবুয়া ভয় পেল, কাছে এল না । ওরা এখন ভেতরের 
বারান্দায় পায়রাদের খাওয়াচ্ছে । 
এতাঁদন বাইরের কাজে এত ব্যন্ত থাকতাম, ঘরে আসতাম আঁতাঁথর মতো । 
খেয়েদেয়ে ঘুমিয়ে পড়তাম | জীবনযান্রার খটিনাঁট কখনও চোখে পড়ত না। 
হঠাৎ নাড়তে টান পড়ে আমার ঘোর কেটে গেছে । মাস ছয়েক আগে 
সন্ধেবেলা খাবার টেবিলের ওপর যশোবন্ত পাবলিক স্কুলের রঙচঙে প্যামফ্রেট 
দেখে মনে মনে হেসেছিলাম । সীমার এক বাতিক- প্রবল মোহ কনভেন্ট 
এডুকেশনের ॥ ছেলেমেয়েকে বানাতে হবে লাখের মধ্যে এক-_তারা যেন দুধের 
দাঁত পড়ার আগেই জয়েন্ট এক্ট্রান্সের মেরিট লিস্টে উদয় হবার স্বপ্ন দেখতে 
শেখে, দিল্লির সবচেয়ে প্রখর কলেজ থেকে বোরয়ে হারভারডের 'দিকে উড়ে 
যায়। সারাণ্ডাঘাটে ওদের উপযুুস্ত কোনও স্কুল নেই, এই নিয়ে সীমার মনে 
যথেম্ট উদ্বেগ ছিল | ওদের ভবিষ্যং নিয়ে কোনও রাঁঙন স্বপ্ন দেখে যাঁদ সীমার 
মন শান্ত পায় পাক, কিন্তু দুই ছেলেমেয়েকে হস্টেলে রেখে রোসিডেন্সিয়াল 
স্কুলে পড়াবার মতো স্ত্মর্থ্য সাত্যিই আমার নেই । বাবুয়া অবশ্য খুবই 


৪ 


ছোট । ওকে স্কুলে দেবার প্রশ্নই ওঠে না। কিন্তু ষে রান্তায় এগোবার কথা 
সীমা এখন ভাবছে, তা যেমনই কুটিল, তেমনই পাঁকে ভরা । আশ্চষ, আমার 
সঙ্গে কোনও পরামর্শ করার প্রয়োজন আছে বলে ভাবোন সামা । একটি 
কথাও জানায়নি আমাকে । সম্পূর্ণ অপ্রত্যাশিত একটা দিক থেকে ব্যাপারটা 
জানলাম পরশু । 

রামপুর থেকে একজন প্রো শিখ এসেছিল, লোকাল এম এল এর চিঠি 
নিয়ে । ভাষাটায় অদ্ভূত একটা মোচড়--“আপনার পাঁরবারের বিশেষ ঘাঁনষ্ঠ 
1হতাকাঙ্ক্ষী এই পন্রবাহক'-এর কেসটা ব্যান্তগত মনোযোগ দিয়ে দেখবেন । 

আমার পাঁরবারের হিতাকাত্ক্ষণ ? একে তো কখনও দোঁখাঁন? বিনীত 
সদারাঁজ হাত জোড় করে বলোছিল-আমার ছোট ভাই খাজান সিং যখন 
আযারেস্ট হয়োছল, ওকে জামনে ছাড়াতে এসৌঁছলাম, তখন দেখে থাকবেন 
আমায় । 

অসৎ লোকেরা লঙ্জাহগন হয়। রোজ কত লোক বেইলড আউট হচ্ছে, 
তাদের মুখ মনে থাকে নাকি ? খাজান [সিংহ কণ্ট্রোলের চিনির বন্তা ব্ল্যাকে 
বিক্রি করে দিয়ে গোডাউনে চিানর সঙ্গে গমের ভূষি মিশিয়ে ভরে রেখোঁছল। 
প্রভেনশন অফ ব্র্যাকমাকেণটং আহে কেস হয়ে এক বছর জেলের আদেশ 
হয়েছে কিছুদিন আগে । খাজান দংহ আমার পাঁরবারের হিতকাঙ্ক্ষণ ? 
হিতাকাত্ক্ষার কতরকম চেহারাই দেখতে হবে এই চাকাঁরতে ! 

বড় বিপদে পড়ে আপনার কাছে ছুটে এসেছি, ডি এস পি সাহেব । 
খাজান সিংহের একটিই মেয়ে । চার-পাঁচ হবে বয়স মাথায় টিউমার হয়েছে 
বেচাঁরর ৷ এখানকার ডান্তাররা ধরতে পারছে না, ম্যালিগ্‌নাণ্ট বা বেনাইন । 
বম্বে নিয়ে যেতে হবে। খাজান 1সংহ জেলে যাবে কদিনের ভেতর, আপনার 
মতো মান্‌ষের দয়া না পেলে । তখন ওর মেয়েকে বউকে কে দেখবে বাবদ 
সাহেব ? খাজান সং-এর বউ শয্যাশায়ী, আমরা দিনরাত ভেবে ভেবে পরেশান 
হয়ে যাচ্ছ। 

এই স্টেজে আমার আর কছু করার নেই । সরকার কেস অ্যাপ্রভ করে 
দিয়েছে । এসব সেপ্টমেপ্টাল কথা বলে আমাকে বিব্রত করবেন না আপনারা । 
যান__। 

দরজার কাছে ওড়নায় আধঢাকা এক শিখরমণীর মুখ একবার দেখা দিয়েই 
সরে গেল । লোকটা স্ত্রীকেও নিয়ে এসেছে মমতা আদায় করার জন্য । 

আমাকে আর একট সময় দিন বাবুজি । দূর থেকে এসোৌছ । আমরা 
উাঁকলের সঙ্গে পরামশ* করোছি। পাট“ এবার হাইকোর্টে যাবে সরকারের 
অর্ডভরের 'বরুদ্ধে। এই সময় আপাঁন যাঁদ একটা নিরপেক্ষ তদন্ত রিপোর্ট 
পাঠাতে পারেন, তাহলে সাপ্লাই ভিপার্টমেণ্টের কেসটা কমজোর হয়ে যায়? 
একটা পাঁরবার বেচে যায় হুজুর । 

এরকম কেস নতুন নয়, সীতামঢ্নীতে আগে একবার হয়েছে, দু'সাল আগে । 
নিরপেক্ষ রিপোর্ট দেব আম ? কার অডণরে ? আপনার দুঃসাহস, আপনি 


৫ 


একজন ক্রিমিনালকে বাঁচানোর জন্য পুলিশের সাহায্য চাইতে এসেছেন ? যান 
এখান থেকে । চেনেন না আমাকে-_-। হিফোর আই টারন্‌ ইউ আউট-_-গো ! 

প্রো হাকিম সং নড়ল না, গুর কাঁচাপাকা গোঁফদাঁড়র ভিতর দয়ে 
রহস্যমাখা বিষপ্ন এক হাসি ফুটে উঠল । বলল, হুজুর, আপনারা দয়া 
করেন তাই আমাদের সাহস হয়, নইলে আমাদের আর “অওকাৎ কী? 
সোশ্যাল কাজও কু ছু আমরা কার | খাল [বিজনেস কার না। সেই 
সুবাদে আপনাদের সঙ্গে জানাশুনো হয়েই যায়। নওয়াদার উকিলসাহেব 
খবর পাঠালেন, আমার মঝলা ভাই অমর িং গিয়ে সব সেট করে এল । ড 
এস পি সাব বোঁটকে-বেটাকে পাক স্কুলে পাঠাতে চান, আচ্ছি বাৎ! 
আমাদের ঘা সাধ্যে কুলোয়, আমরা করেছি । আপনার বোট আর খাজান 
িসংহ-এর লড়াঁকর কতই বা বয়সের তফাত বাবুসাহেব ? কাল আপনার মেয়ে 
ঝকঝকে শানদার ইউনিফর্ম পরে স্কুলে যাবে, আর খাজানের মেয়ে বনা 
ডায়াগনোঁসসে জেলা হাসপাতালে মরে যাবে তাই বা ক করে মেনে নই ! 
আপনিই বলুন ? 

নওয়াদার উাকলসাহেব, মানে সীমার বাবা । নিজের অজান্তেই শরীরের 
ভেতর শীত-শত করে উঠল । অপরাধী ব্যবসায়ধর দাক্ষণ্যে নাতি-নাতাঁনকে 
পাবলিক স্কুলে পাঠিয়ে নিজের বিবেকের কাছে পাঁবন্র হয়ে বসে থাকতে চান । 
এবং এই সামাঁজক পাঁরবারিক ফয়সালায় ছেলেমেয়ের বাবার যে কোনও 
ভূমিকা থাকতেও পারে, ভুলেও মনে করেন না। 

আঁফিস থেকে সময়ের আগেই বাঁড় চলে এলাম । সীমা অকাতরে 
ঘুমোচ্ছিল। পূতাল ও বাবুয়া বারান্দায় একরাশ ইট ও বাল কাদা এনে 
ব্রজ বানানোর সেই শাশ্বত খেলায় ব্যস্ত । আমাকে দেখে দু"জনে দৌড়ে এল । 
এত সকাল সকাল বাবাকে কখনও বাড়তে দেখোনি ওরা । 

কাল আম সীমাকে মেরোছ। জন্তুর মতো অন্ধ হয়ে গোছলাম রাগে, 
আমাদের দারুণ ঝগড়া হয়েছিল । শেষকালে নীজেকে সামলাতে পারলাম না 
সীমা যখন শাসাল-_বাচ্চাদের তুলে নিয়ে চলে যাব নওয়াদা, উকিলের মেয়ে 
আমি, দোঁখ তুমি কী করে ঠেকাও, তখন সব মধ্যাঁবত্ত ভদ্রতার বাঁধ ভেঙে গেল 
আমার । মার খেয়ে সীমা কাঁদোন, উলটে গালাগাল 'দয়োছল। তারপর 
বাঁড়র কাপড়েই চপ্পল পায়ে গালয়ে বোরয়ে গেল বাঁড় থেকে । ফিরে এল 
ধিনজেই, রাত সাড়ে দশটা নাগাদ । হয়তো ইারগেশন কলোনিতে কারও বাঁড় 
গিয়ে বসেছিল । ঈ*বরের 'দাব্য, না এলে আমি ওকে খ'জতে যেতাম না। 
হয়ে €পুইন্কুতে ওর প্রাত! 
ভুটস্ নাবুয়াকে “ফী, শুইয়ে দিলাম, নিজে শুলাম ওদের 
মাবখানের্ গা এসে গিয়োছল, মর ভেতর ও আসতেই আমি উঠে 


















চলে সু কার মঙ্লের'।মধ্যে আমল থেকে গেছে লম্বা এক 
কাঁটা-* মার স্বাব্য়ার্কে ভ্টাখের আড়াল করতে ভয় পাচ্ছি। 
আইনের স্ক২শঠনিত। 


। যাঁদ ও সেরকম ড্রাঁস্টক কিছু 


করেই বসে, বাচ্চাদের লিগাল কাস্টাডি কে পাবে-_ও না আমি ? সামার সঙ্গে 
কথা বন্ধ। পুতাঁল আর বাবুয়া আমার পায়ে পায়ে ঘুরছে, ওদের মনে 
অনুচ্চাঁরত কিছু আশঙ্কা, দিছু ভয়। ওরাও বুঝতে পারছে ফাটলটা 
সোজাস্ীজ নেমে এসেছে আমার ও সীমার সম্পকে মধ্যে। 

আজ ভোরে ওদের 'নয়ে ব্যারেজের রান্তায় বেড়াতে গেলাম । ভারী মনোরম 
ছিল আজকের ভোরবেলাটা ৷ মেঘলা কিন্তু বৃষ্টি নেই, হাওয়ার ঝাপট এসে 
লাগাঁছল চোখেমুখে । পাহাড়ের পিঙ্গল সবুজে আনঃশেষ শান্তি, সাঁর সার 
ডাঙনৌকো চলেছে-_ মাছধরা জেলের দলের নৌকো । এক-একটা নৌকো 
যায় আর জলের ভিতর পাহাড়ের ছায়া দুলতে দুলতে ভেঙে চুরমার হয়ে 
যায়। পুতি চুল ডীঁড়য়ে, ফ্রক ডীঁড়য়ে খুব দৌড়োচিছল । 

ফেরার পথে মিঃ মুখাঁজর বাঁড় হয়ে এলাম । আজিজ চলে গেছে বদাল 
হয়ে সারাংগা । যাবার আগে অপ্রীতিকর একটা পাঁরাক্ছীতি তোর করোছল-_ 
মানি অর্ডারের টাকা পাঠিয়েছিল মুকুটকে। তাই নিয়ে বাড়তে অশান্তি । 
জ্যোৎস্নাদেবশী অবশ্য ডাকাঁপিওনের কাছ থেকে টাকা নেনান, 'ফারয়ে 
দিয়েছেন । মায়ে-মেয়েতে কিছু কথা-কাটাকাটিও হয়ে গেছে । বদালিটা খুবই 
দূত হয়ে গেল আণজজের | হয়তো ওর মা জেলা আঁফসে কাউকে ধরোছলেন । 
[মঃ মুখাঁ্জ বলাছিলেন, ওদের গ্রাম থেকে মেয়োটর জন্য বিয়ের সম্বন্ধ এসেছে 
একটা । তবে মুকুট কি বিয়ে করতে রাজি হবে ? মনে হয় না! 

বাচ্চারা কল-কল করে টিলার ওপর দৌড়ল। পাঁরজাতবাবর বাঁড়তে 
যাওয়ার এই রাস্তাটা ভার সুন্দর নাঁড়পাথরে ঢাকা আঁকাবাঁকা, দুই পাশে 
পাঁচমেশাল বড় বড় গাছ, তাদের শরীর থেকে বষরি সুগন্ধ বেরোচ্ছে । রাষ্তার 
শেষে কেনটাঁকি ঘাসে ঢাকা লন, লন পোৌরয়ে ঢাকা বারান্দা । পারজাতবাবু 
তখনও রাতের পোশাকে । লনে ছোট টোবিলে চেয়ার নিয়ে বসে কী লিখছেন, 
পাশে চায়ের পট, কাপ । আমাকে দেখে হাসমুখে হাত বাঁড়য়ে দলেন । 

ক লিখাঁছলেন 2 

কাবতা ৷ 

আপনি বাংলায় লেখেন ? 

হ্যাঁ । অন্য কোনও ভাষায় লেখার মতো আত্মীয়তা নেই, ব্যাকরণের 
সঙ্গে। 

দেখি ? 

কাঁবতা আর কা দেখবেন, এইটা দেখুন ! 

সকালের কাগজটা বাঁড়য়ে দিলেন । প্রথম পাতার নীচের 1দকে ডানাঁদকে 
মাঝাঁর অক্ষরের হেডলাইন ও প্রায় চারকলম খবর । 

নিজস্ব সংবাদদাতা লিখেছে । আপনার ক মনে হয় ? 

সব বোগাস। আপনাকে এত তাড়াতাঁড় কোথাও যেতে 'দচ্ছি না 
আমরা । আপাঁন তো এখনও একবছর কমাঞ্পট করেনান। 

রাজধানীতে যারা আছে তারা বছর মাসের হিসেব রাখেন না, বেদ- 


২০ 


প্রকাশজি । মাফিয়া কার জন্য কত দামের টিকিট এটেছে, সেটাই আসল 
কথা । আমরা দু'জনে যেটুকু পারবর্তন আনতে সাহায্য করোছ সেটুকু তো 
রয়েই যাবে । আমার কোনও দুঃখ নেই, যদি যেতেও হয়। 

পুতুল, বাবুয়া কাম অন, আমরা যাব ! আমার মনে পড়ে গেল, আজ 
রাঁববার । সীমার সৃযপুজো, উপোস । মনের ভেতরটা 'বিস্বাদ হয়ে গেল 
আবার । 

আমার আপাতত আছে। আপাঁন এত তাড়াতাঁড় যাবেন না মিঃ 
মুখাঁজ। আম বড়-__ 

প্রবল আনচ্ছেয় বন্দুকের ফাঁকা আওয়াজের মতো কথাটা উীঁড়য়ে দিলাম 
আমি একা হয়ে যাব তাহলে ! 

বারান্দার সামনে বড় দেওয়াল আয়নায় আমার ছায়া পড়োছিল । খাবলা 
খাবলা সাদা দাগ কপালে, গালে ঠোঁটে-ঠোঁটে কালচে সাদা ছোপ পড়তে 
লেগেছে । সীমার গালে চড় কে মেরেছিল ? বীভৎস কোনও ইতর প্রাণ ? এই 
কি সে? তাহলে আমি কে? 


পারিজাত 


ঢাকা বারান্দার নীচে দাঁড়য়ে আঁছ। বাঁধের জলে ঝলমল করছে 
জ্যোৎস্না । রাত দেড়টা বাজে এখন। ঘুম আসছে না। অনেকক্ষণ এপাশ 
ওপাশ করে উঠে পড়োছি আবার । রাতচরা পাঁখরা মাঝে মাঝে ডাকাডাক করে 
উঠ্ছে-_-এক গাছ থেকে অন্য গাছে মন্ত্র বিনিময় চলেছে । বাগানে আর একট; 
এঁগয়ে দাঁড়ালে এখন দেখা যাবে ব্যারেজের বাঁধানো রাস্তা__হসাঁকউীরাঁট টহল 
দয়ে বেড়াচ্ছে এ মাথা থেকে ও মাথা । তারই সঙ্গে সসকোণে পূর্ব থেকে 
পাঁশ্চম দিকে যেন চ্যানেলের দীর্ঘ" জলরেখা উজ্জ্বল এক পথের মতো পড়ে 
আছে । পণ্তাশ কিলোমিটার গেছে এই জলপথ সপ্তপুরা স্টিল প্র্যাণ্টের 
রিজাভার পযন্তি। ূ 

দিন পনেরো আগে মুকুটকে যখন বাঁড় পেখছে দিয়ে একা একা ফিরে 
এলাম সোঁদনও না ঘুমে অনেকটা রাত কেটে গোছল । কী আশ্চর্য মানৃষের 
মন! যখন জসীমপুর থেকে ফিরে অন্ধকার বারান্দায় ওকে বসে থাকতে 
দেখোছলাম, হঠাৎ মনে হয়োছল জিপ ঘুরিয়ে ফিরে চলে যাই । ওর সঙ্গে 
সোঁদন সন্ধেবেলা মুখোমাখ হবার মতন কোনও মানাঁসকতা ছিল না আমার । 
এটা কাপুরুষোচিত হতে পারে । তবে কাঁদন ধরেই মনে হচ্ছিল, যতটা শোভন 
তার চেয়ে বৌঁশ আগ্রহ দোঁখয়োছি ওদের, 'াবশেষ করে মুকুটের ব্যান্তুগত 
ব্যাপারে ৷ যাঁদও জানি সঠ্কোচের সঙ্গেই জ্যোৎস্নাদেবী আমার মত চেয়েছেন 
আভাসে হীঙ্গতে, আমাকে স্পম্ট বলতে পারেনাঁন বলে বেদপ্রকাশের কাছে ছুটে 
গেছেন, তবুও আমার এইভাবে জাঁড়য়ে পড়ায় মুকুটের কতখানি সায় আছে 
আমার জানা নেই । আর মুকুট তার সব জেদ, ছেলেমানুষী লড়বার দুঃসাহস 


কট 


[মশিয়ে এমন এক স্পম্ট ব্যান্তিত্ব ধাকে চোখের আড়াল করা অসম্ভব । 

সোঁদন স্বভাবতই ভেবেছিলাম, মুকুট ছুটে এসেছে আমার ওপর রাগ ও. 
আভমানে। ওর পক্ষে এটাই ভাবা স্বাভাবিক যে আজিজের বদাঁলটা আমরাই 
উঠে পড়ে কাঁরয়ৌছ । হয়তো ঝগড়া করবে বা কান্নাকাটি, অথচ ওকে দেবার 
মতো কোনও বিশ্বাসযোগ্য প্রত্যুত্তর নেই । অথচ তেমন কছুই করল না ও। 
ওর চোখ দুটো ঈষৎ লাল ও ফোলা-_-অনেকক্ষণ ধরে কদে এলে যা হয়। 
ঠিকই শুনেছিল মুকুট-_সারাংগার বদালর অর্ডার আজজ ীনজেই করিয়েছে, 
ফাইলের প্রায় পিছু ধাওয়া করে । নাহলে এত দ্রুত হত না। জেলা আঁফসের 
একজন কেরানীকে 'কছু টাকাও দিয়েছে আজিজ । মুকুন্দ বলে একটি ছেলে 
আছে আমাদের আফসে। যার কাকা কাজ করে জেলায়, সেই এসে বলেছে 
মুকুটকে | মুকুট আশ্চর্য হয়েছে, দুঃখ পেয়েছে, আর তার চেয়েও বোশ 
1ব*বাসভঙ্গের আঘাত । 

আপনার ক? মনে হয় এটা সাত্য ? 

কী এসে যায়, আমার মনে হওয়া না হওয়ায় ধখন এর চেয়েও মম্বান্তিক 
দুঃসংবাদ ওকে দিতে হবে। কথাটা ওকে বলব না কয়েকাঁদন ধরেই ভাবাছি। 
আজ ও ীনজেই চলে এসেছে আমার কাছে । যন্ত্রণায় ছটফট করতে থাকা 
মৃতপ্রায় ই'দুরের দেহের ওপর আজ থেকে ষোলো বছর আগে গরম জল ঢেলে 
দয়োছল এক কিশোর | তারপর দাঁড়য়ে দাঁড়য়ে দেখোছিল, ছোট্র শরণরটার 
থর থর করতে করতে একসময় থেমে যাওয়া । মা এসে ঠাস ঠাস করে চড় 
মেরোছলেন দুই গালে- দয়ামায়াহীন, নিষ্ঠুর, কী করে তুই এমন হালি 
পারজাত, আমাদের ছেলে হয়ে ? 

খবরটা এনেছে ডি আই 'বি"র খুব নিভ“রষোগ্য একজন লোক । কাঁমউনাল 
টেনশনের খবরগুলো এর আগেও ও এনেছে যথাসময়ে, তৎপরতার সঙ্গে । 
বেদপ্রকাশ জানতে পারে সবচেয়ে আগে । তারপর আমাকে জানায় । 

কাঁরমগঞ্জের সালম্যাদ্দন মহম্মদ আজজের *বশুর । দু'বছর আগে 
বয়ে করেছে আজজ । অবশ্য বউকে এখনও ঘরে আনোন । সালম্দাদ্দন 
আ জজের বাবার ব্যবসায় কিছু টাকা ইনভেস্ট করতে চায়। সেটাও আটকে 
আছে । এবার ঘটনাগুলোর পর আজিজের ওপর চাপ, বউকে ঘরে আনো । 
চাপ পড়েছে মহল্লার তরফ থেকে । ব্যাপারটাকে আর ঠেকানো যায় না। তাই 
তড়ঘাঁড় এই বদলি । 

তোমাকে কখনও আঁজজ বলোঁন যে ও বিবাহত ? 

সাদা পাণ্ডুর দেখায় মুকুটের শ্যামবণণ মুখ । আমার টোবলের ওপর 
রাখা ঠপনকুশনের পিন একটা করে তুলছে আর ঢ্াঁকয়ে 'দচ্ছে। 

কখনও ওকে জিজ্ঞেস কারান । 

কিন্তু ও কি তোমাকে বিয়ের প্রন্তাব দেয়ীন কোনওাঁদন ? 

দিয়োছিল | কিন্তু এসব কথা কিছ? বলোনি। 

আঁম স্থির হয়ে বসে মুকুটের চোখের জল দেখাঁছলাম মোঁদন । একটার 


২৯ 


পর একটা ফোঁটা চিবুকের ডোৌল বেয়ে ঝরে ঝরে ওর শাড়ির সাদা কালো 
ডোরার ঘে*ষাঘেশীষ অন্ধকারে মিশে যাচ্ছে। 

আম এখন কী করব বলুন তো? আফসের বুড়ো লোকগুলো আড়ালে 
যা-তা বলাবলি করে। িওনগুলো সামনেই টিটাকার দেয়। এবার তো 
আমার কাজ করাই মুশাঁকল হয়ে যাবে। পড়ার জন্য বই নিয়ে যাই বাড় 
থেকে, যতটা পারি ওদের এাঁড়য়ে চঁলি। চাকার তো করতেই হবে আমায়, 
খোকন চাকার না পাওয়া পর্যন্ত আমার মূস্তি নেই। ওই দম-আটকানো 
অন্ধকারে বসে বসে ওহ 

তুম আই-এর জন্য পড়া শুরু করো ম.কুট । আমি বই এনে দেব তোমার 
জন্য । পড়াশুনোয় এত ভাল ছিলে তুমি--বি এ পাস করো, ব্যাঙ্কে চাকারর 
পরক্ষা দিতে পারবে । সারাজীবন এখানেই যে থাকতে হবে তার ক মানে 
আছে ? 

আম কিছু পারাছ না যে। জানেন বাড়তে আমার সঙ্গে ভাল করে 
কথা বলে না কেউ, বোনগুলো পর্যন্ত মুখ বেঁকয়ে থাকে । মাসের মাইনেটা 
যোঁদন মার হাতে তুলে দিই সৌদন মা একটু হেসে কথা বলে, তারপর ষে-কে 
সেই । আম চাকার কাঁর বলে নাক আমার আরাম, আর ওরা উদয়ান্ত খাটছে 
আমার জন্য ! খোকা না থাকলে সব ছেড়েছড়ে চলে যেতাম । 

আমি মাসমাকে বুঝিয়ে বলব । ওরাও টেনশনে ছিলেন তোমার জন্য, 
তুমি তো বুঝতেই পারছ । এখন সব মিটে গেল, ওরা আন্তে আস্তে সবাই 
তোমার কাছে চলে আসবে, আগের মতন-_ 

ক, কী মিটেছে? কিছুই মেটেনি। এইরকম ভাবে সব ?িছু শেষ করে 
দেবে ও ভেবেছে? আম যাব- সারাংগা যাব নিজে । কী ভেবেছে কী ও? 
ওকে আসতে িখোছ--দোখ ওর কত সাহস, আসে কিনা ! আহত বাঘনীর 
মতো মারয়া মুখচোখ শ্বুকুটের । এই অবস্থার ওকে বোঝানোর চেষ্টা বৃথা । 

চলো তোমাকে বাঁড় দয়ে আস । 

জামা বদলাতে উঠলাম । ভারী একগ্য়ে, জোঁদ মেয়ে । আঁজজ না এলে 
ও গিনজেই যাবে সারাংগ্রা | ।নজের মানসম্মান কিসে তাও বোঝে না। 


ডায়োরটা আজ সকালে পেলাম । শোবার ঘরের একটা 1টপয়ের তলায় 
মরা প্রজাপাঁতির মতন পড়ে আছে । গত সাত-আটদিন লেখার কোনও সময় 
[ছিল না। ঝড়ের মুখে উড়ো পাতার মতন ঘটনাপ্রোত আমাকে তাড়া করে 
বেড়াঁচ্ছল। আজ সকালে ঘুম ভাঙার সময় থেকে মনে হচ্ছে গায়ে ব্যথা, 
জবরও আছে সামান্য । আটটা বেজে গেছে, রোদের দিকে তাকালে চোখে 
লাগে। 

লখন দেশে গেছে মেয়ের অসুখের খবর পেয়ে । নতুন যে ছেলেটা আসছে, 
সে দূর থেকে আসে, কাজেই সাড়ে ন'টার আগে হয়তো পেশছতে পারবে না। 
কালকে আজিজের বউ আর শবশরকে ওরা বাসে তুলে দেওয় পর্যন্ত 


৩০ 


জেগোঁছলাম । তারপর কোনও মতে বিছানায় পেশীছে চাদর গলা পর্যন্ত টেনে 
নিয়ে শুয়োছিলাম । গত এক সপ্তাহের আঁনবাষ ক্লান্তি সমুদ্রের এক বশাল 
ঢেউয়ের মতো অতার্কতে ঢেকে দিয়েছিল আমায় । কখন ঘুমিয়োছ কিছুই 
মনে নেই । 

কোথা থেকে শুরু করব জান না। কাল শাঁনবার- আমার কোনও 
ব্যন্তগত কুসংস্কার নেই । তবে কখনও কখনও ঘটনার গাঁতর মধ্যে লজিক 
খুজে নাপেয়ে মন কুসংস্কারের দরজা খোঁজে । জুলাই মাসের তৃতীয় 
শীনবার । আমি পুরো মহকুমার অফিসারদের একটা মিটিং নিই--সমপ্ত 
[রপোর্ট এসে জমা হয় । সব রক তহশিল থেকে লোক আসে । আগে এটা 
ভার িলেঢালা ছিল । আ'ম অনেকটা রেগুলার করোছি। সাড়ে দশটা নাগাদ 
কনফারেন্স হলে সমবেত জমায়েতের ওপর চোখ বুঁলয়ে নিয়ে শুরু করতে 
যাচ্ছ__আঁবনাশ, আমার সেকে্ড আফসার বললেন, স্যার, তিন-চারজন 
এখনও এসে পৌৌছোনাঁন । একটু অপেক্ষা করলে ভাল হত বোধহয় । 

কেকে আসোন ? 

কারমগঞ্জ, সারাংগা, আমিনপুর । 

দে আর অল-ওয়েজ লেট ! আরম্ভ করুন । এগারোটায় চা এল। ইতিমধ্যে 
কাঁরমগঞ্জ ও আ'মিনপুরের আঁফিসারদ্বয় ঘামতে ঘামতে এসে গেছেন । সবে 
চায়ে চুমুক 'দিয়োছি, এমন সময়ে মনে হল আঁফসের লামনের রান্তায় কিছ; 
লোক দৌড়ে যাচ্ছে_জন বশ-পাচশ হবে, আবার রিপোর্ট রিটার্নে মুখ 
ডাবয়োছি, আবনাশ সং পানের পক ফেলতে বাইরে গোঁছলেন, ফরে এসে 
উদ্বিগ্ন মুখে বললেন, স্যার, একটা গাঁড় পড়ে গেছে মেন ক্যানালে, লোকে 
তাই দেখতে দৌড়চ্ছে। গাঁড়র ভেতরের কয়েকজন লোক সাঁতরে পাড়ে উঠেছে। 

প্রাইভেট গাঁড় নাঁক ? কোনও ক্যাজুয়ালাটি ? 

সন্তু দৌড়ে এসে বলল, স্যার, সারাঙ্গা তহাঁশলের গাঁড় । 

থাড“ আঁফসারকে বললাম, আপাঁন আঁফসে থাকুন । আঁবনাশকে সঙ্গে 
নয়ে দ্রুত বোঁরয়ে পড়লাম । আঁফস থেকে মানিট সাতেকের রান্তা ৷ মেন 
ক্যানেলের সঙ্গে সমান্তরাল পাকা রান্তভা চলেছে, বার জল ছেড়েছে স্লুইস 
দয়ে। তোড়ে জল বইছে ক্যানেলে, ফেনায় ফুলে ফেঁপে । আরও একটু 
এগিয়ে ডান হাতের পাড়ে ছোটখাট জটলা । 

আঁবিনাশ উত্তোজত মুখে বললেন, ওই যে স্যার, দেখুন দেখুন । জিপের 
কালো ক্যানভাসটা খাঁল দেখা যাচ্ছে জলের ওপর । বষার জলে টইট-ম্বর 
সাপের মতন কেনাল । 'জিপের বাঁক শরীরটা জলের তলায়--ঢ্উয়ের তোড়ে 
অল্প অল্প দুলছে । ভিডুটা ফাঁকা হয়ে পথ করে দিল আমাদের । ওই তো 
তহশীলদার উদ্ভ্রান্ত চেহারায় ভিজে শরীরে ঠক ঠক করে কাঁপছেন ! 

রামনরেশপরসাদ* কী হল? কী করে গাঁড় পড়ল ? 

স্পিডে আসাছিলাম স্যার, দোর হয়ে গোছল, এখানে লাইটপোস্টের 
সামনে এক,সাহী'ক্রস্ট ছোকরার সঙ্গে হেড-অন-কাঁলশন হচ্ছিল, বাঁচাতে গিয়ে 


৩১ 


যেই বাঁয়ে ঘেষোছ, গাঁড়টা লাইটপোস্টে ধাক্কা মেরে ফ্লাই করে জলে পড়ে. 
গেল । আমি সামনে ছিলাম, জলে পড়েই সাঁতিরাচ্ছি। 

রামনরেশের হাতে চোট লেগেছে, কপালে ও চুলের গোড়ায় কাদারন্ত 
মাথামাঁথ। উৎসাহী ভিড় ইাতমধ্যে টেনে তুলেছে আরও চার-পাঁচজনকে । 
সবারই একরকম অবস্থা, জলে ভেজা কাদামাখা । আঁমনবাবুর ডান হাতটা 
বোধহয় ফ্যাকচার হয়ে গিয়ে থাকবে, অসহ্য যন্ত্রণায় কাত্রাচ্ছেন, এদকে জলের 
দিকে তাকিয়ে কাঁদছেন- হায় হায়, সারে কাগজওয়া ডুব গয়ে মেরা ! 

ড্রাইডার কোথায় ? ড্রাইভার ? 

সপসপে ময়লা, ভেজা, খাঁক ডীর্দ পরা একজন লোক, কপালে নাকে 
রন্ত, ভিড়ের পেছনে পালাঁচ্ছল-_ক্ষুধাত* জনতা তাকে পাকড়াও করে আমার 
সামনে হাজির করে দিল। 

জিপ চালাও, না বৈলগাঁড় ? এতগুলো লোকের প্রাণ যাচ্ছিল তোমার 
জন্য ! 

কাঁদো কাঁদো লোকটা হাতজোড় করে বলল, হুজ;র, মেরা কোই কুসুর 
নোহ। গাঁড় আম চালাইন । 

রামনরেশ দুঃাঁখতভাবে বললেন, সাত্যই দোষ আমার, ও চালালে গাঁড় 
জলে পড়ে ? 

আপান চালাচ্ছিলেন ? 

নাঃ, উাঁন উদত্রান্ত দুম্টিতে হঠাৎ এঁদক ওাঁদক তাকাতে লাগলেন-__ 
কই সেতো ওঠোন? 

কে? 

আঁজজ ময়াঁ ? 

আঁজজকে আপাঁন গাঁড় চালাতে দিয়োছলেন ? 

ওর লারনারস লাইসেন্স আছে একটা । ওখানে যাওয়ার পর থেকেই 
মাঝে মাঝে হাত ঝালাত জপের ওপর । সালমুদ্দিন নাক জিপ কিনছে 
একটা । আজকে ইটভাটি থেকেই বলতে বলতে আসাছল, একটু 'দিন, চালাই । 
ভাবলাম এসে তো গোঁছ, আট-দশ 'কিলোমটার আছে- চালাক একটু । 
ভাগ্যে যে কী আছে তখন আর ক জান! 

আগজজ তাহলে ওঠোঁন ? কোথায় সে? সাঁতরে আগে বা পেছনে চলে 
যায়ান তো ? 

ভিড় দু'ভাগে ভাগ হয়ে একদল আগে, একদল পেছনে চলে গেল । 

আঁবনাশ সিং গিয়ে এক সেকশন হোমগ্ার্ড-কে ডেকে এনেছে । গাঁড়টা 
আগে তুলতে হবে-যাঁদ ওর মধ্যে থাকে ! 

মোটা কাছ বাঁধা হল গাঁড়র ফ্রেমে । তারপর একাদক থেকে টানা শুর: 
হল জন পনেরো মিলে । াঁনট বিশেকের চেষ্টার পর মরা কাঁছমের মতন 
উল্টে গেল গাঁড়টা। ভেতর থেকে আরও িছ? কাগজের বাণ্ডিল, হাওয়াই 
চ*পল একপাটি, ফাইল বাঁধার লালসালু বোরয়ে ভাসতে ভাসতে চলে গেল 


৩ 


পাশ্চমে । আঁবনাশ আমার পাশেই দাঁড়য়ে ছিল। বলে উঠল- লাশ ভেতরে 
থাকলে বোরয়ে আসত- ভেতরে নেই । 

আমার বুকটা ছ্যাঁং করে উঠল। রুক্ষ গলায় বললাম-কা যা-তা 
বলছেন ? হি মে বব আলাইভ ! 

আঁবনাশ কাঠন হেসে বলল-_আপনার খারাপ লাগলে মুদ্ণা বলব না। 
তবে আধঘন্টা তো হয়ে গেল । দশামাঁনট জলের তলায় থাকলেই জিন্দা আদাঁম 
মুর্দা হয়ে যায়। 

একঘণ্টা হয়ে গেল ক্যানেলের ধারে | দুণ্ঘণ্টা । দুপুরের সূর্য মাথার 
ওপর উঠেছে । যারা দলে দলে ভাগ হয়ে খজতে গোছল, তারা হতাশ হয়ে 
পাড় থেকে ফিরে এসেছে । হোমগার্ভরাও ফিরে এল। দদ'মাইল এঁদকে, 
ওদিকে দেখোঁছ । আজিজ মিয়া সাঁতরে ওঠোঁন। জলের দারুণ ম্রোত। ভরা 
বর্ধার মাস। খড়কুটো গাছের ভাঙা ডাল ীনয়ে ঘোলা জল বয়ে চলেছে। 
পাকা সাঁতারু ছাড়া জলের তলায় নাববে কে ? দেখছ না, আজকাল স্নানেও 
কেউ নামছে না। 

বেদপ্রকাশকে ফোন করলাম আঁফস থেকে । ও শুধু? আমার সহকমশই নয়, 
কাইসিস-এর মুহূর্তে পরম নিভ'রযোগ্য বন্ধু । একান্ত কাছের মানুষ । 

পাঁচ মানিটের মধ্যে আঁফসে এসে গেল বেদপ্রকাশ । পুরো ইউনিফর্মে। 
সতেজ, রোদে পোড়া চেহারা, মুখের দাগগুলো না থাকলে সবপদ্রুষ বলতে 
কোনও বাধা থাকত না ওকে । 

এভাবে হবে না । জলের দিকে ভুরু কুশ্চকে তাঁকয়ে আছে বেদপ্রকাশ । 

ভরা জলের মধ্যে, তার ওপর এত কারেণ্ট, পাড়ে দাঁড়িয়ে একজন মানৃযকে 
খোঁজা যায় না। আমাদের জল বন্ধ করতে হবে । জল বন্ধ করলে আটঘণ্টা 
অন্তত লাগবে জল নামতে । আমাদের খংজতে হবে পুরো পণ্টাশ কিলোমিটার, 
সপ্তপৃরার িজাভণরের স্লুইস গেট পর্ষন্ত। প্রাতাঁট হা না খখজলে লাশ 
পাওয়া যাবে না। 

িন্তু বেদপ্রকাশ, আপাঁন যা বলছেন তা তো একরকম অসম্ভব । 
ক্যানেলের জল স্টিল প্যান্টের রজাারে গিয়ে পড়েছে । ওরা ভারত সরকারের 
অনুমতি ছাড়া জল বন্ধ করতে দেবে না। জলের লেভেল নেমে গেলে ওদের 
প্রোডাকশনে গণ্ডগোল হয়ে যাবে, আর তার অর্থ হল" 

কথাটা আমার মুখ থেকে নিয়ে পূর্ণকরে দিল বেদপ্রকাশ | স্রোতের 
টানে মৃতদেহ সরতে থাকবে ব্লমশ পশ্চিমে । এক জায়গায় থাকবে না। যাঁদ 
ঘণ্টায় আধ গকলোমটারও যায়, তাহলে আজকের মধ্যে জল বন্ধ না হলে 
বডি 'িজাবারে গিয়ে পড়বে কাল । সেখান থেকে আর কোনওাঁদনও খঃজে 
পাওয়া যাবে না ওকে । মিঃ মুখাঁজ, আমাদের হাতে সময় বড় কম। 
আ'ীজজের [বিধবা স্ত্রী যাঁদ লাশটাও না দেখতে পায়, আমরা বড় অপরাধী 
হয়ে থাকব ওর কাছে । প্রাতটি হোমগার্ড, প্রাতাট প্দাীলশকম”, তন্ন তন্ন করে 
ক্যানেলে খজবে জল নেমে যাওয়ার পর, আঁম অর্ডার দিচ্ছি। কিন্তু আপান 


৩৩ 
৮ন্দনরেখা- ৩ 


যান আগে ইীরগেশন হইঞ্জীনয়ার আর "স্টল প্ল্যাণ্টের সঙ্গে কথা বলুন । 

শমাঁটং ভেঙে গেছে কতক্ষণ । আজ আর কারও খাওয়া দাওয়া হয়নি । 
আঁফসে গুন গুন করছে ভিড়। আম এসে পেশছতে আবার চাপা নিস্তব্ধতা 
ঘণনয়ে এল । ফোনে বহু বাগাঁবতণ্ডার পর জল বন্ধ করতে রাজ হয়েছে 
ব্যারেজ কর্তৃপক্ষ-_আফাঁসয়াল শালীনতার বেড়া ভেঙে হীর্জীনয়ারকে প্রায় 
ধমকোছি, আশা কার ভদ্রলোক পরে মাফ করে দেবেন । 

আধঘণ্টা অন্তর ফোনে খবর পাচ্ছি কণ্ট্রোলে। জল বন্ধ করেছে ওরা । 
গবকেল চারটে নাগাদ জল নামতে আরম্ভ করল । পুলিশ ও হোমগাডরা 
নেমেছে কাদাজলে । আমাদের আফসের লোকেরা নেমেছে । কোনও কোনও 
পয়েণ্টে গ্রামের লোকেরা হাত 'মাঁলয়েছে ৷ কাঁরমগঞ্জে লোক পাঠানো হয়েছে 
ওর *বশুরবাঁড়তে । গাঁ থেকে দৌড়ে এসেছে ওর বুড়ো বাবা ও দাদারা। 
হঠাৎ এই ধাক্কায় সকলেই হতবাক । আর ঘণ্টা দেড়েকের মধ্যে সন্ধের অন্ধকার 
নেমে আসবে । তারপর মশাল আর টর্চ ছাড়া কিছু সম্বল নেই পাঁলশ- 
বাহনীর। কলকলানো কালো জলে টর্চের আলোয় কী হবে? অন্ধকার 
ক্যানেলের দুই তর, আলো নেই । দু"ধারের গ্রামেই বিদহ্যৎ নেই তো রান্তায় 
আলো! 

রাতের আট দশ ঘণ্টা যাঁদ খোঁজ বন্ধ রাখতে হয়, অনেক দোঁর হয়ে 
যাবে। কে জানে ততক্ষণে'"'জঙ্গলে শেয়াল আছে, জলে কুমির কামট কি 
নেই? 

সন্ধেনাগাদ সন্তু এক কাপ চা এনে দল আর চারটে 'বস্কুট । মুখে তেতো 
লাগাঁছল, তাও জোর করে খেলাম । এখন মনকে দুর্বল করলে চলবে না । 
সন্ধের আকাশ লাল ।-পাঁখরা ডাকতে ডাকতে উড়ে যাচ্ছে দূরের বাসায়, 
সূর্যের কাছ ঘেঘে । এত টানাপোড়েন, ব্যরেজের জলে কোনও উচ্ছ্বাস নেই । 
দারাং পাহাড় সেই রকুমই শান্ত, গম্ভীর, সূর্যান্তের আগে নীল কালো । যেন 
জীবনের ছন্দে কোনও স্খলন হয়াঁন । আফসের লোকেরা প্রায় চলেই গেছে । 
ঘরগুলো সনসান। খালি সন্তু দফতাঁর, আমাদের বেগুক্লার্ক আর চৌকিদার 
িউঁটিতে দাঁড়য়ে । 

থামের পাশ থেকে বোঁরয়ে মুকুট আমার সামনে এসে দাঁড়াল, রন্তুহশীন 
বর্ণ ওর মুখ, চোখ দুটো আঁন্ছুর তারার মতো জব্লছে। ওর কথা ভাবার 
সাত্যই কোনও সময় পাইনি সারাঁদনে ৷ ওকে সান্ত্বনা দেবার কোনও ভাষা 
ছিল না আমার কাছে । ওর মাথায় হাতটা রাখলাম । 

শীতের অরণ্যের অন্ধকারে শুকনো পাতা উড়ে যাওয়া হাওয়ার গেরুয়া, 
1নরালম্ব আওয়াজে ও বলল-- 

পেলেন না, না? 

কী? 

লাশ ? 


৩৪ 


জ্যোৎস্না 


তনুর ভারপ খারাপ অবস্থা গেল দিন-দশ-পনেরো । আম ভয় পেয়ে- 
ছিলাম, ওর মনের রোগ না দাঁড়য়ে যায়। ঘুম নেই খাওয়া নেই, চোখে 
একফোঁটা জল নেই, পাগলের চাউীন। ও নাক চা লখে ডেকেছিল 
আ'জজকে সোঁদন। চিঠি না লিখলে কি ও আসত না ? কিংবা গাঁড় যাঁদ না 
চালাতে যেত, মরত ক ? ওকে সেকথা কে বোঝাবে? এক থোকা ছাড়া ওর 
কাছে কেউ ঘেষতে পারোন একাঁদন। দিনের বেলা গুম মেরে বসে থাকে, 
রাত্রে ঘুমোতে গেলে খানিক পরে চিৎকার করে উঠে বসে। চোখেম:খে ভয়। 
আিজকে নাকি স্পম্ট দেখতে পায়, কাঁধের কাছে এসে দাঁড়য়েছে। গত ছ- 
সাত গদন ধরে ঘুমের ওষুধ খেয়ে ঘুনোচ্ছে, তাও পাশে কেউ একজন বসে 
থাকতে হয় । তা নাহলে আচমকা ভয় পেয়ে যাবে । আম মানা করেছিলাম, 
আজিজের বাঁ ওকে দৌঁখও না। মুকুট ভো পাগলের মতো দৌড়ে দৌড়ে 
যায়। নাজরবাঝুর বউ, আম আর শান্তি ওকে ধরে বেধে রেখোঁছলাম। 
পাঁরজাত বলল, দেখেই নিক, নাহলে সারাজীবনের আফসোস রয়ে যাবে । 
তবে দোৌর করবেন না। দেখে দফরে আসুক । আজজের বউ এসে যাবে 
রাতে । শেষে আমই নিয়ে গেলাম ওকে সঙ্গে করে । ঠক সম্ধের মুখে খঃজে 
বার করেছিল পুলিশ আর রতনপরের লোকেরা, আর 'মানট কুড় দোর 
হলে অন্ধকার নেমে আসত, সারারাত বসে রয়ে যেতে হত ওদের । বোশদূর 
যেতে পারোঁন ডেডবাঁড। তিন নম্বর পুলিয়ার কাছে কাঁটার মন্ত একটা ঝাড়ে 
আটকে রয়ে গোঁছল। ট্রেকারে করে আঁফসের সামনে নিয়ে এসোঁছল ওরা । 
গায়ের শা্টপ্যাণ্ট তেমনই আছে, চুলগুলো কাদায় চিপাঁচপে, চোখনাক থেকে 
রন্ত গাঁড়য়ে নেমেছে, প্রকারের দেওয়ালে ঠেঁসান দয়ে বসানো, হাত দুটো 
কাঁটার খোঁচায় রন্তারান্তি, মুখ দিয়ে ফেনা বেরুচ্ছে । আহা রে! কত গালমন্দ 
করোছি ওকে । কত খারাপ চেয়োছ ওর । এমন তো কখনও চাহীন ! আমারই 
চোখ দিয়ে জল গপড়াছল। তনুর মাথাটা আমার কাঁধে তখন, ওর যে জ্ঞান 
নেই বুঁঝান, ও আমার ওপর চলে পড়তেই চেঁচিয়ে উঠোৌছলাম। আফসের 
লোকেরা এসে ধরল । বাঁড়তে 'দয়ে গেল আমাদের । ডান্তার এল। তারপর 
থেকে এই চলেছে। 

বড় আশা করেছিলাম, তনুর বিয়ে হয়তো ?দয়ে দিতে পারব । সম্বন্ধ 
একটা এসোঁছল পুরহীলয়া থেকে ৷ দেওরকে চিঠি লিখে হাতেও রেখোঁছলাম । 
মাঝখানে এতসব ঘটনায় সমস্ত উলটোপালটা হয়ে গেল। তন; কেন, কোনও 
মেয়েরই বিয়ে দিতে পারব বলে মনে হয় না। 

আজিজের বউকে ওরা সোঁদন নিয়ে এসেছিল, নাই বা আনত ? ওকে বয়ে 
করে আ'জজ বাপের বাঁড় ফেলে রেখোঁছল । দু'বছর ঘরে আনোন। মেয়েটা 
নাক একেবারে ছেলেমানূষ, সতেরো-আঠারো বছর বয়স। বাবা আর 


৩৫ 


ভাইয়ের সঙ্গে এসোছল। শোকের থেকে ভয়টাই যেন বোঁশ পেয়েছিল । 
বোরখার পর্দা তুলে শোয়ানো আজজকে দেখে চিৎকার করে উলটো দিকে 
ছুটে চলে যাঁচ্ছল। ওদের গাঁয়েই মাটি দিল ওরা আজিজকে । বউটাকে আবার 
নয়ে এসোছল ওর বাবা আর ভাই । কাগজপত্রে সই হল । গ্র্যাচায়াটর টাকা 
পাবে অল্প গছ আর বিধবার পেনশন । বাপের ঘরেই ফিরে যাবে মেয়োঁট 
আবার, যে কে সেই । 

সারাণ্ডাঘাটের ভার খারাপ দিন ঘাঁনয়ে এসেছে । যেন একটা পাঁরবারের 
ওপর অঘটনের ছায়া__সবাই কাছাকাছ ঘেষে বসেছে । গত পাঁচশ বছর 
এখানে আঁছ, কখনও ক্যানাল বন্ধ হতে দোৌখাঁন। আঁজজের মৃতদেহ খ*জে 
বার করার জন্য পাঁরজাত সেই অসাধ্যসাধন করল। আঁজজের বউাঁট 
হয়তো কখনও জানতেই পারবে না, পাঁরজাত ও বেদপ্রকাশ কী করেছে ওদের 
জন্য । 

পাঁরজাত চলে যাবে । খবরের কাগজের খবরটাকে আমরা কেউই আমল 
দইনিন। কিন্তু কথাটা সাঁত্য ৷ শুনছি ওর বদলির অ্ার করবার জন্য ফাইল 
ওপরে গেছে, হয়ে এল বলে। কয়লাখাঁনতে সাহকারদের ওপর একটানা 
পাঁরকজ্পিত হামলা-_নেতারা এক বছরের মধ্যে দুশীতনবার পাটনা দৌড়েছে, 
এবার গ্রীমত জামলা খাতৃন নিজে উদ্যেগী হয়ে উঠেপড়ে লেগেছেন। 
কোলকাটারদের বাণ্ততে পাঁরজাতের নামে দোয়া দেয় লোকে । তনর বাবা 
বেচে থাকতে বলতেন_কোলকাটাররা আধকাংশ কখনও মাইনেই পেত না 
কাউণ্টার থেকে । যে পণ্াশ টাকা ধার নিয়েছে, শোধ করতে তার লেগে যেত 
দশ বছর । সামন্তপুর আর ভূবন কোিয়াঁর এরয়ায় তো ক্লাকবাবুদের সঙ্গে 
সাহ্‌কারও এসে বসে থাকত কাউণ্টারে । পেমেণ্টের স্লপৃটাই চলে যেত তার 
হাতে । বেচারা মজুর হাঁ করে দাঁড়য়ে থাকত ওপাশে । তারপর সাহকার 
একটা ধারের হাতাঁচঠে দিত মজুরকে । বলত, যাও আমার িকরানা দোকানে । 
ওখান থেকে ওষুধ, চাল ডাল যা লাগে 'নয়ে যাও। বছরের পর বছর, 
মজদ্‌রের মাইনের কাগজ থাকত মহাজনের কাছে আর ওই হাতাঁচগ্ঠে সম্ধল 
করে বেচে থাকত মজদুর- একবার নেওয়া ধারের পাপের প্রায়শ্চিত্ত করতে । 
বেনামশতে চাকাঁরই বা কত। িধবাকে ঠাঁকয়ে রাতারাতি সই জাল করে নকল 
ছেলে বাপের জায়গায় চাকার পেয়ে গেল । পুরনো, ঘোরপ্যাঁচের কেসের মধ্যে 
ম্যানেজমেন্ট এখন আর যেতেই চায় না। কোনও কেস রি-ওপেন হবে না। 
যেমন চলছে চলুক | পেমেণ্টের জন্যে সবার বাধ্যতামপক ব্যাঙ্কের খাতা 
খোলা হয়েছে এবার, কয়লাখানি ও জেলা সরকারের আলাপ-আলোচনায় । 
পাঁরজাতকে পাটনা যেতে হয়েছে তার জন্য । কাউন্টারে পেমেন্ট বন্ধ হয়ে 
গেলে ইউাঁনয়ন ও সাহুকার-দুহ'জনেরই অন্ন মারা যাবে । তার সঙ্গে চলেছে 
সাহুকারদের ওপর পেমেন্ট কাউণ্টারে রেইড ৷ শত শত কেস বুক হয়েছে এই 
ক'মাসে ৷ মান্যগণ্য ভদ্রব্যান্ত 'হসেবে ছাড় ঘারয়ে যাঁরা ঘুরে বেড়াতেন 
শহরগঞ্জে, নিজের কাঠগড়ায় ওঠার সম্ভাবনায় তাঁরা ব্যাতিব্যন্ত। কোলিয়ারর 


৩৬ 


জন্য আরও জম অধিগ্রহণকে বিরোধিতা করে যে সমাতি বানিয়েছেন খাতুন, 
সেই সাঁমাত সমানে টাকা তুলে যাচ্ছে গাঁয়ের চাষাভুষোর কাছ থেকে, 
হাইকোর্টে নাক কেস লড়তে হবে। অনেক টাকা দরকার । লক্ষপাঁতি 
ব্যাঁরস্টারের স্ত্রী খাতুন। ওর [িনমহলা কোঠা তোর হচ্ছে রাঁচিতে । গত 
মাসের মিঁটিং-এ পাঁরজাত গুঁকে বলেছে মধ্যস্থতার নামে শোষণ থেকে যাঁদ ওর 
সামিতি বিরত না হয় তবে আইনের আশ্রয় নেবে সরকার । ভদ্রমাহলা "স্টিম 
ইঞ্জিনের মতো ফ£সতে ফংসতে চলে গেছেন রাজধানী | 'াবরোধী দলের হলে 
কী হবে, সরকার দলের লোকেরা দারুণ সমঝে চলে ওুঁকে, গুর টাকাকেও, 
[জভকেও। 

পাঁরজাত চলে গেলে আমরা বড় একা হয়ে যাব। টিলার ওপর ওই 
বাংলোয় তো কতজন এসেছেন, গেছেন, আমাদের কখনও সুযোগই ছিল 
না যাবার দরকারও নয়, আর হবেও না কোনওাঁদন | তরকাঁরগুলো যা 
লাগিয়োছলাম, ছেলেটা খেয়েও যেতে পাবে না হয়তো । ঝিঙে ধরেছে কাঁচ 
কাঁচ, পুইশাক হয়েছে । আর িছু ফলোন এখনও | কশদন আগে আগে ঝরে 
পড়োছিল। দশদন গেছিলাম । 'কন্তু বোশ সময় বসতে পাঁরানি। তনুর 
শরীরমন এত খারাপ যে ওকে রেখে বোঁশক্ষণ কোথাও থাকা যায় না। তার 
ওপর কখন ষে কলোনর কে এসে যায় ওকে একা পেয়ে কুশল শুধোতে । 
1হতাকাঙক্ষীর তো অভাব নেই আমাদের । 

কত তফাৎ পারিজাতদের সঙ্গে আমাদের । অর্থে, শিক্ষায়, পদমধাদায় ! 
তবু এক বছর সময় ওকে কাছাকাছি পেয়ে মন ভরোন আমার । ঘুমোলে মনে 
হয়েছে মাথায় হাত বুলিয়ে দিই । আবার সঠ্কোচে থেমে গেছি, হাত ওঠেনি । 
তনু হবার সময় খুব ছেলের শখ ছিল আমার । সেই গোপন আকাঙ্ক্ষা যেন 
ফিরে এসেছে পাঁরজাতকে দেখে । এখান থেকে বদাঁল হয়ে অনেক দরে চলে 
যাবে পাঁরজাত । পার্ণয়া কি সীতামঢ্রী, দক্ষিণে আর আসবে না হয়তো 
[শগাগর । আর কি দেখা হবে ওর সঙ্গে? চিঠিপত্র লিখলেও ওর সময় কই 
জবাব দেবার । ব্যারেজে যাবার রাস্তা ধরে যতবার যাব, 1টলার ওপর চোখ 
পড়লেই বুকের ভেতরটা হু হু করে উঠবে- এমন একটা ফোঁপরা আছে মনের 
মধ্যে যা দুনিয়ার কোনও জিনিসেই আর ভরবে না। কেন যে মানুষ আপন 
হয়, কেন চলে যায় ! 

০ সঃ সং 

গতকাল তনুকে দেখতে এসোঁছল পাঁরজাত। অনেকক্ষণ বসোঁছল। 
দরজা বন্ধ করে ওরা ভেতরে ধারে ধরে কথা বলাছল। বোরয়ে এসে 
পাঁরজাভ আমাকে ডেকে নল বাইরের ঘরে । আমাদের হাসপাতালের 
ডান্তারকেও ডাকয়োছল । আম ?কছুই জানতম্ম'না । ওর অসুখের সময় বহু 
রকমের সব যে টেস্ট হয়োছিল, তারই ভিতর ইউারন কালচার থেকে ডান্তারের 
[রিপোর্ট বোরয়েছে অপ্রত্যাশিত । তনু সন্তানসম্ভবা । কথা শোনার সঙ্গে 
সঙ্গে শরীরটা টলে উঠোছল। মনে হয় হাত পা ঠাণ্ডা হয়ে আসছে। পারজাত 


৩৭ 


বলল, আম যেন এমন গছ না করি যাতে তনুর কোনও ক্ষতি হয়। ডাক্তার 
যাবে সঙ্গে। বিশ্বস্ত প্রৌঢ় ভদ্রলোক, ওরা রাঁচি যাবে পারিজাতের সঙ্গে, তনুর 
ভাল করে চেকআপ দরকার । বিশেষ করে এইরকম মনের অবস্থায় ৷ 

ণনজের ট্রান্সফার অর্ডারটা পেয়ে গেছে বলেই এত ব্যন্ত পারজাত। দেরি 
করতে চায় না। রাঁচিতে তনু আযাডাঁমট হবে একাদনের জন্য ৷ ডান্তারেরও 
মত, এখনই ব্যবস্থা না লে দোর হয়ে যাবে, পরে তনুর দুর্বল শরীর 
গরভপাত সইতে পারবে না। আমার মনটা ভেঙে গোছল খবরটা শোনার 
পরই, তবু রোগা মেয়েটাকে গাঁড়তে তুলে দিলাম । বহহাদন পর তনু ঘর 
থেকে বেরোল । আঁফস যাওয়া নেই, কতাঁদন শয্যাশায়শ, এখনও হাঁটতে গেলে 
পা টলে। বাগানের লঙ্কা জবা ও করবী গাছগুলোর পাতা ছংয়ে ছখয়ে 
দেখাঁছল। বর্ষার জল পেয়ে কত বড় হয়ে গেছে গাছগুলো । নতুন একরকম 
কম্ট হচ্ছিল ওর জন্যে, যা এর আগে কখনও হয়াঁন । 

সন্ধেরাতে ফিরে এল ওরা । পাঁরিজাত এসোছল তনহকে ছেড়ে দিতে । 
মেয়েটা গাঁড় থেকে নেমে দূর্বল হাতে আমাকে জাঁড়য়ে ধরল ৷ আমার কাঁধে 
মাথা ঘষছে, ওর বাবা মারা যাবার পর এই প্রথম বোধহয় ৷ কতাঁদন আমি 
ওর শরীরের ঘ্রাণ স্পশ€ ইন ৷ ভেবে দেখলাম, আ'মই কখনও নিজে থেকে 
গয়ে ছ:ইনি ওকে, যৌদন থেকে আমার সন্দেহ হয়েছে আঁজজের সঙ্গে ওর 
সম্পর্ক। সংসার থেকে বিচ্ছিন্ন করে দেবে ওকে, আমিই পাঁচিল তুলে দয়োছ 
ওর ও আমার মধ্যে । আম এখন ওর পিঠে হাত বোলাচ্ছ। কত রোগা হয়ে 
গেছে, শিরদাঁড়াটা স্পম্ট ছোঁয়া যায়, আঙুল ফেরাচ্ছি ওর ঠাসবুনুন চুলে, 
এই, তোর কা হয়েছে বল তো! 

মা, তুমি কিছু বলবে না, বলো? আম পারলাম না, টোবলের ওপরই 
আমার দমবদ্ধ হয়ে হল, যেন এক্ষ2ীণ মরে যাব, পাঁলয়ে এলাম ডান্তারকে 
বলে। মা, আম ওকে. রাখব । বাড়তে থাকবে, বড় হবে আমাদের সঙ্গে, 
কেমন ? 

আমার চোখে জল দেখে ও আবার ফিরে এসে জাঁড়য়ে ধরল আমায়। এক, 
তুমি কাঁদছ ? তোমার কম্ট হচ্ছে ? হাসনহানার গন্ধভরা অন্ধকারে এবার 
আমি হাতড়ে হাতড়ে ওর দুচোখ, নাক, মুখ, ঠোঁট খঃজাছিলাম । সেই আঁচন 
ভাস্ক*, আমার শরশীরের মধ্যে তিল িতিল করে কুঁড় বছর আগে যে বেড়ে 
উঠেছিল । ওকে একজনের জীবন নিতে পাঠিয়েছিলাম, ভালই হয়েছে ও ীফরে 
এসেছে । আমাদের বারান্দার লেবু গাছটার মতো শ্যামল, নরম, ছোট-_জাবন 
ওর ভিতরে রোজ বেড়ে উঠছে । আর একট. হলে সাঁড়াঁশর জিভ ছিড়ে নিয়ে 
যেত তাকে-_আমার কণ্ট নেই তনদু, তুই আবার নতুন করে বাঁচতে আরম্ভ 
কর। বড় হ। সখী হ। 

ঘরের ভেতর যেতে যেতে বলে গেল, আমার বিয়ের জন্য আর ভেবো না 
মা। মা হওয়ার জন্যই তো 'বিয়ে করে মেয়েরা, না ? আর কা দরকার-_ আমি 
আর তুমি একসঙ্গে থাকব । 


৩৮ 


পারিজাত চলে গেল বাঁড়। বলে গেল কাল প্যাঁকং শুর । একটু 
আসবেন কাল । ডান্তারও ফিরে গেছে । অন্ধকারে দাঁড়য়েছিলাম অনেকক্ষণ, 
খোকন এসে হাত ধরে টেনে ঘরে নিয়ে গেল। 


বেদপ্রকাশ 


মিঃ মুখার্জ চলে যাচ্ছেন। পাটনা থেকে ট্রাঙককল এল গতকাল, 
সরকারের চিঠিও এসে গেছে-_খবরটা আগেই শুনোছলাম ৷ কাজেই প্রস্তুত 
ছিল মন। তব গরমের দুপুরে শুকনো হাওয়া যখন পাতার ঘনর্ণ উীঁড়য়ে 
চলে যায়, সেই দলের এককপাতার মতো সঙ্গহীন, মূলহান, গন্তব্যবিহখন 
মনে হল নজেকে। এই সারাণ্ডাঘাটে আমার জীবনের একটা অধ্যায় শেষ 
হয়ে গেল। আর তারই সঙ্গে সঙ্গে সমার সঙ্গে আমার সম্পক এমন এক মোড়ে 
এসে দাঁড়য়েছে এই মুহূর্তে যেখান থেকে পরবতার্শ পথরেখা দেখাই যায় না। 

পারজাতবাবু আর আম, আমরা এতাঁদন একসঙ্গে রেইড-এ বোরিয়োছ, 
একসঙ্গে সাম্প্রদায়ক সম্প্রশীতর মিটিং নিয়োছ, একসঙ্গে খাদান-এ গিয়োছ । 
আমাদের মিলিত শান্তর একটা ধারালো ইমপ্যান্ট ছিল এখানে । আমরা যখন 
সাহুকারদের চোখে আঙুল দিয়ে দেখালাম যে আযাণ্ট-মানি লোণ্ডিং আ্যান্ট-এর 
দাঁতনখ আছে, এবং পেমেন্ট আঁফস থেকে আরম্ভ করে ক্যাণ্টনের আপাদ- 
মস্তক “কীভাবে সাহ্‌কারের মোকাবিলা করবেন? পোস্টারে ছেয়ে গেল, তখনই 
এরা প্রথম বুঝল আমাদের আপসে লড়ানো সম্ভব হবে না এবং তখন থেকেই 
হায়েনারা পিছ হটতে আরম্ভ করল । ডান ষে এত তাড়াতাঁড় চলে যাবেন 
আশঙওকা কারান । হঠাৎ খবরটা পেয়ে মনে হল আমার একটা হাত যেন অবশ 
হয়ে গেছে । পাঁরজাতবাবুকে আঁফসে বসে আচমকা বলেও ফেলেছিলাম 
সোঁদন--“আপাঁন চলে যাচ্ছেন, এবার সবাকিছ নম্ট হয়ে যাবে । এতাঁদন ধরে 
যে ভিত আমরা তোর করোঁছিলাম, বড় তাড়াতাঁড় ভেঙে দিল ওরা 1, 

বেদনা ও উদ্বেগের স্পম্ট আভাস ফুটে উঠল পাঁরজাতের চোখেমুখে 
“এ কী বলছেন আপাঁন, বেদপ্রকাশ ! যু কানট: লেট দেম ডাউন হোয়েন আই 
আযাম নট দেয়ার ! নেভার! 

ওনাকে অবশ্য বলতে প্রান, পাঁরবারিক জীবনে ক আঁম্থরতার মধ্যে 
কেটে যাচ্ছে আমার এক একাটি দিন ॥ যোঁদকেই তাকাই মনে হয় আগুন লেগে 
ঝলসে গেছে সব । ছাট নিয়ে কোথাও যাঁদ পালিয়ে যেতে পারতাম ! কোথায় 
যাব? রাঁচির বাঁড়তে মা শয্যাশায়ী, মৃত্যুর পায়ের শব্দ শুনছে প্রাতাঁদন । 
ওমের চাকাঁরিটা নেহাতই সামান্য--বাবার পেনশন আর আমার পাঠানো টাকা 
'মাশয়ে কোনও মতে ওদের চলে । ওদের কাছে নিজের সুখদুখের খখটনাটি 
ণনয়ে কখনও গিয়ে দাঁড়াইনি- আজও পারব না। পুতলী আর বাবুয়াকে 
একা রেখে কোথাও যেতে পার না। ভয় করে, যেন সেই অদৃশ্য আততায়ন 
পেছনে তাড়া করে আসবে । ফিরে গিয়ে ওদের দেখতে পাব তো! যাঁদ দেখি 


৩৯ 


ওদের 'নয়ে সীমা চলে গেছে ! সীমার সঙ্গে কথাবাণা বন্ধ হয়ে গেছে বহাঁদন 
হল । 'নতান্ত ঠোরূর না লাগলে দু'একটা হং-হ্যাঁও না। তবে ওর বাবাকে 
লেখা আমার মারমুখী চিঠির একটা আপাত ফল হয়েছে--পাবাঁলক স্কুলের 
প্রসঙ্গ বন্ধ আছে আজকাল । তবে সেটা বাদ্ধির প্যচিও হতে পারে ওদের 
তরফের, ঝড়ের আগের শান্তির রহস্য । নওয়াদার এক উাঁকল বন্ধুর সূত্রে 
খবর পেলাম, ওরা ডিভোর্সের কথা ভাবছে । পারাস্থৃতি যখন গনজেই সামনে 
এসে দাঁড়ায় তখন মানুষ পেছন ফিরে পালাতে পারে না, লড়তেই হয় । অন্য 
কোনও িকজ্প তাকে ববেক কণ করেই বা দেবে! 

এখন আমার বয়স প'য়ীত্রশ । কত তাড়াতাড়ি সব ?কছু ফ্ারয়ে গেল ! 
এই বয়সে মানুষের স্বপ্ন দেখা আরম্ভ হয়, বাঁড় করার জন্য জমির সম্ধান 
নেয় মানুষ, মেয়ের বিয়ের গয়না গড়াতে শুরু করে । শাঁনবারের হাটে 
আমাদের বুড়ো কনস্টেবল হ'রি তার বউয়ের জন্য খংটয়ে খংঁটয়ে বাছছিল-_ 
শেষে পছন্দমত নীল ফুল-ফুল শাঁড়টা হাতে তুলে আনর্বচনীয় হাঁস ফুটে 
উঠেছিল বুড়োর দন্তহশন মুখে । আমার চোখে চোখ পড়ে কণ লজ্জা! 

সব কিছুই ছিল আমার করায়ত্ত-_ভাল চাকার, ভাল বংশ, চেহারা, শিক্ষা, 
সুন্দরী স্ত্রী-শরীরের এই দাগগুলোকে ছেড়ে দলে অসুন্দর ছুই না। 
আমাকে মেরে দিল আমার শরাফৎ। আমার বারমুখো না হওয়া, মদ না 
খাওয়া, বাঁড়তে গাঁলগালাজ না করা, মদ খেয়ে বউকে না পেটানোর মতো 
অকল্পনীয় সব অপরাধ । বাবা যখন বলতেন শরীফ আদমণী সব জায়গায় মার 
খায়, শুনে হাসতাঘ । তখন কলেজে পড়তাম, খোলামেলা িভশ্ক জীবন 
ছিল । ভাবতাম শরাফৎ ক দাঁতনখ ওপড়ানো সার্কাসের বাঘ, তার ?ক 
মেরুদণ্ড নেই ? এখন দোৌখ এই রাস্তায় কত যন্ত্রণা, হাত-পা কতরকমে বাঁধা । 
চেঁচিও না- পড়শী শুনতে পারে । মাতলাম করো না- বাচ্চারা ভয় পাবে। 

বড়বাবুর মেয়ে মুকুটকে আবার দেখাঁছ অফিস যেতে । পুরোপার ভেঙে 
পড়োছি্ল আঁজজের মতত্যুর পর মেয়েটা । আবার যে উঠে দাঁড়িয়েছে হম্মত 
করে, অফিসে যাচ্ছে, লোকলজ্জার পরোয়া না করে নিজের অজাত সন্তানকে 
পৃথিবীতে আনার মতো মনোবল দেখিয়েছে এমন প্রাতিকূল পাঁরস্থিতিতে-_ 
সাদাসধে চেহারার নশচে ইস্পাতের মতন কান মেয়েটা । ওকে দেখলে আবার 
মস্োতের ওপর ভেসে উঠে বাঁচতে ইচ্ছে হয় । এই [তিন রমণীর কথা একসতোয় 
বাঁধা হয়ে মনে পড়ে যায় । আঁজজের বউকে যারা বাসে চড়াতে গোছল তাদের 
মধ্যে আমাদের বুড়ো হাবিলদার লগনু ছিল। ফিরে আসার পর দোঁখ তার 
চোখে জল ৷ আজীবন আমৃত্যু বৈধব্য মেয়েটার । *বশুরবাঁড় ফেরা আর হল 
না, সব চাওয়া ওর শেষ হয়ে গেল তার আগেই । 

রতন ঘাঁসর বউ সোনাবড়ার ধুলোভরা ভাঙা রাস্তা ধরে আজও ফি 
জল আনতে যায়? হেলে পড়া ঘরের দাওয়া নাঁকয়ে জোয়ারের রুটি হাতে 
গড়ে জলে 'ভাঁজয়ে খেতে দেয় বুড়ো *বশুরকে ? ওকেও তো বাঁচতেই হবে। 
ওর মনের আগুন আজও ীনভেছে কিনা জানি না--ধুলোভরা ওর চুলের 


৪০ 


মেটে গন্ধটা এখনও আমার স্মৃতিকে রক্তমাখা নখের আঁচড়ে বদ্ধ করে। 
আমার মরদকে জবাই-এর জানোয়ারের মতো কেটে দিল দনদুপুরে আর 
তোমরা মজা দেখতে থাকলে ! হায়রে পীলশওয়ালা ! ট্রায়াল এখনও শহর* 
হয়নি সেসন্স কোর্টে, 'বচারের রায় বেরোলেই রাজপুতরা আবার দৌড়বে 
হাইকোট আপিলে, যাঁদও তন্ন তন্ন করে প্রাতাঁট সাক্ষ্যপ্রমাণ এনে নিখুত, 
ছদুহীন করেছি আমাদের চাজাশট, বাঁরিডির ও সি'র প্রায় ট£াট চেপে ধরে 
ইনভেস্টিগেশন নিরপেক্ষ করিয়োছ । জান না শেষ পযন্ত কা দাঁড়াবে! 
বিচারের পুরো রাগ্ভাটাই এত দখর্ঘ, এত জটিল তার বাঁক ! এত মহার্ঘ্য সেই 
তণর্থ যাত্রার নৈবেদ্য ! সব দাম চুঁকয়ে শেষ পর্যন্ত পেশছতে পারবে ক রতন 
ঘাঁসর বউ ? 

মিঃ মুখাঁজ-র বাঁড় কাল গোঁছলাম ৷ ঘরগুলো ফাঁকা ফাঁকা দেখাচ্ছে। 
[জানসপন্র বাঁধা প্রায় শেষ । বাঁড়টা ছেড়ে দিয়েই যাবেন, বড় আসবাবপত্র 
একটা ঘরে বন্ধ করে । কলকাতায় থাকবেন দিন পনেরো, তারপর পাটনা হয়ে 
মুজঃফরপুর। গুর সঙ্গে অদর ভবিষ্যতে দেখা হওয়ার আশা রইল না। 
মুকুটের মা চার-পাঁচাঁদন হল প্যাঁকং-এর তদারক করছেন । কাল দোঁখ কাপ- 
প্লেটগুলো কত যত্ব করে তোয়ালে 'দয়ে মুড়ে আবার কাগজ 'দিয়ে প্যাক 
করছেন একাঁট একাঁটি করে। বললেন-_এতে ট্রাকের ঝাঁকুনিতে ভাঙবে না। 
তাঁরতরকাঁর, ফলমূল সব বালয়ে দেওয়া হল । পাঁরজাত কিছুই দেখছেন 
না। একমনে কেস-এর জাজমেণ্ট লিখছেন, ফাইল দেখে দেখে নীচে কেলছেন। 
টেবিলের কাগজের গাদায় গুর মুখ অদ-শ্যপ্রায় । 

[বদায়সভার একটানা জের চলেছে । সব জায়গাতেই অবধারিতভাবে ওরা 
আমায়ও ডাকে । সভা আযাটেপ্ড করতে করতে ক্লান্ত হয়ে গোঁছ আম, মিঃ 
মুখাঁজঁর 'নার্বকার মুখ দেখে অবশ্য কিছু বোঝা যায় না। সেই একই 
রকমের বাঁধানো মানপন্র, ফুলের তোড়া, ভাষণে চোখের জল ফেলা, কাগজের 
প্লেটে জলখাবার, আতাঁথদের জন্য দাম কাচের বাসনে চা, অন্যদের জন্য 
কাচের গ্লাসে । আমাকেও ভাষণ দিতে হয় সবন্ত, সেটা আরও যন্ত্রণার । 

চার নম্বর কোলিয়ারর কোলকাটাররা যে ফেয়ারওয়েল দিল সেটাতে 
কোনও ভাষণ ছিল না, চেয়ার টোবিলও না। িনশেডের তলায় ছেড়া গালিচা, 
হ্যাজাকের আলো, সারা পাঁরমণ্ডলে ধেনো মদ, বাঁড়র ধোঁওয়া আর কয়লার 
গণ্ড়োর গন্ধ। বাচ্চা বুড়ো, কামনদের 'ালয়ে প্রায় তিনশো লোক। 
কোঁলয়ার ম্যানেজার বিব্রত, হতবাক এরকম জমায়েতে আমাদের মতন 
ভদুলোকেরা ৷ তাও প্রশাসনের দুই গ্তল্ভ ! খোলটোল বাঁজয়ে ওরা ানজেরাই 
গান করল খাওয়া দাওয়ার পর । শালপাতায় গরম খিছুঁড় আর খাঁসর মাংস। 
[টপটপে-ব্টি অন্ধকারে আমরা সবার কাছ থেকে [বিদায় 'নয়ে জিপে 
বসতে যাব, দাঁড়পাকানো চেহারার এক বুড়ো বলল-_একটু দাঁড়াও বাবদ, 
আমার ওরৎ আসছে। অন্ধকারের ভেতর থেকে অল্পবয়সী একটা যুবতী 
মেয়ে প্রায় হাঁপাতে হাঁপাতে এল । পাতায় করে টগর ফুল, 'সি“দূর আর 


৪১৯ 


চন্দন এনেছে । আমাদের দু'জনের মাথায় টিকা একে দিল, রাখ পাঁরয়ে দল 
হলুদ সুতোর । পাঁরজাতকে বলল, ভাইয়া, যেখানেই যাও বোনকে ভূলবে 
না। মরদ যাঁদ বেচাল কাজ করে, আম কিন্তু তোমাকেই চিঠি দেব । 

সেই বুড়োসমেত জনতা হাসতে লাগল । 

স্পন্দমান হাসিমুখ সেই কোলাহলের কাছ থেকে বহুদূর গিয়ে হাইওয়েতে 
এসে পড়ে পাঁরজাত শুধোলেন, আপনার মনে পড়ছে মেয়েটাকে কোথায় 
দোখাছি আগে ? 

আমার তৎক্ষণাৎ মনে হয়নি, এবার মনে পড়ল । ওর নাম মনে নেই । চার 
নম্বর কোলয়ারির পে-ক্লাকররে রাক্ষতা হয়ে ছিল বছর পাঁচ ছয়। শেষে 
সন্তান-সম্ভবা হয়ে মেয়েটি দিজের বাবা-মাকে সঙ্গে 'নয়ে চন্দ্রবীর সংএর 
স্তীর সঙ্গে দেখা করতে যায় ওর বাঁড়। প্রত্যুত্তরে চন্দ্রবীরের ছেলেরা মায়ের 
ইঙ্গতে নিজেদের বাড়তেই প্রচণ্ড মারধর করে মেয়োটকে, পাঁরশেষে অর্ধউলঙ্গ 
করে রাস্তায় ছেড়ে দেয় । মেয়োট পাঁরজাতের আফিসে এসে বাইরে বসোছল । 
ছেলেগুলির নামে কেস হয়েছিল, চন্দ্রবীরকে থানায় ডেকে বিশদ জেরা করা 
হয়োছিল ওদের সম্পর্ক নিয়ে। আজ্ঞে সব ষড়যন্ত্র, সর্বৈব মধ্যা__বলতে বলতে 
হার্ট ও রব্রাডপ্রেসারের দোহাই ?দয়ে দুম করে অজ্ঞান হয়ে গোছল লোকটা । 
থানার ভেতরেই । আজকের এই রোগা শুকনো বুড়ো গণেশরাম, মজদূর 
সরদার, ওকে বিয়ে করে । আমাদের মধ্যস্থতায়, ওর প্রাকাঁববাহ সন্তানের 
িতৃত্বও নিয়ে 'নিয়োছিল গণেশরাম । 

পারিজাত সামনের হ্যালোজেন আলো জলা দূর পযন্ত বিছানো রাস্তার 
দকে তাঁকয়ে হাসলেন । 

পাথরের দেওয়াল চিরে যে অ*বখ গাছ রোজ বেড়ে ওঠে, আকাশের দিকে 
উঠে যায় আলোর খোঁজে, তার পরমায়ু নিয়ে আমরা মিথ্যে ভেবে মার ৷ ওই 
মেয়োট সেই দেওয়ালের অশবখ গাছ । 

এ ্ঘ সং 

রামগড় ছাড়িয়ে চলে এসেছি আমরা-__আঁম, পাঁরজাত, পুতলী ও 
বাবুয়া | বাচ্চা দুটো গাড়িতে উঠলেই ঘুমিয়ে পড়ে । এ ওর গায়ে পা তুলে 
ঘুমোচ্ছে । হু হু করে হাওয়া এসে আমাদের চুল লণ্ডভণ্ড করে 'দয়ে যাচ্ছে । 
বাইরে প্রসন্ন দিন। মেঘভাঙা নরম রোদ ঠোঁট ফালয়ে জেগে আছে । অল্প 
জলে ডোবা ধানক্ষেত ঝকঝকে সবুজ । দূরের পাহাড়ে নীলচে মেঘ জমাট 
বেধেছে । গাঁড়র সামনের সিটে বোঝাই ফুল, ফুলের মালা, তোড়ায় বাঁধা 
গোলাপ রজননগন্ধা । আমাদের ঘাড়ের পেছনেও ফুল, মাথা হেলালেই কুসুম 
স্পর্শ । এত ফুল একই দিনে কেন দেয়__পারজাত জিজ্ঞেস করলেন, রইয়ে 
সইয়ে দিতে পারে না ? 

আজ গর বাঁড়তে পুরো শহর ভেঙে পড়েছিল যাবার সময় । কলোনির 
সব লোক তো এসেই ছিল, বাইরের বাজার থেকে দোকানীরা, ককট্রান্টুর, 
কয়লাওয়ালা, স্কুলের 'মাস্টার-_কোনও বাধানষেধ না মেনে সবাই গেট খুলে 


৪ 


ঢুকে পড়েছিল । অবশ্য আজ কেউ ছিল না আটকানোর জন্য । ফুল নিতে 
নিতে ক্লান্ত হয়ে পাঁরজাত একসময় বিদায়ের নমস্কার করে গাঁড়তে বসে 
পড়লেন । 

জ্যোৎস্নাদেবী গর প্রণাম লেন না । গুর মাথাটা বুকে চেপে ধরে ঘ্রাণ 
ণনলেন মাথার, অস্ফুটে কি একটা বললেন । গর ছোট দুই মেয়ে দনিঃশব্দে 
কাঁদছিল। বারান্দার একটা থামের আধো আড়ালে মুকুট দাঁড়য়ে ছিল, সাদা 
শাঁড় পরেছিল আজ । পাথরের প্রাতমার মতো মুখ, কোঁকড়া চুলগুলো উড়ছে 
মুখের চারপাশে, যেন কোনও স্বপ্নের ঘোরে অনেক অনেক দরে দেখছে। 
দু'চোখের বাদাম মাঁণতে আবশবাস মাখানো মুগ্ধতা । ও যেন ভাবছেই না 
আজ কেউ চলে যাচ্ছে বলে । গাড়িটা ধীরে ধীরে টিলার নীচে নেমে এল । 
দু"পাশের গাছেদের পাতায় জমে থাকা বাঁন্টর জল গতরান্রের গাঁড়র মাথায় 
পিঠে ঝরে পড়ল । বাঁধের জলে দুপুরের সূর্য ভেঙেচুরে মিশে গেল। এই 
দলের আয়নার কাছে, এই নীল সবুজ দারাং পাহাড়ের দীর্ঘ কাহিনীর কাছে 
আবার কখনও দি ফিরে আসতে পারবেন পাঁরজাত ? 

হঠাৎ লখন চেখ্চয়ে উঠল, মেরা কেয়া হোগা হুজুর ? ডুকরে কেঁদে 
উঠল জোয়ান লোকটা । ভিড়ের মধ্যে কেউ ওকে কাঁধ জাঁড়য়ে কাছে টেনে নিল। 

আজ রান্রে মিঃ মহুখাঁজ” কলকাতার ট্রেন ধরবেন রাঁচি থেকে । গুকে স 
অফ করে বাচ্চাদের নিয়ে বাঁড় যাব আম | সাতাঁদনের ছাট [নিয়ে নিয়োছ। 

পেটরবারের মোড়ে তুমূল এক জনতা আমাদের পথ আটকাল। ফলের 
মালা নিলেন পাঁরজাত, 'ন্তু নামতে রাজ হলেন না, বললেন, আম ক্লান্ত । 
ট্রেনও ধরতে হবে আজ । নাছোড়বান্দা উৎসাহশ জননেতা রমেন্দ্রনারায়ণ ঝা 
জানলা 'দয়ে মাথা গাঁলয়ে দুঃখতভাবে বললেন, “কেন চার্জ দিয়ে দিলেন ? 
আমরা পাটনা যেতাম অড্নর বাতিল করাতে ! মিছিমিছি জামিলাজর জেদ 
1জতে গেল । আপাঁন জানবেন এখানকার পাবাঁলক ওকে সাপোর্ট করবে না। 
আমরা ছাড়ব না, ইলেকশন ইসন্য বানাব এটাকে ॥” 

হাসতে হাসতেই ঝা-এর হাতে মদ চাপড় দেন পাঁরজাত-_ আপনার 
আর খাতুনাঁজর কলহ দীর্ঘজীবী হোক | আমাদের মুক্তি দন। দুই শালের 
ডালে বাঁধা বদলি বিরোধী ক্লুদ্ধ ফেস্টুনকে পিছনে রেখে গাঁড় এঁগয়ে যায় । 

ঝাটিয়ানার মোড়ে কচি ডাব দেখে থামলাম | বাচ্চা দুটোও ঘুমের থেকে 
জেগে উঠেছে তেম্টায়। ঘেমে নেয়ে গেছে ওরা দহঃ'জন। আনাড়ী হাতের 
গোছগাছ--ওদের জলের বোতল আনতে ভুলে গেছি আম | আগ্রমূল্য এখানে 
ডাব-_তাই নিলাম একটা করে । ডাবের মধ্যে স্ট্র ডুবিয়ে দেখাঁছ ফুটপাথের 
ওপর থেকে হাতজোড় করে আমাদের নমস্কার করছে দেহাঁতি একাঁট বউ । লক্ষ 
কারান বাঁড়টার দোতলায় ব্যাঙ্ক । টের শার্ট ও ধুঁতিপরা দুই জোয়ান 
1সশড় দিয়ে নেমে ওর পাশে দাঁড়াল । হলদে ছাপাশাঁড় পরা, মাথার চুল টেনে 
1ফতেয় বাঁধা, পানের রসে ঠোঁট রাঙানো দুই হাতে গোছা গোছা কাচের চুঁড়। 

পারজাত জিজ্ঞাস চোখে তাঁকয়ে, কে মেয়েটি বেদপ্রকাশ, আমাদের 


৪৩ 


নমস্কার করল ? 

আমাদের রতন ঘাঁসর বউ। 

মেয়োট ততক্ষণে গাঁড়র কাছে এাগয়ে এসেছে। 

পরণাম বাবু ! 

রাম রাম । তুমি এখানে ক করছ ? 

ব্যাঙ্কের টাকা তুলতে এসোঁছলাম । আমার দেওর আর ওর বন্ধ আছে 
সঙ্গে। দশ হাজার টাকা জমা করোছলাম আমরা, রতন ঘাস মারা যাবার 
পর। 

কত বাড়ল তোমার টাকা সুদে-আসলে ? পারজাত শুধোল। 

মান হাসে বাট । টাকা আর কই বাবু, আজই তো সব ফাারয়ে গেল ! 
খাতা বন্ধ হয়ে গেল আজ! 

সে কী! বছরও তো ঘোরোন, করলে ক এত টাকা? নাজেরই গলা 
আত্নাদের মতো শোনায় আমার কানে । 

কত আর টাকা বাবু ! *বশুর বুড়ো মরে গেল, পাড়াশুদ্ধ লোক ধরল 
ভোঁজর জন্য । তারপর রোজ সংসারের খরচা । পাঁঠা কাটল ওরা মাঝে 
দু"তনবার। শুয়োর কিনেছে ভাসুরপো । দেওর একটা নতুন সাইকেল 
িনতে চাইছে । দু'মাস থেকে ঝগড়াঝাঁটি অশান্ত । রোজ গালাগাল দেয় । 
আজ সাতশো টাকা তুলে নিলাম । কিনে মন শান্ত করুক । 

পাঁরজাত ম্নান চোখে তাঁকয়ে আছেন ওর দকে-তোমার ছেলে কেমন 
আছে বউ ? 

আমাদের গাঁড়র চাকার দিকে তাকায় রতন ঘাঁসর বউ, বোধহয় দেখে 
চাকায় পম্ট ঝরা পাতা, মুথো ঘাস, কাদায় জড়ানো থ্যাংলানো গগরাঁগাঁটির 
শরীর । 

বউয়া তো নেই হুজুর ! মরে গেল আষাঢ় মাসে। দাস্ত পাইখানা হল 
জলের মতো । ঘরে মরদ কেউ নেই । রাতভর কোলে ক'রে বসে ছিলাম, 
সকালে ওরা নিয়ে গোর দিয়ে এল । 

রাঁচি হাতিয়া এক্সপ্রেস স্টেশনে ঢুকছে । কয়লার ধূমল গন্ধ, ভিড়__-আকুল 
হয়ে মানুষ দৌড়োচ্ছে, রাতের জন্য একটু মাথা রাখার জায়গা চাই চলন্ত 
গাঁড়তে ৷ হুইলারের স্টল থেকে একটা বাংলা পেপার কনলাম পাঁরজাতের 
জন্য--আর জলের বোতল একটা, জল আনেনান । ট্রেনের শেষ ঘণ্টা পড়ে 
গেল । পাঁরজাতের দুই চোখে আর্র বিষপ্নতা । ঠোঁটে মান একাঁচলতে হাঁস 
লেগে আছে । গত এক বছরের সব ছাঁব, দৃশ্য ও স্মৃতি ষে বল্মীকগৃহ ধারে 
ধীরে তৈরি করেছে গুর চেতনার ভিতর, আজকের চলে যাওয়া তাকে নিমেষে 
ধংস করতে পারবে না। এই বেতোয়া নদীর দেশ, এই কয়লাখাঁনর ধুূলো- 
ধোঁয়ার গন্ধ, শালবনের গরম হাওয়ার ঘূর্ণি বহুদিন ধরে ফিরে ফিরে আসবে 
পুর মনে--উান মুখে কখনও না বললেও আম জান। 

করমরদনের সময় আমি বললাম- আপাঁন চিন্তা করবেন না, কাজ চলবে 


188 


আগের মতনই। যতাঁদন এখানে আছ, মুকুটকে আম দেখব_ আপান' 
শ্চিন্ত মনে যান। 

ট্রেন চলতে শুরু করেছে, প্রায় বুঝতে না পারার মতো 'নভগর ঝাঁকান 
দয়ে । আন ট্রেনের সঙ্গে সঙ্গে দ্রুত হাটাছ। 

পাঁরজাত চেঁচয়ে বললেন-_ আর আপনাকে কে দেখবে, বেদপ্রকাশ ? 

[স্পড নিল ট্রেন। নরালম্ব একাঁট করতল, প্ল্যাটফর্মের আলো থেকে 
বাইরের অন্ধকারের দিকে ধীরে ধারে চলে যাচ্ছে । ট্রেন চলে যাওয়ার পরবঙণ 
জনতার ওপর দরে পা ফেলে আম প্ল্যাটফর্মের বাইরে গাঁড়র মধ্যে দুই 
শশুর কাছে এসে দাঁড়ালাম । 

ওদের কিছু খাওয়ানো হয়ান। 

কত দৌর করে দিলে বাবা, বাবুয়া ঘাময়ে পড়ল । 

তুমি এখনও ঘুমোওান মামাঁন ? 

আম কী করে ঘুমোই ! তুমি যে আসান আমার চিন্তা হয় না বাঝ ? 

পুতলশর িহ্কলঙ্ক 1শশু-কপালের দিকে তাঁকয়ে আম পারজাতের 
প্রশ্নের উত্তর খংজাছলাম। 


৪৫ 


ন্িল্ুদ্েম্ণ আভ্র। 


বাকা আলো এসে পড়েছে জলে । আলো নয়, সে কী মেঘের উড়ন্ত ছায়া, 
পিঙ্গল নদীর ওপর 'দয়ে ভবিতব্যের মতন এাঁগয়ে যাচ্ছে আগে আগে ছুটতে 
থাকা হলদে রোদের ফালাটিকে ধরতে । কার্তিকের শুরু । নদীতঁর থেকে 
আরম্ভ করে যতদ-র বাঁয়ে চোখ যায়, ধানের চারাগুল শস্যভারে নুয়ে 
পড়েছে । তারই মাঝ 'দিয়ে হাওয়া বয়ে গেলে শিরাঁশরানো শব্দ ছাঁড়য়ে পড়ে 
উদ্বেল রোদে । নৌকোয় নোঙর ফেলা । তবু এক্ষীন ঢাউস ক্যান হাতে 
সারেংকে ডাঙায় নেমে যেতে দেখে মণীশের সৌম্য ভুরু কুচকে ওঠে । 

আই সত্যেন, এখন চললে কোথায়, দোর হয়ে যাবে না? এগারোটা 
বাজে! 

তেল নয়ে আস । আগে তো বলেনাঁন একাকুলা যাবেন । তেলে কুলোবে 
না। আর ওই আপনার হাতঘাঁড় আর দ্যাখেন না, এখন ঘাঁড়তে টাইম দেবে 
না। আমরা এখন জোয়ার-ভাঁটার হাতের পুতুল, বুঝলেন ? 

তবু মণীশের ভূর সোজা হয় না দেখে বুড়ো আঙুল দিয়ে কপালের 
মাঝখানটা খচিয়ে নিয়ে একটু 'বিরন্তভাবে হেসেছে সত্যেন, এই তো যাব 
আর আসব । জল বাড়ছে । সাড়ে এগারোটায় ছাড়লে চারটে নাগাদ খুলা 
পৌছোব। আগে ছাড়লেও লাভ নাই, না ! মাঝপথে যাঁদ জল নামতে শুরু 
করে, মুশাঁকলে পড়তে হবে । এই খগাই, বাবুদেরকে চা দে। 

মণশ-এর রে-ব্যান-এ আকাশের মেঘ-মায়ার নেগোঁটিভ । (রিয়া স্বামীর 
মুখের দিকে তাঁকয়ে মৃদু হেসে বলেছে, এত ব্যন্ত হচ্ছ কেন ? এও তো বেশ 
লাগছে, নৌকো ডাঙায়* বাঁধা, জলের ছলাং-ছলাৎ শব্দ, যাব যাব ভাব, অথচ 
যাচ্ছি না। 

মণীশ ও 'রয়ার চারদিকে পিঙ্গল জলে রোদ চমকাচ্ছে, যেন বিশাল এক 
খয়োর বালচরা শাঁড় বি*বভুবন জুড়ে মেলে ধরেছে কেউ । 

কোঁবিনের বাইরে এসে রোলিংএ পিঠ দিয়ে দাঁড়য়ে রিয়ার খোলা কোমরে 
একাঁট হাত রাখে মণীশ, আমার জন্যে নাকি ওকে সাত-তাড়াতাঁড় তুলে 
আনলাম ! হয়তো সকালে জলখাবারও খায়নি ! 

এই ওকে কছু খেতে দাও না, আর খগাইকে বলো আমাদের চা দিতে । 
ওর গলা যতই মৃদু করুক বাইরে, লোয়ার-কোবিনের ছাতে পা লম্বা করে 
বসে থাকা আঁনন্দ্যর কান এড়ায় না। আনন্দ্য ওখানে বসেই বলে ওঠে, ভ্যাট-, 
আম ব্রেকফাস্ট খেয়ে বোৌরয়োছ, তোরই বোধ হয় খিদে পেয়েছে, পেটুক 
কোথাকার ! 

1িছুক্ষণ পর নিচ থেকে 1সাঁড় ভেঙে উঠে "স্টলের থালায় চায়ের কাপ 


৪৬ 


সাঁজয়ে ধূপ্ধাপ্‌ শব্দ করে অসুন্দর অসুখী খগাই এসে হাজির হ'লে রিয়া 
তার জলরঙা চুঁড় পরা হাতের তরল শব্দ তুলে মণীশকে হাসি 'মশিয়ে চা 
দেয়, তার পর পেছন থেকে আনন্দ্যর কাছে গিয়ে চায়ের কাপাট বাড়িয়ে ধরে 
বলে, ভালো লাগছে ? 

আনিন্দ্যর কপালের ওপর এসে পড়া কোঁকড়া এক গাছ চুল একটুখানি 
কেপে ওঠে শুধু । তার ঠোঁট ঈষং আলোকিত হয় হাসিতে । 

হ্যাঁ ভালোই লাগছে, সুন্দর হাওয়া- আপনার ? 

এ প্রশ্নের উত্তর দেওয়ার আগেই 'রিয়ার চোখের সামনে অস্পম্ট হয়ে যায় 
নদশতীর, নদ ীজল, রৌদ্র, ধানক্ষেত ও ভ্যান গঘের ছবির মতো আকাশের 
নল । চরাচর আত সক্ষম দোলায় দুলতে আরম্ভ করে । 'রয়ার মুখের উবে 
যাওয়া স্বর্ণাভা আনন্দ্য দেখতে পায় না। দেখে না মণীশও, সে নিচু হয়ে 
এই মুহূর্তে সামান্য ধুলোমাখা পুরু কাঁচের প্লেট থেকে বুনো চেহারার 
নোনতা বিস্কুট তুলে নিচ্ছে, খিদে পেয়েছে মণীশের। 

সারেং ফিরে এসে মণশের ঈদকে পেছন ফিরে একাঁট শবাঁড় ধরায় ও 
কোবনের ভেতর ঢুকে লণ্ স্টার্ট করে । নোঙর তোলা হয়ে গেছে, হাঁটু 
পর্যন্ত কাদা, কাদা দুহাতের আঙুলে, একজন ক্ষেতমজুর ছপছপ করতে 
করতে জল ছেড়ে উঠে আসতে লেগেছে । খগাইও আসছে, তার ধুতি হাঁটুর 
ওপরে, শালীনতার এক ই িনচে গোটানো । চুলে কাদা লেগেছে । 

হংসাল নদী ধরে নৌকো এগোয়, সূর্য মাঝ-আকাশে । তাকে দেখা যায় 
না, বরং এক ধরনের মেঘচাপা আলো ছাড়িয়ে পড়েছে সারা পৃথিবীতে, 
ছপাং ছপাং জল সরে যাচ্ছে । বুড়ো হাতির গায়ের চামড়ার মতন অনর্থক 
আঁকবধীক নদীর জলে । দামাল হাওয়ায় ঢেউ ফংসে উঠে আছড়ে পড়ছে 
নৌকোর ওপর । নৌকোর চলার মধ্যে এক অদ্ভুত টলমল ভাঁঙ্গ আছে, যেন 
সদ্য হাঁটতে শেখা শিশু বেড়াতে বোরয়েছে। রোলং ধরে দাঁড়াতে গেলে 
হাওয়া এসে চোখেমুখে নোনা ঝাপট মারে । মণীশ নিচে তাঁকয়ে সরে আসে। 
রিয়া কোবনের ভেতর থেকেই একদহ্টে তাকে দেখছে, জানে মণীশ | এও 
জানে এই মুহূর্তে রিয়ার চোখের পলকগ্ীল ভিজে, চোখের কোল আন্ত 
আন্তে শুকোচ্ছে । এই বোধ মণীশকে এক ধরনের কষ্ট মেশানো আনন্দ দেয়। 

দু-এক 'মাঁনট বাইরে তাঁকয়ে থাকার পর 'রয়া বোঁরয়ে এসে উল্টোদিকের 
রোলং-এ তার সুন্দর শরীরখাঁনির ভয় সইয়ে দাঁড়ালো । মেঘলা আকাশের 
[দকে চেয়ে আছে রিয়া, দেখছে টানের ঝাঁক কেমন নরম ল্যা্ডিং করে ঠোঁটে 
তুলে 'নিয়ে যাচ্ছে ঢেউয়ের চুড়োয় ভেসে ওঠা রুপোলি মাছ, চিলেরা মালার 
মতন আকাশ থেকে নেমে জলে সাঁতার কেটে ভাসতে ভাসতে এগিয়ে যাচ্ছে । 
আহা, রিয়াকে যাঁদ কেউ আকাশে তুলে নিয়ে যেত! 

ভেতরের কৌবনে একাঁদকে সারেং-এর সস্টয়ারং। স্টিয়ারং-এর দুই 
পাশে জানলার ধার ঘেঁষে তার ঠাকুর-দেবতারা- লক্ষমী, গণেশ, বনদেবা, 
মা কালী ; স'দ;র, শুকনো ফুল-বেলপাতার গন্ধ । উল্টোদিকে গাঁদ-মোড়া 


৪৭ 


বিছানা, 'তিনাদক খোলা কাচের জানলাপথে থইথই নদী দেখা যায়। মেঘের 
মাঝখানে কাঠের রোলিঙে ঘেরা নিচে যাবার প্যাচালো পিশীড় । সেই বিছানার 
ওপর ফোমের বালিশে ঠেসান দিয়ে বসে সিগারেট ধারয়েছে মণীশ, তার 
পায়ের কাছে সামান্য জায়গা খালি পেয়ে ময়লাটে ম্যাপাঁট মেলে ধরে 'নশীথ 
দে। নতুন কি পুরনো ম্যাপ বোঝা যায় না, খয়োর কাগজে লুপ্ত হরপ্পার 
নকশার মতন আঁকাবাঁকা রেখা সব- নদীর গাঁতপথ, দ্বীপ, জঙ্গল, নদশতশর 
আলাদা আলাদা সংকেতে বোঝানো । 

আমরা এখানে, 'রিয়া শুনছে জেনেই গলা পাঁরিম্কার করে সপ্রাতিভ হবার 
চেষ্টা করে নিশথ, আমরা এখন কাট্ানয়ার দিকে এগোঁচ্ছি । আমাদের ডান 
ধারে কুশাভদ্রুপুর, বাঁদিকে রিয়ামাল । 

কই, কাটা'নয়া কোথায় ? 

মণীশ জিজ্ঞেস করে, কিন্তু হেলান দিয়েই বসে থাকে । কাজেই ম্যাপ 
সমেত তার দিকে ঝ*কতে হয় নিশথ দে-কে। সম্ভ্রম-জনিত দূরত্ব বজায় রেখে 
বলতে হয়, এই যে এইখানটায় ! 

দূরে তাঁকয়োছল 'রয়া-_অনেক দরে । মেঘ-ফারয়ে-যাওয়া রোদ-ঝলমল 
আকাশ মেখলার 'নচে সে হঠাৎ দেখতে পেয়েছে ধানবোনা মাঠের ঝাপসা 
সবুজ নেই, পাঁখদের ওড়াউীড় নেই, নেই লোকালয়ের জলরঙা ছবি-_আকাশ 
বাতাস জুড়ে কেবল 'পঙ্গল, ছটফটানো, গজরানো আঁস্ছুর জল--এই সেই 
সংগম যেখানে শঙ্খ এসে মিশেছে চন্দনীতে । দুই ডাকসাইটে নাগরণ নদণী 
উত্তরের টাঁড়, পাহাড়, শালবনের হলুদ সবুজ মাঁড়য়ে টলমল করতে করতে 
সমুদ্রের নেশায় চুর হয়ে সমতলে নেমে শান্ত হয়ে গেছে, বিশাল হয়ে গেছে 
এক দন, তারপর সমুদ্রের কাছে এসে তাদের দেখা হয়ে গেছে আচমকা-_-এই 
দুইয়ের মিলনে তোর কাটানয়া নদ সমদুদ্রেরই মঙ্তন অন্তহীন, উদ্ভাসত । 
সেই তুমুল আঁবন্কারের আনন্দে বালিকার মতো দৌড়ে এসেছে 'রয়া। 
ভিতরে ঢ্‌কে নশীথ দে-র গা ঘেষে দাঁড়য়ে ম্যাপের আকবধীকর ওপর 
সোনার ময়ূর আংট পরা চাঁপা-গৌর তার আঙুল রেখে বলেছে, এই যে 
কাটানিয়া এখানে, আমি দেখোঁছ । 

মণীশ অলসভাবে জানলা 'দয়ে বাইরে তাকিয়ে বলে উঠেছে, আরেব্বাস, 
ক জল! আই আনন্দ্য, ভেতরে এসে বোস না! আমরা ক 'ফাঁশং 
হারবারের দিকেই যাচ্ছি? নিশীথবাবু, খাওয়া-দাওয়ার কাঁ ব্যবস্থা হয়েছে 
দুপুরে ? 

আনন্দ্য হেসে মুখ ফেরায়, তোর আবার খিদে পেয়ে গেল ! এই তো 
খোল ! 

[নশশথ নিচে পণ্ডা ও খগাইকে বকছে লেবু-লংকা আনোৌন বলে। 
ইত্যবসরে মণণীশ ধোঁওয়া ছাড়ে, আমার তো সব সময়েই খিদে--দিনে, 
রাতে । 

রয়া অপমানে রাঙা মুখ নিয়ে বাইরে চলে যায় । ওটুকু তো তুচ্ছ করতেই 


৪৮ 


পারে মণীশ । আনন্দ্যর মুখের হাঁসি মেলায় না। যাঁদও সে কেবিনের ছাত 
ছেড়ে ওঠে না। মাথার পেছনে এক হাত রেখে রাজার মতন এই আকাশ- 
রোদের ঘ্রাণ নেয় অনিন্দ্য । তামাটে, ঘন ওর মাথার চুল সেই রকমই আছে, 
যেমন ছিল 'বশ্বাবদ্যালয়ের দিনগুলিতে । রোদে-জলে গায়ের রং হয়তো 
খানিকটা পুড়েছে, এইটুকুই । নইলে সেই রমণীমনোহর ঠোঁট, তখক্ষ1 নাক, 
সেই কপাল--া ছঠুলে পুড়ে ছাই হয়ে যাবে ওম্ঠাধর ; লম্বায় অবশ্য 
মণীশের ধারে কাছেও নেই আঁনন্দ্য, মাত্র পাঁচ ফুট ছ ইি। তব ছিপাঁছপে 
বলেই এখনও পালকের মতন 'াভ্ঘর দেখায় ওকে । তুলনায় মণীশের মাথার 
সামনের দিকের চুল পাতলা হতে লেগেছে, চিবুক ও গাল ভা'র, চুলের পিছ-- 
হঠাকে জুলপিও সামাল দিতে পারছে না আজকাল । ছ ফুটের ওপর হাইট 
বলেই ওর শরীরের বিশালতা আরও প্রকট হয়ে পড়ে । 

এখনও বাঁশি বাজাস, আনন্দ্য, এনোছিস ? 

হ্যাঁ, আছে সঙ্গে । এখন না। দেখি, সন্ধেবেলা বাজাবো । 

নিচে হীঞ্জনঘরের কাছ ঘেঁষে কাজ চলছেই । এই দুলুননির মধ্যেও 
অসন্তুষ্ট খগ্াই ও তার সঙ্গে বারো-তেরো বছরের একটা ছোট ছেলে, তার নাম 
পণ্চা, ডাব কাটছে, কেটে ওপরে আনলো, চা বানয়েছে দুবার, 'বাঁড় খাচ্ছে 
জেরা, বাটা মশলাও বানানো হল । পাঁচফোড়নের গন্ধ সাঁড় বেয়ে ঘুরতে 
ঘুরতে ওপরে উঠে হারয়ে যায় ঢেউয়ের ওপর | এই জলযাত্রায় সবাঁকছ 
গুছিয়ে গাঁছয়ে সঙ্গে আনতে হয়েছে নিশীথ দে-কে, পান-চুন-খয়ের অবাধ, 
খাবার জলও ৷ 

কাটানয়া 'ফাঁশং হারবারের কাছে এসে পড়েছে নৌকো । এখানেই 
খাওয়াদাওয়া সারা হবে দুপুরের । নৌকোয় নৌকোয়, মাছ ধরার ট্রলারে 
ছয়লাপ নদশীর কূল । নানা রকম ক্ল্যাগ উড়ছে লাল, সবুজ, নীল । জলের 
রং এখন ময়লাটে কালো । আকাশে মেঘ, রোদ নেই কিন্তু সেই চাপা আলোর 
ক্ষীণক বদলেই নদী তার রং বদলায় । বাতাসে আনমনা ঝুলে আছে শুখুরার 
গাঞপ্জ । এখানে সব ট্রলারের ছাতেই মাছ শুকোচ্ছে, ষেন সবাই ভেবে নিয়েছে, 
বৃষ্টি হবার কোনও সম্ভাবনা নেই আর । এত ভিড়, নৌকো 'ভিড্রোবার ঠাঁই 
নেই । মন্ত বড় একটা মোটর লণ্চের কাছ ঘে'ষে এসেছে ওরা ৷ নতুন রং বার্ণসে 
চমকাচ্ছে, কালো বাজারের টাকায় ফুলে-ফেপে ওঠা নতুন বড়লোকের মতন । 

খগাই, এই খগাই, নৌকো বাঁধবে ! 

নৌকো সোজা এগোতে এগোতে এক সময় ঘা খাওয়া জন্তুর মতন কাতর 
আওয়াজ করে, বোধহয় তীরের এটেল মাঁট পা টেনে ধরায় ৷ সবুজ মাস্তুল 
সামান্য টাল খেয়ে আবার সোজা হয়। ইঞ্জিনের শব্দ এখন থেমে গেছে । 
নোঙরের দাঁড়দড়া পড়ে আছে কোঁবনের মাথায় । নোঙরটা কাদামাখা অবস্থায় 
অবসন্ন পড়ে । একটা বাজতে চলল । 

খগাই রোলং টপকে আঁতকায় দাঁড়টা হাতে ধরে পাশের লণ্ে চলে গেল । 
ওর গায়েই আপাতত নৌকো বাঁধা হবে । পণ্চাও লিকাঁপকে পায়ে চলে গেল, 


৪৯ 
ভিনদনারেখা-8 


হাতে একটা আধুলি। লেবু ও লংকা নিয়ে আসবে পাড়ের দোকান থেকে । 

পাশের নৌকোয় চিংঁড় ধরা হচ্ছে । নাইলনের জালের মধ্যে ছটফট করতে 
থাকা মাছগুলি বাঁধাঁডহার প্রসৌসং ইউানটে চলে যাবে সমন্ধের আগেই । অল্প 
কিছু ভাজা হয়ে রামৃ-এর সঙ্গে সেজে চলে আসবে ডিনার টোবলে-_ যদি 
সন্ধেবেলা নৌকোয় মালিক আসেন, অথবা তাঁর বন্ধুরা । এই লণ্চে অনেক- 
গুলি লোক, মাঝিমাল্লা, হেজ্পার, জোয়ান সব । রোঁলং ধরে গাদাগাদি দাঁড়য়ে 
গঞ্পগাছা করছে, সম্ভবত অন্পধরপ্রদেশ থেকে এসেছে, দেহের বর্ণ শ্যাম । হাঁটুর 
কাছে রান লুঙ্গি গোটানো ৷ জদ্শা পানের গন্ধ ভূরভুর করছে কারও মুখে, 
কানের কাছে তারস্বরে ট্রানীজস্টর ধরে শুনছে কেউ । (রিয়া আঁচয়ে উঠে 
তোয়ালেতে হাত মুছে রেলিঙের ধারে দাঁড়াতেই ও লণ্চের পুরুবদের ভিড়ে 
শশহরণ বয়ে যায়। মোমের মতন মাজা এই মেয়ের তনুদেহ । কাঁধের ওপর 
ঝাঁপয়ে পড়া রেশম-সদৃশ ট্রিমূড্‌ চুল, নিবিড়-কালো পাঁখর মতন 'বাস্মিত- 
অবোধ দুই চোখ ও ভুরু- এই নোনা-পানির দাঁরয়ায় ! 

রয়ার কস্তুরীগন্ধে তাদের মুগ্ধতা, আওয়াজ, টাকরায় জিভ ঠেকানো এ 
নৌকোর পুরুষদের চোখ এড়ায় না । মনীশ বাইরে এসে দাঁড়য়েছে, খাওয়া- 
দাওয়া তাঁড়ঘাঁড় সেরে, সতর্ক এটো-হাতে নিশীথও । কেবল মন্ত্রমুগ্ধ আনন্দ্য 
বসেই আছে । খাওয়ার পর ওর প্লেট নিয়ে গেছে খগাই । ছিমছাম নিরামিষ 
লাণ্। রাজনগরের মিস্টি সেদ্ধ চালের লাল লাল ভাত, বউালর ডাল, করলা 
ভাজা আর কুমড়োর তরকার। সামান্য ওপাশে বেকে হাত ধুয়ে নিয়েছে 
আঁনন্দ্য, খগাই জল ঢেলে 1দয়েছে তার হাতে । এখন আঁনন্দ্যর সুন্দর কপালে 
কিছ চিন্তা খেলা করছে। 

হুট্‌ ক'রে তুলে তো নিয়ে এলি, 'প্রন্সিপালকেও বলা হল না! ছেলে- 
গুলো দুদন যে কী করবে! 

ছাড় তো! প্লেজর ট্রিপে এসে তখন থেকে কেবল স্কুল স্কুল করছিস। 
ওরা ঠিক ম্যানেজ করবে । আর প্রান্সিপালকে চিঠি লিখে এসোছিস তো! 
কাল রোববার_ সোমবার দুপ5রেই তোকে নাময়ে দিচ্ছি । 

তবু আনন্দ্যর কপালের সক্ষম রেখাগীল মেলায় না দেখে মণণীশ বলেছে, 
বোর হচ্ছিস না তো? কাঁবতা-টাবতা লিখাঁতস এককালে, মনে হ'ল তোর 
ভাল লাগবে- একা একা আর কত জায়গায়ই বা বেড়াস ! 

না, না। মান মুখে জোর ক'রে আলো ফোটায় আনন্দ্য। 

তুই না নিয়ে এলে আমার কোনাঁদন আসাই হ”্ত না। আচ্ছা বাঁদিকে কণ 
বল তো আমাদের ? 

নৌকো সরে এসেছে পাড়ের কাছ থেকে । নদীর মাঝবরাবর ৷ দূরে ফিকে 
হয়ে মাঁলয়ে যাচ্ছে ফিশিং হারবারের বেচাকেনার গুঞ্জন, মাছের জালের 
আঁশটে গন্ধ। ক্যা ক্র্যাও করে ডেকে কী যেন অচেনা এক পাঁখি উড়ে গেছে 
এইমাত্র ওদের মাথার ওপর দিয়ে । সেই কি এনেছে প্রথম আসন্ন-সবুজ সমুদ্রের 
সংকেত ? 


041 


নিশীথ দে তার ম্যাপ সাবধানে কোঁবনের ছাতে শবছিয়ে বলল, উমৃম্‌, 
বাঁয়ে কালয়াপুরাণ, [রজাভ“ ফরেস্ট । 

কেওড়া, সুন্দরী ও হেতাল জঙ্গলের ঘন-সবুজ দেওয়াল দেখা যাচ্ছে 
এখান থেকেই । এহ অরণ্য--আঁদম, দুভেদ্য ও রহস্যময় । শোনা যায় 
রূপকণকার জঙ্গলও এর তুলনায় এখনও কিশোর । পাড়ের মাঁট খেয়ে যায় 
জল । জল সরে গেলে ভাঁটায় সঃদাঁরর শেকড় জেগে থাকে কাদার ভেতর । 

নশীথ কালো, লম্বা, দাঁত উচ্চু। নিশীথ একটু গবের সঙ্গে বলে £ 
আপাঁন তো রূপকাঁণকা থেকেই ফিরতে চেয়োছিলেন ! একাকুলার আইডিয়াটা 
আমার । আজ পীর্ণমা । একাকুলার সঈ-বীচে যাবার এমন ভালো সময় আর 
পাওয়া যাবে না, জানেন ? 

সত্যেন তো বলাছল, তেলে কুলোবে না। 

নিশবথ দে গলা নাময়ে বলে, ওদের সবসময় ছুতোনাতা | লম্বা ভিউ 
করতে হবে যে, কাল আবার রোববার--এই তো রূপকণিকায় তেল নেবো । 
কাটানিয়াতে খগাই দশ লিটার নিয়ে এসেছে পাশের ট্রলার থেকে । তেল একটা 
ব্যাপার নাক! 

খুলা নদশীট ক্ষীণকায়া, নতান্ত লাজুক । কাটানয়ার মতন আতকায় 
নদদেহ থেকে বোরয়ে নানাভাবে একেবেঁকে সে যে কীভাবে রূপকাঁণকায় 
গিয়ে পড়েছে, এ পথে না এলে তার চলন-বুত্তান্ত অজানাই রয়ে যেত ওদের । 
অবশ্য 'িশীথ দে তাকে ছেড়ে কথা কইত না। তার হরস্পাম্যাপে খুলার 
মতন একাকনী রজস্বলাও নীল পোঁন্সলে দাগানো । 

খুলার মুখেই নৌকো বদলাতে হল । অগভীর, কৃশা নদী- বড় মোটর 
বোট যাবে না এতে । ছোট্ট একটি রঙচঙে নীল-লাল হালকা বোট, খুলা ও 
কাটানয়ার সংগমের মুখে পাড়ের কাছে বাঁধা । তার রাঁঙন ছায়া ভেঙেচুরে 
1থরাঁথর করে কাঁপে জলের ভেতর | ঠিক ওপরেই তীরের কাদায় এক জংধরা 
বো লেখা- সাবধান, মির আছে । কুমিরের কু” মুছে গেছে কবে । জরাগ্রন্ত 
এই বোর্ডকে কেউ আর তোয়াক্কা করে না। প্রথমে নিশীথ লাফিয়ে নামে 
ছোট নৌকোয়, তার পর এক লাফে দৃপ্ত মণীশ, আনন্দ্যর দিকে নশীথই হাত 
বাড়িয়ে দেয়, এই যে স্যার” বলে। ললা'য়ত ?রয়া পায়ের চাট হাতে নিয়ে, 
শাঁড় সামলে নেমে আসে-__নিশীথেরও হাত নেয় না, মণীশেরও না। 

অপ্রশন্ত জলধারা চলেছে আঁকাবাঁকা । দুধারে হেতাল বন। নল, 
হেতাল, কেরুয়া, সুন্দরী গাছে মেশামাঁশ ঝাপসা দেওয়াল । 'দনের পড়ন্ত 
আলোয় গাছগুলি রহস্যভরে জলে ঝঃকে পড়েছে । প্রায় স্থির নদীজল । তার 
কাঁপন এমনই সক্ষম যে, খাঁল চোখে দেখাই যায় না। হয়তো কেবল আনন্দ্য 
শুনতে পায়--তার স্নায়ুতন্তীতে কোথাও পৌছে সে শব্দজাল শিঞ্জন 
তোলে । ঘন সবুজ ছায়া । মোহময় তাদের দুলুনি জলের ভেতর । সালম 
আলর পাঁখর বইটি নিশথের প্রাণ । এখন সে বইটি বার করে মলাটে 
একবার ফু দিয়ে মণীশের করকমলে সমর্পণ করেছে । একশো চল্লিশ রকমের 


৬৯ 


পাঁখ আছে এখানকার পাঁখিরালয়ে । মাছরাঙাই কেবল ছ রকমের । যত 
প্রজাতির পাঁখ দেখতে পাবে মণশশ, ততই উজ্জল হবে নিশীথদের কাল, 
পড়া ভাবষ্যং ৷ 

এখন ডান হাতে বনের ফাঁকে ঘন ধানক্ষেত। বাঁয়ে সুন্দরীর বন। জলের 
তোড়ে গাছেদের দম বন্ধ হয়ে আসে বুঝি । তাই শেকড়গদীল উচিয়ে আছে 
ণন*বাস নেবার জন্য | মাঝনদীতে জেগে আছে পুরনো আঁকাবাঁকা ডালপালা 
ও গণীড়সহ কে*রুয়া গাছ । তার মাথায় বসে ওটা ক গো? সাদা-কালো 
গছটাছট পায়েড কিং ফিশার কণ সুন্দর, কী গম্ভীর! !রয়া প্রায় নেচে ওঠে । 
কত দেখবে ওর দু চোখ ! জলে হাঁটু ডুবিয়ে গুগল খোঁজে দোৌশ বক। 
মাথার ওপর শদয়ে হু-উ-স করে উড়ে চলে যায় আইবিস। জংল আম 
ও গরানের ঝোপের ফাঁকে ছটফট করে উড়ে বেড়াচ্ছে সবুজ তোতারা । বনে 
আঁবশ্রান্ত ডাকাডাকি চলেছে সারাঁদন | সুন্দর, অপর:প বিকেল । রোদ মরে 
গেছে অনেক আগেই । ছায়া ঘনায় । বনের সবুজ গন্ধ হাওয়ায় জাঁড়য়ে ভেসে 
থাকে । অচেনা কত হলুদ বনফুল উঁকি মারে সবুজ পদরি ওপার থেকে । 
কত লতা দোলে মগডাল থেকে হাতির শখড়ের মতন । খালি নৌকোর ভটভট 
শব্দ, এইটুকুই যা! বাঁক সমন্ত চরাচরকে গভজলের মতন ঘিরে আছে 
স্তষ্ধতা ৷ 

ব্যাটার অপারেটেড নৌকো রাখেন না কেন, নিশীথবাবু ? মণীশ ভুরু 
কু্চকোয়, এত শব্দ করে যাওয়ার কোনও মানে হয় 2 

ছোট নৌকো । কোবিনও খুদে একটি । খাওয়ার জল, 'রিয়া-মণশশদের 
মালপত্র সুউকেস-এ বোঝাই । বাইরে ওরা চারজন । আড়াআড়ি পেতে দেওয়া 
পাটাতনের ওপর আনন্দ্য, ওর গা ঘেঁষে 'রয়া । বাইনক্স হাতে মণীশ সামনে 
দাঁড়য়ে, ঠিক পেছনেই সম্ভ্রমে একট. কুঁজো হয়ে নিশীথ দে । রিয়ার নরম চুলে 
ভরা মাথা আনন্দ্যর কাঁধ ছয়ে গেছে । বাঁক ঘোর।র পরেই আচমকা িকেলের 
হলুদ আলোয় ঝলমল করে ওঠে দৃশ্যপট । এ আলোকে কি অরণ্য শুষে 
গনয়েছিল এতক্ষণ ? অরণ্যের ছায়াঘেরা খুলা নদী যেন আনবার্যতার তোড়ে 
এসে পড়েছে রূপকাঁণিকায় ৷ রূপকাঁণকা বড় নদ, এখানে তার চলন ইন্দ্রধনুর 
মতন বাঁকা । এই কাঁকন-বাঁকে ঢোকার মুখে কাদায় শুয়ে থাকা প্রাগোতিহাসিক 
এক আতকার কুমিরকে কন্টে হাতে ভর 'দিয়ে দাঁড়য়ে উঠতে দেখে রিয়া । 
বুঝ অনেকক্ষণ শহয়েছিল এই কুমির । ভাঁটার সময় কাদায় শুয়ে সে রোজই 
শকারের অপেক্ষায় থাকে । জোয়ারের জল এলে আনমনে ভেসে যাবে । ফার্ন ও 
হেতাল পাতা খুজে তার ওপর ডিম পেড়ে রাখতে হয় তাকে এখানে ওখানে । 
হয়তো আচমকা নৌকোর শব্দ ভেসে এসে সব কিছু গোলমাল করে দিয়েছে । 
ধরয়া কথা বলে না, ওর সারা শরীর শিউরে ওঠে একবার এবং এই িশিহরণের 
উত্তপ্ত রোমা আনন্দ্যর দেহে জহরের মতন সণ্তারিত হয়ে যায়। আঁনন্দ্য 
1নঃশব্দে মুখ ফেরায় 'রয়ার দিকে । রিয়া ডুবন্ত মানুষের আতুরতায় আনন্দ্যর 
কপাল, নাক, ঠোঁট, চিবুক স্পর্শ করে তার চোখের ভাষা দিয়ে । সেই মুহূর্তে 


৬৭ 


আনন্দ্যর কালো চশমায় এক মায়াময় ছাঁবর প্রাতাবিম্ব ভেসে যায় £ নটী- 
সংন্দরীর ডাল ছেড়ে উড়ে যাওয়া তুতে নীলরঙা স্বাপ্নল এক মাছরাঙার ! 
মাত্র একাঁট ক দ্যাট মহত, কারণ চোখ থেকে বাইনঝ্স নামিয়ে মণীশ পেছন 
ফিরেছে ; তার পেছন ফেরার সঙ্গে সঙ্গে হাওয়া বদলে যায় । খিদে পেয়েছে 
মণীশের | 

এই, খগাইকে বলো না! কাছে এসে 'রিয়ার শুভ্র কাঁধের ও পিঠের দৃশ্য- 
মানতাকে ওর আঙুলগুলি খিদের কথা জানাতেই, খগাই অন্তর্ধামীর মতন 
পিছন থেকে বিস্কুট ও চানাচুরের থালা বাড়িয়ে দিয়েছে । কোথায় লুকিয়ে 
ছিল কেজানে! 

হ্যাঁ, খগাইও এসেছে এ নৌকোয়। পণ্চা রয়ে গেছে বড় নৌকোয়__ 
ঘ্‌মোচ্ছে, ঘমোক ছেলেটা । খগাই না এলে বাবুদের ফাইফরমাশ খাটে কে! 
খগাই ভালমত ফাইফরমাশ না খাটলে [়িশীথও বদাল হবে না এই অজ- 
গোবিন্দপুর থেকে । আর বদল না হলে সিম্ধবাদের গজ্পের বুড়োর মতন 
অনাঁদ অনন্ত কাল নশীথ দে তার বসদের, তাদের বউ ও বউয়ের বন্ধুদের 
ঘাড়ে করে এইসব আই'বিস, পেইণ্টেড স্টক্ৎ স্নেকবাড+ কুমির, জোয়ার-ভাঁটা 
দোঁথয়ে বেড়াবে । কুশভদ্রপুরের ভারনাকুলার স্কুলে এক হাঁটু কাদা ভেঙে 
গিয়ে আষাঢ় থেকে আশ্বিন হেজে যাবে তার চোদ্দ বছরের ছেলে । 

কাজেই খগাই ! 

আজ দুপুরে কেবল দটিখানি ভাত ছেল-_ডাল নাই, কিছু নাই | পেট 
ভরে নাই মোর ! 

ক্ষুণ্রভাবে খগাই এই কথা বলতেই দশ টাকার একখানি নোট নিশশীথ তার 
হাতে গজে দিয়েছে স্নেহভরে ৷ 

রাখ রাখ ! রাতে বেশি করে ভাল খাস এখন । আর রাঙতাপুরের চিধাঁড় 
তা 'নাচ্ছই আমরা--লংকা কালোজরে দিয়ে ঝোল, কেমন ? 

বাঁক ঘোরার পর থেকে আসন্ন সন্ধ্যার ঘ্বাণ জাঁড়য়ে ধরছে চরাচরকে । 
নিবে যাওয়ার আগে যেন কীভাবে একবার জঙলে উঠোছল শেষ 'বকেলের 
হলুদ আলোটি খুলার মুখে । রূপকাঁণকার দুই পাড়ে অগাধ হেতাল বন, 
ঝাপসা সবুজের পদাঁ িনথর দাঁড়য়ে, এখান থেকে দেখা যায়। চিতল 
হারণেরা জল খেতে এসে ইতঃভ্ত খুরের লিগ রেখে গেছে কাদায় । গেরুয়া 
রঙের বাজের শরীরে সাঁঝ নামছে । গরান কাঠে বানানো রূপকণিকার আদম 
জোট পোরয়ে পাড়ে পৌছতে পেশীছতে শেকড় ছড়ায় সন্ধে। কাদায় অনবরত 
লাফ মেরে চলেছে রাশি রাশ মাড স্পাইক। 

আনন্দ্যটা সন্ত দেখতে পেল না! ধূস্‌, কী লাভ হল ! খগাই ওকে 
জেটি পার করে দেবার পর আনিন্দ্য ততক্ষণে একাই আপ্তে আন্তে সরু 'সাথর 
মতন স.রাঁকর রাম্তা ধরে ডাকবাংলোর দকে চলেছে । 

রিয়া তার খরপবদহ্যুৎ দৃ্টি হানে মণীশের মুখে, তুমি তো জানতেই, 
তবে ওকে আনলে কেন 2 


$৩ 


মণীশ এ কথার কোনও উত্তর দেয় না। তার ভূরু কুঁচকেই থাকে। 
আসলে এই প্রশ্নের উত্তর তার নিজেরই জানা নেই। প্রথমে সে ঠিক করোছল, 
রুপকাণকার এই বাংলোয় একি রাত কাটিয়ে, যে পথে এসেছিল সেই পথেই 
কুশভদ্রপূর ফিরে যাবে । অথচ নৌকোয় পা রাখার পরবতর্শ মুহূর্ত থেকেই 
তাকে টানছে একাকুলার বিজন সমযূদ্রতট, তার জ্যোৎস্না, ক্যাসহীরনা-বন, 
পাগল হওয়া | যাবেই মণীশ। নিশীথ দে আরও প্রলুত্ধ করেছে তাকে । 
রোহতখুল্লার ও তার সঙ্গীরা আসছে, সেই খবরাঁট তারই পাঁরবেশন করা । 
একাকুলায় ওরা অপেক্ষা করবে, মণীশ ও রিয়া আসছে জানলে । 

এইভাবেই 'বনা পাঁরকল্পনায়ই কি মণ+শ চলে যায়নি আনন্দ্যর কাছে ? 
কুশভদ্রপুরের দুমড়োনো ছাতা পড়া শহরতালিতে জপ বগড়োনোয় 'বিরন্ত 
হয়ে সে আঁনন্দ্যদের স্কুলের কম্পাউণ্ডে আচমকা ঢুকে পড়োৌছল দন পনেরো 
আগে। তখন অবশ্য মণীশ জানত না, এখানেই থাকে আঁনন্দ্য । কয়েক 
মুহৃতের বিহৰলতা কাটিয়ে ওঠার পর দুজনে 'প্রীন্পপালের ঘরে বসে গন্রপ 
করেছিল দুশতন ঘণ্টা । সতেরো বছরের নরবাচ্ছিন্ন পগ্তব্ধতার পর । তখনই 
সে মনে মনে ঠিক করে, আগামী মাসে এই নদীযান্রার সময় সে আঁনন্দ্যকে তুলে 
ণনয়ে যাবে । একেবারে সকালে পেছে চমকে দেবে আনন্দ্যকে ৷ এই শহরে 
আ'নন্দ্য নির্বাম্ধব ৷ ছান্র হস্টেলের নিচের তলার একাঁট সিঙ্গল রুমে কীভাবে 
কাটে তার দিন! তন্তপোশ, সূটকেসের ওপর কাগজ পেতে বইপন্র সাজানো, 
এক কোণায় এক কেরোঁসন স্টোভ, ময়লা কোঁচকানো চাদর । ছিঃ! 

কিন্তু জল, আকাশ ও অরণ্যের আলিঙ্গনে হল এই বন পাঁথবীর 
সোনার গুঁটর ভেতরে প্রবেশ করার পর থেকেই মণীশ অনুভব করেছে যে, 
নিজের অজ্ঞাতসারে প্রাত মুহূর্তে এক অমানাবক নিষ্ঠুরতার পাঁরকলপনা 
করছে সে আনন্দ্যর প্রাতি। রিয়াকে সারপ্রাইজ দেবার ভূত তার মাথায় ভর 
করোছল আঁনন্দ্যরে দেখার সঙ্গে সঙ্গেই ৷ কিন্তু সেই প্ল্যান আর এই আঁদম 
বর্বরতা যে একই আত্াবশ্বাসের দুই সূচীমুখ, মণীশ ভালো করে বুঝে 
উঠতে পারোনি তখনও । 

তাদের দশ বছরের বিবাহোত্তর সহবাসে আঁনন্দ্য একবারও রিয়ার 
দৃশ্যমান পানিধ্যে আসোন, রা মুখেও নেয় না তার নাম । কত রাত না 
ঘুমিয়ে উৎকর্ণ কাটিয়েছে মণীশক্টছটফট করেছে এই আশঙ্কায়, যাঁদ স্বপ্নে বা 
জহরে আনন্দ্যকে ডাকে রিয়া ! হতাশ করেছে তাকে বার বার, অথচ আনন্দ্য 
তো আছে, তাদের জীবনের রন্ধে রন্ধে আনন্দ্যর বাস, রন্তধমনন-পথে তার 
যাওয়া আসা! কেন রিয়া এভাবে কষ্ট দেয় মণণীশকে, কেন এই আত্মপ্রবণ্নার 
নকাব ছিড়ে ফেলতে দেয় না িছুতেই ! 

রুক্ষ হয়ে উঠছে মণণীশ। যাঁদও বলেছে একাকুলা যাবেই, ানশীথ দে মনে 
করোছল, ও শেষমুহূর্তে মত বদলাবে । এতটা একটানা জলে জলে আসা-__ 
রৃপকাঁণকার আই. বি-তে রয়ে যাবে হয়তো রাতে । নিশশথের এই আভাস 
অননযায়ণী সামান্য ক্লান্ত অনিন্দ্যও সুটকেস খুলে জিনিসপত্র খাটের ওপর 


$৪ 


ছাঁড়য়ে ছিটিয়ে রাখাঁছল। কিন্তু চা খাওয়া ভালো করে শেষ না হতেই 
পকেটে দু হাত ভরে আকাশ আড়াল করে উঠে দাঁড়য়েছে মণীশ। 

কাম অন, লেট-স গো! 

এক্ষুনি বেরোবেন ? 


নিশীথের অমায়ক প্রশ্নের উত্তরে খচয়ে উঠে বলেছে, না তো ক, 
এখানে বসে মশার কামড় খাব ? একাকুলায় খুল্লার ওয়েট করবে না ? সবাইকে 
বলে দন রোড হয়ে নিতে । 

বাঁধাঁডহার কাগজ কলের ম্যানৌজং ডাইরেক্টর রো'হত খল্লার । সে বা 
তারা আজ রাতে একাকুলায় অপেক্ষা করবে মণীশের জন্য, 'রয়ার জন্য । 
মদ্যপান হবে চাঁদের আলোয় অনেক রাত পর্যন্ত লনে বসে । সঙ্গে রাঙতা- 
পরের ভাজা চিংাঁড়। কাছেই সমুদ্র তার শিঙার আওয়াজে ভরে দেবে নভগ্ভল। 
ঝাউবনে ঢুকে হে+টে চু্পিসাড়ে এগোবে রাতের হাওয়া । যতবারই গ্লাস থেকে 
ওত্ঠাধর|বষুন্ত করবে রোহত, রিয়াকে জরিপ করতে করতে তরল হয়ে 
উঠবে তার বড় বড় দুই চোখ । এমন তো কতবার হয়েছে ! 

তুমিতো আগে বলোন, ওরা আসবে ! আঃ, কী করছ £ রিয়ার গলা 
অভিমানে বুজে আসে জেঁটির দিকে এগোতে এগোতে । সম্ধের অন্ধকারে 
অভয়ারণ্যের এক ঝাঁক হারণ নিঃশব্দে চলে গেল ওদের পাশে রেখে । সুরকির 
রাঙা পথাঁট পেছনে হাঁরয়ে গেছে অভয়ারণ্যে ক্রমশ কৃশ হতে হতে । সামনে 
সেই আবার জেটি বেয়ে নেমে গেছে রূপকাঁণকা নদীতে । নদীর 'দকে তাঁকয়ে 
আকাঁস্মক ভয়ে হঠাৎ জমে যায় 'রয়া। এইমাত্র মণীশের আঙলগ্ল সাঁড়াঁশর 
মতন তার বাহুতে গেঁথে গোছল । এ কি চাপা রাগ মণীশের, অবোধ 
নিষ্ঠুরতা ! 

স্যার, আই ভিড নট মিন ইট । আচ্ছা, আসুক না খল্লার । তোমার জন্য 
অন্য ব্যবস্থা করব । 

নৌকোর পাটাতনে বসে অনিন্দ্য মৃদু গলায় মণীশকে বলে, তোর কি 
হয়েছে বল তো? ছটফট করাঁছস তখন থেকে ! এত রাতে ?স-ীবচে যাব, জল 
তো রুমশই বাড়ছে মনে হচ্ছে । তার চেয়ে না হয় আমরা রূপকিকাতেই *"" 

মণীশ একাঁট গাঢ় নিশ্বাস ছেড়ে বলে, তোর জন্য আমার বড় কম্ট হয় 
আঁনন্দ্য । এত ট্যালেন্ট, এমন রেজাল্ট, কী হল তোর বল তো! 

আনন্দ্যর মুখ অন্ধকারে কাঁছমের পিঠের মতন কাঁঠন হয়ে ওঠে, আম 
তো তোর দয়া চাইনি মণীশ ! 

1নঃশব্দে হাসে মণীশ । 

আমিও তো তোর দয়া চাইনি! কন্তু কী করবো বল, এক ঢোঁক দু 
ঢোঁক করে তোর দয়া পান করেই তো বাঁচতে হচ্ছে আমাকে ! 

সতর্ক নিশীথ দে নঃশব্দে পেছনে চলে গেছে, ইজিনের কাছে ছোট নৌকো, 
আড়াল-আবডালের জায়গা কই আর ! তবুও এ সময় কাছোপঠে না থাকাই 
ভাল। 


৫৫ 


কোঁবনের ভেতর ডান ধারের কাঠের বোণ্চিতে খগাই-এর পাতা গাঁদ ও 
চাদরে ঘুমিয়ে পড়েছে 'রিয়া। ?স-ীসকনেস না হলেও সকাল থেকে ক্রমাগত 
নৌকোর দুলমীনতে তার শরিরে এক ধরনের ব্যথা, মাথাটা ভারা লাগাঁছল। 
শোওয়ার আগে বোঁশ দুধ-চিনি দিয়ে এক কাপ চাও দিয়েছিল খগাই । চা-এর 
পর ঘুম আসার কথা নয়, চোখ তবু লেগে আসাছল রিয়ার । ঘ্‌মের ভেতর 
অনেক দূর পর্যন্ত সে টের পাচ্ছিল ঠাণ্ডা হাওয়ার ডানা ঝাপটানো, দুলন 
বাড়ছে, বাড়তে বাড়তে উত্তাল হয়ে যাচ্ছে । ঢেউ-এর মাথায় একখান প্রদীপের 
মতন ভাসছে রিয়ার শরীর | শাল-সেগুনে মেশানো ছোট নৌকা পলকা 
একেবারে ৷ কতক্ষণ ঘুমিয়েছে, খেয়াল নেই_কম্টে চোখ খুলে এক সময় 
শুয়ে শুয়ে ছোট্র জানলা দিয়ে রিয়া দেখতে পেল, জ্যোৎসনায় গজরাচ্ছে সবন্জ 
জল, আকাশে ঝলমল করছে প্ণার্ণমার চাঁদ ; এ তো নদী নয়, দু ধারে কলের 
রেখা কই? এ কি সমুদ্র! রুপকণিকার মোহনা পোঁরয়ে তবে কি নৌকো 
সাগরে এসে পড়ল ? 

ভশষণ দোলার মধ্যেই কোনও মতে বাইরে বোঁরয়ে এসে রিয়া দেখল, চাঁদের 
আলোয় দিগন্ত পর্যন্ত টলমল করছে সার্পল জল । এখন সবাই স্তব্ধ, নিঃসঙ্গ 
-মণীশ, আনন্দ্য, নিশীথ । আন্তে আস্তে রিয়ার মন্ত্রমুগ্ধ দু চোখের সামনে 
ফুটে উঠল হেতাল জঙ্গল দহ ধারে, মাঝখান "দিয়ে বয়ে ষাওয়া সর; নিম্তরঙ্গ 
এক জলরেখা, তার ভেতর "দিয়ে নৌকো এগিয়ে চলল তারের ঝাউ জঙ্গলের 
দিকে । তারপর এক সময় থেমে গেল হইীঞ্জনের শব্দ । 

আর এগোবে না বোট, কূলে ভিড়োবার উপায় নেই, জল একেবারে কম। 
এই হাঁট্জলেই লাফিয়ে নামতে হবে সবাইকে । 

একাকুলা । যেন বিসাঁজ'তা হয়ে বসে আছে একা'কনী এক নারী । অথবা 
চারাদকের ক্যাসুিনা গাছেদের সাম্মিলত দীর্ধানশ*বাস ৷ নাম শুনেই যেন 
বুকের ভেতরটা ফাঁকা হয়ে যায় । ডাকবাংলোর চারপাশে ঘন মশ্র জঙ্গল__ 
ঝাউ, গরান, নারকোল, বট, বড় ছোট নানা গাছপালা এলোমেলো ভাবে বেড়ে 
উঠেছে । বাইরে থেকে বাংলোটা দেখাই যায় না প্রথমে | নিঃশব্দ এক মাঁছল 
হেটে যাচ্ছে অন্ধকারে মণপশ, িশশথ দে, অনিন্দ্য, রিয়া ও সবশেষে লটবহর 
নয়ে খোঁড়াতে খোঁড়াতে খগাই । হ্যাঁ ওরা-এসে গেছে আগেই । রোহিতরা । 
হ্যাজাক, সিগারেটের ধোঁওয়া, ব্রিজের টোবিল, পানীয়, উরু চাপড়ে হাঁসি। 

খগাই-এর মুখ দুঃখে কুচকে যায়, অবশ্যই সে কিছ বলে না। এর অথ, 
একাট ণবাঁড় ভাল করে ধরানোর আগেই খগাইকে ধ্যাত গাঁয়ে রান্নাঘরে 
ঢুকতে হবে, গেঁথে যেতে হবে এবং দরকারে রান্নাঘর ও বাংলোর মাঝখানকার 
পথটুকু ট্রে হাতে পেরোতে হবে বারবার । মণীশের কপালে জ্যোৎস্না ও 
হ্যাজাক-মোমবাতর মেশামিশি আলো । ও এক পা বারান্দায় রেখেছে, এক 
পা 'নচে। নিচে থই থই বাল । বাংলোর চৌহাঁদ্দ খখজলেই বোরয়ে পড়বে 
কাঁকড়ার মরদেহ, ঝিনুক, পাঁখতে এনে ফেলা উীঁচ্ছস্ট। মণীশ এই ম্হুতে 
রুদ্ধ, 'িবষগ্ন না বিরন্ত বোঝার কোনও উপায় নেই, যাঁদও অন্ধকার বাথরদম 


৬৬ 


থেকে বোরয়ে মোমবাতির আলোয় সারাঁদনের ক্লান্তিমাখা পোশাক ছেড়ে 
হাঞ্কা সালোয়ার কামিজ পরতে পরতে ওর গলার মৃদু ডাকে বূক কেপে 
ওঠে রিয়ার । 

হ্যাঁ, আসাছি। অন্ধকারের ভেতর থেকেই সে সাড়া দেয় । 

ততক্ষণে রোহিত এগিয়ে এসে করমর্দন করেছে । ওঁদকে ম:খ করে 
বসোছল বলে প্রথমটা দেখতে পায়ান মণীশকে । রোহিতের সঙ্গে দুজন 
বন্ধু । তারাও উঠে দাঁড়য়েছে । 

কতক্ষণ এসেছেন ? 

এই তো পাঁয়তাল্লশ মিনিট মতন । আপনার রাহ্‌ দেখাছলাম | 

য়া দ্রুত বোঁরয়ে এসেছে, কপালে টিপ নেই, চোখে সেই ভোরের কাজল, 
ঠোঁট রাঙায়ান, নীল সালোয়ার কামজ ও জলের চ্ণ মাখা চুলে তাকে দেখে 
নটীসুন্দরশর ডাল ছেড়ে উড়ে চলে যাওয়া সেই নীল মাছরাঙাটির কথা মনে 
পড়ে মণীশের | মণীশ স্বতঃস্ফৃত উচ্ছৰাসে বলে ওঠে, বাঃ ! 

রোহত খৃল্লার ও তার সহযোগীদের উপস্থিতিতে অস্বান্ভত বোধ করে 
শরয়া । অথচ যেন কাছাকাছি কেউ নেই, এই আলো-আঁধারে তারা নঃসঙ্গ__ 
এইভাবে মণশ কাছে টেনে আনে রিয়াকে, ওর দুই কাঁধে হাত রেখে কানে 
কানে বলে, ওরা এসেছে । আম বসাঁছ। রাত হবে আমাদের । তুমি একট, 
আনন্দাটাকে নিয়ে বোঁড়য়ে এসো ি-বিচ থেকে । নাহলে বেচারার কোথাও 
বেড়ানো হবে না। 

1নজেকে [বিষুন্ত করে নিয়ে অপ্রাতিভ রিয়া প্রায় দৌড়ে ভেতরে চলে যায় । 
তার গমনপথে খাণনকটা নাটকণয় ভাঙ্গতে বে+কে দাঁড়াতে চেষ্টা করে রোহত 
খুল্পার, একটা হাত বাঁড়য়ে দিয়ে বলে, এ কী ! বসবেন না? বসুন, আপাঁন 
না থাকলে তো সন্ধের মেহাঁফিলই জহাড়য়ে যাবে" 

মণীশ হাসতে হাসতেই বলে, য়ু শাট আপ! 

এক ভর্খসনা ? রোহিত সোজা হয়, চেয়ারে ফিরে আসে । এবং তার 
বাশ জঙ্গল নিমূ্লীকরণের পারামট মণীশের কড়ে আঙুলে ঝুলছে, মণীশ 
আঙুল নাড়ালেই তা টুপ করে পড়ে ছ:ঃচের মতো অদৃশ্য হয়ে যাবে ফাইলের 
খড়ের গাদায়_-এই কথা জানে বলেই ম:খের হাঁস মেলাতে দেয় না রোহত, 
বসে পড়ে তাস সাজায় । 

বাংলোর খিড়ীকপথে একেবারে সর5, ঝাঁকড়া গাছপালার ভিড়ে গা 
ছমছমানো প্থাট ধরে আনন্দ্য আর রিয়া জ্যোৎস্নাকীর্ণ বেলাভূমিতে এসে 
পড়ার সময় আরও একজন তার পথ আটকাতে চেয়োছল । মালগাঁড়র লুজ 
শাণ্টেড বাঁগর মতন এখন পথেই দাঁড়িয়ে আছে নিশীথ দে। 

জণর্ণ ম্যাপাঁট সর্বদা কাছেই রাখে সে । সেই ম্যাপ বার করতে করতেই 
আনন্দ্যকে শোনাবার ছলে নশীথ রিয়াকে বলেছিল, পণিমার রাতে এই 
একাকুলা-'অপূর্ব ! জানেন না হয়তো, আঁলিভ িডলে কচ্ছপদের এই হচ্ছে 
1বরল এক নোস্টং গ্রাউন্ড । তিন-চার লাখ কাছিম এখানে ডিম পাড়তে আসে 


$৭ 


জানুয়ার-ফেরুয়ারতে । প্রথম ভিটেকশন- হুম, বোধ হয় উানশ শো 
চুয়াত্তর ! সবচেয়ে বোঁশ রেকড“ আরাইভাল-_ছ লাখ ! 

নিশীথবাবৃ, আপাঁন বাংলোর দিকে যান প্রিজ। গুদের কি লাগবে 
টাগবে'** 

রয়ার গলায় যে কাতরতা ফুটে ওঠে, তার অর্থ জানে নিশীথ। সোনার 
পাঁখাঁটকে পায়ে শেকল পাঁরয়ে ছেড়ে "দিয়েছে মণীশ । 'রয়ার কাছে এখন 
প্রীতাঁট মুহূর্ত দারুণ দামশ । িশীথ জানে, খেলা চলছে পাঁথবীর সবন্ত। 
এই খেলায় যে যার দাম আদায় করে নেবে । ষে নিতে পারবে না, সে বোধ । 

আনন্দ্য সমুদ্রের দিকে মুখ করে দাঁড়য়েছে ; রিয়ার একট, কাছে এসে 
অন্তরঙ্গ গলায় হিশথ বলে, আমার বদালর কথাটা একটু মণীশবাবুকে 
বলবেন ? বড় কম্টে আছ-_ছেলেপুলে-বউ এক জায়গায়, আমি এক জায়গায় 
দু বছরের ওপর এইভাবে বলবেন ? 

ক্রমশ দূরে চলে যায় রিয়ার শরীরের সুগন্ধের বলয় । 

য়া ও আনন্দ্যকে জ্যেৎস্নায় মিলিয়ে যেতে দেখে নিশীথ । হাতঘাঁড় 
দেখে সে। ফিরে যাবার পথে কিছু চিন্তা তার কপালে স্পম্ট হয়ে ওঠে 
শুকনো চন্দনের মতন । 

মাথার ওপরে--ঠিক ওপরে নয়, একটু বাঁয়ে হেলে চাঁদ । ডান হাতে 
ক্যাসরনা অরণ্যে হাওয়ার ডাহুক-ডাক। বাঁ দিকে সমুদ্র বাঁলতে ভেঙে 
পড়ছে উদ্বেল সাদা ঢেউয়ে । রিয়া ও আনন্দ্যর অবয়ব এই মুহূতে আলাদা 
করে চেনা যায় না। রিয়ার মূখ ঝুকে আছে আনন্দ্যর মুখের ওপর । ওর 
কপালে, গালে এসে লাগছে রিয়ার নশ*বাস। 

চশমাটা খোলো । 

থাক না। কী হবে দেখে? 

কেন তোমার এমন হল আনন্দ্য ? 

তুমিও যে মণীশের,মতো কথা বলছ ! 

প্রত্যুত্তরে য়া জোরে ঠোঁট দুটো চেপে ধরে ওর ?নজের দুই ঠোঁট দিয়ে । 

খুব কাছেই বালুবেলায় পড়ে আছে [বশাল এক কাছমের কংকাল। 
মাছধরার জালে শশতের মরসুমে প্রায়ই কাছিম ধরা পড়ে । ট্রলারগলি বর্বরের 
মতন কাঁছম তোলে । জালের মধ্যে ধাক্কাধাক্িতেই তাদের কতগুলো মারা 
যায় । কখনও জেলেরাই 'পাঁটয়ে মেরে ফেলে । জাল থেকে ছওড়ে বাইরে ফেলে 
দেয় । সেই প্রাণহশন শরীর সমুদ্র ফিরে নেয় নাআর। কাঁকড়া কি উড়ন্ত 
পাঁখরা ধীরে ধারে খেয়ে গেছে এই মৃত কাছিমের শরীর । পিঠের খোলাটা 
কেউ তুলে 'নিয়ে বিক্লি করে দিয়েছে । অর্থহীন কঙকালটা কেবল পড়ে আছে- 
মানুষ, পাঁখ, পোকা-মাকড় কেউ এখনও তাকে নিমূল করোন বলে। 

অনিন্দ্যর গলা রুদ্ধ হয়ে আসে, কেন আবার 'নজেকে জড়াচ্ছ রয়া ! 
তুম তো মণীশকে জানো_নিজে কম্ট পাবে ও দ্বিগুণ কম্ট দেবে, ঘণা 
করবে তোমায় । কেন তোমাকে আজ আমার হাত ধরে 'নিয়ে বেড়াবার জন্য 


৮ 


পাঠাল, আম তো চাইনি ! আমাকে বলাছল, রিয়াকে ছধলেই আ'ম বুঝতে 
পার, ওর শরীর-মন সেই মুহূর্তে অন্য কাউকে চাইছে ! অথচ গত দশ বছরে 
আম তোমাকে একাটও চিঠি লাখান, ফোন কারান, আর দেখার পাট তো 
উঠেই গেছে কবে । মণীশও তো জানে । কুশভদ্রুপুরের আমাদের স্কুলে খাওয়ার 
সময় ঘখন অন্ধ ছেলেমেয়েগীলকে মৃক-বাঁধর ছেলেগ্ালর গৃণ্ডামর হাত 
থেকে বাঁচাতে হয় [নিয়ম করে, আম এই ভেবে মনে মনে হাস--কী জাঁবন 
আমার ! পনেরো বছর আগে সেই যে তোমরা বালিগঞ্জ ফাঁড়র বাসা ছেড়ে 
চলে গেলে, 'দীল্লর ট্রাকে তোমাদের জানসপন্্র লোড হচ্ছিল, আমি দোতলায় 
দাঁড়য়ে দেখাঁছলাম, তারপরেই তো জানলা বন্ধ হয়ে গেল রিয়া! ট্যাবক্সি এল, 
সবার শেষে তুমি পেছনে জানলার ধারে বসলে । ওঠার আগে আমার দিকে 
তাকালে, হাত নাড়লে । তোমার শাঁড়র হলুদ আঁচল, তোমার সোঁদনের সেই 
দুই চোখ, সমস্ত আপ্তত্বের সেই এক মৃহৃতে“র ভাষা সেইটুকু আজ কতাঁদন 
হল অন্ধকারে বার বার উল্টেপাল্টে দেখছি । আর কোনও দিন দেখতে পাব 
না তোমাকে । 

চোখের জলে 'রয়ার সামনে মোছা শ্লেটের মতন [হাঁজাবাঁজ সাদা হয়ে যায় 
রাতের সমুদ্র । 

একটি আঙুলে ওর ভেজা গাল ছংয়ে 'নয়ে আঁনন্দ্য বলে, আজ সারা'দন 
তোমরা কত কথাই যে বলছিলে ! রোদ্দুর, জলের রং, গাছের সবুজ, 
পাখিদের ওড়াউড়-_আগি সব শুনাছলাম। 'ানশশথ দে-র রানিং কমেন্টারিও? 
যেন রঙিন এক স্বপ্নের পৃথিবীতে তুমি ও মণীশ চোখ বেঁধে ঘোরাঁচ্ছিলে 
আমায় সারাঁদন । আমাদের ভাঙাচোরা স্কুলে, বিবর্ণ ঘরে এত কম্ট পাইনি 
রয়া। আজ বজ্ড কম্ট হচ্ছিল-_দম বন্ধ হয়ে আসাছিল আমার । 

রুপকাণকার সেই চিত্রল হারিণগুঁলকে তো দোৌখাঁন আম, তাদের চলে 
যাওয়ার যেটুকু শব্দ উঠোছল ঘাসে, পাতায় সেইটুকু শুনছি কেবল । তুমি 
বললে, আমার কালো চশমায় পাথর ওড়া দেখেছ তুমি, আম কেবল ডানার 
শব্দটুকু তুলে 'নতে পেরেছি নদীর বুক থেকে । হাওয়া, জলের নোনা স্বাদ, 
রোদের ওম এই সব আম পেয়েছি, বাঁক সব ছু তোমরা ছিঞ্ড়েখএড়ে 1নয়ে 
গেছ কেড়ে! তোমরা কেন আমাকে এখানে আনলে রিয়া ? 

জাফনার সমুদ্র থেকে শরতের শুরুতে রওনা হয়ে গেছে জলপাই কাছিমের 
দল। এ মরসুমে তারা সংখ্যায় কত, কেউ জানে না। তন লাখও হতে 
পারে, পাঁচ লাখও। মাঝ-সমদ্দ্রে যায় না, উপকূলের কাছের ম্রোতরেখা 
ধরেই সাঁতরায় দিন-রাত । মাঘের শেষে একাকুলায় এসে পৌছবার আগের 
মুহূর্তাট পর্যন্ত তাদের বিশ্রান নেই । তারপর একদিন নরম রোদে খাতাপন্র, 
বাইনকুলার নিয়ে ধেয়ে আসে ানশীথ দে-রা, এ অণ্চলের ও দেশের যত প্রাণী- 
শবজ্ঞানণ, পাঁরবেশাবজ্ঞানীরা । বালির ওপর যেখানে আনন্দ্য ও 'রয়া এখন 
শুয়ে আছে, একাদন সেখানে তিলধারণের জায়গা থাকবে না। জলপাই সবুজ 
লক্ষ লক্ষ ঢেউয়ের এক সমুদ্রে তৈরী হবে বেলাভৃমিতে ৷ ক্লমশ ভিম দেওয়া 


৬৯১ 


শহর করবে নারী কাছিমের দল । ছোট্র ছোট্ট সাদা বিশ-ত্রিশাটি কাঁছম 1শশদর 
জন্ম-সম্ভাবনাকে বড় মমতায় পাশ্পাখনা দিয়ে ওড়ানো বালিতে ঢেকে দেবে 
তারা-_যাতে আকাশের গাঙাচিল, এই পৃথিবীর ক্ষুধাত বালকবালকারা 
অথবা লোভী” ট্রলার-ব্যবসায়ীদের হাত তাদের ছ:তে না পারে । তারপর ফিরে 
চলে যাবে কাছিমেরা। যেমন আতুরতা নিয়ে দীর্ঘ সমুদ্রপথ পার হয়ে 
এসোঁছল একাদন, তেমনই অপার ওদাস্যে ফরে চলে যাবে । কিছ্াদন পর, 
হয়তো বা এমনই এক পহর্ণমার রাতে, বেলাভূমিতে আরম্ভ হয়ে যাবে 
অগ্রন্যংপাতের মতন এক নিঃশব্দ ওলট-পালট । লক্ষ লক্ষ কাঁছমশাবক [ডিম 
ভেঙে বোরয়ে আসবে, শরীরে বালু মেখে, মুখ তুলে একবার দেখবে এই অচিন 
তটরেখা, ওই কান্নায় ভেঙে পড়া সমদ্র, তারপর ধারে ধষ্ঈরে চলে যাবে জলের 
দিকে । আবকল সেই স্রোতরেখা ধরে ভেসে যাবে তারা-যে পথ দিয়ে তাদের 
অচেনা জননণীরা চলে গেছে । কে তাদের অজাত চেতনায় ভরে দেয় এই দীর্ঘ 
জলপথের নকশা, কে তাদের বলে দেয় সমুদ্রের দিশা, অন্তহীন রহস্য ! 

জ্যোৎস্না আপ্লুত জলের দিকে তাকিয়ে রিয়া ভাবে-_ কোনও অদ্ভুত 
মন্বলে যাঁদ সে ঢেউ-এর মাথায় ভাসতে ভাসতে ওই হে্তাল জঙ্গল ঘেরা কৃশ 
জলরেখা পোঁরয়ে চলে যেতে পারত, একাঁদন এই বালুবেলায় জেগে উঠত যাঁদ 
তার ও আনন্দ্যর সন্তান, তারপর জ্যোৎস্নায় হাঁটতে হাঁটতে সেই স্বপ্নের 
শিশু যেত জননীকে খুজতে । বাল "দিয়ে, খড়কুটো দিয়ে, আলো-অন্ধকার 
য়ে রিয়াও ?ি ঢেকে রেখে যেতে পারত না তার জন্ম-সম্ভাবনা ! তা পারোনি 
রয়া। শেষবারের মতন ও্ঠাধরে আনিন্দ্য7র চেতনা থেকে আজকের বণ- 
হশনতার স্মাতি মুছে দিতে দিতে সে দেখে দূর ক্যাসীরিনার দেওয়াল ঘেষে 
দুঁট লণ্ঠন এগিয়ে আসছে আততায়ীর মতন-_নিশীথ আসছে এবং মণীশ। 

মণীশ যতই পান করে থাকুক, রিয়া জানে, আজ তাকে নেবে না 
আগামশীকালও নয় । ঘরে ফেরার অনেক অনেক পর প্রয়োজনে গভ“সম্ভাবনা 
নিশ্চিহ্ন করাবে । তারপর? রিয়া নড়ে না, আনন্দ্যর একাঁট, হাত মুঠোর মধ্যে 
নিয়ে ভয়শূন্য, চিন্তাশূন্য বসে থাকে । সে জানে, বেচে থাকার সমন্ত 
অর্থহীন কোলাহলও ঢেউ-এর মতন শেষ হবে একাদিন। 


৬০ 


লসুখ-ুঃত্ধেল্র জন্হি 


দরজার বেলটা বেজে উঠল । বসার ঘর থেকে রান্নাঘরে আসার পথে ডান দিকে 
তাকালেই বাড়তে ঢোকার দরজাটা । টি ভি-র সামনে বসে কোলের ওপর 
খবরের কাগজ পেতে সবাঁজ কাটার ট্রের ওপর আম আটা মাখাছলাম । এখন 
আমার দহ'হাতের আট আঙলেই আটা । এমানতে একটা ভোঁতা ছার দিয়ে 
ঘষে ঘষে আটা তুলি । কোথায় যে রেখে গেছে মিলু, এখন হঠাৎ খুজে পেলাম 
না। আঞ আবার বেল বেজে উঠল ! গরম জলের কলের নীচে হাত পেতে 
তাড়াতাঁড় আগুলগুলো ধুয়ে নয়ে আপ্রনে মুছে দরজা খুললাম । মুখে 
সামান্য হাসির উদ্ভাস নিয়ে দাঁড়য়ে নীল। 

_-বিরন্ত করলাম না তো? 

_-ওমা, সে কী! ভেতরে আসুন না! 

_াঃ, অনেক কাজ । কিছু যাঁদ মনে না করেন, আপনাদের গাছ-ছাঁটার 
কাঁচিটা একট ধার নিতাম । আমারটায় একেবারে ধার নেই । 

দোতলায় যাবার সীঁড়র নীচে জুতো ও অন্যান্য জিনিসের না-খোলা 
দু-একটা বাকার সঙ্গে বাগানের গ্লাভস জোড়া আর কাঁচটা ছিল । লন- 
মোয়ারটা শামত পেছনে নিয়ে গেছে। আম বে+কে-চুরে কাঁচিটা তুলতে 
গেলাম, তার আগেই নল ভেতরে এক-পা রেখে দেখতে পেয়ে গেছেন 
1জানসটা কোথায় । 

__ও কী, আপানি দাঁড়ান, আমিই নিচ্ছি । 

মজবুত আযাথালট-শরীর হালকা চাঁপা ডালের মতন মুহূর্তে বাঁকয়ে 
নল কাঁচটা তুলে নিলেন, ওঠার সময় আমাদের দুজনের মদ ধাক্কা লাগল । 
দু'জনেই বোকার মতন হাসলাম । ঘাড় নেড়ে “সার” বললেন নীল, কাঁচিটা 
সন্ধের আগেই 1ীদয়ে যাচ্ছি 

_-তার জন্যে ব্যস্ত হবেন না। 

দরজার বাইরে চলে গেছেন, এখন তো আর প্রথা ভেঙে চা খেতে বলা 
যায় না। 

দরজা বন্ধ করে এসে রান্নাঘরে দাঁড়য়ে লেচি বানাতে বানাতে আঁম 
মনশ্চক্ষে নীলের বাগান ও লন দেখতে চেস্টা করাছলাম । আমাদেরই 
ডানাদকে পাশের বাঁড়টা। দৃশো একুশ নম্বর । আমাদের বাঁড়র চেয়ে 
অনেকটা বড়। দোতলা । সামনে পেছনে লন। নীল মাস-দুয়েক হল 
এসেছেন । 'কন্তু রোদে-জলে দ্রুত বেড়ে ওঠা ঘাসগ্াীল গুকে নাজেহাল করে 
ছাড়ছে। চুন্ত অনুযায়ী বাঁড়ওয়ালা লন দুটিতে বুরূশ-ছাঁট 'দয়েই বাঁড়াট 
হ্যাণ্ডওভার করোছিলেন। এখন ঘাসের মধ্যে অনায়াসে গা ডুঁবয়ে পাঁখরা 


৬৯ 


চলাফেরা করে। হলদে আগ্াছার ফুল, গাঢ় লাল পপি ইচ্ছেমতন বেড়ে 
উঠেছে । এইরকম ছোট শহরে এই নিয়ে সাধারণত প্রাতবেশীরা বলাবাল 
করে। তবে নীলের কথা আলাদা । উন চাঁদে গিয়ে ঘুরে এসেছেন। উন 
একটু খাপছাড়া, অগোছালো, প্রথাঁবরোধী- সবাই জানে । প্রথমে তো আম 
গরকে চিনতামই না। মিলু-শীমতও নয়। তখন মাত্র সপ্তাহখানেক আগে এক 
বৃষ্ট-ঝরা সকালে নীল আমস্ট্রং এসে পৌৌছেছেন । দুই বাঁড়র মাঝখানে ঘন 
ফার্নের বেড়া । বেড়া না থাকলেও অবশ্য কার সময় আছে প্রাতবেশশগর 
গীতাঁবাধ লক্ষ করার! রাস্তা পেরলে, আমাদের ঠিক উল্টোদিকে লিল 
হপারের বাঁড়। 'িল-এর ভাল নাম এলজাবেথ। উানশশো একচন্লিশে 
নৌনতালে ইয়ান হপারের সঙ্গে বিয়ে হয়েছিল। তারপর চার-পাঁচটা বছর 
কেটেছে মীরাটে । 'ভারত ছাড়ো"র অশান্ত আবহাওয়ায় টেনশন, আতঙক-_ 
অবশেষে সাতচল্লিশের গোড়ায় এীডনবরাতে ফেরা । ইয়ান মারা গেছেন বেশ 
কয়েক বছর আগে, লিল-এর ভারতজানিত মন-কেমন-করা এখনও মেলায়?ন। 
প্রায়ই সন্ধেবেলা এসে বসেন, কখনও আমাকে নিয়ে যান পুরনো ছবির 
আলবাম দেখাতে নিজের ড্রইংরুমে । 

সোঁদন সাড়ে আটটা নাগাদ আম রান্নাঘরে, মিলু-শামত টিভি দেখছে, 
প্রচুর পাঁরমাণে ক্ষমা চাইতে চাইতে লিল এসে টোবিলের ওপর থেকে একটু 
আগে ফেলে যাওয়া নজের টুীপটা তুলে নিলেন । তখন চন্দ্রুবজয়ের পণচশ 
বছর দেখাচ্ছল চ্যানেল ফোর-এ | মিলুরা আঠার মতন সেটে গেছে 
সোফাতে । টুক করে গলা বাঁড়য়ে লিল বলেছিল, আমার প্রাতবেশশকে চিনতে 
পারলে ! আশ্চর্য, পঁচিশ বছরে মানুষ কত বদলে যায় ! ইয়ান-এর পুরনো 
সাদা-কালো ফটোগুলো যখন বার করে দোখ**" 

আরে, এই তো নীল ! 

রপ্রুজ নাক, মোটা ভুরু, প্রায় মঙ্গোলয়ান কপাল । স্পেসক্যাফট ছাড়ার 
আগে মুহূর্তে কোবনের মধ্যেকার স্টিল ফটো । সামান্য উদ্বেগ, এক চিলতে 
টেনশন, একাঁবন্দু ভয়ও ি লেগে ছল সেই মুখে £? আম তো ভীষণ অবাক 
হয়ে গোছ, ইনিই নীল আমস্টট্রং ! কী আশ্চর্য! মিলুর বয়ন তখন ছয় না 
সাত, আমরা বেহালায়- সেই চাঁদে মানুষ পাঠাল আমোরকা । আমাদের 
পাড়ায় বেশ গুলতান হয়েছিল, একটা আলোচনা-সভা মতন হয়েছিল পরে। 
নেতাঁজ ক্লাবের িছু ছেলে একটা আভনন্দন পত্র ইংরোঁজতে দিখে আমোঁরকা 
পাঠিয়োছিল। তাতে আমাদের সবার সই 'নিয়েছিল-_আম, সাঁবতা, মণ্ট;র 
দাঁদমাও কাঁপা হাতে বাংলায় সই 'দিয়োছিলেন । মনে পড়ে সকালে উঠেই সমস্ত 
কাগজের হেড লাইনের চিৎকার_ চাঁদের ওপর টলমল পায়ে হে+টে বেড়ানো 
মানুষের ছাঁব ! 

সোঁদন রাতে বেশ উত্তোঁজত বোধ করেছিলাম । ?মলু-শামত মাঝখানের 
শোবার ঘরে শোয় । আজকাল ওদের দুজনের সম্পর্কে বেশ টালমাটাল চলছে। 
ফলে বুবালি রোজই আমার কাছে । আগে ঠিক ঘুম আসার আগে মাঝে-মধ্যে 


৬ 


বাবা-মায়ের কাছে দৌড় লাগাত। এখন আর মুখ ফুটে িছু বলে না। 
তাছাড়া মিল? ওকে সাড়ে নটার পর জাগতেই দেবে না, ধমকধামক দিয়ে ঘুম 
পাড়াবে। আম অনেকক্ষণ ধরে গন্গপ বলি বুবলিকে-_কাটা ঘড়ির, ভূতের, 
দৈত্যের, জানলে শাঁমত আমাকেও বকবে, বলবে আনসায়েণ্টাফক, কুসংস্কারের 
ঢাঁপ হচ্ছে মেয়েটা । বুবাঁল আমার গায়ে এক পা তুলে, হাত ?দয়ে আমায় 
জাঁড়য়ে ধরে শোয় । সন্তান মানুষ করতে বুকের উত্তাপও লাগে, সে কথা কি 
মুখে বোঝানো যায়? অথচ মিলুকে তো আমি কত আদর 'দয়ে মানুষ 
করোছ। 

তা সেই রাতে চ্যানেল ফোর-এর প্রোগ্রামে নীল আমস্ট্রং অথবা আমাদের 
শানঃশব্দ, লাজ_ক প্রাতিবেশীকে আঁবন্কার করে আম বেশ উত্তোজত বোধ 
করাছলাম । অনেকক্ষণ ঘুমই এল না । হয়তো দহু*পশলা বৃল্টির পর আচমকা 
চারপাশ ঠাণ্ডা হয়ে যাওয়ায় সেন্ট্রাল হি।টং চালিয়ে ভুল করেছিলাম । ঘরটা 
গরম হয়ে গোছল প্রয়োজনের চেয়ে বৌশ | কিংবা ীলল-এর সঙ্গে দু'কাপ চা 
খাওয়া উঁচত হয়ান সন্ধে সাতটার পর। বয়স তো বাড়ছে, ঘুম কমছে। 
রুটন সামান্য ওলট-পালট হলেই মুশকিল । ঘুম না এলে আমি আকাশ- 
পাতাল ভাব, আর তার মধ্যে প্রকাশের মুখটা ভেসে ওঠে বার বার । একটা 
চিঠিও তো 1দতে পারত সমপ্রকাশ ! সম্পর্কের দায় তো নেই, তবুও- মেয়ে- 
জামাইয়ের সামনে লঙ্জা করে না! শীমত আগে ভালবাসত আমাকে, নতুন 
নতুন বয়ের পর আমাদের বাড়তে আমার কোলে মাথা রেখে. শুয়েছে, কারণে 
অকারণে মা বলে ডেকেছে আমায় । খাওয়ার সময় প্রথম দহ-তিনটে গ্রাস ওর 
মুখে ভরে দিতে হবে আমায় । 

শীমতের মা ওর অল্প বয়স থেকেই রগ্র, মায়ের আদর ও ছোঁয়া কখনও ও 
তেমন ভাবে পায়ান । অথচ শামত ক্মশ দূরে চলে গেছে আমার কাছ থেকে । 
এই যে সংপ্রকাশ চলে গেল, রূপান্বিতাকে নিয়ে আলাদা থাকতে আরম্ভ করল 
অন্য বাসায়, এই ব্যাপারটার ব্লমাবকাশের জন্য শাঁমত মনে মনে আমাকেই 
দায়ী করে। আম জান আমার নিঃশব্দ একগঃয়েমিকে । তার সঙ্গে জ্‌ড়ে 
গেছে এই আশঙুকা যে, যেহেতু মিলু আমার একমান্র সন্তান, আমাকে দেখা- 
শোনার ভার পড়ল বুঝ ওদের ঘাড়ে । ছোট ছোট কারণে গলার স্বর বদলে 
যাওয়া, রুক্ষতা, খত ধরা শামত যেন কেমন হয়ে গেছে সাত্য ! এদেশে 
আম ?কন্তু নিজের ইচ্ছেয় আ'সাঁন। ওখানে মানে কলকাতায়, একরকম 
চলে যেতে পারত আমার । বাঁড়ভাড়াটা এখনও স:প্রকাশই দেয় । জয়েণ্ট 
আাকাউন্টের টাকাও তুলতে পার প্রয়োজনমতো । এটাও সংপ্রকাশের 
উদারতা । 'ববাহ্?বচ্ছেদের কাগজে সই কাঁরানি, তব বস্তু-স্বাচ্ছন্দ্যের কোনও 
অভাব বোধ করতে হয়ান আমাকে ৷ একা থাকলে ?কছু ছেলেমেয়েকে বাঁড়তে 
পড়াতে পারতাম । মিলুই আমাকে ধরে টেনেছিল- মা, তুমি চলো । জানোই 
তো ওদেশে কোনও সোশ্যাল লাইফ নেই, মেয়েটা সারাদন একা একা হাঁপিয়ে 
যাবে। আমাকে কাজ তো নিতেই হবে কিছ? একটা, নইলে চলবে না। তাছাড়া 


৬৩ 


লাইসেন্সড বোব-সিটার রোজ রাখতে গেলেও বেশ খরচা সোঁদক থেকে -"" 

শামতের এই বোকার মতো কথায় মিল: রাগ করেছিল । 

ও, মাকে তাহলে বেবি-সাঁটং করতে নিয়ে যাচ্ছ আমি ! 

আমিই হেসে ওদের থামিয়ে দিয়োছলাম--বাঁড়তে তো বসেই আছ, 
বুবাঁলকে দেখব না কেন £ ওদের বয়স কম, উচ্চাকাতক্ষা আছে, পথে নামতেই 
হবে ওদের-আমি এইটুকু করব না কেন ? শামত-মিলুর জন্য ? তবে শাঁমত 
যেটা বুঝতে পারেনি, বাবা তো হাজার হোক, প্রশ্নটা শুধু টাকার নয় 
নানা ধরনের বোব-সটারের সঙ্গে মানিয়ে নেওয়া কত মুশাকল হত বুবালর 
পক্ষে ! 

শামত উঠে গেলে মিলু আমাকে জাঁড়য়ে ধরে বলোছল, মা, তোমাকে 
আসতেই হবে, নাহলে মরে যাব আম । 'প্রজ, আসবে তো ? 

তা সেই আমার প্রথম আকাশে ওড়া । 

টেলিভিশনের পদয়ি ১৯৬৯-এর নীলকে দেখার পর সপ্তাহ তিনেক কেটে 
গেল নিজের গাঁততে। সকালে উঠি, জলখাবার এ বাড়তে দুধ আর 
সারয়ালস, কাজেই কিছু তোর করার নেই । মলু-শামিতের স্যান্ডউইচ 
বানাই, ওরা সঙ্গে নিয়ে যাবে । ববাল লা স্কুলেই খায় । সওয়া আটটার 
সময় বুবালকে স্কুলে দয়ে আসা । এটা অবশ্য দারুণ লাগে আমার | হম 
হিম সকালে দু'পাশের গাছগুঁল স্তব্ধ দাঁড়য়ে, রাতের বাঁম্টতে ঝরে পড়া 
চেরর ছোট ছোট গোলাপি পাপাঁড়তে ফুটপাত ছেয়ে আছে । মৃদু সুগন্ধ 
ওঠে ভেজা ঝোপঝাড় থেকে । একবার, বসন্তের গোড়ায়, আমাদের বাঁড়র 
কাছে চৌরান্তার রোড আইল্যাণ্ডে শরতের মরশহমী ফুলগুিকে বদলে বসন্তের 
নানা রঙের ফুল লাগাচ্ছিল ছ-সাত জন নীল ইউনিফর্ম পরা মানুষ । আম 
বুবালকে স্কুলে পৌঁছে দিয়ে ফেরার পথে অনেকক্ষণ দাঁড়িয়ে দাঁড়য়ে 
দেখলাম । লোকগদীল একটা ভ্যানে চড়ে এসেছে, সম্ভবত নগরপািকার । 
একজন মাঁট কোপাচ্ছে, আর একজন উপড়ে ফেলা ফুলগুিকে সযত্বে তুলে 
হাত-গাঁড়তে রাখছে । খুব বুড়ো একজন নতুন আনা ফুলের গাছগ্ুলিকে 
প্লাস্টকের পান্র থেকে বার করে সাজাচ্ছে। গাছ লাগাবে আরও দুজন । 
গিনঃশব্দ এক 1সম্ফানর মতন এই সাম্মীলত টিম-ওয়ার্ক মরমী মানষগুলির-_ 
কেউ কারও সঙ্গে কথা বলছে না, কেউ সিগারেট খাচ্ছে না, সকলে মিলে যেন 
কাচের দেওয়ালের ওপার থেকে দেখা এক ছাব। 

বাঁড়র সদর দরজার একটা চাবি থাকে আমার কাছে, কাজেই দোৌর হলেও 
ক্ষাত নেই । মিলু-শামত বোরয়ে যায় আমি ফেরার আগেই । আমি এসে 
স্নান সার । তারপর এক কাপ চা খেয়ে নিজের জন্য, দ্‌পুরের ও রাতের 
রান্না সবার সার | বুবাঁল স্কুল থেকে ফিরলে আর সময় পাওয়া যায় না। 

দুপুরে খেতে বসার আগে মাঝে মাঝেই আমাকে কাছের সুপার মাকেটে 
যেতে হয়_াকছ একটা ফুরলো, অথবা ফুরোবে, কিংবা হয়তো ভাল শাক- 
সবাঁজ নেই ঘরে । 'মলু অবশ্য বলে, মা, তুমি যেও না তো! সম্ধেবেলা। 


৬৪ 


আমরা এসে দেখব । কিন্তু ওরা যে বড় ক্লান্ত হয়ে ফেরে। লু আসে 
ছটায়। শাঁমত সাড়ে সাতটা নাগাদ । আটটায় সুপার মাকে বন্ধ হয়ে যায়। 
মানে, এসেই বাজারের ফর" হাতে সাইকেল ?নয়ে দৌড়বে শামত ।॥ তাকীীকরে 
হয়? আম যখন বসেই আছ বাঁড়তে ৷ সেই 'িনটেয় ব;বাঁলকে স্কুল থেকে 
নিয়ে আসা । তার আগে তো কোনও কাজ নেই । টুক টুক করে হেটে আমি 
পাউরুটি, মাখন, চিজ, ডিমের বাক্স অথবা আল-পেয়াজ, যতটা ওজন হাতে 
সয় আমার, 'নয়ে আস । গ্রীষ্ম এসে গেছে । মেঘ-মেঘ বেলা হলে অথবা 
বাঁম্ট পড়লে অতটা কম্ট হয় না। কন্তু চড়া রোদ উঠলে ঘাড়ে মাথায় জবালা 
ধরে, হাঁটা আরও শ্রথ হয়ে আসে । এমনই এক রোদের দুপুরে আমি আস্তে 
আস্তে হেটে আসাঁছ, এক হাতে আলু পেয়াজ আর পাউরাঁট, অন্য হাতে 
রান্নার তেলের তন িলটারের বোতল । অজ্প কিনলে শমিত খতখত করে, 
নাক ইকনাম হয় না। 

কখন যে পাশের বাঁড়র ছাই-রঙা টয়োটা বনবেড়ালের মতো পেছনে এসে 
দাঁড়য়েছে বুঝতে পাঁরাঁন । নীল আন্তে করে ডাকলেন, বটাচার ( ভন্রাচাষ* ), 
মে আই াগিভ ইউ আ িলকট হোম ? 

এর আগে বাঁড়র সামনের রাস্তায় দু-তনবার শুভেচ্ছা 'বানিময় হয়ে 
গেছে । কাত এই প্রথম আম ভদ্রলোকের সঙ্গে কথা বললাম । অকারণ 
লঙ্জার সঙ্গে বললাম, না না, এটা আমার"**আমি রোজ খাঁনকটা হাঁটতে 
ভালবাস । লিফট দরকার নেই । ভাঙাচোরা ইংরোজতেই, তবে নাভাসনেসের 
জন্য, “হাঁটতে ভাললাস"র ওপর বেশ জোর এসে গেল । 

নীল এগিয়ে গেলেন। আমি এই সুযোগে একট; দাঁড়িয়ে জীনসগুলো 
হাত বদল করলাম । ডান হাতটা পাঁলাথনের থলের দাগে লাল হয়ে উঠেছিল । 
একটু এগোতেই দেখ, রাসেল ড্রাইভের ক্লাঁসং ছাড়িয়ে নীলের গাঁড় আবার 
দাঁড়য়ে পড়েছে । 

কী ব্যাপার 2 

_-বটাচার, আই হ্যাভ আযান আইিয়া। আপান হেটে যান, জানস- 
গুলো আম বাঁড়তে পৌঁছে দিচ্ছি । হাঁটার আনন্দ পেতে হলে ওজন বওয়া 
তো জরুঁর নয়। ওকে? 

এবার আম ভীষণ ব্রত বোধ করলাম । 

নীল নেমে এসে নিজেই আমার হাতের ব্যাগ [তিনটে তুলে পেছনে রাখলেন, 
তারপর সামনের সিটের দরজাটা খুলে 'দলেন। সিট বেল্টটা ম্যানেজ 
করতে পারাছলাম না, সষত্বে লাগিয়ে দলেন। তারপর চন্দ্রুবিজয়ী দলের 
ক্যাপ্টেন আমায় আড়াই মিনিটের মধ্যে বাঁড়র সামনে নাময়ে দিয়ে বা-ই বলে 
চলে গেলেন। 

এই দুপুরে কোথা থেকে 'ফিরাছলেন কে জানে ! 

এক বছর হতে চলল, প্রায় রোজই দুপুরে সুপার মাকেন্ট যাচ্ছি, কেউ 
আমায় এলফট দেয়ান কখনও । 'কম্তু নীলের যাঁদ এটাই ফেরার সময় হয়, 


৬ 
চন্দনরেখা-ে. 


আমাকে সময় ষদলাতে হবে । রোজ রোজ পরের গাঁড় চড়ে আসা যায় ? 
পাগল ! শুনলে শামত আর মিল্‌ও ভুল বুঝতে পারে । পরের দিন নীল 
1নজেই রহস্যমোচন করে দিলেন, নি্বামত [িছ নয় । কাছেই একটা থিয়েটারে 
পৃতুল তোর শেখাচ্ছে_-পুতুল নাচের পুতুল । বড়দের আর ছোটদের আলাদা 
আলাদা সময় | চারাঁদনের ওয়াকশপ । আজই শেষ হল । 

-_ আগামশ কাল থেকে আপনার সঙ্গে দেখা হবে না এই রাস্তায় । হাঁটতে 
হাঁটতে আপাঁন নিজের বাঁড় পোঁরিয়ে গেলেও কেউ কিছ; বলবে না। 

খানিকটা জ্যোৎস্না মেশানো ছিল নীলের সেই হাসিতে । তাই ? 

আমাদের বাঁড়র কাছে ছোট এক নদী আছে । কেন জানি না, তার নাম 
লোলা ৷ এইকেবে*কে শহরের পাশ দিয়ে বয়ে যেতে যেতে সে আমাদের বাঁড়র 
কাছে যে বস্তৃত ঘাস জমি ও লালিত জঙ্গল আছে তার বুকে এক ঝলক 
দেখা দিয়েছে । নেহাতই খেয়ালের বশে। তারপর আবার নিজের মনে 
সমুদ্রের দিকে চলে গেছে । নদীর ধারে মনোরম একটি পায়ে চলা পথ আছে, 
পুরনো সব বিরাট গ্রাছ £ ওক, বার্চ, আশ, উইলো । বসন্ত ও গ্রীষ্মে নানা 
রঙের ফুলে ঘাস জাম ভরে ওঠে । একাঁদন বৃবলিকে নয়ে সেখানে বেড়াঁচ্ছি, 
দেখ নীল একমনে মাছ ধরছেন । রীতমতন ছিপাঁটপ নিয়ে । পাকো মাছের 
খাবারের টন, একটা ব্যাগ, একটা চাঁট বই । এখানে নদীর ওপর বাঁকা একাঁট 
ব্রজ আছে, সাদা রং করা । সেই 'ব্রজের তলায় পাথরে লেগে জলের খর- 
ন্লোত। আম নশলকে দেখেই বুবালকে নিয়ে একটু এঁগয়ে গেলাম, মেয়েটা 
অনর্গল কথা বলে । কথা বললে মাছ ধাঁরয়েদের অস্াবধে । এখানকার মাছ 
শিকারীরা তো মনপ্রাণ দিয়ে মৌন অবলম্বন করেন মাছ ধরার সময় । নশলের 
মাথার উপর ডালপালা ও সবুজ অজন্ত্র পাতা নিয়ে ঝকে আছে এক পুরনো 
উইলো গ্রাছ। 

ফেরার পথে দোখু নীল ছিপ তুলে নিয়েছেন, আমাদের হাতছানি দিয়ে 
ডাকলেন । 

বুবাঁল এঁদক ওঁদক দৌড়োদৌঁড় করে বেড়াতে লাগল । 

আম বসলাম । 

_ আমাকে না দেখেই চলে যাচ্ছিলেন, আযাঁ? 

_-সাঁর, আম ভেবোছিলাম কথা বললে আপনার *** 

_-দুর ! এ তো শখের মাছ ধরা । এ মাছ নিয়ে আম করব কী? 

তারপর জলের দিকে তাকিয়ে জিজ্ঞেস করলেন, বটাচার, হোয়াট ইজ ইওর 
হাব ? কী করে সময় কাটান? 

আমার নামটা নীলকে বলতে ইচ্ছে করল। এতদিন পরে, অব্যবহারে 
পুরনো হয়ে গোছল | ঝেড়েঝুড়ে, ধুলো মুছে যেন পদ্মপাতার ওপর রেখে 
বললাম, আমার নাম সীমা । আমার কোনও “হবি নেই । সময় কাটানোর 
জন্য কোনও চিন্তাই নেই আমার, সময় কেটে যায়--বরং কাজই শেষ হয় না। 

_সে কী! নীল ভুরু তুললেন, হাউ ? 


৬৬ 


লোলা নদীর লাস্যময় জলে সূ ডোবে। নিভন্ত সূর্যের আলোর ভাষায় 
কী এক আঁনবচনীয়তা আছে, যা স্পান্দত হওয়া মাত্রই চারাদকে আরম্ভ 
হয়ে যায় পাঁখদের অজন্্র কলকাকাঁল। উইলো গাছটি বহতা জলকে 'িসাঁফস 
করে কান্না-ভেজা গলায় কিছু বলে । হাঁসেরা নদী, জল ছেড়ে ঘাসের ওপর 
উঠে পা মোছে, ডানা ঝাড়ে। ডানা থেকে মুগ্ধ জলাবন্দুগুলি ঝরে পড়তেই 
ঠাণ্ডা নরম মাটি সেগ্ীলকে শুষে নেয়। সন্ধের হাওয়া আমার গালে, কপালে, 
আঙুলে ছোয়াতেই আম চমকে উঠে হৃদয়ঙ্গম কার আমার সারা জীবনকালের 
পটচিত্র আম নিজেরই অজান্তে খুলে দিয়োছ নীলের কাছে । 'বাঁনিময়ে নীল 
আমাকে বলেছেন, আমেরিকা থেকে চলে এসে উত্তর সাগরের এই ছোট্ট দ্বীপের 
এক ানবন্ধিব শহরে মাস চারেকের অজ্ঞাতবাসের ইচ্ছের কথা । পঁচিশ বছর 
আগেকার সেই োবজয় আঁভযান 'নয়ে এখন রমরম করছে টোলভিশন, বই 
বেরুচ্ছে, কাগজের কলমগুল নতুন করে সরন হয়ে উঠছে-_ কত 'মাঁলয়ন ডলার 
খরচা হয়োছিল, তারপর চাঁদের কী হল, নীল ক সাত্যই হে*টে ছিলেন চাঁদের 
মাঁটতে না ওটা ফটোগ্রাফর টেকনিক ছিল ? ইত্যাদ ৷ নীল এইসব থেকে 
দূরে চলে এসেছেন । টি ভি চ্যানেলগুলর কাছে নিজের কামটমেণ্ট শেষ 
হতেই, অন্য সব আন-ষাঁঙ্গক দায় 'মাঁটিয়ে, একেবারে চুপচাপ । এখানে নীলকে 
ব্যন্তগতভাবে প্রায় কেউই চেনে না। নামে চিনলেও যেচে এসে আলাপ করবে 
এমন সময় কারও নেই এই নন শহরে । নীল ভাল আছেন। বাগানের 
দেখাশুনো করা নিজের নিয়মে, সপ্তাহে একদিন সিট সেণ্টারের সপারমাকে্, 
মাঝে মাঝে থিয়েটারে ভাল ছাঁব দেখা কিংবা কনসার্ট এই তো পুতুল তৈরিরও 
তালিম নিয়ে এলেন । 

নদীতশরের অন্ধকারমাখা পথ ধরে আমরা দু'জন আর বুবাল বাঁড় 
ফাঁর । বেশ ঠাণ্ডা । মিলু ওর পুরনো জ্যাকেটটা 'দয়ে দিয়েছে আমায় । 
এবার তার বোতামগুলো এটে 'নতে হয়। কোনও কথা বলাছ না কেউ। 
অথচ আমার আর নলের মধ্যে একটা নিজজন সাঁকো তোর হয়ে গেছে, 
ানজেদের অজান্তেই । বসার ঘরের জানলা দিয়ে মিলু বারবার বাইরে 
তাকাচ্ছল উদ্বেগে । এত দোর তো হয় না আমাদের | দরজা খুলেই 
বুবালর দুই গালে হাত ছংইয়ে বলল, ইস, কী ঠাণ্ডা! অতক্ষণ জলের ধারে 
বসোছলে ? 

বুবাল আমার দিকে আড়চোখে তাকায় । অর্থাৎ দোঁর কেন হয়োছল, সে 
কথা আম জানব আর ও জানবে_াঁমলু না জানলেও চলবে । 

আট আঙুলে আটা, রান্নাঘরে দাঁড়য়ে আম নীলের অতীতকে ভাবাছ । 

আঃ নীল, মনে পড়ে আপনাদের সেই বিজয় আভিযান ? হাজার হাজার 
মান্য আমোরকার রাস্তায়, ওয়াশিংটনে, ীনউ ইয়কে* কেপ কেনোডতে। 
আঁভযাব্্রীরা ফিরে এসেছেন, কোয়ারানটাইন চলেছে স্পেস ক্লাফট থেকে নামার 
পর থেকেই । সেই খাঁচার ভিতর থেকেই বুঝে গেছেন আপাঁন, অলাঁ্রন, 
কালন্স যে জীবন আর কোনও দন আগের মতন হবে না। আকাশে উড়ল 


৬৭ 


রাঁঙন বেলুন, বাঁড়র বারান্দায়, ফঃটপাতে মানুষ, ছাতে মানুষ, আকাশ থেকে 
উড়তে উড়তে নামছে অসংখ্য বরফকুচির মতন কাগজ । আপাঁন হাসতে 
হাসতে হাত নাড়ছেন ছাত-খোলা গাঁড় থেকে । এরপর, মানে রাশিয়াকে কেটে 
আমোরকা বোঁরয়ে যাওয়ার পরই কেমন করে যেন জ্যাড়য়ে গেল চাঁদ বিষয়ে 
সাধারণ মানুষের ও বিজ্ঞানীদের কৌতৃহল। একজন জিওলজস্ট এরপর চাঁদের 
মাটি বিষয়ে কিছু মন্তব্য নিয়ে ফিরে এলেন, আর একটা আঁভযান। কন্তু 
সবাই বুঝে গোছল, পাটি শেষ হয়ে গেছে । 

তখন তো আপনাকে আমি চিনতাম না, সেই যখন চ্যানেল ফোর-এ 
চন্দ্রীবজয় দেখাচ্ছিল । অথচ লণ-এর সময়ের সেই মুহৃতণট আপনার মুখের 
সেই ক্লোজ আপ, আমার চেতনায় একেবারে গেথে গিয়েছিল । আপাঁন তখন 
কশ ভাবাছলেন বলুন তো ? 

গভীর নীলের মধ্যে তীর গাঁতিতে হাঁরয়ে যাচ্ছে রকেট, সাদা ঝকঝকে 
ধাতব শরীর, পেছনে আগুনের স্পন্দমান ল্যাজ, কেপ কেনোডিতে টেনশনে 
টান টান রোদ চশমা পরা হাজার হাজার মানষ-মানুষীর মুখ । এক লহমার 
এক ভগ্নাংশের জন্য আপনার মুখে কী ফুটে উঠেছিল নীল, ভয়? না 
পুখখিবীতে আর কোনওাঁদন ফিরতে না পারার আশাঁঙকত বেদনা ? অলী্রন 
তো তবু লণ-এর আগে ফোন করে জোয়ানকে বলোঁছলেন, যাঁদ কিছু হয়, 
মনে রেখো তোমাদের ভালবেসোছিলাম । আপাঁন তো ?িকছুই বলেনান ? 

তার পরেই তো টেক অফ । কণ্ট্রোল রুমের গুড লাক আযাণ্ড গুডস বিড 
এর উত্তরে আপাঁন থ্যাংক ইউ বলে মৃদু কণ্ঠে প্রথম রিপোর্ট করলেন । 

আকাশযানের মধ্যে আপাঁন খুব আড়ন্ট বোধ করছিলেন, আম বুঝতে 
পারছিলাম দেখেই । সারা পাাথবীর মানুষ প্রাত মৃহূর্তে আপনাদের দেখছে 
টোঁলাভিশনের পদয়ি । কণ্ট্রোল রুম ওয়াচ করছে । পাউরহাটর স্লাইসটা মাথার 
ওপর ডিগবাঁজ খাচ্ছে স্পেস ক্লাফটের মধ্যে, আর কেমন অনায়াসে আপনি 
ম্যাঁজশিয়ানের মতন: তাকে ধরে মাখন লাগালেন--আজকাল টোস্টার থেকে 
বেরিয়ে পাউরুঁটর স্লাইসরা আপনার সামনে [নিশ্চয়ই সাদা, নশ্চেম্ট শুয়ে 
থাকে । এখন সাঁত্যই জীবনে কোনও উন্মাদনা নেই, নীল । 

চাঁদে নামার আগে ক টেনশন । যেমন আসার কথা, ল্যাপ্ডমাকগর্ল 
তেমন আসছে না। হয়তো কমপিউটারে প্রোগ্রামিং-এর ভূল । গুরা ল্যান্ড 
করবেন, না করবেন না? শেষ মূহূর্তে ভেবোঁচন্তে ঝাঁক 'নয়েছে কণ্ট্রোল, 
যা হওয়ার হবে, ল্যান্ড করো । পাঁচশো ফুট নীচে চাঁদের মাঁটি। এই তো 
চাঁদ একেবারে কাছে উগ্চুননচুগুলো পযন্ত স্পজ্ট। নীলের কপালে তেরছা 
হলুদ আলো । আপ্তে করে বললেন, মিশন সাকসেসফুল । 

অনেক ধুলো জুতোয়, মাঁডউলের মেঝেতে, ভিজে ছাই-এর সোঁদা গন্ধ__ 
এই ক চাঁদের ঘ্রাণ ? আকাশযান থেকে মাডিউলাঁট 'বযুন্ত হয়ে চাঁদে নামতেই 
এই সব অলীক গন্ধ ঘিরে ধরেছে নভচরদের । নীল টলমল পায়ে হেটে 
এগোচ্ছেন, স্টেটস অফ আমোরিকার পতাকা টাঙাবেন সেই বিজন আকাশ- 


৬৮ 


'দ্বীপের মাটিতে । 

কেন জান না, আজকাল মাঝে মাঝেই আমার সেই নিঃসঙ্গ পতাকার 
কথা মনে পড়ে নীল, পাঁচশ বছর হয়ে গেল, পাঁথবীর কোনও এক দাঁজ'র 
মোঁশনে সেলাই হওয়া ক্ল্যাগাট এক অচেনা মায়াবী বায়ুমণ্ডলের হাতের দোলে 
ধারে ধায়ে দুলছে । তাকে আর ফিরে দেখতে যায়নি কোনও মানুষ, কোনও 
আভযান্রী ৷ কেউ ধফাঁরয়েও আনোন তাকে । 

গত রাঁববার আমাদের বেড়াতে যাওয়ার কথা ছিল । লম্বা ড্রাইভ নয়, 
এখান থেকে আঠেরো মাইল দরে হলডেন বলে ছোট একাট গ্রাম আছে, সেখানে 
সতেরোশো বাইশ থিস্টাব্দের জা আছে একাঁট । কখনও গেছেন ? আপান 
তো কোথাও যান না। দাঁড়ান, এক রাঁববার সকালে যাব । ফিরবো লা 
টাইমের পর । ইধীলশ পাব্‌-এ কখনও দুপুরের খাওয়া খেয়েছেন ? 

খাইনি । তবে যাওয়া হয়াঁন শেষ পর্যন্ত । আগের দন রাতে বুবাঁলর 
জবর হল, কানে ইনফেকশন, কাঁশ । শামত আর মিলুর যাওয়ার আছে 
শীমতের এক সহকমর্শ পল-এর বাঁড়। ওদের প্রোগ্রামটা হঠাৎই ঠিক হয়োছিল, 
আমার প্র্যানটা আমি খুব সংকোচে শুরুবারেই ওদের জানয়ে দিয়েছিলাম । 
তবু রাঁববার সকালে শামত বাঁকাভাবে বলোছিল, মার আযাপয়েনমেন্টটা বোঁশ 
জর্ীর । আফটার অল, এই বয়সের বন্ধৃত্ব । আমরাই না হয় পলকে ফোন 
করে-*। 

খাট থেকে বুবাঁল করুণ নাতি ভরা চোখে লোলা নদীর ধারের সেই 
উইলো গাছটার মতন আমার দিকে তাঁকয়েছিল । 

আমার যাওয়া হয়ান। আটটার সময়, বেরনোর আধঘণ্টা আগে নীলকে 
ফোন করে দিলাম । 

কেউ জানে না, নীল আমাকে একটা জানিস দিয়েছেন ৷ একটা ছবি । 
সেটা আম আমার সটকেসের একেবারে নীচে রেখে নরম একটা ধনেখাল 
শাঁড় তার ওপর 'বাছয়ে দিয়েছি। এই বাড়তে আমার কোনও 1নজদ্ব জায়গা 
নেই ৷ একটি ড্রয়ার বা আলমারর তাকও । আপোলো আট যখন চাঁদের 
কক্ষপথে ঢুকোঁছল, সেই সময় জিম লঙেলের তোলা চাঁদের আকাশে পাঁথবীর 
উদয়। সারা বিশবজগৎ কালো, অন্ধকারে ৷ একমান্র রঙের বৃত্ত এই নিঃসঙ্গ 
গ্রহটি । আমাদেরই পাথবী । ষে মুহূর্তে ওই ফটোটি তোলা হয়, তখন 
আম কী করছিলাম ? বেহালার বাড়তেই হয়তো ৃবছানার চাদর টান টান 
করে পাতছিলাম শোবার ঘরের খাটে, 'াবকেলে গা ধুয়ে চুল বেধে সথেয় 
আলতো করে সিঁদুর দীঁচ্ছলাম হয়তো । আমাদের বাঁড়র পেছনে সজনে 
গাছটায় একটা কোকিল ডাকাঁছল, হৃদয় উজাড় করে দয়ে। ওই ফটোর মধ্যে 
অন্তরীণ হয়ে আছে আমার বেঁচে থাকার একপল, একটা দিনের কয়েক 
লহমা। খুব ভালবাসত আমায় স:প্রকাশ, নতুন বিয়ের পরের সেই দিন- 
গুলোতে । সেই দিক 'দিয়ে দেখলে, ভালবাসার মধ্যে বাঁচার আমার জণবং- 
কালের এ এক অমূল্য অদৃশ্য ছাঁব। 


৬৯ 


আজ যেমন টুক করে এসে ঘাস ছাঁটার কাঁচিটা নিয়ে গেলেন, একদিন' 
দুপুরে তেমনই টুক করে এসে ছবিটা দিয়ে গেছিলেন নীল । হ্যাঁ, সোঁদন 
দুধ চিনি ছাড়া চা খেয়েছিলেন এককাপ । 

বলেছিলেন, যখনই সক্ষম কোনও কম্ট হয়, মনে হয় হেরে গেলাম, বা 
শকছ_ চেয়ে ছিলাম, বাত হয়েছি, তখনই আম ওই পৃথিবীর ছাবিটার 1দকে 
তাকাই । একখান দূরত্ব থেকে যখন দেখি, মনে হয় কী আঁকিংকর আমাদের 
ব্যর্থতাগুি ! আমাদের হাহাকার দৌড়ঝাঁপ, ছটফটান, সব ছু? 'স্থর 
অথচ অদৃশ্য হয়ে জমে আছে ওখানে । মনটা তখন আপনা থেকেই শান্ত 
হয়ে আসে । এ হ'ল নিজে থেকে নিজেকে ছিড়ে আলাদা করে দেখা । 
এইভাবে ীনজেকে য়ে দূরে চলে যেতে হয় কখনও কখনও সীমা । বাঁচা সহজ 
হয় তাহলে । 

রাতে ঘুমোবার আগে মাঝে মাঝেই আম ওই ছাবিটা দেখি আজকাল । 
ঘুমে তলয়ে যাওয়া 'িঃ*বাসে বুবালর ছোট বুক ওঠে নামে । সংপ্রকাশের 
চিঠি আর আসবে না বুঝতে পার । শাঁমতের রাগ, রুক্ষতা এও বুঝ নিজের 
মতন করে । যেমন বুঝ মিলুর চাপা অসহায়তা, ছটফটানি । সোৌঁদন রাঁববার 
নীলকে ফোন করার পর শাঁড়তে জড়ানো ফটোটা 'নয়ে টয়লেটে গোঁছলাম। 
কলেজের দিনগুলোর মতো ফ্রাশের শব্দ ?দয়ে কান্নার আওয়াজ ডুবিয়ে 
দিয়েছিলাম । নীলের মৃদু গলা কানে আসাঁছল, আম কিছু মনে কারান 
সীমা । তাছাড়া আবও কত রাঁববার আসবে যাবে, অনেক রাঁববার । 

আট আঙুলের আটা ধুয়ে রান্নাঘরে দাঁড়রে ঘাস ছাঁটার মৃদু, একটানা 
শব্দ শুনাছি। নীল প্রাণপণে কাজ করছেন লনে। ভূপাতিত পাতা ও ঘাসেদের 
[নঃশব্দ চিৎকারে ভরে উঠছে হলুদ দিনাঁট। বিকেলে নীল কাঁচিটা ফেরাতে 
আসবেন । আম ওইভাবেই দরজা থেকে হাত পেতে নেব ভোঁতা অস্ত্রটাকে । 
বলব, ধন্যবাদ । এরপরও রবিবার আসবে, আরও আরও রাঁববার | 

নীল, আম অপেক্ষা করব। 


৭0 


ক্কানুস 


ট্রেনটা স্টেশনে এসে ঢুকতেই তাকে ঘিরে ধরল শব্দের ভাপ, অমলেট- 
পাওভাজর গন্ধ ও রোদ-চাপা এক বিষগ্ন বিকেলের আলো । বাইরে থেকে 
কেবল দেখা যায় এয়ারকন্ডিশনূড্‌ কামরার কালো কাচই, মানুষের মুখ ঠাহর 
করা যায় না। না, এগোবার সিদ্ধান্ত নিল দিবাকর পাল । তারপর কু'লিরা 
যেখানে কামরার দরজাটা পড়বে বলোছল, সেইখানে দাঁড়য়ে গেল । 

রোদ-চশমা পরে নিয়েছিল শ্যামলী । তার সঙ্গে একটাই বড় সৃটকেস। 
তবে চাকা দেওয়া । সেটাকে টেনে আনতে আনতে ভেতর থেকে দবাকর 
পাঁটলও তার চিন্তিত মুখাবয়ব দেখতে পায়ান ৷ সামনের কূপের গুজরাত 
পাঁরবারাঁট খাবার জলের কু্জো ভেঙে ফেলা কাঁরডরে জল । সেই জলের 
ওপর দিয়েই সুটকেসটিকে হাঁটয়ে এনে কামরার দরজা খুলে বাইরে এল 
শ্যামলী । ওর পায়ে কোলাপার চপ্পল । ভিজে ৷ ততক্ষণে দিবাকর পাঁটল 
ভেতরে ঢুকে শ্যামলীর হাত থেকে প্রায় 'ছানয়ে নিয়েছে সুটকেসটা । 
দিবাকরের পেছনে একাঁট লাজক যৃবক--ফসাঁ, বেটে, দুই গালে ব্লনর দাগ । 
একে তো চেনে না শ্যামলী । 

ও আমাদের সম্পং-এর ভাইপো । এখানে ব্যাঙক-ক্লার্ক। ওকেও নয়ে 
এলাম । 

ছেলেটা হেট হয়ে শ্যামলীকে প্রণাম করতে এল । কিন্তু পা ছংলো না__ 
ছ*লো প্ল্যাটফর্মের মেঝে । 

থাক থাক, মাছামাছ ওকে আনতে গেলেন কেন ? দুজনেরই সময় নষ্ট । 

চাল্লশ ফুট ডায়াঁমটারের দুই কুয়ো এবং খানপাঁচেক ডিজেল পাম্পের 
মাঁলক দিবাকর পাঁটল এ বছর শুকনো লঙকা, বাজরা ও আখের ব্যবসায় 
লাখের ওপর লাভ করেছে । 'কন্তু আজও রাজারাম পুরুষোত্তম যোশী বা 
তাঁর পাঁরবারের সামনে দাঁড়ালে দিবাকরের জিভ জাঁড়য়ে আসে, চোখ নেমে 
যায় মাঁটর দিকে এবং অকারণে হাত কচলাতে থাকে সে। ওর কাঁচুমাচু মুখ 
দেখে শ্যামলী বুঝল, দিবাকর ছেলোটকে ডেকে এনেছে, পাছে ইংরোজ বলতে 
হয়, এই ভয়ে। সাত বছর পরে এই আসা শ্যামলীর । বিয়ের পর থেকে 
প্রতিদিন অঞ্প অঙ্গ করে শব্দানচয় কুড়িয়েবাঁড়িয়ে এক কাজ-চালানো ভাষা 
অবশ্য রপ্ত করেছে সে। তবে ওদেশে তো বাঁড়তে বলার সুযোগই হয় না। 
অন্তত সন্দীপ তার সঙ্গে মরাঠি বলোৌন কোনওাঁদন-_ইংরোজ বলেছে । তাদের 
জোড়াতালি দেওয়া সম্পর্কে ইংরোজই বেশ, কাজ ফুরোবার পর শ*কলে 
মণবন্ধে লৌককতার ঘ্রাণটুকুও থাকে না। 

অহজকে গাঁড় বিফোর টাইম | সঙ্গের ছেলোট, মানে সম্পতের ভাইপো 


৭১ 


বলে উঠল। 

এ গাঁড় কখনও লেট হয় না। ওঁদকের পাঁচ নম্বর প্র্যাটফর্মের ট্রেন 
লাইনের দিকে তাঁকয়ে আছে দিবাকর । 

সে এখন একমনে ভাবছে তাদের গন্তব্যস্থল, কীভাবে যাবে সেই কথা । 
বিকেলের রেলওয়ে স্টেশনে একাঁটি আলাদারকম মন-কেমন-করা আছে, শ্যামলী 
ভাবল । ওভারাব্রজের ও প্রান্তে ঝিরঝাঁরয়ে কাঁপতে থাকা অশ্ব গাছটি, 
ব্রিজের ওপর মানুষের যাওয়া-আসা, ব্রেকভ্যান থেকে মাল নামানোর 
শোরগোল ॥ অমলনের গাঁড় বদলের তীর্থযাত্রীরা মাটিতে মোটা সুতি চাদর 
বিছিয়ে আরামের জোগাড় করছে, এ ছাঁব শ্যামলী বেশ কয়েকবার দেখেছে । 
নানারকম মন 1নয়ে কতবার সে এই দশ্যপটাঁটকে গ্রহণ করেছে । আজও তার 
বড় ভাল লাগল এই বিকেলাট । দিন দশেক আগে এই শহরে দশহরার ভাসান 
নিয়ে বড়সড় দাঙ্গা হয়ে গেছে । গুলি, রন্তপাত, মানুষের মৃত্যু, দোকানপাট 
জবালানো । কারফিউ উঠে এই সবে শান্ত হয়ে পা মেলে বসেছে শহর-গঞ্জ । 
কলকাতা থেকেই রাজারামকে আসার দিনক্ষণ জানয়ে তার করেছিল শ্যামলী । 
রাজারামের বয়স আশি পেরোল এই গ্রীন্মে । এতাঁদন [নিজেই নিতে স্টেশনে 
এসেছেন, গ্রাম থেকে গাঁড় বদলে, এখন আর শরীরে ও সাহসে কুলোয় না। 
রোদের দিকে তাকালে মাথা িমাঝম করে, হাঁফ ধরে ওভারারজে চড়তে, সেই 
জন্য শ্যামলীর পাঠানো তারের গোলাপি কাগজাঁট নিয়ে ভাবতে ভাবতে তিনি 
গণপাতি মন্দিরের রাস্তায় যাচ্ছিলেন, পথে 'দবাকরের সঙ্গে দেখা । দিবাকর 
পাঁটল বিষগ্র-গম্ভর মুখে জানিয়েছে, স্টেশনে সেই যাবে । বাঁহনী এতাঁদন 
পরে আসছে, পথঘাট, বাসরুট, ট্রেনরুট, সে সব কী আর মনে আছে ? আঁমই 
যাব, নানা । আপাঁন একদম ভাববেন না। সম্পতের ভাইপোকে তুলে নেব 
শিবাঁজ চক থেকে । ছোকরা ফটাফট ইংরোজ বলে । 

সুরাত প্যাসেঞ্জার বড় লেট করে যে। না হলে ওটাতেই আসতে সুবিধে 
ণছল। বউকে স্টেশনে বসে থাকতে হবে না-হক আড়াই ঘণ্টা । না না, 
কলকাতা হয়ে আসছে, বড় কম্ট হবে, তুমি স্টেশন থেকে বোরয়ে বহড়ুর জিপ 
ণনয়ে নিও । না হয় আড়াই শোই নেবে, নিক- আম কালই টাকা তুলে দেব 
তোমায় । 

টাকার কথা থাক, আন্না । আমি পরে এসে নেবখন সুবধেমতন । মাটির 
দিকে তাঁকয়ে বলেছে দিবাকর ৷ ওইট.কুই তার সাহস। 

শ্যামলীর সুটকেস হাতে এবড়োখেবড়ো পায়ে এগয়ে চলেছে 1দবাকর-_ 
ভূড়, পেশোয়াসদশ পাকা গোঁফ। ওভারব্রিজের ?নচে একাঁচিলতে দোকানে 
ডে অনেক দুধ ও চিনি দেওয়া চা খেল ওরা । বিদেশে থেকে দুধ চিনি 
দিয়ে চা খাওয়ার স্বভাবটাই চলে গেছে । কলকাতায় অবশ্য ও আন্দাজমতন 
দুধ মাঁশয়েই নেয়, তবে এখানকার মতন মোষের দুধের চল নেই কলকাতায় । 

কড়াই থেকে জাঁলাপন তুলে খবর কাগজের ওপর সাজাচ্ছে দোকানদার । 

1জালাঁপ খাবেন ভাব, গরম ? সম্পতের ভাইপো শদধোয় । 


৭৭ 


ধজলাপর দিকে শ্যামলীর 'নীর্নমেষে তাকিয়ে থাকাকে লষ্ধতা বলে ভুল 
করতে পারে কেউ কেউ । ঘোলা, জবলে যাওয়া তেল, গাঢ় ও অস্বাভাঁবক 
কমলা জীলাপ। কাগজের ওপর লেপটে আছে কারও মাথার চুল। এ জানিস 
খাওয়ার প্রবৃত্ত বা সাহস, কোনোটাই নেই আজ শ্যামলীর । পনেরো বছর 
আগে নতুন বিয়ের পর সে এবং সন্দীপ লোভীর মতন গরম 'জালাঁপ ও আল 
বড়া শালপাতার ঠোগায় ধরে বাসাঁডপো আঁভমুখে চলে গোছল অটোরিকশা 
চেপে। 

দাদা আসতে পারল না? এলে ভাল হত। আন্নার শরীরটা ভাল যাচ্ছে 
না আজকাল । 

সন্দীপ বয়সে ছোট। গদবাকর তবু তাকে দাদা বলেই ডাকে, রাজারামকে 
আন্না ডাকার সুবাদে । 

দাদার আঁফসে বন্ড কাজের চাপ। এখন ছুট পাওয়া শন্ত। আমি তো 
এসোঁছি। আন্নাকে ভাল ডান্তার দেখাব দরকার পড়লে । 

না না, তেমন কিছু দি আর ? বেফাঁস বলে সামলায় দিবাকর । আসলে 
মনটাই ভাল নেই তেমন । মনোহর ডাক্তার মারা গেলেন গত বছর । তার 
আগের দেওয়ালিতে বসন্ত গোখলে । আন্না একেবারে একা পড়ে গেছেন । 

রাজারাম তাঁর দশ জগবনে কোনপগ্াঁদন আযালোপ্যাঁথ ওষুধ খানাঁন। বড় 
জোর এক ডোজ হোণমওপ্যাথ বা আয়ুবেশীদক, তাও মনোহর ডান্তার লিখে 
দেবেন । এল এল এম পাস করে বিরনগাঁওতেই আজীবন প্র্যাকাঁটস করেছেন 
মনোহর । আলোপ্যাঁথর সঙ্গে সঙ্গে হোমিওপ্যাথি, কাবরাজি ওষুধও লেখেন । 
গাঁ-গঞ্জের এটাই দস্তুর | 

বসন্ত, মনোহর এরা দৃজনেই ঘাঁনজ্ঠ বন্ধু ছিলেন রাজারামের ৷ মনোহর 
বছর চারেকের বড়, বসন্ত ছোট। বসন্তবুয়ার কী হয়োঁছল ? শ্যামলী 
[জিজ্ঞেস করল । 

ছেলে-ছেলের বউ রান্নাঘর আলাদা করে দিয়োছিল অ?নকাঁদন ৷ বুড়ো- 
বুঁড় নিজেই রেধে খেতেন। বৃঁড়র জন্য চা করতে বসন্তবশয়া রানাঘরে 
গোঁছলেন ভোরবেলা, গায়ে আগুন লেগে**" 

বহড়ুর 'জপে আরও দুজন যাত্রী আগেভাগেই বসোঁছল । একজন বুড়ো, 
দেখলে মনে হয় শ্রীমন্ত চাষী, সাদা ঝকঝকে খদ্দরের পাঞ্জাব, পাজামা, 
গান্ধীট:ীপ_ পালাধ যাবে । আর একটি বউ, কাছা 'দিয়ে পুনোরি শাঁড় পরা, 
আধঘোমটা মাথায়, কোলে একটি ছোট মেয়ে-সে যাবে বিরনগাঁও ছাঁড়য়ে 
এরেন্ডোল ৷ দবাকরদের দেখে ড্রাইভার হাতে চাঁদ পেল, অন্য প্যাসেঞ্জারের 
জন্য দাঁড়াতে হবে না। সম্পতের ভাইপো মনমিন করে বলল, আম আবার 
মাঝপথেই_ মানে আজ একটু রাজবাড়ায় কাজ""" 

[ঠিক আছে, শ্যামলী হেসে বলে, তুমি মাঝপথেই নেমে যেও এখন । 
গদবাকরকাকা তো আছেই সঙ্গে । 

গত ,সাত বছরে খান্দেশ বদলেছে । ধনধান্যে ভরেছে। হাইওয়ের দুধারে 


৭৩ 


যেখানে খাল টাঁড় জাঁম ছিল সেখানে উঠেছে কারখানা, হোটেল, ওয়াকশপ ॥ 
কে বলবে, এই কালো মাঁটর দেশে বৃষ্টি নেই? এক ই জাম কেউ খাল 
ছাড়েনি কোথাও । গা-ঘে*ষাঘোঁষ করে উঠছে জোয়ার, বাজরা, আখ, মাঝে- 
মাঝেই আল বরাবর বাব্লার ঝাড়-বাব্‌্লা এখন উন্নত পশুখাদ্য । রান্তা 
ছটেছে চওড়া একটি ফিতের মতন, বিশাল, পাঁরচ্ছন্ন । এক পাশে জলের 
পাইপওয়ে গেছে ভূসাবল থেকে সোজা জলগাঁও হয়ে রাজবাড়া পর্যন্ত । এসব 
কিছুই ছিল না যখন সাত বছর আগে শ্যামলী শেষবার এসোঁছল । সেবার 
সন্দীপও ছিল সঙ্গে, আর আট বছরের রাজার্। রাজবাড়ার পরে রাগ্তা নিচ 
হয়ে নেমে গেছে পালাঁধর [দিকে । এ রাস্তা হাইওয়ে নয়। পণ্চায়েতের । 
মনোযোগ, মেরামতের অভাবে ফাটাচটা । আঁকাবাঁকা । যেখানে বসাঁতি ঘন, 
সেখানে বাস-্রাককেও সাবধানে চলাফেরা করতে হয় । কোথাও শুয়োর এসে 
ছিটকে পড়বে, কোথাও শিশু টলমল করতে করতে হঠাৎ রাস্তা পেরোবে । 

সন্ধের আভা ছড়িয়ে পড়ছে সারা আকাশে । একধারে সদ্য বেড়ে ওঠা 
ইউক্যালপ্‌টাস বন দুলছে। অন্য ধারে গ্রাম-সধমানার উচ্চানচ গোচারণ- 
ভূমি। এখন কি ভোর-হ্যাঁ, এখন সকাল.ক্যালিফো'নয়্ায় । সন্দীপ তার 
আটন্রিশতলার আ্যাপার্টমেণ্টে ঘুময়ে আছে, এখনও ওঠোন । উঠবে আটটায়, 
যখন তার সাইড টোবিলের ঘাঁড় কোকিলস্বরে সময় জানাবে । চোখ খুলে 
ধড়মাঁড়য়ে উঠে বসে মুখ না ধুয়েই সোজা রান্নাঘরে যাবে সন্দীপ । কালো চা 
খাওয়ার পর তার ধোঁওয়াটে চৈতন্যের জট খুলবে । তারপর দ্রুত রেডি হয়ে 
ব্রেকফাস্ট খেয়ে ঠিক চল্লিশ মানটের মাথায় সে গাঁড় স্টার্ট করবে, আঁফসের 
জন্য । ফিরবে রাত নটার পর । 

শ্যামলশ আসার আগের দন সন্দীপের ফোন পেয়োছিল। 

_তাহ্‌*লে সাঁত্যই যাচ্ছ? 

_কেন” বশবাস হচ্ছে না তোমার ? 

-_তৃমি একা গেলে বাবার কম্ট দি কমবে ? 

-যাঁদ না কমে, তবে ক তুমি আসবে সন্দীপ ? 

_তুমি জানো, আমার যাওয়া অসম্ভব ! সন্দীপ তীক্ষ; হয়েছে । 

_জানি তো। শ্যামলী একেবারে শান্ত, তাহ'লে আর বাবার মন খারাপ 
ণনয়ে ভাবছ কেন মাছামাছ ? 

_বাট হোয়াই আর ইউ গোঁরং শ্যামলী ? জোরটা ছিল 'ইউ'-এর ওপর । 

_ হাটে হাড় ভাঙবে কি করে আম না গেলে? বাবাকে তাঁর গ্ণধর 
ছেলের কীর্তিকাঁহনী বলতে হবে না? তুমি কী কী করো, কোথায় থাকো, 
কার সঙ্গে, সব-__ 

এই, তুমি আমাকে ব্ল্যাকমেইল করছ ! সন্দীপ লঘু করতে চেয়োছল, 
আবহাওয়া । 

_মোটেই না। যা.সাত্য সেটুকু বলব না! 

_তুমি নম্চুর। বাবার বয়স কত জান ? 


৭8 


_-আমি জান না। তোমার বাবা-তোমার জানার কথা । 

_বেশ। খানকক্ষণ চুপ করে থেকে সন্দীপ বলোছিল, যা ভাল বোঝ 
করো । তবে একটা কথা গুকে আম চিঠিতে লিখেছিলাম কয়েক মাস আগে, 
এখনও কোনো উত্তর দেনাঁন বাবা । ওই ভাঙা বাঁড়টা বার করে যে কোনো 
শহরে, মেট্রোপাঁলসে উীন বাঁড় ভাড়া 'নতে পারেন । আম 'র-ইমবার্ঁস করে 
দেব। প্রতি মাসে ওই বাঁড়র পেছনে নানা খরচা । কখনো খোড়ো ছাত 
ঢালাই করছেন, এই সোঁদন ওয়্যাঁরং খুলে লাগালেন, ন'মা িপেয়ার--একে 
তো অত টাকা ব্লকড হয়ে আছে, বেচে দিলে সেগুলো ইনভেস্ট করা যায়__ 

_- তোমার কত টাকা দরকার, সন্দীপ ? 

_-আবার সেই বাঁকা বাঁকা কথা ! তুমি ইন-সাফারেবূল একাঁট। টাকা 
বাবার আকাউশ্টেই থাকবে | িন্তু জের বলেই যে বুড়ো বয়সে টাকাগুলো 
নম্ট করার স্বাধশনতা গুঁকে দেওয়া যায়, তা তো নয়! 

-টাকার দরকার হ'লে বলো । চেক ছিখে দেবো'খন । বলে শ্যামলণী 
ফোন রেখে দিয়েছিল । আহত বাঘের মতন জের ক্ষতস্থান বেশ খাঁনকক্ষণ 
ধরে এবাব চাটুক সন্দীপ | বলবে না কেন শ্যামল, ও তো নিজে থেকে ফোন 
করেনি-করোছল সন্দীপই । গায়ে পড়ে, যেচে নিয়েছে এই সব মন্তব্য । 
দেশে, প্রা সামাজিক সম্পকণীবহশীন, কঠিন জশব্নযাপলে এখন অভ্যস্ত হয়ে 
গেছে শ্যামল । সন্দীপের বান্ধবী এক নয়, একাধক । যাঁদও লারাকে ও বয়ে 
কববে, মোটাগৃটি ঠিক । অন্তত লারা বা সন্দীপের তরফ থেকে কোনো 
আইনগত লাধা আর নেই। লারার নরস আটাত্রশ, দুই মেয়ের মা, চাকার করে, 
সুন্দরী এবং ববাহযোগ্যা । ওয়াশিংটনে পড়তে চলে যাচ্ছে রাজার্য এ বছরই । 
শ্যামলীর আপার্টমেণ্টে হুহ করে বেড়াবে শীতি, বসন্তের হাওয়া । 
শন্যতাকে প্রকতাবরৃদ্ধ জেনে ভরাট করার জন্য কাউকে জীবনে নিয়ে 
আসার কথা এখনও ভাবোঁন শ্যামলী | তাই সে প্রায়ই ভাবে, ফিরে যাব । 
গ্রাজুয়েশনটা শেষ হোক রাজার্যর । দেশে ফিয়ে যাব বাকি জীবনের জন্য । 
চল্লিশের দোরগোড়ায় দাঁড়িয়ে একধরনের উদাস দার্শানকতা রোদ-ছায়া ফেলে 
মানুষের গায়ে-মাথায় ৷ তারই মায়ায় শ্যামলশও ভাবে, আর তো বছর কুঁড় ! 
একটা জীবন, কেটে এল বলে ! এবার অক্টোবরের গোড়ায় একাদন সন্ধেবেলা 
আঁফস থেকে ফিরে বুকর্যাকে ধূসর পুরোনো পাঁঞ্জকার পাতা ওল্টাতে গিয়ে 
সে হঠাৎই বহু দূর থেকে ভেসে আসা এক ডাক শুনতে পেয়েছিল, পাঁরাচিত 
কয়েকাঁট [াথির, একটি আধা-ঘুমন্ত গ্রামের, বয়েল গাঁড়র বলিষ্ঠ চাকার 
পেছনে উড়তে থাকা ধৃলির'**তার চোখের সামনে আবছা থেকে ক্লমশ স্পন্ট 
হয়ে ফুটে উঠেছিল রাজারাম পুরুষোত্তম যোশশীর শীণ“ মুখের রেখাগ্াল, 
একট গোঁরমাটিরগা পুরোনো ইটের বাঁড়, একাঁট আঁকাবাঁকা গাল, 
পেট্রোম্যাকঝ-জবলা গঞ্জ-বাজারের কোলাহল-রাঙানো সন্ধেবেলা, ময়লার গদ্দায় 
মহানন্দে গড়াতে থাকা মা ও বাচ্চা শুয়োর*"*তার এশবর্য-দশীনতা, ভালো-মন্দ 
সব কিছ দন হাতে জড়ো করে এক গ্রাম ডেকোছিল প্রায় অচেনা একটি মেয়েকে, 


০ 


1বরনগাঁও-*"বিরনগাঁও ডেকেছিল ! 


সন্ধে জালতে বসে রাজারাম ছোট্র জানালাপথে মুখ বাঁড়য়ে শ্যামলীকে 
বললেন, চা খেলে ? তোলা উনুনে পেতলের ডেকচিতে জল ফুটছে দেখ, চান 
করে নাও। তোমার জন্য বাজরার আটা এনে রেখোঁছ, 'দবাকর ওর গণপং- 
পরের ক্ষেত থেকে এনেছে, এমন মিটি আটা তুমি কখনো খাওাঁন। আড়ায় 
দেখ বরাঁণ (হাতলঅলা পেতলের পান্র )-তে বেসন আছে । কাঁচা লংকা ভেজে 
নেব মুচমুচে করে" 

আখের গুড় দেওয়া ঘন চা, কাপের প্রান্তে ধুলোর বলয়, অনেকাঁদন 
ব্যবহার হয়াঁন। রাজারাম চা খান না নিজে, তবে কাপ দুটিই ধুয়ে রেখে- 
ছিলেন । আজ চা ছাঁকতে গিয়ে শ্যামলী দেখাছল গুঁর শীর্ণ হাত দুটি 
কাঁপছে-*” 

এখন রাজারাম গৃহদেবতাদের স্নান করাবেন, পুরনো বসন বদালিয়ে নতুন 
পট্টবস্ত্র পরাবেন, চন্দন লাগাবেন তুলসীর পাতায় করে, তারপর একে একে 
উপাস্থুত ও অনংপাস্থিত সমস্ত দেব-দেবীদের আবাহন আরম্ভ হবে- ঘণ্টাখানেক 
তো লাগবেই । কুসুমলতা বেচে থাকতেও এ কাজে কোনোদন কাউকে 
ডাকেনাঁন রাজারাম । আজও দুর্বল হাতে চন্দন নিজেই ঘষেন, কুয়ো থেকে জল 
তুলে দেবতার পুজোর বাসন ধুয়ে নেন। রান্নাঘরের দরজায় দাঁড়িয়ে শ্যামলগ 
গর কুয়ো থেকে জল তোলা দেখাঁছল দিছুক্ষণ আগে, আধো অন্ধকারে । 

সন্দীপ যোশী, আজ থেকে পনেরো বছর আগে এই বৃদ্ধ একশো বছরের 
পুরনো খাটা-পায়খানা নিমমিভাবে ভেঙে দেবার জন্য রাজমিস্তশ ডাকিয়ে- 
ছিলেন। বিয়ের খরচের ওপর আরও আট হাজার টাকা, এই সময়ে ! বলে 
কুসুমলতা উৎকশ্ঠিত হলে, বলেছিলেন, আমাদের বউ যে কলকাতার মেয়ে, ওর 
কম্ট হবে। যাবতীয় আত্মীয় বন্ধুর অনুরোধ ঠেলে ফেলে দিয়ে এই প্রাচীন- 
পন্থী বয়ের আসর তুলে ?নন্মে গোছলেন 1বরনগাঁও থেকে মুম্বই, কেননা 
গাঁয়ের লোক অনাবশ্যক কৌতুহলে প্রশ্ন করে দুঃখ দেবে নতুন বউকে, কেন 
তোমার বাবা মা ভাইবোন কেউ এল না, মুম্বইতে এসব শুধোবার সময় নেই 
কারও, গাঁয়ের লোক গাড়িভাড়া খরচা করে দৌড়োবে না সেখানে । তুমি ভুলে 
গেছ সন্দীপ ! ভুলে গেছ দু দশক আগে স্টেট-স-এ যাবার প্লেনের [কউ 
সণয় ও ধারদেনায় টাকা জড়ো করে কে কনে 'দয়োছল তোমাকে ! সেই 
রাজারামের জন্ম ওই চিলতে ঘুপঁচি ঘরে, যেখানে আজ রাখা হয় কাঠকয়লা, 
গুল ও কাঠ, পুরনো খবর কাগজ, পেতলের বাসন, তোলা উনুন--আজ 
থেকে আঁশ বছর আগে, টগবগ্গ করে ফুটতে থাকা এক দুপুরে । আজ থেকে 
ষাট বছর আগে এ বাড়তে বউ হয়ে এসোৌঁছলেন নাগপুরের মেয়ে, তোমার মা 
কুসমলতা । দেড়শো বছরের পুরোনো গজ দেখাতে আমাকে টেনোহ*চড়ে 
একশো িলোমটার ড্রাইভ করে নিয়ে গোছলে তুমি, আর তোমার প্রাপতামহ 
পুরুষোত্তম গঙ্গাধর যোশীর তোর এই বাঁড় সার কারখানার মালিক মদন 


৭৬ 


জৈন অথবা কেরোসিনের হোলসেলার মহাদেব আগরওয়ালার হাতে সালংকারা 
কন্যার মতন একশো কুঁড় বছরের রোদ-বাঁম্টর স্মতিসহ তুলে দিতে বুক 
কাঁপবে না তোমার? তাও তো এ বাঁড়র খোড়ো ছাত তোমার ডলারে 
সারাই হয়াঁন, এ বাঁড়র নদ'মায় যে-টাকা পড়েছে তাও রাজারামের 
স্বোপাঁজত । ধুলো-ওড়া বাঁকাচোরা গ্ালর শেষে পাথরের স্ল্যাব বাঁধানো 
উঠোন, তারের জাল ঘেরা বারান্দা, এ তো কেবল এক দিনযাপনের খাঁচা নয়, 
এ ঘর ছেড়ে উৎখাত করবে এঁকে তুমি, বম্বে, বাঙ্গালোর, মাদ্রাজে এক কামরার 
ফ্ল্যাটে ! তুমি ভাড়া 'র-ইমবার্স করতে চাও ! ফরাসী পারফিউমের সুবাস 
দিয়ে মুছে ফেলতে চাইছ ওই কাঠের আগুনের ধোঁওয়ার গন্ধ! দোঁর হয়নি ! 
বড় দেরি হয়ে গেছে! 

আগামী কাল নরক চতুদ্শশ । পরশ দীপাবলণী । তারপর ভ্রাতীদ্বিতীয়া ৷ 
এককালে আত্মীয়স্বজন, বন্ধুবান্ধবে গমগম করত এই ছোট্র বাঁড়াট। 
কুসূমলতা দ্রুত চলে গেছেন, সন্দীপ এ দেশে থাকে না, পাড়ার গোনাগুনীত 
কট লোক এসে বাতাসা-নকুলদানা প্রসাদ নিয়ে যায় হাত পেতে, এইটুকুই । 
বন্ধু মনোহর নেই, বসন্ত নেই । রাজারামের খুড়তুতো বোন রত্বাবলী থাকেন 
দুই গ্রাম ছাড়য়ে মালাধতে, তিনি আজ পক্ষাঘাতে শধ্যাশায়ী । এক বাঁড়তে 
ছোটবেলায় দুজন বড় হয়েছেন হেসেখেলে, টানা সত্তর বছর ভ্রা্তীদ্বতীয়ার 
ফোঁটা দিয়ে রত্বা আজ আর 'বছানা ছেড়ে উঠতে পারে না। নরক চতুর্দশীর 
ব্রাহ্মমুহূর্তে আগে পটকাবাঁজর শব্দে কে পে উঠত এ বাঁড়র চার দেয়াল, 
নরকাসুর বধ করার পর শ্রীকৃষ্ণের মত দেহে তেল-অগুরুর প্রলেপ লাগয়ে 
স্নানে বসত এ বাঁড়র পুরুষেরা, দরজার সামনে, আহারের থালার চারাঁদকে 
আলপনা, তৃপুরুষের জন্য চিনেলণ্ঠন জঞ্লবে কার্তক মাসভ'র । আজ 
এই বাঁড়খানি নিশ্চুপ, শান্ত । তবু শ্যামলী আসবে বলে আলপনার রং কিনে 
এনেছেন রাজারাম | লণ্ঠন কিনেছেন, শাক ভাজা হবে বলে শাকের 'বিড়ে। 
প্রদীপের জন্য সলতে বাঁনয়েছেন নজের হাতে, রোড়র তেল এনেছেন । 

খাওয়াদাওয়ার পর মেঝেতে পাতা ীবছানার রাজারাম শুয়ে পড়লে গুর 
মশার ভালো করে গ*জে 'দয়ে পাশেই ীনজের বিছানায় বসে শ্যামলী । মৃদু 
কণ্ঠে কথা বলছে দুজনে । আগেও *বশহর-বউ-এর মধ্যে ঘোমটা টানা অথবা 
আড়ালের বালাই কোনোঁদন ছিল না, আজও এই শুন্য ঘরে নেই কোনো 
পদদা। 

ধদবাকরের ভাইপো, সে কাজ করে বম্বের কোনো কাগজকলে । বৃহৎ 
মুদ্বই-এর শহরতাঁল ডোম্ববালতে সেই দেখে দেবে ভাড়া একটি বাঁড়। 
ভালো বাঁড়, কলের জল, বিজাল । ছশো টাকা ভাড়া । ভাড়া তো খোকাই 
দেবে । সংক্রান্তির পরই উঠে যাবো ঠিক করেছি । দিবাকররা তো থাকতে চায় 
না এখানে, ওদের নিজেদের বসতবাঁড় আছে, চাষের জাম তারই লাগোয়া । 
এখানে ওরা হয়তো দোকানই করবে, অথবা গোদাম । 

-আপাঁন কি কিছহ"'মানে দবাকর কি ?িছু আযডভান্স 'দয়েছে 


৭৭ 


আপনাকে, বাবা ? শ্যামল খুব শান্তভাবে জিজ্ঞাসা করেছে । সে যেন এমন 
এক নাটকের গাঁলপথে হাঁটছে, যার শেষ তার ঘাঁনম্ঠভাবে চেনা । 

-_ পণ্চাশ হাজার ফিক্সড িপোঁজট করোছি । বাকি টাকা বাঁড় ছাড়ার 
আগের দন দেবে । ওর ধান উঠবে সেই সময় । আমার পেন্‌শনে তো কুলোয় 
না জানোই । মুম্বইতে, তা সে শহরতলিই হোক আর যাই হোক, দেড়গুণ 
খরচ । খোকাও এত করে বলল, আর এখন তো কুসুম নেই, মনোহর নেই, 

__বম্বেতে কে আছে আপনার ? 

নিঃশব্দে একটু হাসেন রাজারাম । -__কেউ থাকবে না, এই গৃহদেবতারা 
ছাড়া । তবে ক জানো, এই শেষ বয়সে নিজের বুদ্ধিতে চলতে বড় ভয় হয়। 
তোমরা আছ, পড়াশুনো করেছ কত বোঁশ, বড় বড় অফিস চালাচ্ছ__ তোমরা 
যেমন চাও তেমনাঁট নাহলে যে জোর পাই না বুকে 

ভোর ভোর ঘুম ভেঙে যায় শ্যামলীর । কুয়োর তলদেশ থেকে হিম এসে 
ঢুকছে ঘরে । দেওয়ালের ফোকরে তারের জাল দিয়ে কুসুমের পুরনো শাঁড় 
টাঙানো । তাতে শীত আটকায় না। বাইরের কলতলায় মন্যানাঁসপাঁলাটর 
জল পড়তে লেগেছে তোড়ে । খাবার জলের বড় বড় কলস ভরে তুলছেন 
রাজারাম । চানের জল ভরছেন ভেতরের ঘরের মস্ত পেতলের বাসনে । শ্যামলী 
উঠে বসতেই হাঁ হাঁ করে এলেন-_আহা, ঘুমোও ঘুমোও। এতটা পথ এসেছ-__ 
এ তো আমার রোজকার কাজ | শ্যামলী অবশ্য শোয় না, জেদ করে 'বছানায় 
বসে থাকে । জল ভরণ শেষ করে রাজারাম একাঁট শুকনো ধুতি পরে এসে 
বলেন, ভারণ ভারী বাসন--দিবাকর বলেছে এগুলি না দিই যেন কাউকে, 
ওই 'নয়ে যাবে । কিছ? টাকা জুড়ে দেবে বাঁড়র দামের সঙ্গে । তুমি যাঁদ 
পারো কেবল ওই ঘড়াটা নিয়ে যাও । এ দেশেই রেখে দিও কারও কাছে। 
কুসুম জল আনত ওটাত্রে নতুন বিয়ের পর । আমি আর টেনে বেড়াতে পার 
না এ বয়সে-_অথচ ফেলে যেতে মায়া লাগে । 

শ্যামল বুঝতে পারে এই মুহূর্তে তার বুকের মধ্যে নড়াচড়া করছে 
ধাক্কা দিচ্ছে যে কম্ট, তার কোনও নাম আজও দেওয়া হয়ান মানবসম্পকের 
ইতিহাসে । রাজারাম ও কুসুমলতার সঙ্গে কলকাতার আঁবনাশ মিত্র রোডের 
শ্যামলশ বসূর কোনো রন্তের সম্পক্ক নেই । যার আছে, সে এই সময় ঘুমিয়ে 
আছে অন্য গোলার্ধের নিশীথ রাতে, শঙখসাদা কোনো রমণীর বাহবন্ধনে। 
ক্যামপোস আবাহত তার ঘুমে চড় ধরে না। কে এই বৃদ্ধ, শীর্ণ মুখ, 

[টরে বসা চোখ__যান গত রাতে তাওয়ার ওপর হাত দিয়ে রুট সমান 
করতে করতে বলাছলেন, কী িন্টি বাজরা, মুখে দিয়ে দেখো ! পনেরো বছর 
আগে, নিরাভরণ হাতে, পুরনো এক ধনেখাল শাড়িতে প্রথম এ বাঁড়তে এলে, 
সকৌতুকে তাকে রান্নাঘরে ডেকে 'নয়ে ছোট্র ড়েতে বসাতে চেয়োছলেন 
রাজারাম- এটায় বসো, আমার মা রাঁধতেন এতে বসে, আমাদের গৃহণীদের 
পরম্পরা । 


9৮ 


উঠহু উঠহ, শ্যামলী মুখ টিপে কুসুমলতাকে দৌখয়েছিল, যতাঁদন মা 
আছেন, ততাঁদন নয়। কুসুম কত গর্ব করে ভাঁড়ার ঘর থেকে মুখ বাঁড়য়ে 
বলোছিলেন, কী, হল তো ! আগ বাঁড়য়ে বলতে যাওয়া-বাঁল কার ছেলের 
বউ সেটা তো দেখবে, না ক! 

শ্যামল এসেছে বলে সন্ধের মুখে তাকে দেখতে এল লাল্‌টেন ধোবার 
বউ । সামনের একতলা বাড়িটা ওদের । রান্তাটা বারোয়ার, তব তাতে খাট 
টাঙয়ে লালচাঁদ, যে সময়ের মারে লালংটেন হয়ে গেছে, সার সার জামাকাপড় 
মেলবে, এবং ঝগড়াঝাঁটির নানা পাঁরস্থিতি তোর হবে আচমকা । দেওয়াল 
বলে কাঁদন শান্তি । লাল-টেন-এর বউ শ্যামলীর হাতের একখানি মাত্র চুঁড়র 
ঠডজাইন ছয়ে দেখে নিল আঙুল বুলিয়ে । লালটেন ধোবার পঙ্গু ছেলেটা 
সকাল থেকে ন্যাড়া ছ্যাতে বসে আছে । ফানুস ওড়াবে। গত বছর মামা- 
বাড়তে বেড়াতে 'গয়ে শহর বাজারে তোর ফানুস দেখে এসেছে সে। 'বিরন- 
গাঁওতে সে গজানস পাওয়া যায় না। জলগাঁওতে পাওয়া যায়, অগাধ দাম। 
ণীকন্তু কিনলে আর মজা ?ি রইল, ছেলে নিজেই বানাবে । রঙন কাগজ কেনা 
হয়েছে, সর: বাঁশের কাঠি জোগাড় হয়েছে, তার্পন তেল । সঙ্গীসাথী কেউ 
নেই, সারাধদন একা বসে কাগজ কাটছে, ছু দিয়ে কাঠি চাঁচছে, আর রাস্তায় 
যে যাচ্ছে, তাকেই আধো গলায় চেচয়ে বলছে, কাকা, আজা, নানা, সম্ধেবেলা 
এসো, ফানুস উড়বে । 

চৌদ্দট প্রদীপ জলে গনবু ানবু হয়ে এসেছে শ্যামলশদের ঘরে, উঠোনে, 
তুলসমণ্ডে। পাড়ায় চলছে আতসবাজর মহড়া । দবাকর পাটিল এসেছে, 
খাঁটিয়ায় শোয়া রাজ।রামের পায়ের দিকটায় বসে আস্তে আস্তে কথা বলছে, 
শ্যামলণ ওর ?সল্কের শাড় বদলে আটপৌরে শা'ড় পরে আসতে ভিতরে যাবে, 
সামনের বাঁড়র ছাতে হডিসাঁউ কান্না । লালটেন বেধড়ক মারছে ছেলেটাকে, 
ছেলেটা গায়ে কাঁদছে । ওদের সামনে জমায়েত উৎসাহী জনতার ভিড় 
টুকরো টুকরো হয়ে ভেঙে যাচ্ছে । হাসছে কেউ কেউ, কারও ম€খে [টটাকার, 
লে বাবা, এ হল শহরের মানুষ, কেউ এমানই ঘরমুখো হাঁটছে । 

লালটেন গিংকার করছে, এতগুলো কাগজ, কাঠি, তেল, আকাশ থেকে 
পয়দা করেছে তোর মায়ে ! টাকা জবালাঁচ্ছিস, সর্বনাশ করছিস আমার ! তিন 
1তনটে ফানুস পুড়ে ছাই হল, একটাও জবলল না ! 

যন্ত্র নয়, কা'রগরশ নয়, কী যে আশ্চর্য এক ভারসাম্য আছে বাতাস ও 
আগুনের । বাতাস পেলে বাঁশের ঝাুঁড়তে বসানো তেলের 'পাঁদিম জলে, সেই 
আগুনের ?িখা হাওয়াকে গরম করে ধাঁরে ধারে ফুলে ওঠে পাতলা কাগজের 
রঙন অবয়ব । তারপর ভেসে ভেসে ফানুস আকাশে ওঠে, যত সে দূরে যায়, 
কাগজের বলে আর মনে হয় না তাকে, আলোর আভা ফুটে বেরোতে থাকে 
এমনভাবে, যেন সে হলুদ, কমলা বা লালরঙা একখান পাার্ণমার চাঁদ! 
এমনাঁটই হওয়ার কথা, 'কন্তু হাঁদা ছেলেটা পারোন। হাওয়া এসে ক্ষেপিয়েছে 
আগুনকে, দাউ দাউ করে জবলে আগুন ছ'ড়ে নিয়েছে কাগজের কাঠামো, 


৭৯১ 


ণনমেষে কাগজ জবলে ছাই, ঝুপ করে নিচে এসে পড়েছে খাঁচা, পাঁদম, 
িটকোনো তেল। বার বার তিনবার | ভিড় মুচকি হাসছে, অপমানিত বাপ 
এলোপাথা'ঁড় মারছে, আর ছেলেটার বুকফাটা চিৎকারে খান খান হয়ে যাচ্ছে 
গন্ধকের ধোঁওয়া মাখা গালর আলো-অন্ধকার । 

1দবাকর কাকা ! 

দেওয়ালর পরের দিন সকালে পাড়াময় ছাড়িয়ে আছে জলে যাওয়া 
তুবাঁড়, পোড়া ফুলঝ্াাঁর, মরা কাঁলপটংকা । ক্ষয়াটে হলুদ রোদ । 

দিবাকর পাঁটল শ্যামলীর সামনে, মাথা নিচু, মাটির দিকে চোখ । 
পণ্চাশ হাজার টাকার একখানি চেক নরম একটি চাউাঁনর মতো আলতোভাবে 
দিবাকরের পুরুষ হাতে রেখেছে শ্যামলী | দবাকর কাকা, ঠিক আছে তো' 
বাবা এ বাঁড়তেই থাকবেন। সংক্রান্তিতে আলু উঠলে আপনাকে আর 
দৌড়ঝাঁপ না করলেও চলবে । ডোম্বিবীলর ওই বাঁড়, সে আপাঁন মানা 
করে দন, কেমন ? তাছাড়া আমরা তো আঁছই-_আমি, সন্দীপ দাদা, যখন 
দরকার এসে পড়ব । 

কন্টে মাথা নাড়ে দিবাকর | পুরোটা সে বোঝে না। ভাঙাচোরা ভাবে 
খানকটা আন্দাজ করতে পারে এই জাঁটল প্রক্রিয়ার । একটা ভয় এবং 
ভাষাজ্ঞানের অভাব তার জিভটাকে টেনে ধরে। খানিক পরে গলা ঝেড়ে 
শদবাকর পাঁটল জানতে চায়, বম্বে ব্যাংকের চেক, খালাস হতে কতাঁদন 
লাগবে ? এক হফতার বোৌশ নাতো? 

ভার ভারী সব পেতলের বাসন, বলতে গেলে ওগুলোর ধাক্কাই তাকে 
বেজেছে বেশি, ঘুরনোর মাকে বলে এসোঁছল, সব বাসন একদিন বয়েল 
গ্রাঁড়তে উঠয়ে গণপৎপুরের রসুইঘরে ঢেলে দেবে । 

বুকের পাথর বুকে ল্হীকয়ে তবু দিবাকর ভারী সুটউকেসটা ?নয়ে 
শ্যামলীকে পেশীছোতে, চলে । বিরনগাঁও-এর রেলস্টেশনে সাইকেলাট হাঁটিয়ে 
1নয়ে রাজারাম এসোছলেন। শ্যামলীকে ট্রেনে তোলার সময় বোশ কথা, 
আবেগ কিছুই উপচে পড়েনি গুর চোখেমুখে । প্রণামের উত্তরে ওর পিঠে 
বুকে শীর্ণ খসখসে আঙুল কাঁটর স্পর্শ পেল শ্যামলী । 

_- তোমরা মাঝে মাঝে এলে বড় ভাল লাগে । সন্দীপকে রাজকে 'নয়ে 
এস এবার যখন আসবে । খোকাকে বলো আম এখানেই রইলাম, ও যখন 
চায় আম এখানেই থাকি । কুসুম ওই মাঝের ঘরে শেষবার আমায় ***আসলে 
আম আর কোথায় যাব বলো দোঁখ। এখানেই তো সব, সমস্ত স্মৃতি, এত 
মায়া-মমতা -*" 

স্টেশন পিছনে রেখে ট্রেনটা দুধারের কালো মাঁটি ও কাতি“কের ভরন্ত 
পাথবীর বুক চিরে ছুটতে আরম্ভ করতেই শ্যামলী কপালে উড়ে এসে 
পড়া চুলগুিকে সারয়ে নেয়। হলুদ িকেলাটর দিকে তাকিয়ে মনের মধ্যে 
এক 'নাঁবড় ভালো-লাগাকে খংজে পায় সে। শ্যামলী পেরেছে_ানঃশব্দে, 
ধবনা রন্তপাতে, কয়েকাঁট আনবাষতার মুখ ঘ্ারয়ে দতে পেরেছে সে। 


৮০ 


এইভাবে যাঁদ সেনা বলত, তবে কি রাজারাম পুরঃষোত্তম মত বদলাতেন ! 
যে সন্দীপ বিশেষ করে বলে দিয়েছে, বাবা, আপাঁন এখানেই থাকবেন ! 
এই বাঁড়তে আমাদের বিয়ের স্নাতও তো আছে, আম বউ হয়ে এসোছলাম 
এখানে প্রথম, এখান থেকে বম্বের শহরতাঁলতে পোষাবে না আপনার । দেখুন, 
আমাকে টাকা সঙ্গে দিয়েই পাঠিয়েছে সন্দীপ । দিবাকরকে তো টাকাটা 
ফাঁরয়েই দেওয়া যায়, ও তো বলতে গেলে নিজেরই লোক"*এইভাবে না 
বললে ! 

শ্যামল অন্য কিছুই ছিঞ্ড়ে-খড়ে বার করোন । তাদের বিচ্ছিন্ন বিবাহ, 
সন্দীপ-লারার ভাঁবষ্যং জীবন, রাজীর্ধ চলে যাবে কলেজ হস্টেলে, একা 
হয়ে গেলে শ্যামলী তখন-**কী দরকার ! থাক না চাঁদের না দেখা মুখাঁটর 
মতন পৃথিবীর ওই অন্য গোলার, ওখানকার দিনরাত, ওখানকার মানুষেরা । 
শ্যামলী আবার আসবে, সামনের ?ি তার পরের বছর, পেছনের চিলতে 
ঘরটার দেওয়ালে লম্বালম্বি চিড় ধরেছে একটা । ওটা সারাতে হবে তো? 

ট্রেনের সটে মাথা হেলিয়ে সুরাত প্যাসেঞ্জারের ঝক-ঝক: শব্দের ভেতর 
তার শ্রান্ত দুই চোখের মধ্যে আর একাঁটি উজ্জল ছবি খুজে পায় শ্যামলশী। 
নরক চতুদ্শীর রাতে হেরে ভূত হয়ে গেলেও, দীপাবলীতে জিতে গোছল 
লালংটেনের ওই পঙ্গ? ছেলেটা । মার খাওয়া, ফোলা ঠোঁট, গায়েপঠের ব্যথার 
মধ্যেই ফিসাফস করে একে-ওকে ধরে সে আবার ছড়িয়ে ছিল তার মন্ত্রগুপ্তি । 
ছে-চড়ে ছাদে উঠে, কোনোমতে দাঁত-মুখ টিপে সে আবার ফানুস বাঁনয়ে 
ছেড়োছল। ভীতু লাল্‌টেনের বউ শ্যামলীর হাত থেকে টাকা কটা নিয়ে 
দৌড়ে চলে গোছল ছেলেকে লুঁকয়ে দতে, লালটেন দেখলে বেধড়ক মারবে 
তাকেও, ছেলেকেও । 

ফানুসটা উড়েছিল। মাঁরয়ার মতন জশবনমরণের সীমানায় দাঁড়িয়ে যখন 
সে তারাজব্লা অমাবস্যা আকাশের হাতছান শোনে, তখন কী এক অদ্ভূত 
কৌশলে হাওয়া ও আগুনের সখ্য হয়ে যায়, হাওয়া দুলে দুলে হাসে, 
পেখমের মতন জব্লে কোমল আগুন । তারপর কাগজের লাল মস্ত শরীরখানি 
হালকা হয়ে আকাশে উঠতে থাকে-উঠতেই থাকে | চশমার ওপর দয়ে চোখ 
তুলে লাল্‌টেন ও সমবেত ভিড় প্রথমে সন্দেহভরা আঁব*বাসে তার গাতপথে 
চেয়ে থাকে । শেষটায় যখন ফানুসের শরীর ফড়ে বোরয়ে আসে তার আত্মার 
অলৌকিক আলো, এবং সেই আলো উড়তে থাকে বিনা তোয়াক্কায়__এক 
বিস্ময়, মুগ্ধ ভালোলাগার ভাপ উঠে আসে এদো গাঁলর বুক থেকে ওপরে । 

আকাশের বুকের মাঝখানটায় এসে ফানুসটা একেবারে হতচাঁকত হয়ে 
যায়। এত দুর কোনোদন আসোন তো আগে। নিচে রয়ে যায় গঞ্জের 
দীপাবলীর গুঞ্জন, িটমিটে চিনে লণ্ঠনগদীল, ছোট ছোট জ্যামাতক 
জীবনযাপন । এক অপরূপ গাঢ় বেগুন অন্ধকার ফানুসটাকে হাতে তুলে 
[নয়ে আদর করে, খেলে । ওই নরম আদরে কেবল ঘুম পায়, ঘুম পায় তার, 
বুঝ খাঁনকটা ঘুময়েও পড়োছল, চমকে চোখ খুলে দেখে, সামনে তীব্র 


৮১ 
চন্দনরেখা- ৬ 


লুব্ধক, কালপরুষের কাছে এসে গেল কী সে? হঠাৎই একটা আলোর ঢেউ 
তাকে লুফে নেয়, দাউ দাউ করে জবলতে জবলতে পোড়ে ফানুস, আর ভেতর 
থেকে ছোট্ট একটা হাসি তাকে বলে, ফানুস, তোমার খেলা শেষ! কাগজ 
পোড়া ছাই যাঁদ আবার উড়তে উড়তে নচে নামে, লাল্‌্টেনের ছেলের ঘুমন্ত 
কপালটা মনে করে বড় কষ্ট হয় ফানুসের, সে হাওয়াকে বলে, ছাইগ্ীল তুম 
রাখোই না হয়, নিচে পাঠিও না! 


৮৭ 


অভুব্রিস্রা্ ও জল্প 


নধর-গম্ভীর একখানা মেঘ এসে ঝম্‌ঝম ক'রে বৃষ্টি দিয়ে গেল সুনাবেড়ার 
মালভূমি অণ্চলে । এ মেঘের বাপ কে, নিয়চাপ না সাইক্লোন, এ তল্লাটে বসে 
জানার পথ নেই । বজাঁলিই নেই, তায় টোল ভিশন । অন্ধকারে বুড়ো বাঘের 
মতন পথচলাঁতি কারও হাতে ঘড় ঘড় করে ওঠে ট্রানীজস্টর-রোডও- তাও 
কালেভদ্রে-তারপর সে আওয়াজ মায়ে যায়। খবর কাগজ পৌছোয় 
অনেক দোঁরঙে- স্থানীয় ভাষায় বাজে নিউজাপ্রণ্টে ছাপা সেই সব সাতবাস 
খবর ছংয়েও দেখতে ইচ্ছে করে না। সূধাময় নন্দ গনজের চারপাশে একখানা 
ঘেরাটোপ বানিয়ে নিয়েছে বেশ। রোগা, ঈষৎ কুঁজো, মোটা কাচের চশমায় 
সুধাময়ের আজকাল দরের 1জাঁনস কাছে চলে আসছে, কাছের নিস চলে 
যাচ্ছে দুরে । নতুন বাইফোকাল নিয়ে সদ্য হাঁটতে শেখা শিশুর মতন টলমল 
করে িছাীদন ঘুরতে হয়েছিল তাকে | তা সে-ও তো অনেকাঁদন হয়ে গেল। 
কাচের অনুভূমিক জোড় সুধাময়ের দষ্টিপথকে দু-খণ্ড করে দিয়েছে । চট- 
ক'রে সুধাময় কাউকে চিনতে চায় না, সদ্য আলাপ দিয়ে কেউ তাকে ছ'তেও 
পারে না। ডানার জল ঝেড়ে ফেলা ওই মেঘখানার মতন, চুপচাপ, গম্ভশ্র, 
একরকম আছে। 

এখন সধাময় নন্দ চন্দনমহলের বর ওপর দাঁড়িয়ে । বুম্টর পর 
আশ্চর্য হলুদ এক আলোয় ভরে গেছে চরাচর। চারপাশের আগাছা ঝোপে 
দনমানে ঝািঝ+ ডাকছে । এমন শান্ত বকেলাটি, যেন পা টিপে টিপে কাউকে 
না জানয়ে সন্ধের নিশে যাবে । 

বাঁআঁ-আঁ."শহরণ্যশ্তত্ধতার বাঁটে মুখ দেওয়ার আগে শম্বারু পহরিয়ার 
বাছুরটা ডেকে উঠল । এখান থেকে নীচের দৃশ্য দেখা যায়। এমন ছু উচ্চ 
নয় িবিটা। তবু দূরে চোখে পড়ে কাণনসাগর- অজস্র লাল পদ্মফুলে 
ছওয়া জল। 1ঢাবর চারাঁদকে আগাছা, জাল কুল, অজ্ন, বাবলা ও 
[পয়াশালের মশ্র জঙ্গল | একট. দূরে উত্তর-পূর্ব কোণে নতুন একঝাঁক ঝৃপাঁড় 
তোর করেছে আঙ্কাটোি ছেড়ে চলে আসা দলছুট ?কছু পাঁরবার । তারপর 
বেড়া দিয়ে ঘেরা সুধাময়দের ক্যাম্প-আঁফম । নতুন ঝুপাঁড়গুলোর ডান হাতি 
সরু একখান পায়ে-চলা-পথ | সেই পথ ধরে কিছ দূর গেলে আতকাটোণলর 
পুরনো বাপ্ত। 

ওখানে এখন কেউ থাকে না। সবাই চলে গেছে । মাটির ঘরগনীল ছেড়ে 
নতুন বসাঁতিতে উঠে যাবার আগে যতদূর সাধ্য উপড়ে নিয়ে গেছে বাঁশ, খড়, 
টাল, দরজা, জানালা । তারপর গত দু'বছরের রোদ-বৃষ্টিতে মরে-হেজে 
গেছে বসত বাঁড়গ্ীল। কেবল লক্ষমণ সিং সামন্তর পাথর-কাঠে গড়া 


৮৩ 


অগ্টালকার টানা জাফার দেওয়া শুন্শান বারান্দা দেখা যায় এই াবর ওপর 
থেকে । 

আজ রাতে কি বৃষ্টি হবে ? আসলে বৃঘ্টির সময় তো এটা নয় । জ্যৈষ্ঠের 
মাঝামাঝ । মনশুন এখনও রওনাই হয়নি, দুর দাক্ষণ সমুদ্রে কোথাও 
মাতৃগভে আড়ামোড়া ভাঙছে । বৃষ্টির ছিটেফোঁটা হলেই কাল সকালে কাজ 
করতে গাঁড়মাঁস করবে পিচার বুড়োর দলবল । আজও গরম ছিল দুর্বিষহ । 
ঠুকঠাক কাজ হয়েছে । 

চন্দনমহলের এই 'ঢাবটা আশপাশের জন্য ঢাঁবগুলোর তুলনায় বেশ উহু, 
বড়ও। বছর পনেরো আগে জঙ্ক নদীর ধারে দান রাজার [টিলা খখড়ে 
পাওয়া গেল কোশল স্থাপত্যের ?শবমান্দির ৷ পাণ্ডিতমহল অজ্পস্বল্প ঢেউ । 
চন্দনমহলে খননের কাজ তার 1কছ: দিনের মধ্যেই আরম্ভ হয়ে গিয়েছিল । 
অঙ্প অল্প করে নিপুণযত্বে মাটির পরত তুলে বার করে আনা হয়েছে পোড়া 
ইট, কলসর ভাঙা কানা, কুঁড় ফট মতন গভীর এক চৌকো স্থাপত্য__এটাই 
হয়তো ছিল এই জনপদের রত্বভাণ্ডার | সহধাময় নন্দর ধারণা, এর ওপর দিকে 
ছিল ওয়াক টাওয়ার গোছের কিছ, কারণ একমান্র এই উচ্চতা থেকেই পুরো 
উপত্যকাটা ভাল ক'রে দেখা যায়। তলায় ছিল গোপন গভগাৃহ- দেখাই 
যাচ্ছে ; কে জানে আরও খংড়লে হয়তো কোনও দরজা পাওয়া যাবে, যেখান 
থেকে আরও, আরও নীচে যাবার সশড় নেমে গেছে । 

জঙ্্ক নদী এখান থেকে দেখা যায় না। কাণুন সাগর আর নদীর মাঝামাঝি! 
একাট গাঢ় সবৃজ বনরেখা আছে । এই বনরেখার ওপারে দান্ট গেলে হয়তো! 
নদপীটকে পাওয়া যেত। পাথর আর পাথর তার বক জড়ে। তারই মধ্যে 
দিয়ে দুই ধারায় কলকল করে বয়ে যাচ্ছে জল । 

সুনাবেড়া মালভূমির উচু কোনও 'দকশূন্যতা থেকে কবে এলোমেলো! 
পায়ে নেমে এসৌঁছল .নদশীট । অনেক অনেক শতাব্দী আগে। তারপর 
বহুদিন তার চালচলন নিয়ে কোনও কথা ওঠোন । ডীনশশো তেতাল্লিশের 
অজন্মায় এ অণ্ুলে মানুষ মরেছিল । ছেষাঁট্রর দ1ীভক্ষেও পথের ধারে মানুষ 
ও বলদের কণকাল পড়ে থাকার কথা বেসরকাঁর সূত্রে জানা গেছে। খরা- 
অনাবাৃষ্টর পৌনঃপহীনক ঝাপট খেয়ে হঠাৎ মানুষজনের খেয়াল হয়, আরে, 
এই স্বোরণী নদশীটর কোমরে নোঁড় পরালে তো বেশ হয়! কেউ বলল, 
বাঁ ক্যানালে এগারোশো কুঁড়ি আর ডান ক্যানালে বাইশশো পাঁচ হের চাষ 
হতে পারে । শুরু হয়ে গেল সাভের তোড়জোড়। তখনও এই উপত্যকা 
অণ্ুলে মাঁট খোঁড়া চলেছে । চৈত্রা পরব, নুযাখাই, করমা থেকে ছাট নিয়ে 
কণকালসব'স্ব মজুররা মাটি কাটছে । প্রায় পাঁচ বর্গনাইল জোড়া এক অণ্চলের 
তলা থেকে বোরয়ে আসছে পোড়া ইস্ট, সার সার বাঁড়র ভিত, মান্দরের 
গভগিহ, মরাহাজা কুয়ো*'তখন পধযন্তি সবাই ভেবেছিল, এমনই চলবে । 
তাড়া তো নেই কোনও । স:ধাময়ের গুরু আফজল আসাদ বলতেন, হর্পা- 
মহেঞ্জোদড়োর খনন চলেছিল বছরের পর বছর ধ'রে । আরে এ কি ছেলেখেলা ! 


৮৪ 


এ তো পুকুর-কাটা নয় যে একশো মজুর জ্হাটয়ে কোদাল চালিয়ে দিলাম ! 
এএক নিপুণ শলপ। এর তুলি হ'ল কোদাল-গাঁইতি-শাবল, ভাস্কর হ'ল 
গাঁগঞ্জের অন্পঢ় মজদূর | এদেরই মায়াস্পর্শে মাঁটর নীচ থেকে ঘুমন্ত 
অতীত পৃঁথবী আন্তে আন্তে ধালিবসন ত্যাগ ক'রে উঠে আসে । 

সুনাবেড়া মালভূঁমির প্রত্ব পাথরগুলর বরাতে কিন্তু সময়ের টানাটানি 
লেখা ছিল। বাঁধের জমির সাভে” শেষ হয়েছে ক হয়নি, আরম্ভ হয়ে গেল 
জাঁম আধিগ্রহণের বিপুল জাঁটল সব কারনামা । তারপর যা হয়, চারপাশের 
গাঁয়ের জাঁমর দাম বাড়তে আরম্ভ করল হু-হু ক'রে । বাড়বেই, কারণ 
আঙ্কাটোলি, রমনাগুড়া, তেলিভ।সা এইসব গ্রামের মানুষরা তো এবার ঘর 
ছাড়বে, নতৃন জাঁমর খোঁজে বেরোবে ৷ 

দাবানলের মতন খবরটা ছাঁড়য়ে গোছল । জল আসছে, জল । জল 
আসছে । ওই নদীর ওপর বাঁধ তোর হবে । তার 'বশাল জলাধারে ডুবে যাবে 
আশপাশের ছ"খানা গ্রাম | ডুবে যাবে ওই পদ্মফুলে ভরা কাণনসাগর, নালা 
পরবে যার বুক থেকে পদ্মফুল তুলে টোলর মুখে ওরা সাজাত এতদিন । ডুবে 
যাবে পুরনো বসাতির কাছ ঘেষা পশুচারণভূঁমি । হ্যাঁ, এইসব মাটি খখড়ে বার 
করে আনা সভ্যতার স্তম্ভ, চিহ্ুগীলও ডুবে যাবে । গাঁয়ের মানুষরা অবশ্য 
তাই নিয়ে কেউ ব্যন্ত নয় । ওসব ওদের “সোনা-খোঁজা” বাবু সুধাময়ের একান্ত 
নিজস্ব ব্যাপার । 

মাটর তলা থেকে ইট, মৃৎপান্রের টুকরো, মর্তি এই সবের সঙ্গে উঠেছে 
ছোট ছোট পাতলা সোনার চাকাতি, হয়তো মদ্দ্রা, গোমেদ জাতীয় পাথর, 
পীতর টুকরো । সে সব সধত্বে তুলে এনে কাচের বোতলে তুলোর নধ্যে রাখা 
হয়েছে । বুড়ো পিচার বিন্দা অনেক সাহায্য করেছে সুধাময়কে । পিচারুর 
বয়স ঘিশ্চয়ই সত্তর পোরয়েছে, দেখায় আরও বুড়ো-_কুরজো, ভাল করে 
হাঁটতে পারে না, বসলে হাঁটুতে থুতাঁন লেগে বায় । এ অণুলের মানুষজন 
তাকে ভালবাসে, মানে । তার সরু হাতখান তুলে সিগন্যাল না দলে কাজে 
জুটবে না কেউ । তাছাড়া ?পচারু বসে একমনে দেখে ক্যাম্প আঁফসে কীভাবে 
নানা রকমের স্পৌসমেন গ্রুপ করে সাজানো হয়, চুনের দাগ দয়ে মাটিতে 
চৌকো সব ঘর কাটা হয়েছে । দেখতে দেখতেই কখনও বাপচারুর ঘুম আসে। 
তার ম্‌খের লালায় জানসাদ্ধ ভিজে একাকার হয় ৷ ইতিহাসের ব্যাপারগুলো 
যথাসাধ্য ওকে বঝয়ে বলেছে সুধাময়, তবু নিজের ঘোলাটে 1চন্তায় বুড়ো 
গানে, ওই সব মাট-টাঁটি খোঁড়া আসলে সোনার খোঁজ । শহর থেকে এসে 
ক্যানভাস জুতো আর শারট-পেন্টুলুন পরা সংধাময় সোনা খখজছে, শহরে 
নয়ে যাবে বলে ! 

সেই কবে থেকে এই বন-পাহাড়কে জোঁকের মতন কামড়ে ধরে আছে 
অভাব, আান্ধক ও মভ্তৎ্ক-জবর | বষাঁর অনেক আগে থেকেই গাঁ ছেড়ে কাজের 
খোঁজে অন্যন্র যাওয়া শুরু হয়ে যায়। পাশে রায়গড় অণ্ুলে মজীরর রেট 
বোশ । এঁদকে, ঘরের পাছদুয়ারে তখন মহাজনদের রমরমা | ভাদ্রে ছোট ধান 


৮৫ 


উঠবে, তা আবার ফুরাতে ফুরাতে তলানতে ঠেকবে শীতের মুখেই, তারপর 
মাণ্ডিয়ার জাউ, মহল সেদ্ধ, আমের আঁধর আগাপাশতলা """ 

জল আসবে এই হল্লায় কতবছর হল মানুষ ঘর ছাড়তে আরম্ভ করেছে । 
প্রথমে আওকাটোল ফাঁকা হয়ে গেল । ওটা তো একেবারে জলাধারের পেতের 
ভেতর | তারপর রমনাগুড়া, তেলিভাসা, চিলকলচুয়াঁর মানুষ আন্তে আস্তে 
জাঁম জঙ্গল নতুন রুঁজর সন্ধানে বেরোতে লেগেছে । 

গোণ্ড্‌, ভুঞ্ীয়া, পহরিয়া_বোশির ভাগ এরাই থাকে আশপাশের এই 
ছ-সাতটা গাঁয়ে । একদা পহারিয়াদের মূলবাত্ত ছিল কামারের, এখন তারা 
বাঁশের কাজ করে । ভূপ্গিয়াদের মধ্যে আনার দুটো শ্রেণন “চন্দা'রা চাষী আর 
গকরিয়া'রা পাহাড়ের ঢালে জুম চাষ করে অথবা শিকার । গোণ্ডরা হল 
গোয়ালা । এ অণুলের মণ্ত মস্ত গোরুর পালগুলি তাদেরই, ছত্তিশগাঁড় লারয়া 
বুলি প্রথম প্রথম বুঝতে পারত না সধাময়, এখন সে মোটাম.1ট লারয়া বলতে 
পারে ৷ মাঝে মাঝে দু-একটা হালকা রাঁসকতাও করে নেয় কুনিকামনদের সঙ্গে, 
যাঁদও এমানিতে সভ্য সমাজে তার মুখ সব সময়েই বিষগ্ন গম্ভীর । 

সুধাময় অনেকক্ষণ হল চন্দনমহলের 'ঢাবর ওপর দাঁড়িয়ে সাঁঝ ঢলা 
দেখছে । মেঘের নীচে মঞ্ত, রাঙা সূর্য । অন্ধকারে [বশ্বচরাচর ডুবে যাওয়ার 
একটু আগে সে সাবধানে হাতে ট৮ জহালিয়ে ক্যাম্পের দিকে যাবে । মাঁণরাম 
তার জন্য ধধুলের তরকাঁর আর রুট ক'রে রেখেছে । তাই খেয়ে যখন 
ক্যাম্পখাটে লু'ঙি আর গোঁঞ্জ পরে টান-টান হবে সুধাময়, রাতপাঁখির ডাকের 
সঙ্গে ঝলকে ঝলকে কুর্চফুলের অগোছালো, মন-কেমন-করানো গন্ধ ছুটে এসে 
শ্রান্ত তাকে ঘুম পাড়াতে চাইবে । আওকাটোলির 'দকে যাবার সর পায়ে- 
চলা-পথটার দুধারে কত কুর্চিফুল ফুটেছে এবার-_এরা বলে করেই । এত 
রকম মন-কেমন-করা- আঃ, সধাময় আর পারে না! 

এই' অন্ধকার নেমে আসার আগের সময়টা বড় অদ্ভুত। এক অতীপীন্দ্রয 
পৃথিবী তার পাখা ছড়ায় অন্ধকারের সুযোগ নিয়ে । সেই কবে াবজ্যের 
পায়ের কাছে নষাদ আর কোশল রাজ্য জেগে উঠেছিল । নর্মদার জন্মভামি 
অমরকণ্টক- উত্তরে সেই অমরকণ্টক থেকে দাঁক্ষণে মহানদশর উৎস, পশ্চিমে 
ওয়েন গঙ্গার উপত্যকা থেকে পুবে জঙ্কনদশী, এর মধ্যবতর্শ অণ্ল ছিল 
মহাকোশল, কাঁনংহ্যামের এইরকম মত । অশোকের ত্রয়োদশ 1শলা'লাঁপতে 
এর নাম ছিল আটাঁবক প্রদেশ । মৌযরা কোনওঁদন একে করায়ত্ত করতে 
পারেনি । আবার সাতবাহনদের নাঁথপন্রে এর নাম ছল গহাবন? । নিষাদ 
রাজ্যের 'বাঁচন্্র রাজধানন “গারপ্রস্থ বলে যাকে বর্ণনা করা হয়েছে মহাভারতে, 
অক্ষাংশ-দ্রাঘমাংশের হিসেব করলে তার অবস্থান আওগ্কাটোলির ধারেকাছেই 
গল কোথাও । হউয়েন সাং মহাকোশল পাঁরভরমণে এসোছিলেন-_ ওয়ারেন 
তাঁর বইতে লিখছেন- ছশো ত্রিশ থেকে ছশো পয়তাল্লশ 'থিস্টাব্দের মধ্যে 
একসময়, মহাকোশলের রাজধানী ছিল এই জগ্কনদীর উপত্যকাতেই | হয়তো 
1হউয়েন সাং ওই কাঁচা, পায়ে-চলা-পথট। ধরে এখন যে আঙ্কাটোলি নেই, তার 


৮৬ 


পাশ দিয়ে হেটে নদীর ধারে গিয়েছিলেন । গুকে দেখার জন্য প*রললনারা 
1 উকঝক মারাছল জানালার পিছন থেকে, শিশুরা ওর অদ্ভূত পোশাকে 
আকৃষ্ট হয়ে ঘাসের ডাঁটা মুখে ভরে চিবোতে চিবোতে পিছন ?পছন আসাঁছল! 
তখন এইসব গাছেদের প্রাপতামহরাও ছিল না। এইসব পাঁখদের পূর্বজরা 
জন্মায়ান, অন্য গাছ, অন্য পাখি, অন্য প্রজাতির অনেকীকছ:, নদশীটও ছল 
নিশ্চয়ই, এরা 'হউয়েন সাং-কে দেখেছে । 

সাঁঝ নামার মুখে, পাখিদের আঁবিশ্রান্ত ডাকাডাঁক জ্যাঁড়য়ে এলে মাটির 
বুক থেকে এক 'রমাঁঝম দুঃখের বাষ্প উঠে এসে সুধাময়কে ঘিরে ফেলে। 
বারোশো বছর আগে এখানে যারা ছিল, ওই ছোট ছোট সার গাঁথা মাঁটর 
নীচেকার ঘরগুিতে, যারা ওই ধসে বাওয়া পাথুরে কুয়োর চত্বরে বসে [দন 
যাপনের গঞ্পগাছা করত এমন সন্ধেবেলচ এই জনপদের অদশ্য নগরকোটাল, 
[শবমান্দরের পূজারী, রত্ঘরের পাহারাদার, সন্ন্যাসী, রমণশ ও শশঃরা 
তাদের গ্তব্ধ কলকাকাঁল গহীজাবাঁজ কাটাকাটি খেলে চরাচরে । জল আসছে; 
স্পলওয়ের কাজ চলেছে আজকাল দিনরাত, 1তনটে শিফটে | রাতে ফ্লাড- 
লাইটে কাজ চলে । বাঁধটা ধীরে ধীরে শেষ হয়ে টইটুম্বুর হয়ে উঠতে চলেছে 
জলে । জলের সশস্ত্র পায়ের শব্দে মাঁটর শরীরে ছাঁড়িয়ে পড়ছে বদহ্যৎ- 
সঙ্কেত । সব ডুবে যাবে, এই সব কিছু."মাঁটর নীচ থেকো তিল [তল করে 
বার করে আনা মহ্াকোশলের রাজধানন'"*ডুবে যাবে জলে । অনেক অনেকাঁদন 
পরে ঢাউস একাটি কালবোস দুপুর রোদে ঘাই দিয়ে উঠলে কেউ জানতেই 
পারবে না, কোনও পাতাল-রমণণর হাঁসি তার কান্কোয় পিছলে গয়োছল 
কনা ! কিন্তু সে সব তো অনেকাঁদন পরের কথা । এই মুহূর্তে সুধাময়ের 
বুকের ওপর পাথরের মতন চেপে আছে চারাঁদকের মাঠ-বন তোলপাড় করে 
উঠে আসা এক ব্যাথত শজজ্ঞাসা"'সুধাময় আমাদের বাঁচাবে তো? জল 
আসার আগে নিয়ে যাবে তো আমাদের ? 

দুর, কী করে বাঁচাবে! আপাঁন শুতে ঠাঁই পায় না, তায় শঙ্করাকে ! 
কণ যে টাকার টানাটা'ন, সে সুধাময়ই জানে । হেডকোয়া১র থেকে সময়মতো 
টাকা আসে না, প্রায় প্রাতমাসেই মাইনে হয় পনেরো তাঁরখের পর। লেবার 
পেমেন্ট নিয়ে বড় রকমের ঝামেলা হতে পারত, 'ন্তু ইউীনয়ন নেই, বুড়ো 
পিচারু -দছ, তাই একরকম চলে যায় । ভালরকম যারা খাটতে পারে, তারা 
প্রায় সকলেই ভিনদেশে, ভিন্গাঁয়ে গেছে_ রয়ে গেছে কেবল ঝড়াত-পড়াঁতরা । 
এখানে কাজের তাল চিমে, থেমে থেমে রয়ে রয়ে কোদাল শাবল চালানো, এই 
আধবুড়ো হাড়-জরাঁজরেরা ভেবোচন্তে কোনওমতে চাগলয়ে দেয় । আটবছর 
আগে, নতুন এসে টাকার জন্য অনেকরকম দৌড়বাঁপ করোছল সংধাময় । 
শানজেই মাথা খাটিয়ে রাঙন মলাটের প্রজেই গুরপোর্ট তোর করোছল, গোলাপ- 
নীল-হলহুদ- দিল্লী, বোম্বে, প্যারসেও পাঠানো হয়োছল, কেউ সাড়া 
দেপ্ণন। এতাঁদন পর সকলেই জেনে গেছে কেউ সাড়া দেবে না। মানুষের 
খদে, শুকনো ডাঙার হাঁ-করা তে্টার জবাব ণমলেছে-_ জল আসছে । জল 


৮৭ 


এসে একটি স্বচ্ছ অঙ্গবস্ত্বের মতো ঢেকে দেবে মাটির নীচেকার এই সব অস্ফুট 
ছটফটানি । 

কয়েকদিন আগে সুধাময় আত্কাটোলির পুরনো, পরিত্যন্ত পাড়ায় 
গিয়োছল । সোঁদন বৃম্টির কোনও লক্ষণ ছিল না, বিকেলের রোদে সাঙ্ঘাতিক 
ঝাঁজ। সেই আশ্চর্য লোকটার সঙ্গে সুধাময়ের আচমকাই দেখা হয়ে গোঁছল-_ 
বয়সের আগেই বাড়িয়ে যাওয়া মুখ, কাঁচাপাকা চুল, কাঁধে একটা গামছা, 
নল জামা, তার সঙ্গে ধুতি । গলায় একরাশ মাদুলি, শিকড়-বাকড় । 

একেবারে ভাঙাচোরা ফাঁকা একটা বাঁড়র মধ্যে থেকে আস্তে আগ্তে বোরয়ে 
এসোঁছিল। কী করাঁছল ওখানে-দিনদুপুরে ভূত নাঁক- চমকে গিয়েছিল 
সুধাময় । সহদেব, নাম বলোছল, লোকটা জাতিতে গোণ্ড-_ আন্দাজে বোঝা 
উঁচত ছল, কারণ ওই শুনশান বাতিল পাড়ায় ইতস্তত ঘুরে বেড়াচ্ছে সাদা 
কালো পাটাকলে অনেকগাঁল গোরু। 

এখানে কী করছ 2 

লাঁরয়া বুলতে আনমনে সহদেব কথা বলছিল, কথার মধ্যেই যেন সজল, 
উদাস চোখ দুটি ওর আঙ্কাটোলির সারা শরীরে ঘুরছিল। অদ্ভূত কথা তো 
_এমন বাপের জন্মে কখনও শোনোন সধাময় ৷ “মে, ইগাঁ ছোড় দেহঠ। 
হজুর ইহর মোর ঘর রাঁহস, ইহর মোর পুরখা বাপমানকে ভিটামাট 
রহিস্‌, নওয়াঁ গানে রহেবার- মোর মন্‌ নি লাগথে-গাই গোরু মান ভি সব 
দিন সাঁঝ্‌ হোয়েলে জুনা থান্‌ লা ভাগ যাথে--ইহর ওমান্‌কে ভি তো গোঠ্‌ 
রহিস- গোরুমান-কে সাঙ্গমে মে ভি এহালা ঘিচা আথ-_” 

ঘর ছেড়ে চলে গিয়ে নতুন গাঁয়ে জাম িনে ঘরদোর করে নত করেছে 
সহদেব অথচ এখানেই ওর বাপ-ীপতেমোর ভিটে । কিন্তু নতুন গাঁয়ে গাই 
গোরুদের মন লাগে না একেবারে- বিকেল হতেই ওরা সহদেবকে টানতে 
থাকে । আত্কাটোলির গা ঘেষে যে পশচারণভূমি-__ওইখানে চরতে চলে আসে 
সহদেবের গরুর পাল-_তারাই একরকম 1হণ্চড়ে টেনে আনে সহদেবকে-এখানে 
এলে নিজের ছেড়ে যাওয়া বাঁড়ঘর ঘুরোফরে দেখে ও । বাঁড়র সামনে কাঁচা 
পথের ওপারে একটা নরা, শুকনো অজনগাছ । ওই গাছের নণচে গ্রামদেবীর 
মূর্তি পুজো হ”্ত। মহল্লার লোক যাওয়ার আগে গ্রামদেবীকে তুলে 'নয়ে 
গেছে--তারপর আন্তে আন্তে গাছটাও মরে গেল শুকিয়ে যেন এই শূন্য 
পাড়ায় ওর বাঁচার ইচ্ছেটাই চলে গিয়োছল। 

এই সোনা-খোঁজা বাবু, সহদেব হঠাৎই সুধাময়কে পিছন থেকে ডেকেছিল, 
এই যে আমাদের তাঁড়ঘাঁড় গাঁ ছেড়ে যেতে বলল সরকার-মালিক, পান 
আসছে, পানি আসছে হল্লা হ'ল-_কই, এখনও আসোঁন তো! আমাদের আর 
ক'টা বছর 'নজের ভিটেতে থাকতে দিত না হয়-_-ক হস্ত! এই প্রশ্নের জন্য 
সুধাময় তোর ছিল না, তব 'মাছীমছি সহদেবের গরুর পালের ক্ষুরের ধুলো 
থেকে নাক বাঁচাতে রুমাল, চেপে ধরেছিল মুখে | কী বলত ? টুকরো টুকরো 
হয়ে গেছে আত্কাটোলি। চাষের জাম একজায়গায়, বসতবাঁড় অন্যত্র । জমির 


৬৮ 


দামের সঙ্গে পাল্লা দিয়ে হেরে গেছে ক্ষাতপূরণের হাতে গোনা টাকা । বাপ 
এক জায়গায়, ছেলে অন্য কোথাও । কাকা-ভাইপোর আর দেখা হয় না নতুন 
গাঁয়ে গিয়ে । ঘর ছেড়ে যাবার দন প্রজেতের সার সাঁর ট্রাক যখন মাল তুলে 
নেবে বলে দাঁড়িয়েছিল--কণ কান্নার রোল আতঙ্কাটোলিতে ! গলা জাঁড়য়ে ধরে 
মায়ে-ঝিয়ে কাঁদে, ভিটে ছেড়ে যাবার আগে আছাঁড়-ীপছাঁড় খায় সমর্থ 
পুরুষ । চশমার আড়ালে সেদিন সুধাময়েরও পৃথিবী ঝাপসা হয়ে গোঁছল, 
কন্তু কী করতে পেরেছে সে! বাঁধের কাজ িসেবমতন এগোয়ান। লোহার 
দাম বেড়েছে, বেড়েছে 1সমেণ্টের ৷ ঠিকাদার তার পাওনা-গণ্ডা বুঝে নিয়ে 
ঘরে গেছে, ইীর্জীনয়ার সময়ের টানাপোড়েনের হিসেব 1দয়েছে আঁডটকে_- 
আচ্ছা, সহদেবরা তো আরও দুটো বছর বাপ-পতেমোর ভিটেয় থাকতে 
পারত, ওদের যারা তাড়াল, তাদের কাছে হিসেব চাক দোঁখ কেউ ! 

উদাস এই সাঁঝপাথবীতে সূধাময় কোনও প্রশ্নের উত্তর দিতে পারোন। 
যেমন পায়ান তার নিজের কোনও [জজ্ঞাসার উত্তর । সুধাময়ের জীবনটা 
এরকম না হয়ে অন্যরকম তো হ'তে পারত-_-এমন কেউ ?ি আছে, যাকে এই 
কথা জিজ্ঞেস করা যায় ? চন্দনমহলের াবির ঠিক মাঝখানটায় যেখানে রত্ব- 
ঘরের গভীর খনন চলেছে, সেখানেই উল্টে মরে পড়ে আছে বিবর্ণ এক 
[িয়াশাল। বাকলে তার কত দীর্ঘ যন্ত্রণার রেখা সন, আঁকাবাঁকা ডালগ্ীল 
স্তত্ধ কোনও ফাঁসল চিৎকারে আকাশের দিকে যেতে চেয়োছল । সামান্যই 
সা গ্রাণ্ট ছিল তখন, কয়েকটা পেপারও বোরয়েছিল, কিন্তু পায়ের নীচে 
দাঁড়াবার জমি, মান চাকার ছিল না। নাহলে ক রুমা তাকে ছেড়ে যেতে 
পারত? রুমা চলে যাবার পর দিন বদলের অমোঘ নিয়মে প্রাভমা এসেছে, 
কিন্তু প্রাতমাই বা কী পেয়েছে সুধাময়ের কাছ থেকে ? একরাত ছেলেটার 
আট মাস না পরতে জন্ম, প্রাতিমাকে বাঁচাতে তাঁড়ঘাঁড় শরীর চিরে বার করে 
আনা, ছ"বছরে দাঁড়য়েছে, সাতে কথা ফুটছে, এখন বারো বছরে দেওয়াল ধরে 
চলতে পারছে, মুখ দিয়ে লালা ঝরে। সঙ্গমের মুহূঙ্ডে রুমার মহ্খ বার 
বার মনে আসত । সমণ্ত শরীর দিয়ে ধাকা দিয়েও সেই দশীপ্ত সরাতে 
পারেনি সুধাময় । ভাই ক ফুটল না ওই কিশলয় 2 কে বলবে ? এই বয়সে 
অহরহ পৃজো-আচ্চামানতে শুকিয়ে জপর্ণ হয়ে গেছে গ্রাতমা, কপালে মস্ত 
[সদরের ফোঁটা ধেবড়ে থাকে, মাপিবন্ধে লাল-কালো নানা সুতো বাধা । এই 
সুদূর জঙ্গলে সুধান্য়কে কেন আসতে হ'ল ঘর ছেড়ে, তার কোনও গডফাদার 
নেই কেন? তাড়া-তাড়া দরখাস্ত, শেষে কোর্ট কেস, কীনা করেছে সংধাময় ! 
প্রতিমার চুঁড়গুঁলি _াবলীন হতে হতে ওইভাবেই কি লাল-কালো সুতো হয়ে 
গেছে! তবু বেরোতে পারেনি এই গোলকধাঁধা থেকে । ওই প্রত্পাথরগ্াীল 
অথবা আঙ্কাটোির মতন তুমুল জলমগ্ন সুধাময়ের ভবিষ্যৎ । 

এবার চলে আসার সময় প্রাতমা ছাড়তে চাইীছল না তাকে একেবারে ; 
কত আর ছুটি বাড়াবে, দুদিন, তিন-দিন, তবু আসতে হ'ল । আলনা থেকে 
জামা-কাপড় তুলে টেবিলের ওপর রাখা স:টকেসে গোছাঁচ্ছল সংধাময়। 


৮৯ 


লোডশোঁডং, মান আলোয় প্রাতমার কপালের মন্ত 1টপটা তার খুব কাছে এসে 
দুই চোখের ভিতর বিষাদমাথা চাউীন দিয়ে ক যেন খজাছিল। 

_ হ্যাঁগো, তুমি আবার ওইসব সোনা-টোনা [জের কাছে রাখছ না 
তো ! রেখো না বাপু, ওসব ভাল না, মাটির তলায় ছিল মানুষের হাড়" 
গোড়ের সঙ্গে । আমাদের তো এই অবস্থা, লোভ করতে গিয়ে হিতেবপরাত 
হবে, বন্ড ভয় করে আমার । 

সোনা-খোঁজা-বাব বলে তাকে এখানকার মানুষ । সাঁত্যও, আবার 
মিথ্যেও। প্রথম দিকে অনেক সোনার পাত, টুকরোটাকরা বোঁরয়েছে। কাজ 
করতে করতে মেট্‌ বা সরদার টুক করে কুড়িয়ে নয়েছে। বুড়ো চারু 
তখন অত বুড়ো ছিল না, কাজের 1াবতে 'নয়ামত যেত, কতবার কোমরের 
কাঁষতে বামাল গংজতে গিয়ে সুধাময়ের দিকে তাকয়ে ফিক লাজুক হেসেছে 
বুড়ো । নিরল্ন দেশের কগকাল মানুষ এদের কিছ বলতে পারোন সুধাময় । 
এই তো কদিন আগে মাটির নীচে সুড়ঙ্গ কেটে বেআইনি গোমেদ পাথর 
খবজতে গিয়ে মাঁট চাপা পড়ে মারা গেল চারটে নেহাতই বালক-মজর । 
ভিন্দোশ ব্যবসাদার সঙ্গে সঙ্গে ফেরার, ছেলেদের বাবা-মায়ে ডাক ছেড়ে 
কাঁদতেও পারোন। সুধাময়ের তোরঙ্গে গোপন তুলোয় মোড়া অমন দুচারটে 
সোনার পাত কি আর নেই ! ফাঁড়র নতুন হাবিলদার ঠাট্রা করে কতবার কাঁধে 
চাপড় মেরেছে, জানতে চেয়েছে, দেখতে চেয়েছে, গম্ভীরভাবে এাঁড়য়ে গেছে 
সধাময় । অদ্ভূত ওই পাতগুলো, গোল, ঠিক সমান নয়, কী সব অচেনা 
হরফ, একটাতে এক রমণশর আবছা মুখ, মুখের অপার্ঘব হাসিটা কীভাবে 
খোদাই হয়েছিল, এতাঁদনেও তার রহস্যমায়া উবে যায়ান-*" 

এখন এক-একটি দিন যাচ্ছে, গ্রীন্ম পোঁরয়ে বা, বাঁ পোঁরয়ে শরৎ-হেমন্ত- 
শীত, মাঁটর পরত খুলে ক্রমাগত বোঁরয়ে আসছে নানা বস্ময়, নদশর কোমরের 
ইস্পাত কথীক্লুকেটের শেকলখান মজবূত হয়ে এনটে বসছে, সুধাময় নন্দ তত 
'নাশ্চিতভাবে বুঝতে পারছে প্রাতমার হাতের হাঁরয়ে যাওয়া, ক্ষয়ে যাওয়া 
চুঁড়িগুলি এ জীবনে আর ফেরানো হবে না তার, তবু রোজ শুতে যাবার 
আগে একবার সে ওই সোনার টুকরোগ্যাীলকে দেখে, ঘ্রাণ নেয়, প্রাণ ধরে 
ফেলতে পারে না। সুধাময় বুঝতে পেরে গেছে, একাঁদন মধ্যরাতে আচমকা 
জল আসবে, ক্যাম্পখাট দুলিয়ে, তোরঙ্গ ভাসিয়ে সুধাময়কে দ্রুত টেনে নেবে 
তার কোলাহলমাখা স্পন্দনের ভিতর ; ওই পাতাল-নরনারশী পাতাল-শশ:দের 
সঙ্গে জীবনযাপন আরম্ভ হবে সুধাময়ের--অনেক অনেক দিন পর মাঝদুপুরে 
এক ঢাউস কালবোস ঘাই দিলে কেউ জানতেই পারবে না যে আওগ্কাটোলর 
সোনা-খোঁজা-বাব্‌ আজও তল খ:জে পায়ান। 


৪১০ 


জম্াতেোেন্স ত্বক 


বালচরের ওপর 'দিয়ে গেছে আন্তজিতিক সামান্তরেখা | রেখাটির অন্য পথ 
ছিল না, সীমান্তে নদী থাকলে এই রকম হতে বাধ্য । আসলে রাম্ট্রশান্তুর 
খঃটর জোর যতই থাকুক, অথবা সময়ের সঙ্গে ভোল পাল্টাবার বিদ্যে, 
নদশীট হাজার হোক তার অনেক অনেক আগে এসোৌছল । জলে-জলেই 
যাচ্ছিল আন্তজঠিতক রেখা, মাঝখানে জেগে ওঠা ধূধূ বালহদ্বীপ খাল 
তাকে যেতে নাহি দিব ভঙ্গীতে আটকাতে চায়। তাই সে সামান্য হোঁচট 
খেয়ে, ভেজা পায়েই বালচরে উঠছে । ওপারের রান্ট্রীট নতুন, বছর বাইশ 
আগে নানা ওলটপালট, রক্তপাত, লণ্ঠন ইত্যাঁদর মধ্যে উুঁয়া-ওুঁয়া শব্দে জেগে 
উঠে সে প্রথমেই শুনোছিল নদীর ছলাৎ। নদীর নয়, নদের । কেউ কেউ নদ 
হয়ে জন্মায়, অন্যরা নদী । কপোতাক্ষর মতন রক্ষপুত্রও নদ । জনমানসে 
ভাবমৃর্তিকে চাঙ্গা করে রাখতে রাখতে খানিকটা পুরুষালী গাম্ভীষ ক্মশঃ 
তার মজ্জায় ঢুকে গেছে । হাজার হাজার বছরে কত কছুই দেখেছে ব্র্পুত্র | 
পুষ্যবর্মণ চলে গেছেন, হিউয়েন সাং এসেছেন কাগরতপে, পরমভন্রারক 
পরমেশ্বর রাজা শ্রীহর্ষের পর বমর্দেব বনমাল সাম্রাঙ্যকে পন্ণ্রবর্ধন পযন্তি 
বাছয়ে দিয়েছেন । পালবংশের রত্বপাল, ইন্দ্রপাল, ধপালেরা ক্যারাভানের 
মতন সময়ের ওপর হেটে গেছেন। পৃথুর সঙ্গে যুদ্ধে মুছে গেছেন মহম্মদ 
ইবুন বখতিয়ার । এই স্মপ্ত কিছুর আগে একাঁদন বেহুলা বলে নেয়োট 
ধোবাবুড়ীর ঘাটে স্বর্গের রান্তা শুধয়েছিল, অথবা হয়তো আসেই নি 
কোনোদন ? তাই কি পাথরটা, কাছারর পাছদঃয়ারে পাঁচিল ঘেরা মন্ত 
পাথরটাকে বড় নতুন মনে হয়োছিল আঁনমেষের ! এমন আলতো হাতে কাপড় 
আছড়েছে নেতা ধোপান+, যে সময়ের দাগই পড়েনি পাথরে £ 

আনিমেষের পাশে বসে ম্যাপের ওপর ঝংকে পড়োছিল প্রহনাদ মৈত্র। 
প্রহনাদও কলকাতার ছেলে । কিন্তু এই কশদনেই প্রচুর ম্যাপট্যাপ জ্যাটয়ে 
1নয়েছে, বইপন্র। একই স্টলে ঘণ্টার পর ঘণ্টা কাটালেও ওসব বইপন্তর 
আনিমেষের চোখে পড়বে না। কন্তু কিভাবে টেনে তাদের বার করে আনে 
প্রহনাদের মোটা কাঁচের চশমার পেছনের বিহ্বল দৃম্টি। তবে 'এখন এ 
রেখাটকে দেখে আঁনমেষ লোভনর মতন ভাবছে জল পেরানোর কথা | 'নাষদ্ধ 
জগতের ডাক । পাসপোর্ট নেই, অথচ বডার পোঁরয়ে এলাম, বাড়ীতে বলা 
যাবে। 

নদের জল স্লেটের মতন, শান্ত, গম্ভীর ভাবে এ কূল থেকে ও কূল 
জুড়ে আছে। ওাঁদকের তীর পোঁন্সল-স্কেচের মতন আবছা, আকাশে আলো 
নেই। এ পাড়ে, 'িনচ রাষ্তার পর ঢালু জাঁম নেমে গেছে জলের দিকে । 


৯৯ 


অনেকখান জায়গা জুড়ে বড় ছোট কেরী নৌকারা, একখানা 1বশাল যাত্রী 
পারাপারের বার্জ দাঁড়য়ে । খেয়া পার হয়ে যাবে মেঘালয় । নদীর ধারে 
অনেকগুলি ছোটো চায়ের দোকান গাঁজয়ে উঠেছে, একখানা 1টীকট ঘর মোটর 
লঞ্চের জন্য । এমন জায়গায় বিনা কাজেই অনেকখাঁন সময় কাটিয়ে দেওয়া 
যার । আঁনমেষের ফিছু কাজ ছিল। অন্ততঃ কিছু কাজ সেরে এলে তার 
পক্ষে ভালোই হত। ধিন্তু দুপুরের পর থেকে আনমেষের মনটা কেমন 
লম্বাটে হয়ে ঝূলে পড়েছে । সকালে আজ কোন আধবেশন ছিল না । স্নান 
করে পাজামা পাঞ্জাব পরে হাসনুদের বাড়ী থেকে বোঁরয়ে সে একা একা 
মণ্ডের পেছনে যেখানে আতাঁথদের খাওয়ার মণ্ডপ, সেখানে যা'চ্ছল। জায়গাটার 
নাম নেহরু উদ্যান। কিন্তু পায়ে পায়ে ঘাস উঠে এত ন্যাড়া মাঁট, যে 
কোনাঁদন ফুল ফুটবে বলে মনে হয়াঁন আঁনমেষের, মণডপের দাঁড় বাঁশ খোলার 
পর বসন্ত এলেও ৷ ভোর সাড়ে পাঁচটায় এক কাপ চা। হাসন*র মাবেশ 
তাড়াতাঁড় উঠে পড়েন। কিন্তু ওর পাঁড়াপীড়ি সত্তেও আনমেষ জলখাবার 
খেতে রাজ হয়নি । একে ওদের শবব্রত করা, এটা উদ্যোক্তাদের সঙ্গে গৃহস্বামির 
আঁলাঁখত চর্তর মধ্যে নিম্চয়ই নেই__এই খাওয়া-দাওয়া, তারপর্ন অচেনা 
পাঁরবেশে, একা, বাড়ীর মেয়েদের সামনে বসে মধ্খ নীচু করে লহাচ বেগদন 
ভাজা খাওয়া ঠিক আঁননেষের ধাতে নেই । মণ্ডপে বরং চত্তদারা থাকবেনই, 
এলাহাবাদের সুমিতা বিশ্বাসের সঙ্গে গতকালই আলাপ হয়েছে, একসঙ্গে 
গঞ্প করতে করতে ব্রেকফাস্ট-_এইসব ভাবতে ভাবতেই বাঁদক থেকে এ্যাই 
অনিমেষ শালা, তাকা একবার শুনে আনমেষ ব্রেক কষে । ঝড়বড়ে গরোনো 
একটা ব্লু ডিজেল এ্যামবাসাডারে ঠেসাঠোঁস হয়ে শত্তদা, সুমিতাদ, অলক 
সেন এবং অচেনা আরও দুজন লোক । 

এখনও খাওয়া হয়ান ? সামতাঁদ ঘাড় নেড়ে হেসেছে, যাও, আজ ভালো 
গজালাঁপ আছে। 

িত্তদা বলেছে আমরা গৌরীপুর যাচ্ছি । লাণ্ের আগেই ফরে আসবো । 
আনিমেষের তেতো হাস দেখে চিত্তদা একটু অপ্রাতিভভাবে জংড়ে [দয়োছল। 

তুই তো যেতিস না। কাল রাঁত্তরে আমাদের যা আওয়ার দাঁল-""না 
হ'লে তোকে ওখান থেকেই তুলে নেওয়া যেত*** 

ক আছে । যান না। দুপুরে দেখা হচ্ছে তো। 

মুখে হাঁস রেখেই অনিমেষ গেট 1দয়ে ভেতরে এগিয়েছে । কন্তু গাড়ীটার 
ধুলো মিইয়ে যেতেই ওর বুকের মধ্যে লাফ দয়েছে একটা ভয়, এখন আনমেষ 
একা, একদম একা "অবশ্য জলথাবার খেয়ে হাসননদের বাড়ীতে ফিরে যাওয়া 
যায়, বড় লেখাটা এগোনো যায়, তবে এখানে একটা বইও আনা হয়াঁন, লেখাটা 
এলেবেলে হয়ে যাবে । 'কন্তু এক্ষ্ন ফিরে যেতে ইচ্ছে করছে না ওদের 
বাঁড়। এই সময়ে বাড়ীর মেয়েরা অগোছালো হয়ে চানে যার ভিজে কাপড় 
মেলে, চুল আঁচড়ায়, পুরুষগন্ণীল ওদের বাড়ীতে কেমন যেন সবসময় অদ্শঠ, 
গলায় আওয়াজই নেই, কেমন একটা অস্বপ্তি হয় আঁনমেষের । 


৯ 


চিত্তদা তাকে একবারও বলতে পারল না? গতকাল সন্ধেবেলা আঁনমেষ 
কী বলেছিল এখন একেবারে ধোঁওয়াটে হয়ে গেছে মনের মধ্যে, [কিন্তু 
কখনোই বলেনি যে গৌরীপুরে যাওয়ার গাড়ী পেলে সে যাবেই না। বরং 
চত্তদাই বলোছিল, গাড়ী পাওয়া যাবে না। কাল ভি আই রা আসছে। 
তাদের চামচেদের জন্য তিন-চারটে গাড়ী মজুদ থাকবে । আমাদের কোথাও 
যাওয়া হবে না। 

সমতা বিশ্বাস বলোছল, তাতে কণ হয়েছে, আমরা তো নদশতে যেতে 
পার | ওই তো হাঁটাপথে ঘাট । 

প্রমথেশ বড়ুয়ার বাড়ীর প্রসঙ্গে তেমন কিছ উচ্ছলতা দেখাতে পারোনি 
আঁনিমেষ। এটা ওর স্বভাব । প্রাতিমা বড়ুয়ার গাওয়া গান দুটি ওর ভারণ 
সন্দর লেগোঁছল, গুর শান্ত, স্নগ্ধ সৌন্দয” যা বয়সে দণপ্তই হয়, শুকোয় না, 
ছঃয়ে গেছিল ওকে । কিন্তু যে মানুষকে মণ্ের নীচ থেকে দেখে ভালো লাগে, 
দিনের আলোয় তার কাছে গিয়ে, অথবা তাদের স্মাতিভরা ঘরদুয়ার দেখে 
আনন্দ পাবে এমন মনে হয়াঁন আনিদেষের | ফিল্ম ফোঁস্টভ্যালের ভগড়ে কি 
আদুরকে গিয়ে বলা যায়, এই যে আপনার ফিল্ম দারুণ লাগে, অথবা 
রবীন্দ্রসদনে সবাঁচত্রা ?মন্ত্রকে কমাপ্রিমেণ্ট দেওয়া মুখের ভাষায় ."-এসব মনেই 
ভাঁজ করে রেখে দেওয়ার জানিস, দিনের আলোয় 'বাঁছয়ে দেওয়ার নয় -* 

চিত্তদা এটা বুঝতে পারোন। চিত্তদার পক্ষে বোঝা সম্ভবই নয় ৷ তাই 
রাগ করা এই পাঁরস্থিতিতে একেবারে অমূলক । 

জলখাবার খেয়ে খাঁনকটা এ-পথে ও-পথে ঘরে নদশর ধার ঘেষে যে কাঁচা 
রাস্তাঁট গেছে তা বেছে অস্ায়ী ধুপাঁড়গুলোর জীবনযাপন দেখতে দেখতে 
আবার শহরের মধ্যে ফরে এসেছে আনমেষ। সময় অজ্পই কেটেছে । মন 
খারাপটা মেলায়ান। অদ্ভূত এই জায়গাটা । এখন শীতের বেলায় এখানে 
ওখানে পাতলা জটলা, বাড়ীর বারান্দায় ইতগ্তত গুঞ্জন, যাঁদও ভীড় কোথাও 
নেই । গত তিন রাত ধরেই অন্ধকারে উপচে পড়াছিল মানুষ, একটা রাস্তাতেও 
ভালো আলোর ব্যবস্থা নেই। মণ্ট অবশ্য আলোয় আলোময়, মণ্ডপেও 
হ্যালোজেন। আলো আছে পথের মোড়ে মোড়ে। আকাশ বাতাস জোড়া 
রবীন্দ্রসঙ্গীত, অতুলপ্রসাদ, নজরুলগীতি-__আর মানুষের চলাচল, কেউ হেটে 
চলেছে মণ্ের বদকে, কেউ দলবেধে ফিরে আসছে"'"'দুগাঁপুজো দুগাঁপুজো 
ভাব চাঁরাঁদকে*"" 

এমন জায়গায় এত, আ্যাঁ, ভাবা যায় না। চিতা উইংস-এর কাছে দাঁড়য়ে 
প্রবন্ধের ওপর আলোচনা শোনার জন্য সমবেত ভশড় দেখে চমকে গোঁছিল। 
অবশ্য এদের মধ্যে আড়াই হাজার অন্যান্য প্রদেশের ডেলিগেটস--তাতে কণ! 
তাদের ধরেই হাজার দশ বারো মানুষ । সাহত্যবিষয়ক সম্মেলনে এমন 
উচ্ছল ভীড় কে দেখেছে । উলটে-পালটে দেখেও ওরা কেউ কোনো অশালগন 
আচরণ দেখোঁন, হান্দ গান চালানোর জন্য অনুরোধ, কিংবা কাফি স্টলে 
তরুণণ মেয়েদের দেখে ইশারা । অলক সেন বে*কতে চায়ান। ছোট জায়গা 


৪১৩ 


তো আফটার অল, এখানকার মানুষের মধ্যে এখনও গ্রাম্যস্বভাব একটন বেশি 
বোঁশ'"তবে চিত্তদা বলোছিলেন, তা নয় । এখানে এই সম্মেলন দোল-দঃগা- 
পূজোর মতন করে [ীনয়েছে মানুষ । মরুভামিতে ক'ফোঁটা জল, এরা কি আর 
পাবে এইসব, অন্ততঃ বছর পাঁচেক তো নয়ই **" 

প্রশংসা, তবু নেগোটভ | কৃতিত্বটা এদের ভালোবাসার 1ক শৃঙ্খলার নয়, 
প্রকৃত শহুরেপনার অভাবে যে মুখচোরা সঙ্কোচ তৈরী হয়, তার ওপর 
চাপানো হয়েছে । 

আনমেষের এত রকম চুলচেরা চার করতে ইচ্ছেই করোন। বরং তার 
ভালোই লাগাছল, যেভাবে অল্পবয়সণ ছেলেমেয়েরা খাতা ?নয়ে অটোগ্রাফের 
জন্য মাঝে মাঝেই তাকে ছে*কে ধরছিল-_-এত অটোগ্রাফ তিনদিন একটানা-_ 
কোনোগদন কি আনমেষ দিয়েছে । দ্বিতীয় আধবেশনের পর মণ্ণ থেকে কাঠের 
ণসঠাঁড় বেয়ে নামতেই লালপেড়ে সিল্কের শাঁড়, লাল ব্লাউজ, খোঁপায় ফুল, 
কপালে চন্দনাতিলক চোদ্দ বছরের একখান গজন তেল মুখ আনমেষকে 
আঁভভূত করে দিয়েছিল । 

আমাকে অটোগ্রাফ দেবেন ! খাতাখানা বুকে চেপে ধরে মুঠোয় সবুজ 
কলম, মেয়েটি কাছে সরে এসৌছল, আমাকে আগে” । আনকোরা শঙ্খ সাদা 
পাতায় কলম ঠেকাতেই আনমেষ শুনোছিল--উফ- সেই কখন থেকে দাঁড়য়ে 
আছ ! 

রোদ্দুরে কানের দুল ঝলসাচ্ছে। 

তোমার নাম কি ? 

হেমনাঁলনী । 

বাঃ, সুন্দর নাম । কে রেখোঁছলেন ? 

আমার ঠাকুমা, উন মারা গেছেন । 

পলক পড়ল । চোখের ওপরের পাতায়ও কাজলের ানপৃণ রেখা । কণ 
অপরৃপ ছোট্ট কপাল। 

এইটুকু মেয়ে, হেমনালনী কি আনমেষের কোনো কাঁবতা পড়েছে ? দুর, 
এখানে কি কলকাতার িলটল: ন্যাগাঁজন আসে ? হেমনাঁলনশ মালয়ে যেতেই 
হাাসভরা মুখে আঁনান্দিতা ছুটে এসেছিল । 

দেখি, ওকে কি [লিখে দিলেন ! আমায় একটা কাঁবতা*"" 

আনান্দতার পর টিংকু, তারপর স্নেহাঁশিস, তারপর তপন,"**.আসলে, 
প্রথম বস্তা স্বনামধন্য দেবব্রত মুখোপাধ্যায় নীচে নামার পরই আণ্থালক 
শাখার সভাপাঁত যান কাছে দাঁড়য়ে ছিলেন, এসে গর দু হাত ধরে, আম 
মুগ্ধ বলার সঙ্গে সঙ্গে রাজ্য কামাটর সচিবের স্ত্রী; আম একেবারে অভিভূত 
..-বলে দেবব্রতকে দ্রুত গজের বান্ধবীদের ভিড়ে টেনে নিয়ে ষান। কচি- 
কাঁচারা দেবর্রুতকে অদৃশ্য হয়ে যেতে দেখে, তারপরই অনিমেষ, একেবারে পড়ে 
পাওয়া চোদ্দ আনা । 

এত সই 'দিচ্ছস কেন- গাড়োলের মতন ! চিত্তদা বলোছলেন। ব্যাজ, ওই 


৪৪ 


গলার উত্তরীয়-টয় খুলে ফ্যাল্‌, কেউ চিনতে পারবে না ভিড়ে। কেউ 
আসবে না। 

আদেখ্‌লেপনা হয়ে যাচ্ছে নাক ? 

দুরে, কাঁধে ঝোলা, ঘাড় গুজে শিশহুসাহাত্যিক গৌরচন্দ্র বসকে আবেগের 
সঙ্গে সই দিতে দেখে জনমানসে নিজের সম্ভাব্য ছবিটা আঁকতে ইচ্ছে করল 
আনমেষের। 

তাই বলে এই শহরের দেওয়া সব ?িছুই ি আর নেওয়া যায়? 

যেমন নেওয়া যায় না তার প্রত্যাখ্যান, মুখ ফেরানো ! 

গতকাল সন্ধেবেলা ইচ্ছে করেই দঃ-দুবার সোজা পথ ছেড়ে বাস-স্টেশন 
ঘুরে মণ্ডপে গেছে আঁনমেষ | ফণীবাবু বলোছলেন, গেটেই থাকবেন । ওকে 
দেখলেই বাডীর ভেতর নিয়ে যাবেন । সেই ভয়ে । 

মোটা কালো ফেমের চশমা, রোগা, লম্বা, মাথায় টাক, ঝূলে পড়া ঠোঁট, 
ফণীবাবুকে দেখে কোনো আকর্ষণ ধোধ করোনি আনমেষ, সেই প্রথম সন্ধের 
সভায় । ফণীবাবু কিন্তু ছাড়েন না। অনেকে মিলে দাঁড়িয়ে কথা বলেছে, 
হঠাৎ লম্বা গলা বাঁড়য়ে, “আমাকে এ-শহরে কেউ চেনে না, বুঝলেন তো, 
আমার স্ত্রীর পাঁরচয়েই আমার পাঁরচয় ***» 

এছাড়া, “আসলে তো আঁনমেষবাবুর আমাদেরই কাছে থাকার কথা, 
আমার স্ত্রী কাবতা বলতে অজ্ঞান, কিন্তু ঠিক গর আসার আগের দিন, 
বুঝলেন, ওয়াঁকং কাঁমাঁট একেবারে হাতেপায়ে ধরে"কলকাতা থেকে 
একসঙ্গে তিনজন ভদ্রমাহলা এসেছেন***আমাদের একেবারে হাতেপায়ে, 
নাহলে" 

এরপর আঁনমেষকে অস্বা্ততৈ কোণাকোণি হেটে কোথাও চলে যেতে হয়। 

আসলে সেই প্রথমদিন, পড়ন্তবেলায়, ভীষণ ক্ষিদে নিয়ে আনমেষ এই 
বাড়ীর সামনেই এসে পেখছেছিল, ভাড়া করা জীপের পেছনে বসে, পায়ের 
কাছে সুযুটকেস। উদ্যোক্তারা বলে দিয়ৌছলেন ড্রাইভারাঁটিকেই, টাউনে ঢুকে 
ফণী মুখজ্জের বাড়ী 1নয়ে যাবে সোঙ্জা। ওই নীল টুক-১ুকে দরজা দুটি, 
জাল দেওয়া জানলা, বাইরে ছোট্ট বাগান বেশ লেগোছিল তার । ড্রাইভারও 
ক্লান্ত । ট্রেন তিন ঘণ্টা লেট ছিল । কুচাবহার রোড স্টেশন থেকে খোয়া বার 
করা ্রিষ্ট রাস্তা ধরে হাইওয়ে । শীতের দন তাই রক্ষে, রোদে কষ্ট হয়ান। 
তবে বহু নাচের বালাখল্যরা আসামে ঢোকার পর অনেকবার গাড়ণ থামিয়েছে, 
পয়সা চেয়েছে । শহরের পথ আরও জাঁটিল, নানা রকমের ভাঁড়, নানা বাঁক। 
শেষ পযন্ত ঠিকানা খঃজে ড্রাইভার চরকুটাট হাতে নিয়ে ঢোকার উপরুম 
করতেই যে নারীকণ্ঠ জানলাপথেই এই এখানে না, আমাদের এখানে আর 
না, প্রবদা আণ্াীলক শাখার সভাপতিকে বলে দিয়েছি তো...এই রবে বেজে 
উঠোছল । ফণীবাবূর অনুরোধে চা খেতে খেতে আবার তা অন্যসরে শুনতে 
ইচ্ছেই করাঁছল না আঁনমেষের । কিন্তু এ কথা যেমন চিত্তদাকে বোঝানো 
যায়ান, তেমন ফণীবাবুকেও বোঝানো যাবে না। তার থেকে ঘুরপথে 


৭১৫ 


যাওয়াই ভালো । ভদ্রলোক বলে দিয়েছেন, যত রাতই হোক, আসবেন । 
গডনারের পর এক কাপ কাঁফই নাহয়'*আম এই গেট-এ অপেক্ষা করব । 


মেঘলা দৃপুরের আলোছায়া মেখে ব্রহ্মপনত্র কেমন স্মিতমখে আনিমেষের 
গদকে তাঁকয়ে রয়েছে । আনমেষ এবার পা বাড়াবে । একটা নৌকা চাই। 
সুমতাঁদকে নিয়ে কেটে পড়েছে চিত্তদাটা, শয়তান । কেমন বাইপাস করে 
বোরয়ে গেল আনমেষটাকে । আঁনমেষ একাই বেড়াতে যাবে । খড় একটা নৌকো 
1নয়ে জাঁমদারের মতন নদীবক্ষে ঘুরবে । প্রহনাদটা আবার আসতে চাইবে না 
তো সঙ্গে? প্রহ্নাদ গম্ভীরভাবে দূরে তাঁকয়ে আছে-_নৌকো চাই ? দাঁড়াও, 
আগম দরাদার করে 'দাচ্ছ । একাঁদনে পাঁচ-ছটা নৌকো এ্যারেঞ্জ করোছি তো, 
আমায় এরা লোকাল বলে জানে । 

পাশের চায়ের দোকানদারই বোগুতে বসে থাকা একটা লোককে খ+চিয়ে 
তুলে দিল--এই তো রমজান মিয়া ধাবে। এযাই রমজান-"* ॥ রমজানের খাল 
গ্রা, পরনে লযাঙ্গ, অজ্প দাঁড়, ভাবলেশহীন গায়ের রং- একশো টাকা নেবো, 
আড়াই ঘণ্টা ঘোরাবো, কোমরের কি বাঁধতে বাঁধতে বলেছে, চলন, চলন । 
প্রহনাদ দরাদারতে বিফল হয়ে ম্যাপটা দিয়ে দিল আনিমেষকে । রাত্রে ফেরত 
দিয়ে দেবেন, তাহলেই হবে । 

স্লেট-রঙা জল কেটে নৌকো এগোয় মৃদু । দুরে সরে যাচ্ছে তটের রেখা । 
সামনে বালুচর, তাই নৌকো একটু কোণাকুণি এগোচ্ছে । কূল ঘেষে ভাঙা 
পাঁচিল, ভাঙা পাঁচিলের পর চুনকাম করা নতুন পাঁচিল, চত্বর, তার পেছনে 
ণবশাল গুরুদ্ধার, মাথার সোনার চুড়ো আলোয় চমকাচ্ছে। দণহাজারের 
কাছাকাছ ডোঁলগেট এবার ওখানেই আছেন, াবরাট এক পক্ষীমাতার মতনই 
ওই সাদা বাঁড়টা সবাইকে বুকে জাপটে ধরে নিয়েছে । কাছাকাছি চর দা 
ফাঁকা । ওদকে বান্ত .,আছে-_এঁ ওখানে । নৌকো বাইতে বাইতে জলে পেতে 
রাখা মাছ ধরার জাল এাঁড়য়ে রমজান চলেছে, ওর সঙ্গে আছে বল্ল: বলে একাঁটি 
অজ্পবয়সন ছেলে । 

তোমরা কি এদেশের, না ওদেশের ? 

শুনে রমজানের মুখের ওপর দিয়ে কোনো ছায়া হেটে গেল না। তবে ও 
আনমেষের 'দকে না তাকিয়েই বলল, আমরা তো আগে টাউনেহ থাকতাম, 
বান্ততে, এখন চরে চলে গোছি। 

চরে থাকতে ভালো লাগে ? টাউনে আসতে রোজ খেয়া পেরোনো ? 

রমজান বলল, চরই তো ভালো । ফসল হয়। পাঁলমাট। খেয়া পেরোতে 
হয়তো ি! আমার একটা জাহাজ, খালার একটা জাহাজ । সারাদিন বাস 
প্যাসেঞ্জারদের ওপারে ছাঁড়। বাকালটা অবশ্য টাউনেই কাটাই । ওখানে 
পান তূকে যায়, মাচা-ফাচা সব জলের তলায় । 

টাউনে কোথায় ? 

ওই যে গুরুদ্ধার, ওই সাদা বাড়ীটা দ্যাখলে না? ওরাই খেতে দেন, 


৯৬ 


থাকতে দেন । দুইটা জাহাজে পোলাপাীল সব লহয়্যা চইল্যা আঁস। 

আচ্ছা ওই সামনের চরের বাঁন্তটা ঘুঁরয়ে আনো না! কারা থাকে দোখ। 
আড়াই ঘণ্টা ঘোরাবে তো বলেছ। 

মাঝনদঈতে একটা যাত্রীনৌকো জেলেদের সঙ্গে দরাদার করছে । জেলেরা 
ডাঙতে করে মাছের নমুনা 'নয়ে ওদের কাছে গেছে। মাছগুলো ধড়ফড় 
করছে । লাফাচ্ছে । কিন্তু দামে পোষালো না। রমজান [বিচিত্র হেসে বলল, 
আপনারা তো ভয় পান, আমাদের লগে আইসতে ভয়। নাহ'লে এক 
জায়গায় লইয়্যা যাইত্যাম চলেন ৷ আমাদের বাড়ী যাবেন ? বলে যেম রহস্য- 
ভরে আঁনমেষের মুখ চোখ হৃদয় সব দেখতে চাইল । 

অচেনা দেশ । 1বজন-বিভূই । একা আঁনমেষ । যাবে ? যাঁদ আর না 
ফেরে, কেউ জানতে পারনে না। 

হাসনুর মায়ের মুখটা ওর চেতনায় টলটল করে উঠল । ষাট পোঁরয়েছে 
তো অনেকদিন, ছেলেমেয়ের বয়স জুড়ে হিসেব যা পাওয়া গেল । চামড়া 
এখনো মসৃণ টানটান, চোখমুখ ঘারয়ে যখন কথা বলেন, ভুরু দুটো মাঝ- 
কপালে উঠে যায়। 

ঝুলবারান্দায় বুকের তলায় কাঠের রোলং চেপে দাঁড়য়ে নীচু হয়ে 
আনমেধকে দেখাচ্ছিলেন গাঁলর অন্ধকার মাখা অন্য দিকটা । বাঁ দিকটা 
স্ট্রীট লাইটে উজ্জল, সামনে একটা ছোট্র খেলার মাঠ । 

এঁ_ এখানে দাঙ্গা বেঁধোছল । ওাঁদকটাতেই ওরা বোৌশ তো। আম 
ভয়ে মার । িভূ কলকাতা গেছে । বাড়তে হাসনু, আমি আর বউমা । 
সারা রাত বুঝলে, চাঁৎকার, বোমার শব্দ, ধুয়া দেখা যাচ্ছে । 'মাত্তরের ছেলে- 
দুটো সন্ধেবেলা এসে বলে গেছে দরজা খুলবেন না, যাই হোক না কেন। 
মাঝরাতে এ গেটের কাছে অনেকগুলো লোক, দরজা খুলুন খুলুন করাঁছল 
__ওরাই, বুঝলে তো, কেউ জল চায়, একজনের চোট লেগেছে, একজন পহড়ে 
গেছে" 

খুললেন গেট ? 

পাগল, খুঁল কখনও ! বিধবা মানুষ, একা থাঁক, তাও তো কন্তা 
বাড়াটা করে গেছেন তাই***তা ডান যাবার পর থেকে সময় আর কাটে না 
বাবা । মেয়েটার মুখের দিকে তাকালে বুক ধড়ফড় করে*"" 

মুখ না ফারয়েও আনমেষ বুঝতে পেরোছিল, মশারী টাঙানো শেষ করে 
হাসন নিঃশব্দে চলে গেল ঘর ছেড়ে । 

মেয়েটার রং ময়লা, চুল এলো খোঁপা বেধে রাখে সব সময়, চাপা নাক, বড় 
বড় চোখে ব্যথার ছাপ, মুখখানা গোলগাল, শরীরটা কৃশ ৷ ?শলচরে বিয়ে 
হয়োছিল, বেশ ভালোমত দেওয়া-থেওয়া করে। বিয়ের জল গায়ে না পড়তেই 
মেয়ে ফেরৎ, জানসপন্রপুলো এখনও আসতে পারোন । 

হাসন; আছে এ বাড়ীতে সেই থেকে । কতাঁদন থাকবে ? হয়তো আমৃত্যু । 
ওর দাদ জ্যোৎস্না এসোঁছল ছোটভায়ের বিয়েতে । 'বয়ে-থা মিটে গেছে । 


১৯৭ 
চন্দনরেখা--৭ 


দিদি বাই াই করছে । জ্যোৎস্নার পর হাসন, হাসনুর পর ভূ । বিভুর 
বউ এখন এক-গা গয়না পরে নতুন শাড়ীর খস খস্‌ শব্দ তুলে এ-ঘর ও-ঘর 
করে বেড়াচ্ছে । আড়াই মাস বয়ে হয়েছে । তবু বউ এখনও নতুন । পাওয়া 
শাড়ীগুলো উল্টেপাজ্টে রোজ পরছে বোঝা যায়। একাঁদন আঁনমেষ ঘরে 
ঢুকতেই হুড়মুড় করে পালিয়ে গেল বউ । দেরাজে কি যেন খঃজাছল। 
খ$জবেই । ঘরটা ওদের দুজনের । তবে এ ঘরের বিছানা তোলে হাসন, 
আঁনমেষ যখন উঠে মুখ ধুতে যায় । মশারী পাট করে আলমারীতে রাখে । 
টোবল, চেয়ার ঝাড়ে মোছে। আঁনমেষের শুকনো জামাকাপড় এনে ভাঁজ 
করে রাখে । এই কাজকর্মের মধ্যে আনমেষের আনা বইগুলি নেড়েচেড়ে 
দেখে । প্রথমাঁদন সন্ধেবেলা মায়ের সঙ্গে কাবতাপাঠ শুনতেও গোছল । 

এসব করতে হবে না আপনাকে, আনমেষ হাসনুকে বলেছে, দিবছানা আম 
তুলে রাখব, জামাকাপড়ও এনে রাখব*** 

হাসনু নিঃশব্দে চায়ের কাপ তুলে নিয়ে গেছে । জ্যোৎস্না তার ভাঙা 
খোঁপা হাতে জড়িয়ে নিয়ে বলেছে, করুক না। ওর মন লাগছে তো। কেউ 
তো এমন আসে না এখানে । তাহাড়া, আপাঁন আমাদের আতাথ । লেখেন 
টেখেন । আমাদের মধ্যে হাসনুই একট. যা বইটই পড়ে, লাইব্রেরী থেকে বই 
আনে । 

তাই নাক, কি ভালো লাগে তোমার হাসনু ? 

আঁনমেব ওকে দেখতে পাঁচ্ছল না, কিন্তু ঘরের মেঝেতে হাসনূর ছায়া 
লোটাঁচ্ছল ৷ 

দরজায় নখ ঘষার মৃদু শব্দের পর, কাঁবতা, দুম করে বলে পালিয়ে 
গোছল মেয়েটা । 

যে মেয়ে বাপ-মার ঘরে জন্মায়, বড় হয়, হাসে-খেলে, সে যখন এইরকম 
অসময়ে ফরে আসে, তখন কোনো ছুই আর আগের মতন করে পায় না। 
জ্যোৎস্না বলাছল, দাঙ্গার পর থেকেই মা কেমন যেন চিন্তায় শকয়ে 
যাচ্ছেন । বাবা নেই, বিভূ বাইরে বাইরে থাকেন, ঘরে অত বড় মেয়ে-**এইরকম 
এলাকায় থাকা***এখানে তো কোনো রকম বাধানিষেধ নেই, নদী পোরয়ে 
হরদম ওপার থেকে রোজ লোক আসছে, টাউনের বাঁণ্ততে থেকে যাচ্ছে, নদশর 
চরগুলো তো বেদখল হয়ে গেল**" 

আঁনমেষ চিন্তার ভিতর থেকে মুখ তুলে দেখে নৌকো বাঁয়ে ঘুরে যাচ্ছে। 
এখানে নদী অত চওড়া নয়। ডান দিকের পাড়ে সার সার খেয়া নৌকো 
বাঁধা, রমজান মিয়ার ভাষায়__ জাহাজ | বালুচরে কারা যেন তাস বুনেছে। 
গাঢ় হলুদ ফুলে ছয়লাপ হয়ে আছে বালুচর | স্লেট-রঙা জলে সেই হলুদের 
ছায়া দোলে, ভাঙে, চুরমার হয়। সূর্য মাথার ওপরে, তবে এ রোদ কম্ট দেয় 
না, গাড় শীত এদেশে । কাল সন্ধেবেলা মণ্ডপের তেরপল ছিঞ্ড়ে শীত 
ঢুকছিল । হাসনুর মা, জ্যোৎস্না এদের কথা ও আশঙ্কার সঙ্গে রমজানের 
“আমনারা তো ভয় পান”-কে মেলাবার চেম্টা করাছল আনমেষ । কত দূর 


৪৮ 


নিয়ে এল এই লোকটা ওকে? ওাঁদকের তটরেখা এখন একেবারে ঝাপসা। 
ইচ্ছে করলে ফেরা যাবে না, যতক্ষণ না রমজান নিজে থেকে ওকে ফেরায়। 
লোকটা আড়াই ঘণ্টা, একশো টাকা এই সব 1হসেবাঁকতেব ভুলে প্রাণপণে 
ম্রোতের বপরীতে নৌকো বাইছে__ বুকটা, বুকের খাঁচাটা উঠছে পড়ছে । 

একসময় ওদকের পাড়ে নৌকো লাগিয়ে ডাকল, আসেন। বিল্লুও 
নামল । কী ীবশাল এই নদ। নদীর ম্রোতধারার বুকেই পাশাপাশি এই 
রকম দু-তিনটে চর, তবে এটা তো বিরাট এক দ্বীপ । আগে আগে রমজান 
যাচ্ছে, পেছনে বিল, সবশেষে আঁনমেষ। একটু দূরে গিয়ে কোথায় হারিয়ে 
গেল বিল্লটা । ওদের পায়ে পায়ে এখন জড়াচ্ছে রাশি রাশ খড়কুটো, সবে 
ধান কাটা সারা হয়ে গোলা ভরা হয়েছে । ম-ম করছে নতুন খড়ের গন্ধ। 

বাঁয়ে ঘস- ঘস: হাঁক্সং মল চলেছে । 

এটাও তোমার ? 

খালার ছেলের । 

খোলা আকাশের নীচে কেবল হাওয়া, ধান, ধানের গন্ধ। 

রমজান এগোচ্ছে । 

ধূ ধ্‌ ফাঁকা । ক"ঘর থাকে এখানে, কে জানে? 

এক জায়গায় ছ-সাতটা খোড়ো চালের কুঁড়েঘর প্রায় গোল করে ঘরে 
রেখেছে উঠোনকে । একরাশ ন্যাংটো ছেলেমেয়ে জটলা করছে । 

বউয়েয়া উবু হয়ে বসে গঞ্গগুজব করাছিল। 

ওদের আসতে দেখে সবাই ছত্রখান। 

ও মা, এই বাবু আমার জাহাজে আসতেছিলেন, নিয়্যা আসলাম, 
কলকাতার লোক । 

বৃড়ীর মুখ দন্তহীন, ভাঙা চশমা, হাজাবাঁজ মুখ । কী ভাবে পদন 
করবে ভেবে পায় না। 

ও বড় ভাবী-_ও ছোট ভাবী আইস, আইস-_-লঙ্জা কণসের ! 

কেউ আসে না। রমজান ডাকে । ঘরের ঘপি অন্ধকারের ডেতর মুখে 
কাপড় গোঁজা খিল খিল হাসি। 

ঘরদোয়ারের পেছনে, ঢালু বালির ওপর, বাপরে কা কাণন্ডই করেছে 
রমজানংরা । মাসকলাই ফলেছিল এত এখানে ! 

ফসল কাটা মাঠ ছটফটাচ্ছে । চাল বেয়ে উচেছে লাউয়ের, শিমের লতা । 

রমজান আঁনমেষকে ছাড়ে না। ঢেকঘরের ভেতরে নিয়ে গিয়ে শহুরে 
মানুষকে ঢেঁক দেখায় । দুই ভাবী আমনা, সাঁজদা ও নিজের বোন শকণলার 
সঙ্গে আলাপ কারয়া দেয় । 

এই ক'মাস যা আমাদের সময়, বুইঝলেন ! বর্ষার পানি এলে এই চর 
ডুববে, ঘরের মাচানতক ডুইব্যা বিব পানির তলায় । আমরা সবাই ওই দুই 
খ্যান জাহাজ ভইর্যা ওই ওপারে**'টাউনে। সে বড় কম্ট--তিন চার মাস 


একটানা । 


৬১৪১ 


গরম গরম সেদ্ধ মুরগীর ডিম আসে সাত-আটটা। কাঁসার গ্লাসে চা, 
জল । 

ণনন্‌, আর কী 'দবা আপনারে, গরীবের ঘর । 

আঁনমেষের মুখের মধ্যে দেশী ডিমের কুসুম গলছে । এই সময় রমজানকে 
জিজ্ঞেস করা যায় কি, এতই যাঁদ কম্ট চর ছেড়ে দিয়ে টাউনে গিয়ে থাকো না 
কেন, বরাবরের মত ? আঁনমেষ জানে, বছরে আটমাস রমজানরা এই বালুচর 
আঁকড়ে পড়েই থাকবে । পাঁলমাটি ঝলকে ঝলকে ওদের মুঠো ভরে ফসল 
দেবে । আরও দু-একটা জাহাজ িনবে ওরা, পুজোর মরসমে টাউন বদ হয়ে 
গেলে ঘরগল সারাবে নিজেরাই ৷ এতখান ফাঁকা জমি--সব, সব ওদের । 
আবার কবে ওপার থেকে মানুষজন আসবে, পাঁলিমাটির জন্য যুদ্ধ আরম্ভ 
হবে, ততাঁদন পর্যন্ত ঝকঝকে নল এই শীতের আকাশের ননচে ধোঁওয়া গন্ধ 
বিকেল গাঢ় হোক । 

নৌকোর ঘাট পর্যন্ত কঁচকাচাগুলো কোলাহল করতে করতে ওদের 
সঙ্গেই আসে, কথা শোনে না। 

ওপারে খন পৌছোলো, সন্ধের মুখে একে একে বাতি জহলে উঠেছে 
ঘাটের নৌকোয়, দোকানে, শহরের বাড়িঘরে । আজ রমজানের অন্য ট্রপ 
হয়নি । ঘরে গিয়ে ফিরতেই ঘণ্টা দেড়েক সময় গেছে । তারপর আবার 
অতখাঁন জল পোঁরয়ে ফেরা । তবু ও হাসম:খেই বিদায় নেয় আনমেষের 
কাছ থেকে । ঘাটের কাদা ভাঙ্‌তে ভাঙ্তেই আনিমেষকে চেপে ধরে সারাদিনের 
ক্ষিদে ও শীত । 

মণ্ডপে গরম চা চলছে, তাঁর সঙ্গে খান্তা কচুর । 

চিত্তরা হৈ হৈ করে আঁনমেষকে ডাকে । কোথার ছি বল: তো, দুপুর 
থেকে আমরা খখংজে খংজে***ওভাবে কেউ যায় ? 

অচেনা জায়গা, এখানে রায়ট হয়ে গেছে কশদন আগে ! 

চিত্তদা বেশ চটেছে বোঝা যাচ্ছে আনমেষ-এর ওপর । আজ দুপুরে 
খাওয়া-দাওয়ার পর চিত্তদা ওকে দিল্লির রাজেন চতুবেদীর কাছে নিয়ে যাবে 
বলেছিল । চিত্তদা ভালবাসে আঁনমেষকে-_অনেকাঁদন তো লিখাঁছস, এখনো 
যাঁদ কিছু না হয়, আর কবে হবে? চতুবেদীর ট্রাস্ট 'দ্বিভাঁষক অনুবাদের 
জন্য বই 1সলেন্ত করে, ওর চোখে লেগে গেলে এঁদকে দিল্লি, ওঁদকে সাউথ, 
দুদকে ছড়াতে পারবি । দেখি, বই আছে তো সঙ্গে ? তিনটে বই সঙ্গে ছিল। 
আনমেষের নতুন কবিতা সঙ্কলন, অগ্রাণের স্বর ৷ একটা দিয়েছে ধুবদাকে, 
একটা হায়দরাবাদের প্রবীণ ডেলিগেট শরৎ দেবকে, কাবতা ভালোবাসেন 
বলোছিলেন । একটা মান্র বই। ওটা চতুরেদীকে দিবি, এর নাম লেখ 
ইংরোজতে, দুরু ওখানে না, উৎসর্গ-পজ্ঠোয়। এখনও বই দিতেই শিখাল না। 

যখন যাবো, তখন নাম লিখলেই হবে তো? 

আঁনিমেষ বইটা কাঁধের ঝোলায় ভরে নিয়েছিল গতকাল । ঘরভতি 
অনুরাগী-রাগিনীদের মধ্যে রামের নেশায় গাঢ় চতুবেনদীর পায়ের কাছেই 


৯১০০ 


একট: জায়গা ছিল কেবল । ওখানে বসা যায় নাক? মুখের কাছে গ্লাস 
ধরেছিল একজন অনাঁতিতরুণ কাঁব। এত ভাঁড় যে চিত্তদা গুর কানের কাছে 
মুখ নিয়ে বলেছিলেন, আমরা কাল আসবো । দস ইজ অনিমেষ রায়, এ 
ভোর ব্রাইট বেঙ্গল পোয়েট। 

কাল রা'ত্রবেলা শোবার সময় ঘরে ঢুকে দেখোঁছল, মশারশ টানটান, 
টিপয়ে খাবার জল ঢাকা দেওয়া । যথারশীতি কাচা জামাকাপড় টোবলে ভাঁজ- 
করা । হাসনু সব কছ সুন্দরভাবে সাঁজয়ে দিয়ে চলে গেছে । 

জামাকাপড় বদলানোর জন্য দরজা বন্ধ করার একটু আগে জ্যোৎস্না 
এল । 

মা শুয়ে পড়েছেন। আজকে আপনাদের খাওয়ায় কি ছিল? ইলিশ 
দেয়ান ? ব্রহ্মপুত্রের ইলিশ খুব ভালো । ওকে কি রমজানের বাড়ী যাওয়ার 
কথা বলবে আজ আনমেষ 2? আবও দু"একটা কথার পর জ্যোৎস্না উঠল । 

আপাঁন শংয়ে পড়ুন । পরশু ভোরে যাবেন তো। রাত হ'ল । দরজা 
দিয়ে বেরোতে গিয়েও ফিরে চলে এসোছিল আবার । তখনই আঁনমেষ বুঝোঁছল 
হাসন ধারে-কাছেই আছে, যায়ান। জ্যোৎস্না একটু লজ্জা-লজ্জা হেসে 
বলল । 

এই আমার বোন ?ি বলে দেখুন ! 

কি বলছে হাসুন ? 

ও আপনার কাঁবতার বই চায় একটা । দেবেন ? কাল রাতেও অনিমেষ 
গ্রানত পরের দিন দপরে খাওয়া-দাওয়ার পর চতুবেদীঞীর কাছে নয়ে যাবে 
[চত্দা। কাজেই অপ্রাতিভ। আচ্ছা কলকাতায় গিয়ে পাঠিয়ে দেব, এখন তো 
নেই আর সঙ্গে । একটু হেসে চলে গোছল হাস্নুহানা ওর দিদির সঙ্গে। 

আজ আনমেষ সকাল থেকেই (িপথগামন হয়েছে । গৌরীপুর যাবার জন্য 
গাড়ীতে জায়গা পায়নি । দুপুরে একসঙ্গে খায়ান। যখন চতৃবেদীর পায়ের 
কাছে বসে তাঁকে নিজের বই উপহার দেবার কথা, তখন আধ্নমেষ রমজান 
ময়াঁর ঘরে বসে মুরগীর আণ্ডা খাচ্ছে । জ্যোৎস্নার মা, জ্যোৎস্না শুনলেই 
চম্‌কাবে | চত্দা-সুমিতাদও কেমন নাকে কাপড় দেবার মতন চোখ 
করেছিল । 

জিনিসপত্র দ্রুত হাতে গুছিয়ে নাঁচ্ছিল আনমেষ । 

সমাপন উৎসবেই বোধহয় গোছল এ-বাড়ীর সবাই, এখনো ফেরেনি । 
কাজের মেয়োট দরজা খুলে দিয়ে ফিরে গেছে । 

সকাল সাড়ে আটটায় বাস আসবে । একেবারে রোড থাকতে হবে । স্টেশন 
বণ্টা তিনেকের রান্তা । সবাইকে টাউনে তুলে নিতে ?নতে যাওয়া । 

বালিশে মাথা রেখে আঁনমেষ ভাবল, অরাঁক্ষতা নার ও আগ্রাসন এই 
নয়ে একেবারে পণ্যবর্মন থেকে নিয়ে আজ পর্যন্ত লম্বা একটা লেখা দাঁড় 
করানো যায়। আগে রাজার সৈন্য যেত। লুণ্ঠনের উপজীব্য ছিল ধনসম্পদ 
ও নারী । বদেশী সৈন্যর হাত থেকে ঘরের পর্দা বাঁচানোর নামে নারী পায়ে 


১০১ 


শেকল পরেছে, মাথায় ঘোমটা, বোরখা ইত্যাঁদ, তবু শেষরক্ষা হয়ানি । 
স্বাধীনতার পর এসেছে রাজনৈতিক বিবাদ, সংঘর্ষ, দাঙ্গা, প্যারামালটারি 
ফোর্স শেষ চ্যাপ্টারে থাকবে হাসনুর মা। হাসন আর রমজানে বন্ধন 
কারয়ে দেবে কাল এক সময় । রাঁখ-ফাঁকি বাঁধা হবে হাতে । বাইরে আগুন, 
বোমার শব্দ, চীৎকার, কেউ জল চাইছে, দ্রুত পায়ে নিচু শব্দে এসে 
কোলাপিবল--এর ফাঁক দিয়ে গ্লাস গলিয়ে দচ্ছে হাসনু""" 


কপালে রোদ । ভোর । সেই সঙ্গে দরজায় মৃদদ হাতের টোকা । ইস্‌, 
সাতটা বেজে গেছে ! ভাঁগ্যস গতকাল সব কিছ গুঁছয়ে রেখোছল আঁনমেষ ! 

হাসনুর মা, জ্যোৎস্না, নতুন বউ বার বার উীীক 'দয়ে যাচ্ছে। হাসনংর 
মা অনেকক্ষণ বসলেন, গম্প করলেন । 

হাসন আসছে না । আটটা কুঁড়। বাস আসার সময়ে সেই আশঙ্কা, যা 
আনিমেষের মনের মধ্যে লুকিয়ে ছিল, ভয়ে পাঁরণত হয় । চুল চ্ড়ো করে বাঁধা, 
গাছকোমর হাসনু রান্নাঘর থেকে বোঁরয়ে আত“কণ্ঠে বলে ওঠে, আপাঁন না 
খেয়ে যাবেন না। আম লুচি ভেজোছ। শরৎ-সাহত্যে বাঙালী রমণী । 
গরম লুণ্চ দিয়ে ততোধক গরম বেগৃনভাজাকে জাঁড়য়ে ধরে মুখে গোঁজা । 
1তনটে খেয়ে হাঁফাচ্ছে, এমন সময় নীচে ক্লীনারের চীৎকার, বাসের হর্ন-_কই 
আসন ! বড় বাস, গাঁলতে ঢুকবে না, মোড়ে যেতে হবে সটকেস নিয়ে । খবর 
কাগজ পাঁলাঁথনে দ্রুত বাঁক লুঁচগুলোকে জাঁড়য়ে হাসন? নীচে নেমে যায় । 

প্রাচীন বন্দর-শহরখানর কাছ থেকে দায় নেবার মুহ্‌ৃতণট এইরকম 
ছিল আনমেষ রায়ের £ 

আনমেষ আগে হাঁটছে, হাতে সুটকেস, কাঁধে ঝোলা । 

পেছনে লুচির প্যাকেট ধরে হাসনু। 

বাসে ওঠার আগের মুহূর্তে ক্লীনার সুউকেসটা ছোঁ মেরে নিয়ে গেল, 
ওপরে রাখবে। 

ড্রাইভারকে আত্মস্থ ডান হাত তুলে থামতে বলে আঁনমেষ । তারপর ঝোলা 
থেকে এগ্াণের স্বর” বার করে উৎসর্গের পাতায় “হাসনূহানা দেবীকে, 
আতিথ্যসুন্দর দিনগুলিতে* লিখে বইটা তুলে দেয় হাসনুকে । হাতে ল:চির 
তেল, তাই হাসনু দ্রুত গাছকোমর খুলে আঁচলে বইটা নেয়, যেন শিউলি 
অথবা গন্ধরাজ নিচ্ছে একরাশ । আঁনমেষের সারা শরীরে শিহরণ বয়ে যায়। 
বৃঝিবা সে নিজেই একটি ফুলে ভরা গাছ। 

ঠোঁট দুটি না খুলেই, কেবল চোখ দুটি 'দিয়ে হাসনু বলে, আবার 
আসবেন । 


এরপর সাকি্ট হাউসে বাকিদের নিতে গেলে চিত্তদা স্নেহমাখা স্থরে ওকে 
ডাকেন, আয়, গাড়োল ! 


১০২ 


স্নলীকক সভৃছিক্স 


ল্যাণ্ডিং-এ সামান্য দম নিয়ে সীড়টা ধীরে ধীরে দোতলায় উঠে গেছে। 
কাঠের সশড়, তীব্র লাল কার্পেটে মোড়া । পুরনো, পাীলশ করা মেহগাঁনর 
রেলিং। 

রাঙা ও খয়োরর সেই গসম্ফানর শেষে ছেলেটা গসড়র মৃখেই দাঁড়িয়ে | 
দু” হাত পকেটে । প্রস্তৃত হয়ে যেন রাঁক্সণশর জন্যই অপেক্ষা করাছল । 

কাঠ ও পাথরে তোর এই প্রাচীন বাঁড়টার নীচের তলায় ডাইানং হল, 
বালিয়ার্ড রুম, লাউগ্জ । এ ছাড়া চারটে বড় ঘর । চোদ্দজন ট্রোনর আটজনই 
নঈচে থাকে, দোতলায় রাঁকঝ্ণন, অমৃতা কাপুর, প্রিয়া দেশমুখ আর তিনটে 
ছেলে । এই মুহূর্তে রাণী ছাড়া অন্য সবাই নীচে বসে গ্পগৃজব করছে, 
[কিংবা গান শুনছে । ছেলেটা, মানে, নওরোজ কি রুক্সিণীর পায়ের শব্দও 
চেনে ? 

একটু বে*কে দাঁড়িয়ে, একটা হাত পকেট থেকে দ্রুত বার করে রূকুর রান্তা 
আটকে 'দয়েছে। 

আজ ভীষণ শীত, না? 

রুক্সিণ গম্ভীরভাবে বলল, পথ ছাড়ো । 

না, ছাড়ব না। আমার ঠোঁট দুটো জমে যাচ্ছে । একট গরম করে দেবে ? 

মাথাটা একটু কি টলে গোছল রুকুর ! অপমানে গাল দুটো ফেটে আগুন 
বেরোচ্ছে । ওর ডান হাতটা চকিতে উঠে এসোছল, কিন্তু লক্ষ্যস্থানে পৌছবার 
আগেই বজ্রমুঠিতে ধরা পড়ে ছটফট করছে বাইশ বছরের ক্ষীণ মাঁণবন্ধ। 

হাত ছাড়ো ! 

চেচায়ান, তাহলে অন্যরা ছুটে আসবে | মৃদু কণ্ঠেই বলেছে রুক্জিণী । 

নওরোজের পদ্মপলাশ চোখে অবুঝ রাগ, গগ্রীসয়ান নাকে, চিবুকের 
ভাস্কর্ষে গা আঁভমান। লাহুল উপত্যকার ছেলে রুকুর হাতটা যেন একরকম 
ছংড়েই ছেড়ে দিল। 

আমাকে বিশাস করতে পার না, না! বুঝতে পার না, তোমাকে ভালবেসে 
ফেলোছি বলেই আম এত হেজ্পলেস ! কেমন মেয়ে তুমি? 

রুকুর কানে নিজের হৃৎশব্দ ?কছুতেই মেলাচ্ছে না। ও আর পিছন ফিরে 
তাকায়ান। আহত মাঁণবদ্ধ অন্য হাতে চেপে ধরে আছে । নিজের ঘরে ঢুকে 
বাঁলশে মুখ গজে তবে স্বন্তি। 


আসার পরের দিন থেকেই ছেলেটা ভীষণ জবালাচ্ছে রুকুকে ৷ দৃরে বসে 
একদ্‌ম্টে ওর মুখের দিকে তাঁকয়ে থাকা, ম্যাল-এর পথে নিঃশব্দে পিছনে 


১০৩ 


আসা, ডিনারের পর সবাই ওপরে চলে গেলে 'বষপ্ন মুখে একা একা গান 
শোনা | মাঝে মাঝে কোটের পকেটে চিরকুট রেখে দেবে । 

বাইরের র্যাকে কোট, টুপি সব রেখে লাউঞ্জে ঢোকে ওরা । সেই ফাঁকে 
চিরকুট রেখে যায় বোধহয় । একমাস হতে চলল, দিনে-রাতে সব সময় এই 
একই আকৃতি, কথায় অথবা চুপ করে থাকায়__ভীষণ, ভীষণ ভালবেসে 
ফেলোছি তোমাকে রুক্মিণী, আর থাকতে পারাঁছ না, প্লিজ ব*বাস করো । কী 
যে করে রুকু! ওকে সব সময় ঘিরে আছে আনন্দ মেশা এক ভয়ের শিহরণ, 
ওর দিকে আগুন এগিয়ে আসছে, কিন্তু পালাতে ইচ্ছে করছে না রাঁক্সণীর । 

আজ রাঁববারের শান্ত সকালে অথৈ নীলমার মধ্যে বসে চারাঁদন 
আগেকার সন্ধেটা হঠাং মনে পড়ে গেছে রুকুর। সোঁদন িকেলেই আবার 
প্রথম তুষারপাত দেখোঁছল ও । আর সন্ধেরাতে আগুনে ছ্যাঁকা খেয়েছিল । 
সব মিলিয়ে দিনটা কখনও হারাবে না ওর জীবন থেকে । 

গাঢ় সবুজ মখমলের শেষে পাথর ও কাঠে তোর এই পুরনো বাড়ীটা দীর্ঘ 
কাঁচে ঘেরা, তারই লাউঞ্জে বসে সৌদন রূকুরা ক্লাস করাছিল । এমাঁনতে ওদের 
ক্লাস হয় এই কম্পাউণ্ড থেকে বোরয়ে অন্য একটা দোতলা বাড়তে । সোৌদন 
অধ্যাপকের নিজেরই আলসোমি লাগাঁছল । লাণ-এর পর কেউ বেরোয়ান। 
ইলেকাট্রক হিটার লাগানো হয়েছে দুটো । তা ছাড়া ফায়ার প্লেস-এ গনগন 
করে জবলছে কাঠের আগুন । ওরা জনা পনেরো, প্রফেসর গণুপ্তাকে নিয়ে । 
শীত বাড়ছে। রন্তের মধ্যে ষেন অনুভব করা যাচ্ছিল তাপমানের দ্রুত 
অবতরণ । 

হঠাৎ কাঁধে টোকা দিল কেউ । রূুকুর পাশে বসা চণ্ডগগড়ের ছেলে 
সুখদনীপ উচ্ছ্বাসত হয়ে বলে উঠেছিল, দ্যাখো দ্যাখো, বরফ পড়ছে । 

হ্যাঁ, সেই তো প্রথম বরফ দেখোছল কলকাতার মেয়ে, মুগ্ধ হয়ে। 
দেখেছিল, মাঁলন মেঘ-মেঘ আকাশের গভীর থেকে মোৎ্জার্টের সঙ্গীতের 
অমোঘ ব্যঞ্জনার মতন নেমে আসছে অসংখ্য স্নো-্রেক্স । দেখতে দেখতে লনের 
গাঢ় সবুজ ঢেকে গেল পাতলা বরফে । প্রাচীন বাঁড়টার কাঁধে ও কার্নিসে 
বরফের চ্ণ, পাহাড় দেবদারুর ডানার ঝালরে সাদা বরফ । ক্লাস শেষ হলে 
ণকছূক্ষণ লাউঞ্জে বসে গান শোনা গেল। অমৃতা আর সুখদীপ ওইটুকু 
জায়গাতেই ভাংড়া নেচে দেখাবে । ওদেরও টানছে । মিজোরামের লালসাওয়া 
একটা রাঁঙন ছাতা 'নয়ে দু পাক নেচে নিল । টানা ডাইীনং টোৌবলে সকলে 
মিলে একসঙ্গে গরম সপে চুমুক | চিয়ার্স! টু দ্য ইয়ার্স ফাস্ট স্নো-ফল। 

এই কলরবের মধ্যেই রুকু বুঝতে পেরোছিল, একজন ওই টোৌবলে নেই-_ 
নওরোজ | 

কোনওমতে গডনার সেরে ঘরের দিকে দৌড়েছিল র্াক্সণী । শের ওপর 
শীতাত খোলা চুল। 

দন্তানা পরার অভ্যেস হচ্ছে না কিছুতেই, বার বার হাতে হাত ঘষতে হয় 
উষ্ণতা ফিরিয়ে আনতে ৷ দোতলার 'িশীড়র মুখে পৌছতেই সেই আগুনের 


৯১০৪ 


ফুলাঁক ওর পথ আটকেছিল নওরোজ । 

কব্জিটা হঠাৎ একটু ব্যথা-ব্যথা করে উঠল আবার । কোলের ওপর 
স্কেচবৃক আর প্যাস্টেল রং নিয়ে রুকু এখন আনমনে খেলা করছে । ভাবছে, 
খুব আলতো করেই ভাবছে, কী করে দর পাহাড়ের ঢাল ও বাঁকগঁলকে 
ধরবে, সামনের ওই গোলাপি চোঁর-মঞ্জরীগীলকে । গভীর নীল আকাশ ওর 
ওপর স্নেহভরে ঝধখকে আছে, সাঁত্যই যেন নখলিমার ঘ্রাণ রুক্মিণীর শরীরে। 
দূরের বরফঢাকা চ:ড়াগুটীল থেকেই যেন শীতের ঝাপট হঠাৎ ওকে কাঁপয়ে 
দিয়ে যাচ্ছিল । সাড়ে দশটা নাগাদ নীল রঙের খুদে ট্রেনটা তীক্ষ! শিস "দিয়ে 
পাইন বনের পর্দার পিছনে দেখা দিল । তার ইঞ্জিনের ধোঁয়া জড়াতে চাইছে 
দেবদারুর 1শখরে । পারল না। ধোঁয়াগাঁল ভেঙেচুরে ছত্রভঙ্গ হয়ে গেল 
শেষপযন্ত। 

ট্রেনটার দিকে তাকালেই রুকর মনে পড়ে যায় সেই দিনটার কথা, একমাস 
আগে যোঁদন প্রথম ও দুদিনের সফর পৌঁরয়ে এখানকার ছোট্ট পাহাড় 
স্টেশনটায় এসে নেমোছিল । ভাবলেই একরাশ মন-কেমন-করা ওকে কলকাতার 
[দিকে টানে । আর সেই সঙ্গে শতভাবের মতন একটুখানি ভয়-মেশা আনন্দ 
রুক্সিণীর বুকের মধ্যে শিরাঁশারয়ে ওঠে । ওই এসে পৌীছনোর দিনটা কি 
ওর জীবনকে বদলে দেবে একেবারে ? 

এখন শীতের হাওয়া নিজের ভাষায় আদর করে যাচ্ছে রুকুকে । চাঁপা- 
গৌর ওর দুই গালে এই কশদনেই গোলাপ আভা ফুটেছে । ঠোঁট দুটি আরও 
রান্তুম হয়ে উঠেছে । পুলোভারের ওপর শালেও শীত মানাচ্ছে না, আঙূল- 
গুল ঠাণ্ডা হয়ে যাচ্ছে । তসরের স্কাফের নীচে ছটফট করে কপালে এসে 
পড়ছে দুরন্ত চুল। নাঃ, কিচু হচ্ছে না ছবিটা! রুকুর চোখে জল এসে 
পড়ছে । পাহাড়টা কেমন যেন জরদ্গর হয়ে গেছে ওর স্কেচবুকে» আকাশের 
নীীলটা রন্তহীন, ফ্যাকাসে, চোরগুলো কথা বলছে না। এই যে দৃশ্যপট ওকে 
মায়াভরে ঘরে আছে, সে-ই কেমন ফাঁকি ?দয়ে পাঁলরে ষান্ছ । সবাই কি 
ছাঁব আঁকতে পারে নাক ? 

রাগ করে রুকু উঠে পড়ল। 

পায়ের নঈচে একরাশ হলুদ পাতা মাঁড়য়ে দ্রুত ওপরে উঠতে লাগল 
রাঁঝ্সণী। পাহাড়ের ঢাল কেটে বানানো পাথুরে সাঁড়। গত পরশও এই 
[সশাড়তে পাতলা বরফ জমেছিল, পা িপে টিপে উঠেছে । যাতে হঠাৎ পা 
না পছলে যায় । সিশড় ফুরোলে গাঢ় সবুজ মখমলের মতন লন । প্রাচীন 
এই অরণ্য-পর্বত-ঘেরা বাড়তে স্বাধীনতার আগে থাকতেন ভাইসরয়ের 
ফাইনান্স-মেম্বার ৷ নানা রাজ্য থেকে এসে ওরা চোদ্দজন একবছর ট্রোনং 
নেবে এখানে, ভবিষ্যৎ ?নয়ে কত জল্পনা কত ভাবনা । কোথা থেকে কীষে 
হয়ে গেল । আসতে না আসতেই পাহাড় হাওয়ার ঝাপট । 


আজ ভোর থেকেই রুকুর মনটা নানা কারণে ভার । বাড়তে ট্রাংকল 


১০৫ 


করেছিল । মায়ের জবর | মা তখনও ঘুম থেকে ওঠোঁন। 

রাঙাদি ফোন ধরেছিল । আর দীপু খাঁনকটা বকবক করেছে, রুকুর ছোট 
ভাই । 

কিন্তু কথা বলতে বলতেই আচমকা লাইনটা কেটে গেছে, মন ভরোন। 

নওরোজের জন্যও রাাঝ্মণীর মনের একটা পাশ বিষন্ন, আর্ত হয়ে আছে। 
কত চেষ্টা করছে, কই রাগ তো করতে পারছে না! ছেলেটা গত [তিনাঁদন 
কোথায় লীকয়ে বেড়াচ্ছে, কী করছে রুকু জানে না। পুলোভারের দুই 
পকেটে রং, হাতে স্কেচবুক রুকু কাঁচের দরজা ঠেলে ভতরে ঢুকল । লাউগ্রটা 
এখন কেমন সুন্দর উষ্ণ, ফায়ারপ্লেসটা ভোর থেকে জবলছে বলে । একটা 
সোফায় লম্বা হয়ে শুয়ে তামিলনাড়ুর বালকৃষ্ণণ শুভলক্ষমী শুনছে চোখ 
বন্ধ করে । মাথার কাছে পাঁলাথন ব্যাগে নতুন বুট জুতো । জুতোজোড়া 
ক্ষয়ে যাবে এই ভয়ে কৃষ্ণণ চান্স পেলেই পা থেকে খুলে রাখে । রুকুর পায়ের 
শব্দে চোখ খুলে অল্প হাসল ছেলেটা । 


গত তিনাঁদন নওরোজ প্রায় অদৃশ্য, ডাইনিং হলেও দেখা যায় না। বেশ 
কয়েকটা ক্লাসও শিস করেছে । ভিতরে ভিতরে কীযে ওকে কম্ট 1দচ্ছে 
ক্মাগত। অথচ এই নওরোজই কেমন নিরীহ ভালমানুষের মতন স্টেশনে নিতে 
এসেছিল রাাক্মণীকে ৷ আযকাডোমর ডাইরেক্টর নিজেই নওরোজকে পাঠিয়ে- 
ছিলেন উদ্যোগী হয়ে । কারণ নওরোজ 'হমাচলেরই ছেলে । আগে এসে 
পৌঁচেছে। যে আগে এসেছে, সে অন্যদের রাসভ করবে, এটাই এখানকার 
প্রথা ৷ দুদিন সফরের শেষে রুকু তখন ক্লান্ত । চুলে, হাতে, মুখে কয়লার 
ধুলো । কলকাতা থেকে "দিল্লি । দিল্লি থেকে রাতের দ্রেনে কালকা। সেখান 
থেকে নীলরঙের খুদে ট্রেনটা র্াক্ণশকে ানয়ে এসেছে রোদজব্লা সবুজের 
মধ্যে দিয়ে, পাহাড়ের নানা বাঁক ঘুরে । অনেকগ্াল সংড়ঙ্গ পড়েছে পথে। 
সূড়ঙ্গের মধ্যে দিয়ে যাওয়ার সময় আরও গভীর হয়ে বেজে ওঠে চাকার 
ঝমঝম । শেষে উল্টোঁদকের মুখে হঠাৎ আলো এসে চোখ ধাঁধয়ে 1দয়ে 
যায়। সোঁদন স্টেশনে হ্যাপ্ডশেক করার জন্য শান্ত, নির্মল হাত বাঁড়য়ে 
[দয়োছল নওরোজ | ভাস্কযের মতন নখত ওর কপাল, নাক, ঠোঁট 'বাস্মত 
করোছল রাক্সণশীকে । নওরোজ কন্তু কোনও কথাই বলোনি আর । এক হাতে 
বড় সুটকেস আর অন্য হাতে রুকুর ব্যাগটা অনায়াসে তুলে নিয়ে আগে 
আগে হাঁটতে শুরু করোছল, কোনও আপাঁন্ত শোনৌন। দেবদারু ও 
পাইনের ছায়া-সুগন্ধে-আচ্ছন্ন পায়ে-চলা-পথ ধরে চলতে চলতে রুকু বুঝতে 
পেরোছিল, এই উপত্যকার পাঁখগুঁলর পরস্পরের মধ্যে কেমন সংন্দর 
বোঝাবুঁঝ । এ থামল তো ও ডেকে উঠল । 


ঘটনার সূত্রপাত দ্বিতীয় দিনে । তখনও আধকাংশ ট্রেন এসে পেশীছয়নি । 
প্রাচীন বাঁড়টা প্রায় ফাঁকা । রূকুর 'বরন্ত ও 'বিষপ্ন লাগাঁছল একা ঘরে বসে। 


৯০৬ 


সুনসান ছাতের রোদ্দুরে ঘুরে ও বালিয়ার্ড রুমে এসে বসোঁছল। সুখদীপ 
আর নওরোজ 'বালয়াড" খেলাছিল। একটু পরে সুখদীপ বোরয়ে গেল, কুক 
হাররামকে তিনকাপ কাফির কথা বলতে । নওরোজ একমনে একাই খেলে 
যাচ্ছে। ছাত থেকে নেমে আসা ঝুলন্ত আলোটা 'বালয়ার্ড টেবিলের সবুজ 
জমিকে স্বগর্শয় এক আভা দিয়েছে । “কিউষ্টা এই মুহূর্তে একটা সাদা বলকে 
ছংয়ে আছে, নওরোজের তীক্ষ] চোখ লাল বলের ওপর, হঠাৎ মদ গলায় 
টোবলের দিকে তাঁকয়ে ও বলে উঠল, পাগল করে দিয়েছ তুমি আমায় ! 

রুকু একেবারে চমকে উঠেছিল । 

ঘরে আর কেউ নেই তো? কাকে বলছে নওরোজ ? কে কাকে পাগল করে 
দয়েছে ? 

কিছু বুঝে ওঠার আগেই টোৌবলের কোণ ঘুরে ওর খুব কাছে চলে এসেছে 
নওরোজ । পাশের চেয়ারে বসে রুকুর মুখের ওপর বিশাল দুই চোখের 
বিষপ্নতা রেখে বলেছে, প্রামস ! মিথ্যে কথা বলাছ না। কী যে হয়েছে 
আমার! আম সাঁত্যই ভীষণ ভালবেসে ফেলোছি তোমাকে, রাঁক্সণশ--কী 
করে বোঝাব বল তো ? 

রুকু একেবারে আড়ম্ট । কোনও মতে, ক্ষমা চেয়ে 'বাঁলয়ার্ড রুম থেকে 
বোরয়ে আসতে পেরেছিল, এই মাত্র । সুখদীপের হাতে ট্রেতে কাঁফ। সুখদীপ 
চেঁচামেচি করে রুকুকে কাঁফ খাইয়োছিল। রুকুর বোধব্যাদ্ধ একেবারে ভোঁতা 
তখনও । এমন আকাঁস্মক, অকপট প্রেম নিবেদন, তাও আবার প্রায় অপাঁরাচিত 
এক ভিনদোৌশ ছেলের ম.খে-রুকুর কল্পনার একেবারে অতাঁত এ জানস। 
কলকাতায় ঘুঁনভাসট ক্যাম্পাসে ছেলেদের সঙ্গে মেলামিশি-সে ছিল 
একেবারে সহজ | কদাচিৎ কেউ বলেছে, বাঃ, আজ তোকে দারুণ দেখাচ্ছে রে! 
কিংবা ভিড় বাসে পিছন থেকে ঠেলেগুলে কেউ অপ্রত্যাশিত পাশে এসে বসল । 
বৌধায়ন একবার প্রচুর মদ খেয়ে রুকুর হাত ধরে ঘ্যানঘ্যান করে ক্ষমা 


চেয়োছল, এইট.ুকুই । 


একেবারে পিছনটায় ভলিবল কোর্ট, টৌনস কোর্ট ছোট একটা পাথরের 
[সঁড় সেখান থেকে আবার নীচের পাহাড়ে নেমে গেছে। বাঁড়, ঘাসের 
গালিচা, কোর্ট সবই পাহাড়ের নানা গর ও তলে তোর করা হয়েছে সুনিপুণ 
যত্বে। বোগেনভ?লয়ার এক গ্রাছ আঁবরের মতন অজম্র ফুল 'বাছয়ে দিয়েছে 
1নজের ছায়ায় । সেখানে একটা পাথরের ওপর চুপ করে বসে আছে নওরোজ । 
আড়বাঁশাট পাশে শোওয়ানো । গায়ের সাদা পশমের চাদর পাথরের ওপর 
উপচে পড়ে আছে । কোঁকড়া চুলে চিরুনি পড়েনি । গালে না-কামানো দাঁড়র 
কালচে আভা । মুখখানা যেন এই কাঁদনেই শীর্ণ হয়ে গেছে । 

ঈষং ফেরানো ওই মুখ, দীর্ঘ পথের ছায়ায় ব্যথাতুর দুট চোখ যেন 
সবলে রূকুর সমস্ত সংযম ভেঙে চুরমার করে দিল । 

নীচের ঝরা ফুল ও হলুদ পাতার ওপর হাঁটু গেড়ে বসে রাঁক্সিণী 


১০৭ 


ানীজেরই অজান্তে কখন মাথা রেখেছে নওরোজের কোলের ওপর । 

এই মুহূর্তে ওদের দুজনেরই চোখে জল, নওরোজের দুটি হাত রূকুর 
খোলা চুলে । 

কেন আমাকে কল্ট দচ্ছ, কেন এমন করছ তুমি নওরোজ ? 

আমার কষ্ট দেখতে পাচ্ছ না? এখানে কেন এলে রুকু ? সব যে ভেঙে- 
চুরে গেল ! 

ওর শেষ কথাটায় কী যেন ছিল । রুক্মিণী মুখ তুলল ।_-আর কাউকে 
ভাববাস না তো? দু" হাতের পাতায় রুকুর মুখ । নওরোজ 'জজ্ঞাসা 
করেছে। 

রুকু আস্তে আস্তে ঘাড় নাড়ল, নাঃ। 

এই মুহূর্তে ওর মনের কাছাকাণছ, আতআার একান্তে আর তো কেউ নেই 
একজন ছাড়া । 

তবুও প্রশ্নটা নওরোজকে ধফাঁরয়ে দিতে ইচ্ছে হল ওর । 

তুমি ভালবাসাঁন কাউকে ? 

নওরোজ ভ্তব্ধ। 

কথা বলো, নওরোজ ! 

নওরোজ গ্তব্ধ, কেবল চোখ দুটি অব্যন্ত উচ্চারণে আর্দর' হয়ে উঠেছে । 
পাইন অরণ্যের ঝাপসা সবুজের পিছনে দিগন্তলীন পাহাড়শ্রেণী । ওই দিকে 
তাঁকয়ে লাহুলের ষুবক ভাবছে নিজের শৈশব-কৈশোরের কথা । 

গদ্দী উপজাতি হাজার হাজার ভেড়ার পাল চরাতে 'নয়ে চলে যায় 
পবণতসানু থেকে তৃণভূমি । সারা শীত তারা ঘরছাড়া । সমতলের ঘন ঘাসের 
জাঁম, উত্তাপ তাদের ডাকে । নওরোজের বাপ-জ্যাঠারা কাঁধে নিত গুলিভরা 
বন্দুক, সঙ্গে লোমশ শিকার কুকুর । ওই দলে ছোট্ট এক দেবাঁশিশু একবার 
রাতের বেলা ঝুপাঁড়তে বই-্পড়তে বসোৌছল । জ্যাা এক থাস্পড় মেরে ফঃ 
দয়ে দীপ 'নাভয়ে দিয়োছিল, বলোছল, আর যাঁদ কখনও দেখ, মেরে হাড় 
ভেঙে দেব! 

গ্রীত্মে ঘরে ফিরে মায়ের কোলে মুখ রেখে কে*দেছিল বালক নওরোজ । 
ফধাপয়ে ফ:পয়ে কান্না ।_ মা, আমাকে তোমার কাছে রেখে দাও । আম 
স্কুলে পড়ব । 

রুগণ মার কথা ঠেলতে পারোনি নওরোজের রাগী বাপও । মার কাছে 
থাকবে, এই জন্য পরের বার ওকে ছেড়েই বেরিয়ে পড়ল ভেড়ার পাল ?নয়ে । 

জানুয়ারর এক বিকেলে, বরফ পড়ছে, আট কিলোমিটার দূর স্কুল 
থেকে ছুটতে ছুটতে বাড়ি আসছে নওরোজ | ন" বছরের ছেলে । স্কুলেই মনে 
পড়ে গেছে, আজ যে ওর জন্মদন-_-মা-কে বলতে হবে, মা সুজির পায়েস 
করতে বলবে জোঠকে। 

1ফরে দেখোঁছল, ঠাণ্ডা কনকনে দেওয়ালের পাশে আগুনের মালসা | হাত 
দুঁট দু পাশে, চোখ বোজা, মা চলে গেছে ঘুমের মধ্যে । জেঠি গরুর জাবনা 


১০৮ 


1দচ্ছে গোয়ালে, পাশে কেউ নেই। 

রুকু, আম ওই দিনটা কিছুতেই ভুলতে পার না। 

ওই দিন থেকেই ঠিক হয়েছে, এ জীবনে কোনও কিছুই পুরোপার 
পাওয়া হবে না আমার । নইলে তোমার সঙ্গে এতাঁদন দেখা হল নাকেন? 

জানো, গত বছর চণ্ডনগড় ঘুীনভাসট এম-এ-র রেজাল্টের জন্য সোনার 
মেডেল দল । আন স্টেজে দাঁড়য়েও ভাবাছ, জ্যাঠার সেই এক ফ:য়ে প্রদীপ 
নাবয়ে দেওয়া, আর জনম্মাদনের বিকেলে বাঁড় ফিরে এসে মায়ের শব 
সৎকারের উদ্যোগ । আমার জীবনটাই এ রকম । 

হ্যাঁ, আম একজনকে কথা দিয়েছি । একজন চেয়েছিল আনায় । আমিও 
তো ভালবেসেছি তাকে । জোঁঠমার সইয়ের মেয়ে । জম্মুর সীমান্তে ফুলপুরে 
থাকে সোনাল আর ওর মা। সোনালের বাবা নেই । ওরা আবার ব্রাহ্মণ । 
আমাব মতন অজাতের ছেলের সঙ্গে বিয়ের কথা পাকা করার অপরাধে 
সোনালের মা একঘরে হয়ে গেছে। গ্রাম ছেড়ে ফুলপুরে চাকার নিয়েছে 
গ্রামসোৌবকার । সব ঠিকঠাক ছিল--কথা ছিল, সামনের এাপ্রলে ওদের এখানে 
আনব। সোনালকে বিয়ে করব ।"**তোমাকে দেখে সব কিছু ওলটপালট হয়ে 
গেছে রুকু । আমি কছুতেই আর অতাঁতে ফিরতে পারাছি না । কী করব ? 


সাদা কালো একটা ছবি । গ্রামের কোনও স্টুডিওতে তোলা । দু” পাশে 
খজ দুই িনুনীী, সবুজ পাতার মতন এক তরুণী, গভীর কালো দহ, চোখ-_- 
সোনাল। পাথরটার ওপর রাখা ওই ছাঁবটা, চিঠির খাম । সোনাল পথ চেয়ে 
আছে। নওরোজ কথা 'দিয়ে এসেছে । রুক্মিণীর চোখের সামনে দুলে ওঠে 
দূর পাহাড়, আকাশের রং ঝাপসা হয়ে একখান গোলাপ ওড়না হয়ে যায়, 
মাঁটতে ঝরা আবর ফুলের রাশ । 

মা মারা যাবার পর জেঠিই বুকে তুলে নিয়োছল নওরোজকে। পরের বাঁড় 
দুধ বেচে, বিচালি কেটে, জ্যাঠার দেওয়া হাতখরচের টাঝ। 1নঃশব্দে সাঁরয়ে 
নানাবিধ উপায়ে ওর পড়ার খরচ চালাত ।--“তোর মা চেয়েছিল তুই পঢ়ালিখা 
আদমি বনাব। আমাকে মরার দিনও বলে গেছে। তুই আর চরাগাহ যাস 
না নওরোজ ।” জেঠি ষাঁদ না থাকত, আজ নওরোজ বন্দুক কাঁধে আর এক 
বংশানুক্লামক মেষপালকে পারণত হত। 

সেই জেঠির সঙ্গে সই পাতিয়োছল সোনালের মা। সেই সূত্রেই সোনালদের 
বাঁড় যাতায়াত করত নওরোজ । বিয়ের প্রন্তাব দিয়েছিলেন সোনালের বিধবা 
মা নিজেই। তক্ষুনি খেপে উঠে জেগে বসল সমাজ । নওরোজ নিজের পায়ে 
দাঁড়ায়ান তখনও । গ্রাম ছাড়তে হল মা-মেয়েকে । 

নওরোজ, কথা রাখতেই হবে তোমাকেও আম ভাঙতে দেবো না। 


রাঁক্বণী বিশ্বাস করো, তোমাকে দেখার পর থেকে সব কেমন ঝাপসা হয়ে 
গেছে। ওই আমাদের গ্রাম, সোনাল আমার অতীত । আম চিনোছি 


১০৯ 


তোমাকে । এ জন্মে হয়তো এর আগে দেখা হয়ান, িল্তু তার আগে ? 
তোমাকে আম সমন্ভ কিছুর মূল্যে চাইছি রোজ, রাতাঁদন-_গ্ৃত এক মাস 
ধরে । 'প্লজ, আমাকে ফেরাবে না বলো ! 

[নিজের আন্তিত্বের বিরুদ্ধে গিয়ে কথা রাখতে বলছ আমাকে ? 

নওরোজ আর্তের মতন রাীক্ষণীর একটা হাত ধরেছে, তুমি পূর্বজন্মে 
বিশ্বাস করো না? বলো আমাকে রুকু! হাতটা গলে যাচ্ছে নওরোজের 
আঙ্চলের চাপে । 

কার তো। মৃদু হেসে র্াক্সণ উঠে দাঁড়ায়, নওরোজের এলোমেলো চুলে 
বাল কেটে দিয়ে ।-_আ'ম গতজন্ম এজন্ম, আগামী জন্ম_ সব কিছ মান । 

নওরোজ আনমনা ছিল, লক্ষ করোন । এক ফাঁকে সোনালের চিঠি ও ছাঁব 
চালান হয়ে গেছে রুকুর বুকের মধ্যে । 

অদ্ভুত দিনটা । রাঁববারের সকাল শেষ হয়ে (ঝিম-ধরা-দুপুর নেমেছে । 
নীল ট্রয় ট্রেনটা ঝিকিঝক করে কালকা আভমুখে চলেছে আবার । আকাশে 
ভেসে আছে একটা মান্র চিল। 


শত গিয়ে বসন্ত আসে একদিন। একসময় বসন্তেরও যাবার সময় হয়ে 
আসে । পাহাড়ের দেশে বাতাস এখনও 'স্নগ্ধ শীতল । আকাশ আজও 
ঝকঝকে মরকতলীন । কেবল নানা রঙের ফুলগাঁল হাত নাড়তে নাড়তে 
চলে যাচ্ছে । বেশ রাত । পায়ে চলা পথটা ধরে জ্যোৎস্না মেখে বড় রান্ভায় 
উঠে এসেছে রাঁক্সণী আর নওরোজ । চতুদ্দশীর চাঁদের আলো পাঁথবীকে 
কেমন নীলাভ এক রহস্য বলয়ে ঘিরে রেখেছে । দুর পর্বতশ্রেণীর কোলে 
বরফ গলেছে । এখন পাঁখরা উত্তর থেকে উঠে আসবে বাসা বাঁধতে, ঠোঁটে 
খড়কুটো ৷ দেবদারুর উ*চু ডাল থেকে ভীতু একটা উড়ন্ত কাঠাঁবড়াল ঝটপট 
করে চলে গেল অন্য গাছে । 

একটু দূরে ছোট্র স্টেশনটা, তার হলদে বোর্ড । একাঁদন ওখানে নওরোজ 
এসোছল রাঁক্সণশকে নিতে । আজ ওদের শেষ নিভৃত আলাপচারতা । 

আগাম কাল ভোরের ট্রেনে এসে পৌঁছোবে সোনাল আর ওর মা। 
নওরোজ গুদের আনতে যাবে । থাকার ব্যবস্থা মোটামুটি হয়ে গেছে, বিয়ের 
সামানা যা আযোজন । আজ রুকু আর নওরোজ খাঁটনাঁট বাজারও শেষ 
করেছে । কনের জন্য পিওর সিল্কের শাঁড়, সবুজ কাঁচের চাঁড়, সদর | 
অবশ্য টাকার জোগাড় তেমন ছিল না নওরোজের। 

রুকু বলল, লকেটের ভিজাইনটা তোমার পছন্দ হয়েছে তো? ওই 
একটাই তো সোনার 'জানস যা দিচ্ছ সোনালকে, এখানে কোনও ভ্যারাইটি 
নেই, গছ মনে কোরো না । কলকাতা-দাল্লী হলে এই সোনাতেই-_ 

নওরোজ হেসে বলে, ভীষণ জোঁদ আর একগংয়ে মেয়ে তুমি । ওদের 
এনেই ছাড়লে শেষে ! কবে থেকে যে লুকিয়ে চিঠি লিখছ সোনালকে, জানতেই 
পারাঁন, আম তো হাঁদা একটা । 


১১০ 


অপাঁরচ্ছন্ন, আঁকাবাঁকা হাতের লেখা । তবু ফুলপুরের সোনাল পরম 
বিশবাসে চিঠি দিত ওর “দাদ? রাক্ণীকে । 

দাদ বলেছে ওদের 1য়ের সব ভার নেবে ানজে হাতে, কনে সাজানো 
থেকে শুর করে । জবালামুখী দেবী কথা শুনেছেন এতাঁদনে । সোনালের 
প্রতীক্ষা শেষ হতে চলেছে এই বসন্তে । 

নওরোজের হাতের মধ্যে রাষ্সিণীর নরম মুঠি । নীজে তোমাকে যে 
কিছুই দিতে পারলাম না রুকু । 

নওরোজের অধীর ওষ্ঠাধরের ওপর সুগান্ধ আওুলগ্ীল রেখে রাক্সণী 
বলে, দলে তো ! আজীবন বন্ধৃত্ব ৷ 

রাঁববারের সেই শশত-সকালে চোঁরর মঞ্জরী আঁকতে পারোন, আঁকতে 
পারোন আকাশ । আজ রুকু পারবে । 

চোখের জল কীভাবে জ্যোৎস্নায় মিশে একাকার হরে যায়, ও আজ 
আঁকতে পারবে ীবনা রঙেই । 


১৯১) 


সমল ক্োোতাগন্র 


চোখ খুললাম । অন্পকার । তাঁকয়ে রইলাম । প্রথমটা মনে হয়োছিল জমাট 
অন্ধকার আমার কপাল, চোখের পাতা ছেড়ে নড়বে না। মিনিট খানেক পর 
অজ্প, সামান্য একটু আবছা ভাব এল । মমর-পেয়ালায় অন্ধকারের 
[ডকক-শন, তাতে দু'এক ফোঁটা আলোর রং 'নংড়ে দেওয়া হচ্ছে। আসলে 
আম গম্বুজ-আকৃাঁত সুন্দর 'সাঁলংটার দিকে তাকিয়ে ছিলাম । চোখের পাতা 
দুটো ভারী, একটু যেন ব্যথা । হাতড়াতে হাতড়াতে চোখ গম্বুজ থেকে 
1খলানে নামল । আরও নীচে । তারপর কুন্দশুভ্র পদ্মফ্‌লের মতন একখানা মুখ 
অন্ধকারের বন্যার মধ্যে জেগে উঠে 'স্ছর হল । ভেনাস অব মিলো। গতকাল 
রাতে এরই পায়ের তলায় শুয়ে আম ঘুীময়ে পড়েছিলাম । বাঁ হাতটা কাঁধ 
থেকেই ছিড়ে নিয়েছে সময় । ডান হাতটাও খাণ্ডত । কোমর থেকে স্খালত 
বসনের ঢেউ একেবারে নঈচে ঝাঁপিয়ে স্থির হয়েছে, ডান পায়ের পাতার অর্ধেক 
দেখা যাচ্ছে সেখানে । অস্ফুট ইচ্ছের মতন শিউরে ওঠা দুটি গুন, বেপথু 
নাঁভকমল ৷ কাল রাতে অনেকক্ষণ ধরে একে দেখোঁছ। পুরুষ হলে কী হত 
জান না, ভেনাসকে দেখে আমার বিষাদই জেগোঁছল আগাগোড়া | ম্যাথিউ- 
এর লাইটারটা আমার জ্যাকেটের নঈচের পকেটে ছিল। কখন যেন দুষ্টুমি 
করে ফেলে 1দয়োছল ওখানে । হঠাৎ হঠাৎ চমকে ওঠা আলোয় আম ভেনাসকে 
দেখাছিলাম রহস্যভরে 1. এক সময় পা দুটো ব্যথা করে এসোঁছিল, সারা 
শদনে কত মাইল যে হেটেছি ! ক্লান্তি, খিদে । পকেটে একটা চকোলেট ধার 
ছল, আধ প্যাকেট সল্টেড পী-নাট্‌স্‌ । জল নেই । গলার ভেতরটা জালা 
করছে অঙ্প অন্গপ । তার পরেই, আচমকা শীতিভাবটা আঁকড়ে ধরল আমায় । 
প্রথমে মাথাটা, টুপ তো ছিলই না, ঘাড়ের পেছনটা, কোমরের কাছে। 
জ্যাকেটের চেন লাগয়ে নিলাম । জীনস পরা ছিল, জুতো মোজা--অথচ 
গতকালও আমি মোজা ছাড়া স্যাণ্ডল- পরে টই টই করে ঘুরেছি । তসরের 
একটা স্কার্ফ পকেটে ছিল । সেটা ঘাড়ের তলায় দয়ে আম পাথরের মেঝেতে 
ভেনাসের পায়ের তলায় শুয়ে পড়লাম । ভাবানি, ঘ"ম আসবে কখনো ; অথচ 
দুলতে দুলতে ঘুম এল । ঘুমের মধ্যেই, স্বপ্নে আমাকে কাঁপাচ্ছিল ইংলিশ 
চ্যানেল পেরোনোর সময়কার খোলা ডেক--এর কনকনে হাওয়া । মাথার ওপর 
তারা ভরা রাত। অবচেতন বলছিল, সাত্যই কি এত শত ? ডোঁমানকদের 
বাড়তে রাতে হাঁটিং থাকে বলে বোঝা বায় না; এখানকার পাথরগুঁল, 
তুমুল সব দেওয়াল অগস্টের মাঝরাতের সবটুকু ?হম গায়ে মেখে ডাকাতের 
মতো বসে আছে । কিছুক্ষণ পর্যন্ত আমার খেয়াল ছিল না কোথায় শয়েছি, 
অথচ সমান্তরালভাবে আমি সাগর পেরোনোর সেই রাতটায় ফিরে গোছলাম । 


৯৯ 


ডোভারের র্রাস্ট করা সাদা পাথরের দেওয়াল ক্লমশ দূরে সরে যাচ্ছে, অথচ 
রাতের 'দগ্‌বলয়ে 'ক্যালে' বন্দর জেগে ওঠার অনেক দোঁর তখনও, ঘন সবুজ 
জল, জাহাজের চাকার পাশে সাদা ফেনা নিঃশব্দ আক্রোশে আছাঁড়-াপছাঁড় 
খাচ্ছে । চলন্ত রেস্তোরাঁর মধ্যে মৃদু মিউাঁজক, আম অন্যমনস্কভাবে বাইরে 
তাঁকয়ে আছি, অন্ধকারে এখন আর কছু দেখা যায় না দুরে, শুধু শীত, 
আর শীতটা 'িকছুতেই যেন ছাড়বে না আমাকে-_-তারপর একের পর এক 
কারুকাময় কাঁরডর আসতে আরম্ভ করল, উদ্ভাঁসত শয়ে শয়ে িলান, 
দীর্ঘ দীর্ঘ, পথ ধরে আম হাঁটাছ, চারপাশে রঙীন ভিড়ের হিজিবিজি 
কাটাকু'টি, ঝাপসা কালো মাথা, গকন্তু আম চেনা কাউকে পাচ্ছ না; ঘুম 
ভাঙতেই বুঝতে পারলাম, ঠিক একমুহূর্ত আগে আমি চেঁচিয়ে “ডোমিনিক” 
বলে ডেকে উঠোছলাম । অন্ধকারে চোখ খুললাম, নজের ডাকটা তখনও 
কানে লেগে" 

চেতনা একট স্বচ্ছ হতে ভাবার চেম্টা করলাম আজ কার মুখ দেখে 
উঠোছলাম সকালে । 


কাল ও পরশুর মতন চিকণ ভোর ছিল আজও, গত দুদনে একবারও 
বাম্ট পড়োন । লেস--এর পদশার ফাঁক 'দয়ে কোমল আলো ফুটে উঠে আমার 
ঘৃমন্ত দুচোখের কাঁন'য়া ছংয়োছল । তখনও কিন্তু আম জেগে উঠান । 
একটা হালকা পারাঁফিউম ভাসতে ভাসতে খাটের কাছে চলে এসে উঠোছল, 
তারপর 'বছানার ওপর বসে পড়ে, আমার মুখের ওপর ঝ৫ংকে ডোমাঁনক বলে 
উঠোছিল, এই রিটা, ওঠ, কত ঘুমোবে । 

ঘুম জড়ানো চোখ মেলে চাইলাম । 

ডোঁমাঁনকের হাসিভরা মুখ, িমলেস চশমার পেছনে উজ্জল বাদাম 
দুই চোখ, সোনালন চুল পেছনে খোঁপা করে বাঁধা, গাঢ় গোলাপ ঠোট দুটির 
মাঝখানে নিপুণভাবে সাজানো দাঁতের সারি, ডোঁমাঁনক প্রায় পুরো শবীর 
দিয়ে আমার ওপর শুয়ে পড়ল । সাদা, হাতির দাঁতের বর্ণ ওর দুই হাতে 
আমাকে জাঁড়য়ে রাগের সঙ্গে বলল, ওঠো বলাছ। জোট (জ্যোতি ) এখনও 
ঘুমোচ্ছে, তুমি উঠছ না, ব্রেকফাস্টের কত দোঁর হয়ে যাবে বলো তো। 
আঃ ডোঁমনিক-, প্লীজ! আর একটু ঘুমোতে দাও আমাকে । মাঝরাতে 
ডোঁমানকের মায়ের পোষা কালো বেড়ালটা উঠে আমার পায়ের নীচে, লেপের 
মধ্যে গুঁটশ্ট হয়ে শুল। আমার বেড়ালে ভীষণ ঘেন্না । হীঁটং চালানো 
হাল্কা শীতের মধ্যে পায়ের কাছে নরম-গরম ছোঁয়া মন্দ লাগার কথা নয়__ 
কিন্তু আমার গা শিরশির করছিল, িছুতেই এখানে শুতে পারবো না 
আম । সশীটং রুমের কার্পেটে জ্যোতি আর ডোমানক পানীয় নিয়ে বসেছে, 
ওদের হাজকা হাসি, কথাবার্তা ভেজানো দরজার মধ্যে দিয়ে কানে আসছে । 
আগাম কাল সকালে লুভর্‌, আটটার সময় বেরোতে হবে, আজ সারাদন 
রাষ্তায় রাস্তায় ঘোরা হয়েছে, অথচ জ্যোতির ভ্রুক্ষেপ নেই । শোওয়ার কথা 


১১৩ 
চন্দনরেখা- & 


বলতে উ“চু করে হেসে বলল, আরে ঘুম ক পালয়ে যাচ্ছে নাক! এসো 
এসো, গজ্প করি। এটা আমার সঙ্গে ভদ্রতা করা হল । আসলে ও ডো'মিনিককে 
নিয়েই বসতে চায় । ভীষণ রাগ হয়োছল তখন | নাঃ, আমার মাথা ধরেছে__ 
বলে উঠে চলে এসোছি। 

ডোমাঁনক নিজেই এসে দরজাটা ভোঁজয়ে 'দয়ে গেল, যাতে সশীটং রুমের 
আলো আমার চোখে না লাগে। কিন্তু বেড়ালটা আসায় আমার মনের সব 
শান্তি আবার ছি'ড়েখংড়ে গেল । গৃহস্বামীর বেড়ালকে কি আর লাথ মেরে 
নামিয়ে দেওয়া যায়, তাও আবার প্যারিসের মতন শহরে । মমাত-এর সুপার 
মারকেটে গিয়ে বেগুন কিনে যে নিদারাণ গ্লান বোধ করেছিলাম, এ যে তার 
চেয়েও খারাপ । ডোমিনিককেই বলি বেড়ালটার কথা । উঠে খাটের নীচে 
রাখা স্লীপার পরলাম । আধো-ঘুম-লাগা-চোখে বেডরুমের দরজাটা ভেতর 
থেকে খুলেই দ্রুত বন্ধ করে দিতে হ*ল। না দিলেও অবশ্য সাঙ্ঘাঁতক 
কিছু হতো না। সাঁটিং রুমের শ্যাণ্ডোলয়ারের নীচে জ্যোতি বসে বসেই 
ডোমিনিককে জঁড়য়ে ধরে আছে, ডোমানকের সোনালী খজু চুলে ভরা 
মাথাটা জ্যোতির কাঁধে, দুজনেরই চোখ বন্ধ । বাঁক রাতটা আম আর 
ডোমাঁনকের মায়ের বেড়াল পরস্পরের প্রতি করকম [হংম্র মনোভাব পহষে 
সহাবস্থান করলাম, তা কাউকে বলার মতন নয়। ভোরের দিকে একটু তো 
ছেড়া ছেড়া ঘুমিয়োছ, তাও মেয়েটা কাকভোরে ঠেলে তুলে দিচ্ছে । অথচ 
এমন নিষ্পাপ হাঁসমাখা মুখ, যেন কাল রাতে কণ হয়েছিল 'িছু জানে না ! 

আম আর একবার দু চোখ বন্ধ করে নিতেই ডোঁমাঁনক [খিলাঁখিল করে 
হেসে উঠে বলল, আর র আযাধাগ্র ? রাগ করে উত্তর দিলাম না। 

এবার ডোমিানিক ঝংকে পরে একটা 'ক্ষিপ্র চুমু খেল আমার ঠোঁটে, তারপর 
বিছানা থেকে উঠে পড়ে বলল, বাট উই ডিডন্‌ট্‌ ডু এীনাথং, আমরা কেবল 
পরস্পরকে জাঁড়য়ে বসে ছিলাম । চলো চলো, এরপরে “বাগেং পাবো না। 
বাইরে থেকে টেনে দিলে দরজা লক হয়ে যায় । জ্যোতি অঘোরে ঘুমোচ্ছে। 
আম আর ডোঁমানক পথে নামলাম । দুটো লেন পেরোলে ছোট্ট একটা 
সুপার মারকেট। বেকারি তার লাগোয়া । এখান থেকেই আমাদের যাবতীয় 
জিনিস কেনা হয় । এইরকম তাজা রুটি কোথাও নেই, এমন ভালো শাকস্জ 
কোথাও নেই, তাঁরশ চল্লিশ রকমের বিদ-ঘুটে গন্ধঅলা চীজ, আম তার 
কোনো তারতম্য বাঁঝ না। ডোঁমানক্‌ তাদের নাড়ী-নক্ষত্র বিষয়ে কলকল 
করে কথা বলে যায়। 

নরম ভোর । কোনো শব্দ না করে দ্রুত এদক ওদিক যাচ্ছে গাঁড়রা । 
রাঙ্তার ধারের গাছগুলি রোদে ঝলমল করছে, ফুটপাথে একাঁট দহটি হলুদ 
পাতা গড়াচ্ছে, এমন সকাল-_এ যেন প্যারস নয়, আম আর ডোঁমানক 
বাঁলগঞ্জের কোনো রাস্তায় হাঁটাছ। 

পথে জ্যোতি আমার ভারী জ্যাকেট নিয়ে, আর হাতে ছাতা নেওয়ার জন্য 
একটু হাঁসঠাট্া করল। তবে আমাদের মধ্যেকার মেঘ কাটোন বোঝাই 


১১৪ 


ধাঁচ্ছল। কাল থেকেই মেজাজটা খারাপ হয়ে আছে । জ্যোতির ধারণা আমি 
ইম্প্েশনিস্ট ছাঁব িছ; বুঝ না, সেই জন্য মুস দ্য অখ্‌সেতে তাড়াহুড়ো 
করাছলাম। ওর আরও সময় দরকার ছিল। অথচ আমি কাল সকালেই 
ব্রেফাস্টের সময় বলে দিয়োছলাম রতদ্যাঁর বাঁড় আম দেখবই । ছাঁদনের 
জন্য আসা এত কষ্ট ক'রে, ওই ভাস্কগযীল না দেখে ফেরা যায় ? হ্যাঁ, ক্র 
মনের লণ্ডনের ওয়েস্ট মিনস্টারের ছাঁব_ কুয়াশায় ঝাপসা নীল ও অরেঞ্জ 
আঁকা, ভালো লেগেছিল, ভালো লেগেছিল সেইন নদণর ছাঁবগুলি, পল গ'গ্যাঁর 
প্যাসেজ দ্য প্রভেন্স দেখে কেমন একটা কম্ট হয়েছিল, অথচ ভ্যান গঘকে 
তেমন করে পেলাম না, সানফ্রাওয়ার নেই__তখনই ঠিক করেছি আমস্টাডামের 
ভ্যানগঘ আকাদেমণীতে যাই বা না-যাই, রদ্যাঁর নজস্ব সংগ্রহের ভ্যান গঘ্‌- 
গুলি দেখবো না? জন, লম্বা একটা রান্তা-_নানা বাঁক ঘুরে রদ্দ্যার 
মিউজিয়ম খঃজাছি, তখনই বুঝোঁছ জ্যোতিময় চুপ, ও আমার সঙ্গে কথা বলছে 
না। না বলুক। 

অবশ্য জ্যোতি রাগ করতেই পারে । এই আমিই তো বলেছি, লুভর.-এ 
পনেরো দিন একটানা কাটালেও ছু না । না দেখেই এত, এ্যাঁ! 

তখন ?াক জানতাম রাতের ৯টা ঘণ্টা পনেরোদনের মতনই দীর্ঘ, স্বপ্ন- 
বহুল হবে লুভর-এ। 

আকাশ অল্প মেঘলা, বাঁন্টর সম্ভাবনা হাওয়ায় ঝুলছে । সেই চাপা 
রঙের বিপরীতে লুভর্‌-এর পাণন্ডুর হলুদ রং, ডানা ছড়ানো রাশভারণ 
স্থাপত্যের মেজাজ-বূকের মধ্যেটা কেমন যেন কেপে উঠোঁছিল, সম্মোহতের 
মতন আম, জ্যোতির একটা আঙুল ধরে পেই-এর তোর সেই কাঁচের 
[পরা?মডের ম্যাজিকের মধ্যে ঢ.কে যাচ্ছিলাম । পিরামিডের দুধারে উলসে 
উঠেছে ফোয়ারা, ব্রিকোণ জলভূমির মধ্যে লুভর.-এর ছায়া ঘুলয়ে একাকার । 
তাহলে সাঁত্যই রূুপনগরের এত কাছে পৌছে গোছি আমরা ! তক্ষ2ীন 
ডোঁমাঁনক মুখ ফিরিয়ে হেসে হাই” বলে উঠেছিল, কারণ ম্যাঁথউ পিছন 
থেকে এসে ওর কাঁধে আলতো টোকা দিয়েছিল । ডো'মাঁনকেব সঙ্গে ম্যাঁথউ- 
এর গবলেতে আলাপ, আমরা চিনি না বলে আলাপ কারিয়ে দিল। দু'জনে 
একই ব্যাচের স্টুডেন্ট ছিল, অবশ্য ডোমনিক আইন পড়ত আর ম্যাথিউ 
সাহ্ত্য । আজ ম্যাঁথউ-এরও প্যারস সফর, আমাদেরই মতন । চব্বিশ- 
পরচশ বছর বয়স হবে, কপালের ওপর কোঁকড়ানো সোনাল চুল, তরুণ 
রোমান দেবতার মতন ম্যাঁথউ জীবনীশীস্তর প্রার্র্যে ছটফট করছে-এই ছাবি 
তুলছে দ্রুত, কাঁধের ব্যাগটা কোথায় রাখবে বুঝতে পারছে না, পকেট থেকে 
নরম হয়ে ধাওয়া চকোলেট বার করে আমাদের দিল, আমাদের বেশ জমে গেল 
ম্যাঁথউ-এর সঙ্গে । 

ভেতরে ঢোকার সঙ্গে সঙ্গে কেমন একটা অদৃশ্য টেনশন আরম্ভ হয়ে গেল 
আমাদের মধ্যে, আমি স্পন্ট বুঝতে পারাছিলাম যে আম একা পড়ে যাঁচ্ছ। 

প্রথমেই আমাদের একটু তকণাতাঁক হল-_ওয়েপ্টাল আযাঁণ্টকুইাটিস বা 


১৯৬ 


মিশর, মেসোপটোমিয়া, সুমের, আব্বাদ এসব ওদের কাছে ভীষণ ভারী, 
বোরিং, ওরা দেখবে না। অথচ আম ওখান থেকেই আরম্ভ করব । 

শেষমেশ দেখা গেল ভেতরে চোকার 'নয়মকানৃন বেশ প্যাঁচালো, তার 
ওপর জ্যোতিও একটুও সাপোর্ট করল না আমাকে, ডোমিনিকের চাপে আমরা 
গ্রেট গ্যালারর ফেণ্চ পোণ্টিং থেকে আরম্ভ করলাম । ম্যাঁথউ দেখলাম যতটা 
না দেখতে এসেছে, তার চেয়ে বোঁশ এসেছে মজা করতে, গোড়া থেকেই ওর 
চিন্তা হচ্ছে কীভাবে একটু আধটু ঘুরে ফিরে তারপর বায়ার 1নয়ে কোথাও 
বসবে, ওপরে কোথাও একটা সুন্দর টেরাস ক্যাফে আছে নাক । ছবি দেখতে 
গিয়েও টেনশন- ওরা ল্যান্ডস্কেপ ভালোবাসে না। দু'একবার ডোঁমনিক 
আমার কাছে কাছে থাকার চেম্টা করাছল, 'কন্তু ভেতরে ক্লান্তিকর ভিড়, 
আমাদের কেবল হেটে যেতে হাঁচ্ছল, না হলে আবার দলটা টুকরো হয়ে যায়। 
ইতালীয় রেনেশাঁ সেকশনে গিয়ে জ্যোতি ওর আদেখলেপনা আরম্ভ করল, 
বিশেষ করে লিওনাদে দা ভিপি, কিন্তু মোনালিসার সামনে অশ্লীল ভিড, 
হাজার খানেক ফ্ল্যাশ চমকাচ্ছে, দেখেই আমার গা গ্যালয়ে উঠল । জাপান, 
জার্মান, ইংলিশ ছবি দেখিয়েরা প্রায় গংতোতে বাঁক রেখেছে পরস্পরকে-- 
আচ্ছা মোনালিসার সামনে নিজেকে দাঁড় কাঁরয়ে ফটো তুলে ক হবে, বাঁড়তে 
গিয়ে দেখাবে লুভর--এ গোছলাম, এই তো ! 

শেষে যখন জ্যোতি গ্যাথউকে বলল, মোনালিসার সামনে আম আর 
রিতা দাঁড়াচ্ছি তুম একটা ফটো নাও--ওফ- ডিস্‌গাসাটং, আম প্রায় ছুটে 
পালিয়ে গেলাম সেখান থেকে এবং একটা কারাশ্হিয়ান প্যাঁচা-আকাতি মৃৎপান্ 
খংটিয়ে দেখার সময় জ্যোতি কানের কাছে দাঁত চেপে বলল, রিতা, ন্যাকামি 
করবে না। বেশি বাড়াবাড়ি করলে ফিরে গিয়ে মজা দেখাব । 

তাকিয়ে দোঁখ জ্যোতির পাতলা ক্র ঠোঁটে একটু হাসি ঝুলে আছে। 
অর্থাং এটা রাগও, আদরও | ওর দঢ ধারণা মেয়েদের একটু টাইট না দিলে 
তারা মাথায় চড়ে বসে, মাঝে মধ্যেই 'ভ্রটমেণ্ট দরকার হয় । যখন খুব 
হোমাঁসক িল কাঁর হঠাৎই, অথবা কোনো কারণে হয়তো মনটা খারাপ, 
তখনও জ্যোতি যে চুপ করে দুমাঁনট পাশে বসে থাকবে, অথবা খাল হাতটাই 
ধরল, এমন কখনো হয় না। “অল ইউ নীড ইজ এ গুড"**” এই একটাই 
ওষুধ ওর জানা । আজ দহ” বছর আমরা [িালভ-টুগেদার করাছ। জ্যোতি 
ছেলেপুলে চায় না এখনই । আমিও বিয়ের কথা তুল না আর । প্রথম দিকে 
মনে হ*ত বিয়ের ব্যাপারটা আমাদের নতুন করে কী দেবে! একই তো ! এখন 
ভাব কোনো একটা পিছুটান থাকলে ভালোই হত বোধ হয়। মেয়েদের সঙ্গে 
জ্যোতি চট করে একটা সহজ বন্ধুত্ব পাতিয়ে নিতে পারে, এটা ওর আগে 
থেকেই ছিল । কিন্তু আজকাল ওর স্বভাবে মাঝে মাঝে ঝলক মারে লোভ, 
সেটা আমাকে নানা আঁনশ্চয়তায় ফেলে দেয়__নাঁক পুরোটাই আমার 
কজ্পনা-_কে জানে ! আত্মীব*বাস কমে যাচ্ছে আমার নাক? নাহলে কেন 
ভাব যে আজ থেকে বছর পাঁচেক পর, চল্লিশের গোড়ায়, কোনোদিন ভোরে 


৯১৯৬ 


ঘুম ভেঙে উঠে দেখব আমার পাশে, বিছানায় উত্তাপ নেই, ফাঁকা ! 

টেরাস ক্যাফে থেকে নামার পরই মনে মনে 'সিদ্ধান্তটা নিয়ে ফোঁলি। বেলা 
গতনটে বাজে, হাতে সময় কম, অথচ প্রায় ছুই দেখা হয়ান । গ্রাফক 
আর্টের ধারে কাছে যাইনি, ভাস্কর্য দেখোছি আধা-খ্যাঁচড়াও বলে না তাকে, 
গ্রীক রোমান প্রাচীন িল্পকলার পাশ 'দিয়ে হেহটে এসোঁছ বললেই হয় 
আমার মধ্যে অশান্ত একটা হতাশা, রাগ ছটফট করতে লেগেছে । চাঁরাদিকে 
মানুষের মাথা, ভিড়, ম্যাথিউ, ডোঁমানক, জ্যোতি কেমন আলতোভাবে 
গল্প করতে করতে এগোচ্ছে, ষেন ওদের কোনো তাড়া নেই, ওরা সকলেই 
মেন আজন্ম প্যাঁরসের বাসন্দা, যে কোনো বিকেলে আবার বেড়াতে চলে 
আসবে এখানে । শ্রান্তভাবে, কোনো পাঁরকজ্পনা ছাড়াই, আমি দীর্ঘায়িত 
গযালারদের মধ্যে দিয়ে হাঁটছ, অজন্্র খিলান, ছাতি আমাকে ওপর থেকে দেখে 
না দেখার ভান করছে, আগার দহ, চোখ ভারী, এত সৌন্দয” এত মল্প সময়ের 
মধ্যে মান দুটি চোখে ভরে নেওয়া কী সম্ভব ! 

মিউাজয়ম বন্ধ হয়ে আসার মুখে জনম্তরোত নানা দরজায় উপচে পড়ছে। 
নেরোবারও একট 'না্দম্ট কলা আছে, তারই নিয়মে ব্ু-স-উ পরা গম্ভীর 
রক্ষীরা দু'হাত দুপাশে ছড়য়ে আমাদের আটকাতে লাগল- অর্থাৎ উহ 
এদিক দিয়ে নয়, ওঁদকে যাও-_ 

আমি ক্রমাগত পিঁছয়ে পড়ছি। একট যেন অনুকম্পা দেখিয়েই ডোমানিক 
বলল, আমরা সমের আক্কাদ-এর সেক-শনটা দিয়ে বেরোই, ম্যাঁথউ ঘাড় নেড়ে 
হ্যাঁ বলল, জ্যোতি কিছু বলল না। সেকশনের দরজায় মোটা দাঁড়টা টাঙিয়ে 
ক্োজ করার ঠক আগের মৃহতে" একটা বড় ঢেউ বেরোল ভিড়ের । তাদের 
মধ্যে ডোঁমাঁনক-এর অরেঞ্জ টী-শার্ট আনার চোখে ডানার ঝাপট দিল । তার- 
পরেই আপ্তে করে আমি হামুরাবর অনুশাসন (১৭৯২-১৭৫০ খঃ হঃ)-এর 
পেছনে চলে গোঁছ। আক্কাদীয় ভাষায় খোদাই করা আড়াই [মটার উচু এই 
[নকষ কালো ব্যাসাল্ট আমাকে আড়াল করেছে মায়াভরে । বুক ঢিবটিব 
করছে এত জোরে যেন লুভরএর রক্ষীরা সাঁত্যই শুনতে পাবে । আস্তে 
আন্তে মেহগানর বিশাল সব দরজা বন্ধ হয়ে সুন্দর নগরণীর ভেতরে রন্তাভ 
সন্ধে ঘন হয়ে এল । প্তব্ধ, নিজন। একটি পাঁখর ডাকও নেই । একজন 
ঘোষক “এনিবাঁড হিয়ার” ফরাসিতে বলতে বলতে কাঁরডর-চত্বর পোৌরয়ে গেছে 
একট আগে, যেমন রোজ যায়। আম সাড়া দিইনি । হাত তুলে মুখে চাপা 
দিয়ে দাঁড়য়ে থেকেছি । পাতলা অন্ধকার ঘন হয়েছে, অথচ একেবারে 'নাশ্ছদ্ 
হরনি । খলানের ভাঁজে ভাঁজে চাপা আলো, ডানায় ঠোঁট গুজে বসে আছে, 
তাইতেই । 

আমাকে অন্ধের মতো হাত ধরে ঘুরিয়েছে এই দীর্ঘ কাঁরডোরের দুই 
পাশের শিল'ভূত, চিন্রার্পিত সময় ৷ পাগলের মত আম ক্লান্তহীন ঘুরেছি । 
শামাস-সূর্ও ন্যায়ের দেবতার সামনে দাঁড়িয়ে থাকা হামুরাঁব ও তাঁর 
আক্কাদ* 'লাপ, সুমেরীয় রেনেশাঁ যুগের নৃপাঁতি গুডেয়া, তার উপচে পড়া 


১৯১৭, 


মৎপান্র, নিনিভ ও খোরসাবাদ থেকে তুলে আনা ীবশাল সব রালফ, 
প্রাসাদের তোরণে ছিল ওই ডানাঅলা, মানুষের মাথাঅলা বিশালাকায় ষাঁড় 
হাতির দাঁতের হাতলে যুদ্ধের দৃশ্যের কারুকাজ, ওয়েবেল-এল-আরক ছার 
প্রাচীন মিশরের আম ওদের সবাইকে একক ও আলাদাভাবে দেখোঁছ, ছংয়োছ 
চোখ 'দিয়ে । মোনালিসার হুজুগে ওরা আমাকে ভাঁজ'ন, দ্য চাইল্ড ও সেইণ্ট 
যানের কাছে ঘেষতে দেয়ান, আম সেইণ্ট-এ্যাল-এর অপূর্ব মমতামাখা 
কপালটা এবার বুকভরে দেখে নিয়োছ। হ্যাল্‌স্‌-এর জিপাঁস মেয়ের দ*' 
চোখে কেমন ছলনাময় চাউীন, রেম-ব্রানডভট-এর গোধুলবেলার ধুসর আত্ম- 
প্রাতকীতি দেখতে দেখতে আম কনস্টেবল, বাঁলংটন আর টানারের 
রোম্যাণ্টিক ল্যান্তস্কেপ্সগুলির কাছে গেছি। প্রাঁতাঁট হারানো পথ, 
ঝাপসা নদ, পাশ-ফেরানো পাতার মরচে ধরা রং আম যতক্ষণ ইচ্ছে দেখব, 
আমায় কেউ 'বিরন্ত করবে না এখন । 

তুমি যখন উচ্চারণ করো, শেষের রটা শোনাই যায় না একেবারে, আম 
ডোমাঁনককে বলোছিলাম । ওর মুখে শুনে মনে হয়েছে লুভ্‌, বলছে ও । 
উ+হ, চেস্টনাট রঙের চুলের চাল দীলয়ে ডোঁমানিক বলেছে, ভালো করে 
শোনো । এটা হচ্ছে নরম “র*, এই দেখো, আমার ঠোঁটের দিকে তাকাও তাহলে 
বুঝবে, লুভর-_লহ-ভ- র,, বুঝেছ ? 

গ।ড গোলাপি দুই ঠোঁট, ঝকঝকে দাঁত, তাদের ফাঁকে মোহময় ছোট্ট 
একাঁট জিভের তাল:র প্রত্যন্তদেশ ছোঁয়া, জ্যোতি তাঁকয়ে আছে, আ'ম জান 
কেবল তাকিয়ে তাকিয়েই নেশা ধরে গেছে ওর, ক এমন নেশা, এই অন্ধকারে 
আম যে লাইটার হাতে দাঁড়য়ে আছ, ওর একশো হাজারগুণ উন্মাদনা 
আমার শরীরের সমস্ত ?শিরায় ছাঁড়য়ে পড়ছে । 'রিমাঁঝম সুমের অববাহকার 
বৃম্টি আমার রক্তে বাজছে । 

সাইকি ও িউঁ্পড আলতো বাল.বন্ধনে শ্থ্ধ ; জ্যোতি পাশ কাটিয়ে 
গেছে আমাদের | সাপকে শনাষ্পম্ট করতে থাকা সংহের উন্মাদনা দেখতে 
দেখতেই ও চোখের সামনে তুলে ধরেছে হাতঘাঁড়, বহমানা ডোঁমানিক হাওয়ার 
ঘুর্ণর মত ম্যাঁথউ, মিকেলেঞ্জোর মুমৃষ্ত ক্লীতদাস'কে দেখেও তোমাদের 
কারো বুক কাঁপোন" 

হ্যাঁ, ওই কাঁরন্ছিয়ান প্যাঁচা-পান্রাটর পাশ দিয়ে হেটে গিয়ে আম গ্রীক 
ও রোমান প্রাচীন ভাস্ক্ষের নিবিড় অরণ্যে প্রবেশ কার একেবারে শেষে """ 

পা দুটো ব্যথা করছে, ঘাড়াপঠ টনটন করছে, চোখ ভারী । এত রূপ, 
এত প্যাশন, এত অস্ফুট ভালবাসা, ক্লোধ আত 1বস্ময়-ক্যানভাসে, ব্রোজজে, 
ব্যাসাল্টে, মর্মরে আমার সারা চেতনার ওপর টুপটাপ জংই-এর মতন ঝরে 
পড়ে প্রায় ঢেকে দিয়েছে আমাকে, চৈতন্যের মাস্তুলের আগাঁট বুঝ জেগে 
আছে এখনো । 

মাটিতে শুয়ে পড়ার আগে সামোথেহম-এর ডানা মেলা সেই নৌবিজয়ের 
প্রতীক মৃর্তিকে চুপি চুপি দেখলাম, হাওয়ার প্রবল তোড়ের মুখে দাঁড়য়ে 


১৯৮ 


আছে খৃন্টপুর্ব দুই শতাব্দী থেকে । নরম বসনের ভাঁজ রহস্যময় ছলাকলায় 
উন্মোচিত করেছে আড়ালের সেই নারশশরণীরের মায়া__ আচ্ছা, এর ডান 
হাতটা নাকি বিচ্ছিন্ন, পাওয়া গেছে খুজে চাল্পশ বছর আগে, বিজয়ের ভাঙ্গতে 
উচু করে সামনে বাড়ানো ছিল নাক, তবু মিলোর ভেনাসের ছিন্ন বাহুটি 
পাওয়া গেল না তো ! আর কতদিন লোকচক্ষুর নিরাবরণ শন্যতায় দাঁড়য়ে 
থাকবে ওই 'ীনর্দোষ সৌন্দর্য, কে তাকে এমন শাস্তি দিল ! কোমরের নীচে 
বহু ভাঁজে ভেঙে পড়া তার স্খাঁলিত বসনাণুল উধ্বাঙ্গের নগ্নতাকে ভারসাম্য 
দেবার জন্য লোটাতে থাকবে, আর ছন্নবাহু নারী চাইলেও লজ্জা নবারণ 
করতে পারবে না। অন্ধকারে শাদা একাঁট পদ্মফুলের মতন জেগে থাকে 
ভেনাসের মুখ, নীচে ঠাণ্ডা মেঝেতে আম শুয়ে পাঁড়। শীত-শীত ও 1খদের 
বোধের মধ্যে হাস্যকরভাবে আমার মনে পড়ে যায় সেইনের কাছের রাগ্ভায় 
ডো'মাঁনকের ফাঁকা বাড়তে আজ আমার ছায়া নেই । ডোঁমানক ও জ্যোতি 
দুজনে একা! শ্যাণ্ডোলয়ার-এর নীচে আিঙ্গনের পরবত€ ওদের সম্ভাব্য 
প্রেম-পষণায় আমাকে কোনোভাবেই ঈষতির, উত্তপ্ত করে না, আম যেন নোঙর 
ছেড়া একাঁট নৌকোর মতন বহুদর মাঝসমুদ্রে চলে গোছ-"*প্রেম, বিবাহ, 
[বিবাহের প্রাতিশ্রুতি, সন্তানের জন্ম-সম্ভাবনা ছাড়াই াবজন দ্বীপে দু হাজার 
বছরেরও বোঁশ দাঁড়য়ে থাকতে পারে 'ছন্নবাহ এক নারী । তখন ঠিক বুঝতে 
পাঁরান, এখন মাঝরাতের পর ঘুম ভেঙে মনে পড়ছে, হারয়ে যাওয়ার আগে 
এইরকমই মনের ভাব হয়েছিল আমার, আলোমাখা ; জ্যোতিকে ক্ষমা করে 
[দিয়োছলাম, ম্যাঁথউ এর জন্য ভালোবাসা জেগোঁছল, হ্যাঁ ডোমানক,, 
তোমাকেও-"*আইফেল টাওয়ারের াবশাল আর্চের তলা থেকে তুমিই না 
দোখয়েছিলে প্যারীর রৌদ্রো্জব্ল আকাশ । 

ঘুম ভাঙার ঠিক একমুহূর্ত আগে আম চেঁচয়ে “ডোঁমানক-” বলে 
ডেকে উঠোছলাম । 


১৯৯১ 


দে আন্নক্নে 
সংধন্য বগর্তী তার বাপের দিকে তাকাল । তাঁকয়ে লঙ্জা পেল ভীষণ । 
আড়চোখে চারাঁদকে দেখে নিল কেউ দেখছে না তো। কী যে আদেখলেপনা 
করে তার বাপটা। লোকে কী ভাববে ? সামনের দাঁত কটা অনেকদিনই নেই । 
মুখটা হাঁ করে, নাক কুচকে ওপরে চেয়ে আছে । ধূতিটা ডান হাঁটুর ওপরে 
উঠে আছে । বাঁ হাতে অন্য হাঁটুটা খামচে ধরে আছে অবাক বিস্ময়ে । 

আলতো করে ধুতিটা হাঁটুর নীচে টেনে নামাল সুধন, তারপর ফিসাঁফস 
করে বলল, বাপা, এই বাপা আগে দেখ । সভা শুরু হয়ে গেছে। 

দিয়া বগরৃতী আশ্চর্য হয়ে ওপরের ঝাড়বাতিটা দেখাঁছল। এত বড় বড়, 
এতগুলি বাতি একসঙ্গে সে ক কোনোঁদন দেখেছে ! মল্লারপুরের জামদার 
বাঁড়তে ভাঙাচোরা যে আলোগুল আছে, তারা আজ আর জহলে না। 
তাদের জৌলুস উঠে গেছে চিরতরে । হাতির দাঁতের রঙের মন্ত এই সভাঘর, 
নঈচে নল রডের নরম কার্পেট, হাঁটতে গেলে পা ডুবে যায়। সেই নীল 
গাঁলচার ওপর গাঁদআঁটা সংহাসন মাকাঁ চেয়ারে ওদের বসতে ীদয়েছে। 
সামনে একটু দূরে ধবধবে সাদা কাপড়ে-মোড়া টোবল। তাতে গণ্যমান্যরা 
কনুই রেখে, কেউ চেয়ারে এলিয়ে বসেছেন । 

ঝাড়বাতগুলি এক একটি মহীরুহসদশ । শীতাতপ মোড়া এই ঘরে 
বাতাস আসে না বহাঁদন, তবু যেন বাতাসের কোনো শৈশবস্মতির আবেশে 
আলোরা অল্প অম্প দোলে । কাঁচের শাখা-প্রশাখায় দাঁড়করানো এগ্ত 
মোমবাতিগুঁল আরোঁঝলমল করে ওঠে তখন । আলোর হিল্লোল দেখতে 
দেখতে দিয়া বগর্তী নিজের রোদে-পোড়া ফাঁকা জমির কথা ভুলে যাঁচ্ছল। 
সুধন তাকে জামা খুলতে দেবে না এই দেড় দিন, আজ আর আগাম কালের 
অর্ধেকটা । খাঁদর কেচিকানো জামাটা খড়মড় করে দিয়া বগরতাঁর সব শান্তি 
নম্ট করে দিচ্ছিল, তার পিঠ অবিরাম কুটকুট করছিল | তবু ওই অপরূপ 
আলোগীল সাঁত্যই সব ছু ভুলিয়ে দেয় । 

আঁবরল ভাষণ হয়ে যাঁচ্ছল। প্রথমে সাফাঁর পরা মোটামতন একজন, 
তারপর চিফ হীঞ্জীনরার, মাঝখানে রোগা খড়কে-কাঠি-মাকাঁ এম এল এ, 
সবশেষে বিভাগীয় মন্ত্রী । কোনো কথাই সুধনরা বুঝতে পারছিল না। সব 
ইংরাজি । হীঁ্জীনয়ার সুদেব শাস্ত্রী আবার একটা শাদা পদার ওপর আলো 
ফেলে নানারকম আঁকাজোকা দেওয়া পাতলা প্লাস্টক ঘারয়ে ফিরিয়ে 
দেখাচ্ছিলেন। হাতে লম্বা এক স্টলের লাঠি। ড্যাম আর ক্যানাল বানিয়ে 
তাদের দেখভাল করতে কত কোট টাকা খরচ হয় সরকারের, এক 
ছেলেখেলা ? | 


৯১২০ 


এ অঙ্ক ক্রমশ বেড়ে বেড়ে আকাশ ছঃতে চলেছে । আর জলকরের বেলায় 
চাষিদের ফক্কা। আড়াইশো কোট খরচের পিঠে পাঁচ কোটি টাকার আদায় । 
টাকা চাইলেই চাষ নাকে কাঁদে, কেউ বলে মোটে জল পাইন, কেউ বলে ধান 
জলে গেছে, কেউ বলে রাতাঁবরেতে সমাজাবরোধীরা স্লুইস ভেঙে নিয়ে চলে 
গেছে। এই জমাখরচের হিসেব কে মেলাবে বলো দোঁখ ! সরকারের হিত 
চিন্তায় সুদেব শাম্ত্রী ঠাণ্ডাঘরের মধ্যে ঘেমে নেয়ে উঠাছিলেন, টাইয়ের 
গ্ট আলগা করার চেষ্টা করছিলেন অন্যমনস্ক আঙুলে । শেষে ক্লান্ত হয়ে 
বসে আড়চোখে বিভাগীয় মন্ত্রীর দিকে তাকাতে থাকলেন, এক বছর চাকাঁরর 
এক্সটেনশন হবে । ঘোড়েল সহদেব 1বশ্বাস ফাইলের ওপর বসে আছেন। 
সরকার দলের চিফ হুইপ দুবেলা তাগাদা দিচ্ছেন তাই । চিফ হুইপের 
মেয়ের সঙ্গে সুদেবের ছেলের বয়ে হয়েছে । অথ5 সহদেব বিশ্বাস অনড় । 
টাকাপয়সার যাঁদ মামলাই হয়, ইশারায় বললেই তো হয়, তাও বলবে না। 

সুদেবের জন্য বুকের মধ্যে একট আধট কষ্ট হাঁচ্ছল সুধন বগরৃতীর । 
বাবুদের কী ঝামেলা ! সাত্যই তো, সুধনরা জল পায় না আজ কত বছর 
হল। দশ বছর তো বটেই । জলকর আদায় করতে আমন ভয়ে নিজেই 
আসে না। ক্যানালের টেল-এর 'দকটা ক্লমশই ভেঙে-মজে যাচ্ছে । ব্যাপারটা 
আরও জাঁটল হয়ে হাতের বাইরে চলে যাচ্ছে তার ফলে । শাস্ত্রীবাবু একা- 
হাতে কত আর করবে ? আর সেইজন্যই তো এই সভা ডাকা । একে বলে 
কর্মশালা, কামারশাল নয় । এখানে বড় বড় মাথা এক হয়ে পরামশ' করবে, 
চাঁষরা কীভাবে ক্যানালের দায়িত্ব নিজেরা কো-অপরোঁটিভ করে নিজেদের 
কাঁধে তুলে নেবে, জলকর তারাই আদায় করবে_ সরকারকে তারাই জমা দেবে 
আ'মন-টামিন আর লাগাবে না, একে বলে স্বায়ত্তশাসন । 

ফুরফুরে লাল শাড়পরা একটা মেয়ে করেকজনকে লেখার কাগজ আর 
পেনাসল দিয়ে গেল। সুন্দর একটা বাস লেগে রইল ঝাড়বাতি দোলানো 
হালকা হাওরাতে । সুধনকে ?দল না। কেন? ও কি দেখে বুঝতে পেরেছে 
সুধন িাখতে জানে না? জানঙ৩ এককালে, এখন লিখতে গেলে ওর হাতে 
পেনাঁসল ভেঙে চুরমার হয়ে যাবে । 

মেয়েটা ঘুরে সুধনের ঘাড়ের কাছে এল আবার । 

সুধন বুকে সাহস এনে ঘাঁউ করে বলে উঠল, আমাদের কাগজ পেনাসল 
দন! 

আমাদের মানে ? মেয়েটা ভুরু কুচকে আছে । 

এই আমাকে আর বাপাকে। 

তাচ্ছিল্য-ভরে এনে দল মেয়েটা । ওই পেনাঁসল "দিয়া বগরৃতীর কোল 
থেকে গাঁড়য়ে নীল গালিচায় ডুবে গেছে ?সগ্রেটের আলোর মতন ৷ সেইজন্যই 
মেয়েটা দাঁচ্ছল না। ওরা মানুষের চেহারা দেখলেই বুঝতে পারে কার কণ 
এলেম । 

সঞ্ালে এখানে পৌঁছনোর পর হলের এককোণায় পোঁটলাপংটালি রেখে 


৯৯২৯ 


সুধন, দয়া আর বিশ্বনাথপুরের রাঁসক ওঝা একটু ঘুরতে বোৌঁরয়েছিল। 
বাইরে শীতের নরম হলুদ রোদ । দুটো িকশাওলা [িসটের ওপর পা তুলে 
ঘুমোচ্ছে । সামনে সার সার দোকান রান্তার ওপারে । এই শশতেও ভেতরটা 
মেশিন চালিয়ে ঠাণ্ডা করে রেখেছে “করম্মশালা*রা । একটু একট সকালই ওদের 
পৌছে 'দিয়োছিল সবুজ জিপটা । চার ঘণ্টার রাস্তা । কাকভোরে বোরয়েছে। 
জিপটা আবার কোথায় যেন শহরে কাকে আনতে যাবে । অতএব নামো, 
নামো, নামো | 

ফিরে আসতে গিয়ে আর ঢোকার পথ পাচ্ছিল না সুধনরা । বড় রান্তায় 
একটা ঝকঝকে ত্রীফক পুলিশ গাঁজয়ে উঠেছে কোথেকে | হোটেলের মুখটা 
পুলিশে ছয়লাপ। সুধনদের ঠেসে চেপে কোণায় রেখে দল । আর তক্ষ্যাীন 
কোনো শব্দ না করে কুমিরের মতন কালো কাঁচে ঢাকা এক গাঁড় ঢুকে এল 
গাঁড়বারন্দার তলায় । সামনে পেছনে জিপ। গাঁড় থামতেই জিপ থেকে 
চিল-পাটকেল পড়ার মতন কালো পোশাক পরা ষণ্ডাগুণ্ডা কারা যেন নেমে 
বিভাগীয় মন্ত্রী সহদেব াব*বাসকে ঘিরে ধরল । 

ওনাকে মারবে না তো ? 

মারবে মানে? ওরাই বাঁডগাড€। ব্র্যাক ক্যাট। ভিড়ের মধ্যে থেকে কে 
বলে উঠল । 

ভিড়টা ঘুরে উীকঝ্ঁক মেরে সুধনদের দেখাঁছল । 

সহদেব িশবাস মাছ তাড়ানোর ভাঁঙ্গ করতেই কালো বেড়ালরা হটে 
গেল । এবার মালা । ফুল । টি ভ ক্যামেরা । বিভাগীয় মন্ত্রী হলে কণ হবে, 
দলের সত্তরজন 1বধায়কই সহদেব-এর কাছের মানুষ । তথ্য ও সম্প্রচারকে 
তাই একেবারে স্ট্যাঁণ্ডং ইনসস্ট্রাকশন দেওয়া থাকে, উনি যেখানে যাবেন 
পিছু নেবে। 

সভার মধ্যে এবার সহদেব 'ব*বাস বলতে উঠেছেন । চেহারা পালটানাঁন, 
জামাকাপড়ও না, তবু ক্যামেরাগুলো একেবারে কাছ ঘেষে এসে গুর ছবি 
নিতে আরম্ভ করল । একটা ছাপা কাগজ খুব কাছে এনে, দেখে দেখে, ভাঙা 
গলায় পড়তে আরম্ভ করতেই, পেছন থেকে আপাঁত্ত উঠল, ইংীরাজ নয়, 
ইংাঁরজি নয়। 

সহদেব 1িব*বাস একটু দমে গোঁছলেন প্রথমটা । পেছনে বসে আছে রমেন 
দাস আর ওর বউ দিলি । রমেন আর ছাল গলা 'মাঁলয়ে বলে উঠেছে। 
স্বেচ্ছাসেবী সংস্থা চালায় ৷ দেশাবদেশের টাকা পায়, মাঝে মধ্যে ইংল্যাপ্ড- 
আমোরকা ঘুরে আসে । বিশ্বনাথপুরের পণ্চায়েত-পাঁমীত চেয়ারম্যানের 
লোক । বশবনাথপুরের চেয়ারম্যান সহদেবের বিরোধী ক্যাম্প। হহমদো 
চেহারার একটা বেড়াল দুলতে দুলতে গিয়ে সহদেবের কানে কী সব বলে 
এল । 

বোধহয় রমেন লালর জন্মবৃত্তান্ত । 

সহদেব সামনে তাঁকয়ে আনমনে ঘাড় নেড়ে, একটা শাদা রুমাল মুখ. 


৯৭৭ 


মুছে আবার ছাপা কাগজটা দেখে দেখে ইংরাজি পড়তে লাগলেন । এতখাঁন 
এঁগয়ে এসে আবার ভাষণের অনুবাদ করে বলা গুর পক্ষে সম্ডব না। 

লাঁলরা একটু 'মান্ট হেসে চুপ করে রইল । 

ইয়াঁসন, তালেব ওরা এল না। 

দয়া বগরতাঁ মাঝে-মধ্যে পেছন ঘুরে দেখার চেষ্টা করছে__বাপা, তুই 
সামনে তাকা তো । 

সুধন বগর-তগ ভয় পাচ্ছে । বাপের হাতে বিপঞ্জনকভাবে ঠকঠকাচ্ছে 
দামশ কাঁচের কাপ-প্লেট ৷ পড়ে যায় যাঁদ। চা-টা অবশ্য ভাতের মাড়ের মতন 
খেতে । পাশের মণ্ডগু্‌লো যে চিন সেটা রসিক কামড়ে খেয়ে বলে না দলে 
বোঝা যেত না। ওদের সবাইকে চা খেতে বড় টোবলে ডাকা হয়োছিল। কিন্তু 
বাবুরা সবাই মশগুল । ঘাড় গ:জে হাতের কাগজে হিজাবাঁজ লিখছে । কেউ 
উঠতে চাইল না। কাজেই সুধনদেরও ওঠা হল না। তার বদলে শাদা ভীর্দ- 
পরা কিছ বেড়াল ওদের হাতে কাপ-ীডশ ধারয়ে দিয়ে গেল । চা চলকে পড়ে 
[বস্কুটগুলো ন্যাতা হয়ে গেছে । সুধনদের বলল, কাপ ভাঙবেন না, কার্পেটে 
ফেলবেন না- মনে থাকবে ? 

ইয়াসিন, তালেব, শঙ্কর ওরা তিনজন বাহাদুর করে নিজে নিজে আসবে 
বলেছে । 'জিগে আসত আরামে । না, নিজে এলে হাতে ক্যাশ টাকা দেবে 
ভাড়ার । 

দেখ দেখি গেল কোথায় ! এখনো তো পৌছালো না! 

1বশবনাথপুর থেকে কামারপাড়া, কামারপাড়া থেকে বাস-এ বেহরমপ*র 
হয়ে শহরে । অনেকটা পথ । 

ভরদুপুরে সুধনই গোঁছল ওদের ডাকতে । 

ণীজপে করে এসে সুগন্ধ-মাখা দুজন বাবু বশবনাথপুরে প্রান্তিক চাঁষ 
খঃজাছল, যারা এগারো নম্বর কেনালের ল্যাজের দিকে থাণ্ড । দিয়া বগর্‌ তী 
খাঁটিয়ায় শুয়ে শীত-রোৌদ্রে মৌজ করছিল | ঝকঝকে নীল আকাশের আভা 
লেগে কেবলই বুজে আসাঁছল দয়ার ঘোর-লাগা চোখ । 

পরশু যেতে হবে। সকালে জিপ এসে 'নয়ে যাবে । দেখো, আবার 
সট-কিও না যেন। বড় হোটেলে কর্মশালা । সেখানেই খাওয়া । রাতে চাঁষদের 
হস্টেলে রাখব । দান যাঁদ চাষবাসের ক্ষাঁত হয়, তা পাঁষয়ে যাবে । শহর 
দেখবে । 

চাষবাস কই যে ক্ষাত হবে ? মরা-হাজা এই কেনালে জল আসে না গত 
দশ বছর । খাঁরফে ধান তুলে দেয় কোনোমতে, তবে ভাব্রের শেষে বড় কম্ট। 

[িন্তু রাঁব চাষ এ অঞ্চলে হয়ই না। সংধন বড় বড় দাঁত বার করে হাসে । 

ওসব বলতে হবে না তোমার । ছোটবাকৃট রেগে ওঠে । বড়বাবৃঁট 
আঙুলের নীলা-পান্না-্ছুনির আধাটতে রোদ খেলায় । ণমাঁট মাটি হাসে । বলে, 
মাত্তর, তুমি আর পাগলাকে দিয়ে সাঁকো নাঁড়ও না, বুঝলে ! বছর বছর 
কেনাল প্লিপেয়ার কাঁরয়ে বিল তো দিচ্ছ বাপু । 


৯২৩ 


তারপর দুজনে মিলে বাঁশগাছের ছায়াতে দাঁড়য়ে লম্বা লিস্ট দেখে । 
দাগ দেয় রাঙা পেনাঁসলে । 

কামাখ্যাপ্র | ক্যানালের হেড এাঁরয়া। ওখান থেকে আসছে সম্পন্ন 
চাঁষরা। পার্বতীপুরের আখচাঁষরা একটা বড় দলে। ওদের মুখিয়া 
হোটেলের মালিকের সম্বন্ধী। প্রান্তিক চাষ চারজন । শেষে এসে ছোট- 
বাবুটি হাঁকে, ভূমিহীন ? 

ভঁমহীন কই ? 

বড়বাবুটি অবন্্াভরে বলে, ভূমিহীন কণ হবে ? দেখছ প্রান্তিক চাষ 
জল পাচ্ছে না আজ দশ বছর ! 

না স্যার, স্পেনসারের নাক ফোন এসোঁছল । ওয়াশশংটন থেকে 'দাল্ 
আঁফসকে বলেছে, ভূমিহীন চাই । 

ওদের প্রতিক্রিয়া লক্ষ করতে হবে। তাছাড়া কেনাল-কমাণ্ডপিছ: প্রাতি 
কো-অপরোটিভে একজন ভূমিহীন থাকবে:**। 

পরশুদিন সৌমনার । আজ ভরদুপুরে ভূমিহখনের ধুয়ো তুলো না তো 
মাত্তর ! 

কেন, এই গ্রামে যাঁদ কেউ থাকে । সুধন ! 

আজ্দে। ঘাস ছণড়তে 'ছি+ড়তে লাজুক সুধন উঠে দাঁড়ায় । আঙুলে কৃচি 
ঘাস, মাটি । 

ষড়যন্ত্রকারীর মতন সস্নেহ নৈকট্যে ঘাড় এনে 'িন্র বলে, তোদের গাঁয়ে 
ভূমিহীন নেই ? 

সোঁদন সধন্য হেটোছল মিব্রবাবুকে নিয়ে । মিঞা টোলতে, ঘাস 
পাড়ায় । তালেব, ইয়াঁসন, শঙ্করকে পাওয়া গেল । প্রায় পুরো পাড়াটাই গাঁ 
ছাড়া । মেয়ে বউ ছনড়া। রাঁবর মরশুম আরম্ভ হয়েছে । এখন আখের 
জাঁমতে লেবার দরকার । কাজের শোরগোল পড়েছে পাশের জেলাতেও। 
শঙ্কর খুব ম্যালোরয়ায় ভুগে উঠল পুজোর মরশহমে । তালেব, ইয়াঁসন 
রায়পুর থেকে ফিরেছে হপ্তাখানেক আগে । তালেবের হাঁটুতে চোট । একটু 
খোঁড়াচ্ছে এখনো । ওরা রাজ হওয়াতে বাবুদের ঘাম য়ে জবর ছাড়ল । 
'নাশ্চন্দি। কিন্তু তালেবরা জিপে যেতে রাজ হল না, কেন কে জানে! 
ক্যাশটাকা ভাড়া হাতে পাবে নিজেরা গেলে, তার ওপর বাসে, ট্রেনে কিট 
না কাটলে পুরোটাই লাভ । 

সুধন জানত, রান্তা চিনতে পারবে না ওরা কিছুতেই । এ শহরে ঠিকানা 
খোঁজা কি মুখের কথা ! তাই হয়েছে । ভূত তিনটে এখনো এসে পৌছোতে 
পারেনি। 

দিয়া বগর্তর মাথায় কোনো একটা চিন্তা ঢুকে গেলে আর বেরোতে 
চায় না। কেন এল না? বার বার ঘুরে ঘুরে দেখছে । প্রত্যেকবারই তার 
মাথার মধ্যে ঝাড়বাতিগুল দুলে উঠছে । 

সুদীপ্ত একেবারে পেছনের সারিতে বসেছিল । চায়ের বরাতির পর উঠে 


৯২৪ 


দেওয়ালের কাছে 'গিয়ে দাঁড়াল । প.রো দলটাকে এখন তিনভাগ করে তিনজন 
দলপতির নেতৃত্বে ছেড়ে দেওয়া হয়েছে । িশ্বাঁবদ্যালয়ের অধ্যাপক, 'সাঁবল 
ইঞ্জিনয়ার, সমাজসেবী, চাষ আমলা সবাইকে চানাচুরের মতন ঝাঁকিয়ে 
মাশিয়ে দল গড়া হয়েছে । যাতে সর্বশ্রেণীর প্রাতীনীধত্ব একেবারে সুষম হয়। 
মন্ত্রী চলে গেলেন। এখন চেলাচামুণ্ডাদের উৎপাত চলছে। কেউ মাগনায় 
চা চাইছে, কেউ দুপুরের খাওয়ার সময়ের আগেই কাটলেট চেখে দেখতে চায় । 

বিশ্বনাথপুরের ফোকলামতন বদ্ধ বিশেষ স্বাগত পাচ্ছে না। গুর 
ছেলেকে অন্য গ্রুপে দেওয়া হয়েছে । এক পাঁরবারের দুজন এক গ্রুপে নয়, 
1কছুতেই না। মতামতে নাক বায়াস ঢুকে পড়বে । বুড়ো ওর ছেলের হাত 
চেপে ধরেছিল, কিছুতেই ছাড়বে না। একেবারে ধ্যাধ্ধেড়ে গোঁবন্দপুরের 
লোক মনে হচ্ছে। সকালবেলা বাথরুমের নব উলটোদকে ঘুরিয়ে ভেঙে 
ফেলছিল প্রায় । 

সুদীপ্ত গয়ে পড়েছে ভাঁগ্যস ! 

কন হয়েছে, আমাকে বলুন । 

বাহ্য যাব কোথার বাপ আমার ? 

সুদীপ্ত টয়লেটের দরজা খুলে দিল। 

এইসব অসীবধের কথা মনে রেখেই ও পণ্চার়েত-ভবনে সোমনারটা রাখতে 
চেয়েছিল । বনা খরচায় হত। রান্না-খাওয়ার ব্যবস্থা জনাপাঁচেক রসংয়ে 
বাসুন হাড় কড়াই নিয়ে এসে করে দিত। শেষ মূহৃতে” জায়গা বদলাতে 
হয়েছে । সুদীপ্তর মন সায় দেয়াীন তবুও । বশাখাপত্তনমের নারায়ণ রাও 
আড়াই কোট টাকা খরচ করে এই হোটেল বাঁনয়েছে । এই পোর্টকো, ভেতরে 
ফোয়ারা, ঝুলন্ত বাগান_স-ব | সেই 'হিনচড়ে হোটেলে তুলে আনতে হচ্ছে। 
উদ্বোধন করেছেন িবভাগটয় মন্ত্রী সহদেব [াব*বাস নিজে । 

ওনার কর্মশালা" এখানে হবে না, হবে পন্ায়েত-ভবনে ? 

টাকা তো ?দচ্ছে াব্বব্যাংক, তোমার পকেট থেকে তো যাচ্ছে না! 

সহদেব বাস ভুরু তুলে সুদীপ্তকে জিজ্ঞেস করলেন । 

না, আমার পকেট থেকে যাচ্ছে না। (মনে মনে ) তোমার বাপের পকেট 
থেকেও না ! বলে সদীপ্ত বোরয়ে এসোছল সোঁদন রাগ করে। 

আজ ও হাড়ে হাড়ে টের পাচ্ছে, সৃপারভাইজ” করার জ্বালা কতখান । 
একে তো প্রেসের নানারকম হুল-বেঁধানো প্রশ্ন । হাউস ম্যানেজার বারবার 
ছুটে ছুটে সুদীপ্তর কাছে চলে আসছে । কে কার্পেটে চা ফেলেছে, কে 
বাথরুমের ফ্লাশ টানৌন। কে গ্লাসের জলে এটোহাত ধুয়েছে। এখন 
ফোয়ারায় কুলকুচি করাটা বাঁক আছে কেবল। সুদনপ্ত জেরবার । দুপুরে 
খাওয়ার সময় আরো ঝামেলা হবে | মোটা চালের ভাত খায় মামুল চাঁষরা । 
তাদের ওই কটকটে আধসেদ্ধ চালের ফ্রায়েড রাইস আর হাড়াঁজরাজরে 
মুরাঁগর টুকরোয় পেট ভরবে ? 

কামাখ্যাপুরের, পার্বতীপুরের চাঁষরা গম্ভীর মুখে আলোচনা শুনে 


১৭২৫ 


যাচ্ছে । ওরা কেউ বিশ্বনাথপুরদের সঙ্গে কথা বলছে না। নারায়ণ রাওয়ের 
সোহাগের পার্ট সব। খাবার সময় কেটারং ম্যানেজার নিজে এসে ঝ;কে 
ঝংকে ওদের প্লেট শঃকে গেল । বিকেলের মুখে রমেন দাস শোরগোল তুলে মাৎ 
করে দল । ওকে বলতে বলা হয়ান তখনো কিছু, টায়ার্ড কীষির অধ্যাপক 
খাঁড় দিয়ে বোর্ডে কী সব লিখে চলেছেন । রমেন দাস বলবেই । 

_এসব হল ভাঁওতা। পাঁচতারা হোটেলে আমাদের ডেকে ষড়যন্ত্রের 
শারক বানানো । জলের বণ্টন চাষ করবে ? আযাঁদ্দিন কোথায় ছিলে ? 
পারবতীপুরের জোতদারদের কাছে জাম বেচে এত লোক পালিয়ে গেল। 
ধানের জাঁমতে মাইলের পর মাইল আখ হচ্ছে । টেল-এ জল আসে না কত 
[দন । এগারো নম্বরে এ বছর আড়াই কোটির 'রপেয়ার হবে ? এই যে টাকা 
ঢাললে দশ-পনেরো বছর ধরে, কোথায় গেল ? আজ বলছ, জলকর থেকে খরচা 
উঠছে না। তাই জলকর বাড়াবে একর-প্রাতি একচল্লশ থেকে আশ টাকা । 
আমাদের মত চাও! তোমাদের আমিন যা পারোনি, চাষরা মিলে খাল হাতে 
সেই বকেয়া জলকর তুলবে ! চাই না এমন স্বায়ত্তশাসন ! 

চটাপট হাততাল। স্পেনসারের সেক্রেটাঁর তানিয়া বলে মেয়েটি 
শর্টহ্যা্ড বই আর পেনাঁসল নিয়ে সুদীপ্তর কাছে এসে দাঁড়য়েছে। এসব 
স্পেশাল রেসপন্স । টাইপ হয়ে ফ্যাক্স বদেশ যাবে । 

ইংরোজ ও গাঁগীল ভাষার এমন ফুলঝাঁর ছাটয়েছে রমেন ! সুদণপ্ত 
গম্ভীরভাবে দু-একটা বাক্য অনুবাদ করে দিল তাঁনয়াকে। লাল বেশ 
আলো-হওয়া-মুখে এঘর ওঘর করছে । তানয়া একসময় ওর সঙ্গে আলাপ 
করে নিল । চাঁষর জলবণ্টনের অধিকার নিয়ে এর পরের সোমনার দিল্লিতে, 
তার পর টাঁকতে। 

রমেন আর লাল ক ইণ্টারেস্টেড ? তানিয়ার কাছে 'প্রশ্টেড ফর্ম রাখা 
থাকে সবসময় । 

আধপেটা খেয়ে শরীর পাত । রাতে দমচাপা গরমে আইঢাই করে দেহ । 
ফ্যাকাশে চায়ে তার রুচি নেই । পরের দিন সকাল থেকেই দিয়া বগরৃতী 
বাঁহড় যাবার বায়না ধরেছে । 

সুধন্য নিজের গ্রুপ থেকে পালিয়ে বাপের কাছে এসে বসেছে কাল বিকেল 
থেকেই । সুদীপ্ত চোখ টিপে ঘাড় নেড়ে দিয়েছে একবার । কিন্তু বাঁড় যাওয়া 
যায় নাক এভাবে £ দুপুরের খাওয়া, আবার চা । চারটের সময় সাম-আপ। 
তারপর আবার ভাষণ । কালো বেড়াল । টি ভিক্যামেরা। 

তালেব, শঙ্কর ওরা [ি:.'। 

সাম-আপের সময় দরজায় ঝটাপট--এসে গেছে, এসে গেছে । হাঁপাচ্ছে 
ওরা তিনজন । উশকোখুশকো চুল । গায়ে ঘাম ৷ পেট ভেতরে ঢোকা । সধন্য 
পেছনে তাঁকয়োছল । আর থাকতে না পেয়ে আইনের শাসন ভেঙে তালেবদের 
হাত ধরে বাইরের চাতালে নিয়ে গেল, যেখানে ফোয়ারা চলছে আবরাম । 

কোথায় ছিলি এতক্ষণ ? 


৯২২৩ 


ওরা হাঁ করে ছাত, কার্পেট, ঝাড়লণ্ঠন দেখে যাচ্ছে । যা দেখে সুধন্য- 
1দয়ার পেট এতক্ষণে জয়ঢাক । 

পকেটের কাগজে কেবল হোটেলের নাম লিখে এনেছিল । ঠিকানা নেই, 
রাস্তার নাম নেই । গতকাল ভোরে বাস থেকে টইটই করে হাঁটাপায়ে 
ঘুরেছে। রাতে বাস ডপোর চাতালে ঘুম । সকালে আবার হাঁটা । শেষে 
একজন লোক খবর কাগজের 'িপোর্ট পড়ে জায়গাটা বাংলে দেয় । তালেবের 
রাস্তা পেরোতে ভয় । ভূলভাল পথে বেঁকে গেছে কতবার । 

বড় মান্দিরে যাসাঁন ? চাঁড়য়াখানায় ? 

কিছু দেখা হয়ান। তবু ধুলোপায়ে এসে যে পেশছেছে শেষপর্যন্ত এতেই 
কৃতার্থ তালেবরা । 

রিসেপশন ডেস্‌্কের লোকেরা ওদের ঢুকতেই "দাঁচ্ছল না। বলাছল, সব 
তো শেষ এখন এসে কী করবে ? 

যারা ওই টোৌবলে বসে নামধাম ঠিকানা টোকে, সরকার লোক, তারা 
ব্যাজার মুখে বলে, এরা তো আযাটেণ্ডই করোঁন, এদের বাসভাড়া দেব ?ক ? 

সুদীপ্ত হেসে তানিয়াকে ডেকে বলল, ইয়োর ল্যাণ্ডলেস-, হ্যাভ 
আরাইভড | 

আযা, তাঁনয়া কাছে এসে তালেবদের দেখে । 

সুধনের মধ্যে একটু একটু নেতাভাবের জোয়ার আসছে এই দেড়াদনে । 
ও দাঁত বার করে, হাত জুড়ে বলে, ম্যাডাম, ওদের ভাড়াটা দিতে বলুন না। 
গাঁটের পয়সা খরচ করে এসেছে । 

সুদীপ্তর মধ্যস্থতায় এক এক প্লেট কড়কড়ে ভাত আর ঝোল খেয়ে 
ভূমিহশীনরা সন্তুষ্ট । টাকা পাওয়া গেছে । ভিড় ভাঙার মুখে শঙ্কর একটু 
থমকে গিয়ে দাঁড়ায় । সন্ধের মুখ | সভা ভাঙছে । মানুষজন বাঁড় যাচ্ছে । 
গাঁড়বারান্দায় হুস হুস করে এক একটা গাঁড় এসে দাঁড়াচ্ছে, পেটের মধ্যে 
সায়েবমেনদের তুলে 'নয়ে যাচ্ছে । 

সুধন্য, দিয়া দুজনেই ানীজেদের ফোলও ব্যাগ আঁকড়ে, দাঁড়িয়ে তাতে 
ব্রাউটনের ওপর শাদা দিযে লেখা £ চঢাষদের জলবণ্টন ও সসটেম রক্ষণাবেক্ষণ 
কমশালা" । আমাদের ওইরকম ব্যাগ দেবে না? 

ব্যাগ না নিয়ে পেশছলে 'িব*বনাথপুরে কেউ কি বিশ্বাস করবে ? রাস্তা 
হাঁরয়ে ফেলেছিল কেরামাতি করতে গিয়ে এ খবর তো চাউর হয়ে যাবে 
আগেহ্‌। 

এখনো ডাঁই করা কিছ ব্যাগ টোবলে, তবু কেরানীবাবুরা গোঁজ হয়ে 
বলে, না না, দেওয়া যাবে না। আযাডেণ্ট করেনি,_কছ: না, ব্যাগ কীসের ! 

সুদীপ্ত বলে, আরে দিয়ে দিন না দুটো ! কতদর যাবে ! 

স্যার, দুটো ক পাঁচটা সেটা ব্যাপার নয়। আঁডট ধরবে ষে। ওদের 
জায়গয়ি অন্য তনজনকে লোকাল 1নয়ে আসা হয়েছে, তারা টি. এ নেয়ান, 
ব্যাগ নিয়ে গেছে তো! 


৯১২৭ 


সুদীপ্ত হেকে বলে, আপনাদের পকেট থেকে যাচ্ছে নাকি ! আশ্চর্য তো, 
দিয়ে দন! 

বাড়ীতি ব্যাগগুলো হাতবদল হয়ে কোথায় যাবে ওর জানা । 

কামারপাড়ায় বাস থেকে নেমে সুধন বলে, আয় হাঁটি । বাসে ভিড় 
[ছিল না। ওরা ভালোমতন বসেই এসেছে । এত রাতে আপ বাসে কে চড়বে ! 
ধবশাখাপত্তনম, 'বাঁজয়ানগরমের ব্যবসাদাররা ট্রেনই পছন্দ করে বোঁশ, রাতের 
মাদ্রাজ মেল । 

ঘোরলাগা কুয়াশায় দেহে শীত জাঁড়য়ে সুধন্যরা হাঁটে । দুই প্রান্তিক 
চাঁষ, তিনজন ভূমহবন । ফোলও ব্যাগগ্ীলকে কাঁখের শিশুর মতো সযত্তে 
ণনয়েছে । হাতে থলে, পোঁটলা । খোলা হাওয়ায় ন*্বাস িনতে পেরে দিয়া 
বগর-তশর পাঁজরের হাড় আনন্দে উঠছে পড়ছে । কামারপাড়ার টেম্পো, 
ট্রেকারঅলারা ঘুমোচ্ছে। এত রাতে কেউ যাবে না। আড়াই ক্োশ তো রান্ভা 
গব*বনাথপুরের, এক ঘণ্টায় পৌরয়ে যাবে অনায়াসে । 

রাঁসক ওঝা ওদের সঙ্গে ফেরোন। পুরীর মান্দর দেখবে বলে রাতের 
উলটো বাস নিয়েছে । কিন্তু যাবার আগে একটু বিষ ঢেলে দিয়ে গেছে 
সধন্যর প্রাণে । 

রমেন দাস প্রথম দন যে হাম্বিতাম্বি করাছল, "দ্বিতীয় দিন কেধ্ল মুচাঁক 
হাঁস, মুখে কুলুপ । কেননা তুরস্ক-মুরস্ক কোথায় নিয়ে যাবে ওকে, ওর 
বউকে, সায়েবদের হুকুম । ওতেই তেজের দফারফা । কিন্তু যা সব বলাছল 
ও, সেই ?হসেবগুলো কা মথ্যে ? প্রথম দিনের কথাগুলো ? 

কত-শো কোটি টাকা যেন খণ নিয়েছে সরকার, ওই কেনাল-াসম্টেমের 
নামে- চাঁষদের বলোন তো! একশো হাজারে লাখ হয়। একশো লাখে 
কোটি! 

নতুন বাঁধকেনালে, আখ হবে, তামাক, সূর্যমুখী, ফলফুলহার । ধানের 
দিন শেষ । এই দাক্ষণের নোনা অণ্ল থেকে হাজারে হাজারে চাঁষ জাম 
হস্তান্তর করে চলে যাচ্ছে কাজের খোঁজে । অন্য জেলা, পাশের রাজ্যের বড় 
চাঁষরা বেনামে চষছে, অথবা কিনছে সেই সব জাঁম। 

অত টাকা লোনের সুদই আরও কত কোটি টাকা ! যাঁদ জলকর চাঁষই 
তুলবে তবে সবচেয়ে আগে চাঁষদের মতামত নিলে না কেন ? রমেন গর্জে 
উঠছিল প্রথম দিন বিকেলে । এখন ও ছ্যাঁকা-খাওয়া সাকাঁসের বাঘ । 

সারা দেশের হিসেব মেলালে এত টাকা লোন নেওয়া হয়েছে বিদেশীদের 
কাছে যে এখন থেকে যে বাচ্চা মায়ের পেটে আছে, সেও মাথাপিছু কতশো 
টাকার কর্জ নিয়ে জন্মাবে ! 

সুধন্যর মনটা খচখচ করে। ওর বউ পোয়াঁত। আগামী বোশেখেই 
নতুন বছরের গোড়ায় ছেলে ক মেয়ে আসবে কিছু একটা । ধার 1নয়ে জন্মাবে 
সুধনের প্রথম সন্তান । বাপের ধারই তো শুধতে পারেনি সুধন, আর এ 
তো না-হওয়া সন্তান । অথচ ওরা সবাই দুঁদন হোটেলে খেয়ে মৌজ করে, 


৯২৮ 


ব্যাগ কাঁখে নিয়ে ঘরে এল । মুখে তালা আঁটার জন্য ঘুষ । ঘুষই তো বলে 
একে । সায়েব মহাজনের ব্যাপার-স্যাপারই আলাদা । 

সেদিন মাত্তরবাবুূকে নিয়ে মিঞ্য টোল, ঘাসে পাড়ায় কেন যে গেল 
সনধন ! কেন যে ওভারাসয়ারের সবুজ জিপে বসতে গেল ! সুদ দিতে-দিতেই 
সুধনের পলকা জীবনটা বোরয়ে যাবে এবার । 


৯২২৯১ 
চন্দনরেখা--৯ 


্ম লাহাত্ডজ্র াতা? 


শশীবাবুকে আম প্রথম দোখ মেজদাদের ঢেনকানলের বাড়তে । ঠিক শহরে 
নয়, শহরতাঁল যেখানে আরম্ভ হয়েছে, রাপ্ভার দুধারে বাঁড়ঘর পাতলা হয়ে 
এসেছে, তারপর শালের চারা ও মহীরুহে আকীর্ণ টাঁড় জমি-_-। তারই কাছ 
ঘেইষে ছোট একটা টিলার ওপর বাঁড়টা। িলার কোমরে বেড় দিয়ে পিচ 
রাস্তাটা 'সড়র নীচে পোৌীচেছে। কুঁড় বাইশ ধাপ ?সখঁড় ভাঙলে তবেই 
বাঁড়র ঢাকা বারান্দা । বাঁড়টা ওখানকার রাজাদের কোনও জ্ঞাঁতিরই ছিল, 
তারা দেখাশোনা করতে পারেনি শেষ পন্ত। তাই মেজদাদের সুতো কলকে 
লম্বা 'লজ-এ 'দয়ে দয়েছে । ওই ঢাকা বারান্দা থেকে ডেনকানল শহরের ঘর- 
বসত চোখে পড়ত, নীলাভ ঢেউখেলানো পাহাড় দিগন্তে পিঠ দিয়ে ঘুমোত, 
বাঁড়র কাছেই রোদে ঝলমল করে উঠত শালের জঙ্গল। 

আমার বয়স তখন সাড়ে সতেরো । আম এমাঁনতেই যাকে বলে ঠ্যাঙঠেঙে 
রোগা, রং কালো । বাড়তে ফ্রুকই পার, কারণ শাঁড় পরার নানান ঝামেলা । 
জেঠিমা বলত, শাঁড় পরতে তিন-ীতনটে 1্জানস লাগে, ফ্রকে একটাই । আর 
তোর যা চেহারা, খুঁক, তাতে কেউ তাঁকয়েও দেখবে না-_বলে চোখ মটকে 
হাসত। আমার লজ্জা হত, অপমানও । কারণ আম তো নতুন শাঁড়-শায়া 
1কছুই চাইতাম না ওদের কাছে । মায়ের পুরনো শাঁড়ই পরতাম। বড় জোর 
দুটো নতুন ব্রাউজ ঘরে মা-ই বানিয়ে দিত। কিন্তু ওই বয়সে বেড়ে না ওঠার 
লঙ্জাটা শাঁড়তে যেমন ঢাকা যায়, ফকে ততটাই প্রকট হয়ে পড়ে পথেঘাটে। 
সেটা আমাকে ভীষণ কম্ট.দত | কিন্তু বাবা মারা যাবার পর মা নিজেকে 
একেবারে গাটয়ে 'নয়েছিলেন । এই সব ব্যাপারে জেঠিমার ওপরে কারও 
কথাই চলবে না জানতাম । 

মড়ার ওপর খাঁড়ার ঘায়ের মতন আম এইরকম বয়সে জলবসন্তে 
শয্যাশায়ী হয়ে পড়লাম । অসুখটা আমার ভাই বাগ্পা স্কুল থেকে বাধিয়ে 
এনোছিল। বাপ্পার থেকে আমার হল। বেশ ভালরকমই হল । প্রবল জহর, 
সারা শরীরে ব্যথা, রাতে প্রলাপ বকা থেকে 'দনে নানা কুস্বগ্ন দেখে ভয়ে 
চেঁচিয়ে ওঠা ! মায়ের রাত জাগা, দিনে রান্নাবান্না । চোখে চশমা ছিলই, 
কন্তু দ্ান্টি আরও ক্ষীণ হয়ে গেল বসন্তের পর। মুখে, হাতে, গলায় 
এত দাগ যে মা-জেঠিমার মাথায় হাত। নাকের পাটার ওপর একটা গুটি 
খ*চয়ে দিয়েছিলাম, সেটা একটা খোয়া যাওয়া নাকছাঁবর দাগের মতন 
দেখাত । 

এইরকম সময়ে মেজদা আমাদের বাঁড়তে এল । মেজদাদের হেড আফস 
ছল কলকাতায় । তিন চার মাসে একবার কলকাতায় আসত কাজে । মেজদা 


১৩০ 


আমার পিঠে আদর করে হাত বলয়ে বলল, চল বি, আমাদের বাঁড় চল ॥ 
শরীরটা সারয়ে আসাঁব। আমার ভাল নাম আঁনান্দিতা, ডাক নাম টিয়া। 
কিন্তু জেঠিমা-জেঠু খুকি বলেই ডাকতেন । আর সবাই ইচ্ছেমতন নাম বদলে 
বদলে ডাকত । এটাও আমার একদম ভাল লাগত না। 

মেজদা আমার নিজের দাদা নন, মায়ের বড় মাসির ছেলে । ?বহারে জন্ম, 
ওখানেই মানুষ । 1কন্তু বাবা যখন বেচে ছিলেন, মেজদা একবার তিনমাস 
আমাদের বাড়তে ছিল, কলকাতায় নানা লাইব্রোরতে ঘাওয়া-আসা করত । 
সেই কৃতজ্ঞতার রেশ চাকার পাওয়ার ও আরও ওপরে উঠে যাওয়ার পরও উবে 
যারাঁন। 

মা শুনে কৃতার্থ হয়ে গেলেন । তব একট ভয়ে-ভয়েই বললেন, মৌসুমী 
জানে না তো! মৌসুমী মানে মেজবৌদ ৷ মেজদা হেসে বলল, আমরা গেলে 
দেখতে তো পাবেই । মেজদার এই স্নেহও অবশ্য পুরোপার নঃস্বাথ ছিল 
না, সেকথা আমরা সকলেই জানতাম । ওদের ছেলে টুবলা তখন মাস 
চারেকের, দেখাশুনোর জন্য স্থানীয় লোকজন আছেই । মেজদার শাশুড়ীর 
বন্তব্য হল, দের ভাষা অনবরত না শুনলে ছেলের মুখে বাল ফুটবে না। 
সুতো কলের জি. এম-এর বৌ-বোৌঁদর অনেক কাজ ঘরে ও বাইরে--সামাঁজক 
দায়। কাজেই টুবলার কানে কলকলানোর অনেকটাই আমাকে করতে হবে । 

তবুও আমার ভাল লেগোছল নেজদান সঙ্গে কলকাতা ছেড়ে চলে আসতে। 
কলকাতা থেকে রাতের গাঁড়তে কটক। সেখান থেকে ঢেনকানল । মটরগাঁড় 
চড়ার উল্লাসে মনের মধ্যেটা কেপে কেপে উঠেছিল । পিছনের সিটে আম 
আর মেজদা । সামনে ওদের মিলের একজন ভদ্রলোক | মালগোদাম অঞ্ুলটা 
ঘাঞ্জ, দ্রাকে বোঝাই । কিন্তু একট এাগয়ে ডাইনে ঘুরে চেক-গেট পেরোতেই 
হলুদ রোদে দূরের পাহাড়শ্রেণনী, উচু নীচু জম, জঙ্গল ঝলমল করে উঠল । 

মেজদাদের বাড়তে পৌছোনোর সম্ভবত তনাঁদনের মাথাতেই আম 
শশীবাবুকে দোখ। তেল দিয়ে পাট করে আঁচড়ানো ঘন ছল, ঘি রঙের 
খদ্দরের পাঞ্জাব আর ধুতি পরা, চুলের মতনই পুষ্ট কালো গোঁফ, মুখে 
একটা কৃতার্থ হয়ে যাওয়া মৃদু হাস । 

মৌসুমী বৌঁদ তখন নত্যানন্দ, মানে, যে ছেলেটা বাজার আর রান্না 
করে তাকে বকাঁছলেন, আল-পেয়াজ আনোন বলে। 

শশীনাবু বারান্দার সামনে নুয়ে দাঁড়িয়ে ক্যাকটাসগুলোকে খুব মন 
[দয়ে পরীক্ষা করাছলেন। তলার নাুঁড়গুলোকে উল্টেপাল্টে 'দাচ্ছেলেন। 
বারান্দার পাশ দিয়ে গেলে বাঁড় থেকে বেরোনোর একটা খিড়াক পথ ছিল, 
সেই পথে নীচে আসার 'সিশড় ভাঙতে হত না। 

মেজবৌঁদি বাইরে আসতেই শশীবাবু কেমন একটা সন্তপ্ত মুখে সোজা 
হয়ে দাঁড়ালেন, হাতজোড় করে নমস্কার করার সময় গুর ঘাড়টা কাত হয়ে 
গেল। উীন যে কোনও কাজে এসে থাকতে পারেন, দেখলাম মেজবৌদি সেটা 
খেয়ালই করলেন না। বেশ তেজী গলায় বলে উঠলেন, এই যে শশনবাবু, দু 


১৩৯ 


কোঁজ আলু আর এক কেজি পেয়াজ এনে দন তো। আপাঁন তো ওাঁদকেই 
থাকেন। 

বাজারের দিকেই শশশবাবুর বাড়ি । কিন্তু আল-পেয়াজ পৌছতে গেলে 
গুকে আবার এঁদকেই ফিরতে হবে । এমন ধরনের অনুরোধের মধ্যেই একটা 
প্রচ্ছন্ন অন্যায় আছে । 

শশীবাব্‌ হাসমুখে বলে উঠলেন, এ আর বোঁশ কথা কণ মা, দিন__ 
একটা থলে দিন না। 

সাইকেলটা নিয়ে ভদ্রলোক বোঁরয়ে গেলেন, ফিরেও এলেন সেইরকম খর- 
রৌদ্র, পিচের কাছে পাঞ্জাবটা ঘামে ভেজা । থলে না খুললেও বোঝা 
যায়, যেরকম যত্বে ভদ্রলোক ক্যাকটাসের টবের নাঁড়গুলোকে উল্টেপাল্টে 
1দচ্ছলেন, সেই একই মমতায় প্রাতিটি নখত আলু আর নজ্কলগ্ক পেয়াজ 
বেছে এনেছেন। 

বাজার দেখে মেজবোৌদির মুখ প্রসন্ন হল, শশবাবু কিন্তু কোনও 
সম্ভাষণ বা ধন্যবাদ পেলেন না। 

শশীবাবুর বয়স চাল্লশ পেরিয়েছে বলেই মনে হত। 'িশ্য়ই ঘরে ওর 
স্তী-পৃত্র-কন্যা ?ছিল। তাদের কথা অথবা শশীবাবুর জাগা তক কুশল 'নয়ে 
কোনওরকম আলাপ শুনৌছ বলে আমার এখন মনে পড়ে না। গরমের দিনে 
এক গ্লাস ঠাণ্ডা জল অথবা এক কাপ চা শশশীবাবুকে কেউ কখনও দিত না। 
কলকাতায় আমাদের গাঁরব ঘরে কেউ এলে আম জে থেকেই চা-জল 
দিতাম, বলতে হত না। জি. এম-এর বাংলোয় আমার সে সাহস হয়ান। 
মেজবৌদি বলত, বোশ খাতির করলে এখানকার লোক মাথায় চড়ে বসে। 
অথচ শশীবাবূর মতন একজন মাঝবয়েস লোক শোবার ঘরে দিনদুপুরে 
ঢুকে পড়েছেন, মানে, গুকে ডেকেই আনা হয়েছে, এতে কারও কিছু মনে হত 
না। 

লোকাঁটর কাছে একটা কালোর ওপর লাল সুতোর কাজ করা ঝোলা 
সর্বদাই থাকত । কখনও কাঁধে, কোনও দন সাইকেল-এর কোরয়ারে রেখে 
আসতেন । সেই আশ্চর্য ঝোলার মধ্যে একটা মহা পাঁথবী ধরে যেত। নাট- 
বল্টু, স্কু ড্রাইভার, টেস্টার, গালা, কাঁচি, সুতো, ছংচ, মোম*"'কী নেই ! 
একবার অসময়ে বাড়তে লোকজন এসে পড়েছেন, মেজবৌদ মশার দাঁড় 
খ*জতে 'গয়ে রাগের মাথায় ড্রয়ার টেনে ফেলে দিচ্ছেন, এমন সময় শশীবাবূকে 
কে যেন বাইরে থেকে ডেকে আনল । উন একটা লাইব্রৌরর বই ফেরানোর 
জন্য নিয়ে যেতে এসোৌঁছলেন । শশীবাবু পাম্পশহ শ্রদ্ধাভরে বাইরে খুলে 
রেখে ঝোলা থেকে একরাশ দাঁড় বার করে বৌদকে 'দলেন। সায়া বা 
পাজামায় পরানোর জন্য আনকোরা নতুন দাঁড় । ছ-সাত মিটার মতন। তাও 
ওই লোকটি সঙ্গে নিয়ে ঘুরে বেড়াচ্ছে । 

সাত্যই একাঁদন মাঝদুপুরে গুকে বৌঁদদের শোবার ঘরে দেখোছলাম । 
টুবলাকে যে দেখে সেই হিরণ িছনদিকে নিজের ঘরে খেতে গেছে, মেজদা 


৯৩৭ 


আঁফস থেকে লা-এ ফিরেছেন । ডাইীনং টেবিলে মেজবোদি মেজদার সঙ্গে 
খাচ্ছেন । আম টুবলার কাছে বসে আছি। 

এমন সময় ব্যন্তভাবে শশীবাবু এসে ঢুকলেন। সঙ্গে একটি রোগা ছেলে, 
মাথায় কোঁকড়া ঝাঁকড়ামতন চুল। তার কাঁধে মই। দেওয়ালে 1টউবলাইটের 
ফেম ইত্যাঁদ লাগানোই ছিল । বৌঁদ কয়েকদিন ধরেই বলাঁছলেন ছোট বালবে 
ভাল আলো হয় না, খরচও বোশ--তাই ইলেক-দ্রীসয়ান এসে ফেমটা ফিট 
করে 'দিয়ে গিয়োছিল, হয়তো বাল-বটা তখন কাছে ছিল না। ছেলেটা মই 
ধরল দহ হাতে চেপে । শশীবাবু স্নেহভরে আমাকে বললেন, খুকু আসন 
তো, আমাকে একটু বালবটা তুলে দেবেন । “খুকু'র সঙ্গে “আসন” আমায় 
মুগ্ধ করল । সঙ্গে সঙ্গে এও বুঝলাম, এ বাড়তে আমাকেই শশীবাবু ডাকতে 
পারেন । উন আবছাভাবে বোঝেন, কে কোথায় দাঁড়য়ে । শশনীবাবু তাহলে 
বিজালর কাজও জানেন ! টুবলাকে বিছানায় রেখে আড়াআঁড় লাঠির মতো 
আলোটা গুর হাতে তুলে দিলাম । ঘরে একটা ষাট পাওয়ারের বাল-ব ছিল, 
তার মাথায় সেকেলে ধাঁচের টোপর | গম্ভীর মুখে শশীবাবু মইটার জায়গা 
বদল করে সেইটাও টেস্ট করতে গেলেন । দেখা গেল বালবটা জবলছে না। 

ইস. ফিউজ হয়ে গেছে! 

কী হবে! মেজবৌঁদর হয়ত খেয়াল চাপল আজ সম্ধেবেলা ওটাই 
জবালবেন ! 

বেশ তো। ঝোলাব্যাগে হাত দিয়ে আর একটা বালব বার করে আনলেন 
শশশবাবু। 

আপাতত এটা লাগয়ে দিয়ে যাচ্ছ, আমার নিজের জানিস, পরে 1দয়ে 
দিলেই হবে । বলবেন বৌঁদিমাঁণকে । 

পরে জেনোছলাম এই সব ঝড়াঁত-পড়াত কাজই আসলে শশীবাবূর 
জশীাবক্কা। এই বাড়তে কোনও কাজেরই মূল্য পেতেন না উান। শহরে এমন 
কত বড় বাড়তে এ ধরনের ফাইফরমাশ খাটতেন, আন্দাজ করার চেষ্টা 
কাঁরনি। খাটতেন নশ্চয়ই ৷ কারণ, মনে হত, এই সব পাঁরবেশে আপনমনে 
কাজ করেও উন আনান্দিত, কৃতার্থ বোধ করছেন । হয়তো তোবড়ানো 
ডেকাঁচর পোড়া তলদেশের মতন গর একটা সংসার আছে, যেটার কথা 
শশীবাবু কাউকে বলতে চান না। বাড়তে দুটো মোটে ঘর, বারোয়ার 
বাথরুম, সেখানে আত্ডা বসানো যায় না। বাড়তে হয়তো গর হাঁপানির 
রোগী আইবুড়ো বড় ভাই থাকে, বৌয়ের ছেড়া শায়া সন্তা শাঁড়র নীচ 
দিয়ে উক মারে, দুটো অসংন্দর ছেলেমেয়ে সারাদন খাই-খাই করে ঘুরে 
বেড়াচ্ছে নেহাত ঘুমে শরীর জাঁড়য়ে না এলে বা ক্ষদেয় পেটে মোচড় না 
দলে শশশবাবুর ওই বাঁড়তে ডুকতে ইচ্ছেই করে না। 

একাঁদন হঠাৎ সব 'কছু বদলে গেল। মেঘের উ্ণাজাল ভেঙে যেমন 
পার্ণমার চাঁদ বার হয়ে আসে, তেমন সাংসারক ঝৃলকালমাখা সঙের 
আুখোশ খখলে ফেলে শশীবাবুর আঁন্তত্ব চিরে একজন মানুষ বের হয়ে এল ॥ 


১৩৩ 


সেই কথাটা এতাঁদন পরেও যতবার ভাব, আমার গায়ে রোমান হয়। 

অথচ শশশবাবৃকে কোনওদন যে কেউ বসে বাঁশ বাজাতে বলবে এটা, 
আমার মনেই হয়াঁন। দুটো কথা বলার জন্যই গুঁকে বসতে বলোন কেউ । 
দাদাই বলোছল, শশশবাবু, আপাঁন বাঁশিটাঁশ বাজান না! একটু বাজিয়ে. 
দেখান না এদের ! 

এদের মানে মেজবৌঁদির ভাই, ভাইয়ের বৌ, তাদের দুই বন্ধু, বন্ধুর, 
অজ্পবয়স মেয়ে ইত্যাঁদদের। এরা কলকাতা থেকে গতকালই এসে 
পেীচেছে। শালবন, সূর্য ওঠা এই সব দেখে 'ীবস্ময়, মুগ্ধতা কিছুই 
কাটোন। সবতাতেই এ ওকে ঠেলে গাঁড়য়ে যাচ্ছে । মেজবৌঁদর বানানো লিস্ট 
থেকে রান্না হচ্ছে । দুপুরের খাওয়া শেষ হতে 'াবকেল হয়েছে । কাজেই 
রাতের রান্না এগারোটার আগে হওয়ার কোনও আশা নেই। দক্ষিণের 
বারান্দায় সতরাণ পেতে হারমোনিয়াম রাখা হয়েছে । সন্ধে থেকে নানা 
শৈলীর রবীন্দ্রসংগীত, নজরুলগীতি, গণসংগীত শুনে আমি হয়রান হয়ে 
গোঁছ। আম ?ানজেও একট-আধট গাই, ওদের চেয়ে খুব খারাপ যে তাও 
নয়, িন্তু বৌদ আমাকে গাইতে বলবে না আম জাঁন। তার ওপর টুবলা 
আমার কোলে । নটার পর টুবলা ঘমোলে আম হাতদুটো মাথার ওপর 
তুলে টান-টান করে লাম । মায়ের একটা পুরোনো চাঁপারঙের শাঁড় 
পরোছি, নিজের নতুন রাউজের সঙ্গে ৷ বারান্দার ফাঁক ঘুরে গানের আসরের 
পুরোনো থামগুলর কাছে ফিরে আসতে আসতে আম শশীবাবুর মদ 
লঁজ্জত আপাতত শুনাছলাম | 

নানা, সে আবার কি, আমার আবার""" 

বোৌঁদির ভাই সংমন্বদা বেশ ভারাঞ্ধি চালে বলে উঠলেন, তাতে ক, বাজান 
না_-আমরাও কি আর আসরে গাই ! 

মেয়েরা কেউ কোনও আগ্রহ প্রকাশ করল না। অথচ 1বস্ময়মাখা 
নিস্পৃহতা নিয়ে শশীবাবুর সামান্য নুন-পড়া গ্রাছের মতো ভীঙ্গ দেখতে 
লাগল । শশীবাবুর মতন মানুষকে িল্পীর আসনে চট করে বসাতে এদের 
যে মান টনটানয়ে উঠছে বোঝা গেল । শশশবাব আবার কৃতার্থভাবে হেসে 
নূয়ে পড়ে বললেন, আম সামান্য লোক, আপনাদের সামনে**" 

দাদা ব্যস্ভভাবে বসার ঘরের 'দকে হেটে চলে গেলেন । তাতে শশবাবূর 
সম্ভ্রম আবার ঝট- করে নেবে গেল । মেজবৌঁদি অসাঁহঞ্ণু গলায় বলে উঠলেন, 
বাজাবেন তো বাজান না, অত সাধাসাধর কী আছে, দেখছেন তো রান্না শেষ 
হতে ঢের দৌর""" 

ওদেশে তখনও টাভর জমানা শুরু হয়নি, এটা বলা প্রয়োজন এখানে । 

শশীবাবু একট: ইতন্তত করে ডেকে উঠলেন, খোকন, আাই খোকন ! 

সেই ছেলেটা এল দেখলাম । এরই নাম খোকন । শশীবাবুর ভরদুপুরের 
বজাঁল বাতির শাগরেদ, যে মই ঘাড়ে এসোঁছল । িকাঁলকে রোগা, ঝাঁকড়া 


৯৩৪ 


চুল। কোথা থেকে বোরয়ে এসে একট. উধীক মেরে, দাঁড়ান, আনছি বলে চলে 
গেল। এরা যেন বড় এই অন্যমনস্ক বাঁড়টার ফাঁকে-ফোঁকরে কোথাও 
অনায়াসে লীকয়ে থাকে । এক লহমায় ফিরে এল ডুঁগতবলা সঙ্গে 'নয়ে। 
এটাও ক বসার ঘরের কোনও কোণায় থাকে অথবা রান্নাঘরের পিছনে ! 
আত্মমগ্রভাবে হাতুড়ির ঠুক- ঠুক- আরম্ভ করে দিল খোকন । 

যেন দম বন্ধ করে থাকতে থাকতে নিজেরই পাঁজর ফাঁটয়ে হা-হা করে 
ছুটে এল হাওয়া । আকাশে তারা দেখা যায় না, হাল্কা আগুনের মতো 
অন্ধকার তার অবয়বে জাঁড়য়ে রয়েছে, ওরা ক মেঘ ? 

শালবনের আঁদম গন্ধ বকুলের স্মৃতি ভারাতুর সুবাসে মিশে যাচ্ছে টের 
পাচ্ছিলাম । 

শশীবাবু ঝোলা হাতড়ে একাট চিকন কালো আড়বাঁশ সাবধানে বার 
করে আনলেন । প্রথমে দারুণ স্নেহে একটি আঙুল বুলিয়ে আনলেন বাঁশর 
সবাঙ্গে, যেন মনঁড় দিচ্ছেন । তারপর চোখ বন্ধ করে মন্ত্রোচ্চারণের ভাঙ্গিতে 
বললেন, মিয়াঁ কি মল-হার বাজাই ? 

কেউ উত্তর দিল না। অল্পক্ষণ চুপ করে থেকে শশনবাবু তাঁর হাওয়া- 
যন্তে ঠোঁট রাখলেন । ঘরের ভেতর থেকে আ'ম একদন্টে গুকে দেখাছলাম। 
দেখাছলাম চুম্বনযোগ্য দূরত্বে প্রোমকার সানধ্যে এলে প্রোমকের মুখ যেমন 
প্রেমে ও কাতরতায় উজ্জল হয়ে ওঠে, তেমন আলোমাখা তন্ময়তায় শশীবাবু 
বাঁশতে ফঃ দলেন। প্রথম দু,এক 'মাঁনট কিছু বোঝা গেল না। আলাপের 
লজ্জা কাঁটয়ে স্‌র যেন শালবনে অন্ধকারে খেলা করে বেড়াচ্ছে, এমন মৃদু 
অথচ বহল। তার পরে বাঁশর চলন দ্রুত হল । আকাশের কোথায় কী হচ্ছে 
স্পস্ট না হলেও আমার মনে হচ্ছিল, আমাকে িরে বৃম্টি পড়ছে । আম 
যেন এক কিশোরী শালতর; ৷ আমার মাথায়, কাঁধে, বাহুতে বাষ্ট পড়ছে। 
আঁতাঁথরা সামান্য আবশ্বাস নিয়ে শশীবাবূকে দেখছেন । শশীবাবুূর চোখ 
দুট বন্ধ। 

আজ আঁম বুঝি, সৌদন যাঁদ শশীবাবু 'ময়াঁ কি মল্হার না বাঁজয়ে 
দরবারী কানাড়া বাজাতেন, তবুও বৃষ্টি আসতই । 1কন্তু সাড়ে সতেরো বছর 
বয়সে বাঁম্টর প্রায় আছড়ে পড়া সুবাস বুক ভরে নিতে নিতে আম কোনও 
বিশ্লেষণমুখ দৃম্টিকোণে দাঁড়াবার অবস্থায় ছিলাম না। আম ভাবাছলাম 
বাঁশ বৃম্টি আনছে, মলহার বৃষ্টি আনছে। 

এবং বৃ্টি হল-সাঁত্যই 

ঝলকে ঝলকে পাগল হাওয়া, বৃণ্টি। সমন্ত্দার বন্ধুর মেয়ে ছাঁট থেকে 
শরীর ও আঁচল বাঁচাতে সরে অনেকটা দেওয়ালের দিকে এল, সঙ্গে সঙ্গে 
অন্যরা । কন্তু তিনাঁদক খোলা বারান্দায় বৃষ্ট কোনও বাধা, আর মানল 
না। শেষে মেয়েরা ইস মাগো অসভ্য বলতে বলতে ঘরের ভিতর ঢুকে এল । 
ছেলেরাও গম্ভীরভাবে হেটে ভিতরে । বসার ঘরের সোফা দুটো ভরে গেল । 
আঁমঞ্মারও পিছনে দাঁড়য়ে, প্রায় দরজার পাল্লার আড়ালে । 


১৩ 


দতিতম সণ্চারে পেীছে মলহার তখন কান্নায় ভেঙে ভেঙে পড়ছে। 

শশীবাবদ ভিজছেন । গুর পিঠ, চুল, কপাল, সারা শরার বেয়ে জলধারা 
গড়াচ্ছে । চোখ দুটি একবারও খোলেননি । পাথরের মতন চ্তত্ধ, কেবল 
আঙুল কি 'প্রয় ও্ঠাধরে খেলা করেছে । খোকন বস্ফাঁরত চোখে বাঁজয়ে 
যাচ্ছে । সাপের মতন অগোছালো চুল ওর কপালে লাফয়ে লাফিয়ে পড়ছে । 
কুশ গলাটা পল:কা ঘাড়ের ওপর নড়ছে । কখনও ক্লুর ভাবে হাসছে খোকন, 
কখনও ভুরু কোঁচকাচ্ছে । ও-ও আপাদমস্তক ভিজে গেছে । গান্ধারকে লঘু 
পায়ে আতক্রম করে খষভ থেকে মধ্যম পণ্চমে যাচ্ছে বাঁশ, আবার মধ্যম থেকে 
খাষভে নামার সময় রোমা? তুলছে শরীরে । 

আমি ষেন বঃচি বা খাঁক নই, বাঁশ আমাকে যুবতঈ রূপলাবণ্যময়ী 
মল্লারকা করে দিয়েছে । চাঁপাফুলের মতো গায়ের রং কেশদামে চাঁপার মালা, 
দুই কানে চাঁপাফুলের কর্ণভূষণ, বাহুবন্ধে কঙ্কণও চাঁপার, যেন রাতের 
দ্বিতীয় প্রহর সাত্যই অতীত, ঘন বর্ষার [নঃসঙ্গ নিশি । শোকাকুল মল্লারিকা 
মলহারের বিরহে আস্ির চণ্ল হয়ে শেষে ক্রন্দন করতে করতে লুটিয়ে 
পড়ছেন । মায়ের পুরোনো শাঁড়র নীচে সদ্যোঁদ্ভল্ন, লোকলজ্জা-কাতর 
আমার বুক দতাট ষেন সাত্যই উদ্ধত কঠিন হয়ে উঠতে চাইছিল । 

সেই মৃহূর্তে, এবং সেই একাঁট মুহূতে শশবাবু আমার সামনে 
মেঘভাঙা চাঁদের মতন উদ্‌ভাঁসত অবয়ব নিয়ে বৌরয়ে এলেন। নিমর্গীলত 
চোখ, ভ্তব্ধ, আপাদমগ্তক ভেজা ওই সামান্য লোকটি হয়ে গেলেন সেই সন্ধে 
বৃম্টিস্নাত বন ও পাহাড় শ্রেণীর রাজা, মলহারের প্রাণ । ওঁর প্রাতাঁদনের 
গ্লান ও তুচ্ছতার অপমান আমায় নিজের সুন্দরতার দেয়ালে মিশে থাকার 
লজ্জায় প্রথমে লীন হয়ে গিয়ে, একেবারে ধুয়ে মুছে মিলিয়ে গেল । অন্ধকারে 
জেগে রইল কেবল একাঁটি আড়বাঁশ, মুগ্ধ বিহ্বল সন্ত দুটি ঠোঁট। 

একসময় বাঁশ থামল- সঙ্গতও | বৈঠকখানায় সোকায় কেউ ছল না, 
সবাই চলে গেছে । শশীবাবু ছোট্র একটা 1নঃশবাস চেপে উঠলেন । তারপর 
উনি আর খোকন যত্ব করে হারমোনয়াম, তবলা তুলে ভেতরে রেখে এলেন । 
ভেজা স্তরািটা ভাল করে পাট করলেন, কেন জান না। আমাকে গুরা কেউ 
দেখতে পানান। 

তারপর ওই বড় বাঁড়টার 'নম্পৃহ ভাঁজে কোথায় যেন খোকনকে রাতের 
মতো লুকিয়ে রেখে আপাদমগ্তক ভেজা শশশীবাবু ধীরে ধীরে হেটে গেট পার 
হয়ে চলে গেলেন। 

বিরিয়ানির জাফরানের গন্ধ রান্নাঘর থেকে বোরয়ে কিছুটা দূর গুর পিছু 
নিয়োছল । শেষটায় না ছংতে পেরে 'ফরে এল । 


১৩৬ 


সদ্কাভিক্ক 


ফুটপাথে উবু হয়ে বসে যতীন গামছা বাছাছল । আচমকা একটা “বাবা” ডাক 
তার অবচেতন ঘেঁষে বোরয়ে গেল। এখানটায় ?দাব্য ছায়া । যতশীনের যৌবন- 
কালে শ্রাবণের শেষে ক ভাদ্রের গোড়ায় এমন ছায়া থাকত না এই পথে । বছর 
কাঁড় আগে একটা গুলমোহর, দুটো বাদামগাছ কীভাবে যেন তরতারিয়ে বেড়ে 
উঠে আকাশটাকে নয়নপথ থেকে আড়াল করে দিয়েছে । ফুটপাথের কংকিটে 
গাঁথা বুক থেকে কী যে আনন্দ পেয়েছে গাছ তিনটে, ক্লমাগত হেসে হেসে 
পাতার ঝাঁক এ-ওর গায়ে ঠেলে 'দিচ্ছে। তবে গাছ মানেই পাঁখপাখাল। 
গামছাওলা "প্রয়নাথ তাই একখানা নল প্লাঁটক টাওয়ে নিয়েছে দোকান 
বাঁচাতে । সামনে ছোট এবটা লাশ্ড্র, বাইরে তাদের তোলা উনুন, একটা 
মাষ্টর দোকান, এ ছাড়া বাঁক সব গৃহস্থবাড় দু'ধারে। শ্যামানন্দ রোড 
সোজা হাঁটতে হাঁটতে হঠাৎই মন বদলে বকুলবাগান হয়ে গেছে এক সময়। 
এখানকার এক আঁনাশ্চত বাঁকে ষতীন দহকলোমটার হেটে গামছা িনতে 
এসেছে । একটু আগেই মথুর অয়েল মিল থেকে সরষের তেলও কেনা হয়েছে, 
যতাঁনের পাশে থলে তার ভিতর তেলের গাদমাখা টিন । হাঁটুর ঠিক নিচটায় 
চোট পেয়েছিল কাঁদন আগে, এখনও ডান পা তুলতে গেলে ব্যথাটা টনটন 
করে ওঠে, যাঁদও সমতলে পা ফেলতে অতটা কম্ট হয় না। সেই যুক্তিতে যতীন 
ভালরকম হেটে বেড়ায়, হে*টে আনন্দই পায়, বলা যেতে পারে। কালাঘাটের 
দেড় কামরার ঘুপাঁচ বাসায় তার হাঁপ ধরে এমন দুপুর বেলা । 

বেরদবার মুখে অভ্যেসবশে স্ত্রীকে জিজ্ঞেস করেছিল, আর িকছু আনতে 
হবে নাক? তোমার ছু চাই ? 

সোহাগবালা স্টোভে কেরোসন ভরাছল। পিঠের ওপর ছড়ানো কাঁচা- 
পাকা কোঁকড়া চুল । শীর্ণ হাতে ব্রোঞ্জ ও কাচের চুঁড় মাশয়ে পরা । সাদা 
ব্লাউজ, আধময়লা সাদা প্রণ্টের শাঁড়, কালো ফেমের চশমার িছনে চোখ 
দুটোও হেসে উঠেছিল। আর সব একে একে হরণ করে নিলেও সোহাগের 
চোখ ও ঠোঁটের যুগপৎ হাঁসখান নিতে পারোন সময় । সোহাগ ঘাড় দুলয়ে 
তরুণীর মত বলোছিল, আমার জন্যে ১ কি আনবে বল তো? তা আজকের 
দিনে একখানা গামছাই এনো না হয়-_লাল ! 

রাঙা গামছা একখানা? বেশ। 

কালীঘাটের মোড়ের ফুটপাথে বসত 'প্রয়নাথ । ?কছাীদন হল সে দোকান 
তুলে চলে এসেছে এতদূর শ্যামানন্দ রোডে । প্রিয়নাথের সঙ্গে যতীনের 
সম্পক' বলতে গেলে সেই পঞ্টান্ন সাল থেকে । পণ্ান্নই, কারণ টুল হয়োছল 
সে বছরণ দীর্ঘ ফুটপাতের নানা খাঁজ-খোঁজ থেকে যতন তার নতুন পোয়াতি 


১৩৭ 


বউয়ের জন্য ট:কিটাঁক সওদা করাছিল-_চুলের কাঁটা, চিরুনি, মশারির দাঁড়, 
চগ্পল। আর হ্যাঁ, একটা ভাল আ্যালুমিনিয়ামের মগ এনো তো, সোহাগ 
বলোছিল। সেবার গামছাটা ছল যতশনের জের সংযোজন । 'প্রয়নাথ 
যেমনাঁটি বোঝে তাকে, তেমন আর কেউ বোঝে ি ? যতপনের নাড়নক্ষত্র জানে 
প্রিয়নাথ । প্রথমে সে কিছুই বলবে না, কিছ: দেখাবে না, অন্যাদকে তাণকয়ে 
থাকবে । তারপর সন্তর্পণে পাঁচহাঁতি একটা গামছা খুলে দেখাবে, অবান্তর 
একটা দাম বলবে । পাঁচহাতি যতীন চায়ই না, সাড়ে তন হাত পর্যন্ত তার 
দৌড় । তিন হাতের অনুপাত মনে মনে করে যতন একটা বিশ্রী রকমের নিচু 
দাম বলবে । শ্লেষে ফেটে পড়বে প্রিয়নাথ । বলবে, জানিস কিনতে এসেছেন, 
না শনকে দেখতে ! ওই রকম বা ওর চেয়েও খারাপ কু ! লম্বা পায়ে 
হেটে যাবে ক্রুদ্ধ যতশন, ভিড়ে-ভরা হকাস“ কর্নারের ফুটপাথ ধরে। নানা 
মানুষের ভিড়ে তার অবয়ব হা'রয়ে যাওয়ার আগেই, প্রয়নাথ একট নামবে, 
তবু ফিরে তাকাবে না যতীন, তখন প্রিয়নাথ আরও নামবে । যতন বাদ 
তখনও ফিরে না আসে, পাতা ইট ছেড়ে ফৃউপাথের মাঝবরাবর উঠে আসবে 
প্রিয়নাথ, জোরে জোরে ডাকবে তাকে, ও মশাই, মশায়, আরে হলটা কণ বলে। 
তখন ঘতান ফিরবে, শ্রেষ ফুটবে যতীনের গলায় । এইভাবে চলতে চলতে 
কমপক্ষে আধঘণ্টায় একটি গামছা রফা হবে, তাও যাঁদ রঙ উঠে যায়, তা হলে 
পরের দিন আবার***এ এক অদ্ভুত খেলা তার ও প্রিয়নাথের । এর তাৎপয" 
লোকচক্ষে স্পন্ট নয় । শ্যামানন্দ রোডের '্নপ্ধ ও তুলনামলকভাবে অনাবিল 
ফুটপাথে এই খেলা একট সতকভাবে, অন্য প্যাটানে” খেলতে হয় । সুযোগ 
যখন পেয়েছে আজ, এখানেই চলে এসেছে যতীন । 

হুমাঁড় খেয়ে বসা অবস্থাতেই যতীন আবার শুনল-_বাবা ! এবার আর 
অবচেতন নয়, কানের কাছ ঘেষে বেশ স্পষ্ট ডাক- চাঁছা গলা । 

মাথা পুরো না ঘ্বারয়েই হলুদ শাড়র ঝলক দেখতে পেল যতন, কালো 
পাড়, স্যাণ্ডেলের ফাঁক 'দিয়ে, উঠে যাওয়া নখপালিশ । তারপর থলে সমেত 
তেলের টিনটা হাতে করে শান্ত পাওয়া ছেলের মতন আন্তে আন্তে উঠে 
দাঁড়াল সে। 

এইটুকু সময়ের মধ্যেই হাঁটুর কলকব্জা জমে গেছে । তৃঁম এখানে ক 
করছ? খুকুরানীর ভুরু কুচকে আছে । গলায় ঝাঁজ। দেখ দিনকাল-যতাঁন 
ভাবল কোথায় সে শুধোবে, এই দুপুররোদে চন্দননগরের ইস্কুল পালিয়ে তুই 
এখানে কী করছিস, না এই একরাত্ত মেয়ে আগবাঁড়য়ে তার কৈফিয়ত চাইছে ! 

প্রয়নাথ বুঝেছে দরাদাঁর আর হবে না, সময় খারাপ । একটা পুরনো 
কাগজে গামছাটা মুড়ে বেঁধে নিঃশব্দে যতশনের 1দকে বাড়িয়ে দিল। 

অজ্প এগিয়ে খুকু আর একটা গাছতলায় বাবাকে আবার কোণঠাসা করে 
ধরে। 

তেল গকনতে এসৌছলাম । 

তেল গকনতে এতদূর ! আচ্ছা কপ বলব তোমাকে বল তো বাক ! সবন্ত 


১৩৬ 


আজকাল পাঁলপ্যাকে তেল পাওয়া যাচ্ছে! 

ওসব মুখে দেওয়া যায় না, ঝাঁজ নেই- ছোটবেলা থেকে তো দেখাঁছস, 
এখান থেকেই বরাবর য়ে যাই | তুইও এসোছিস কতবার ! দোকানের তেলের 
খালি প্লাস্টিকের বোতল একবার তেলকলে 'নয়ে গিয়োছল যতীন । ঘাঁনর 
তেল ন'শ ধরল ওতে, বোঁশ না_ মানে প্রত্যেকবার একশ তেল কম পাচ্ছে, 
তাই তো! এদকে দাম বোশ, ওাঁদকে ওজন কম । বছরের যাঁদ বারো ইনট; 
আড়াই, মানে তিরিশ কোঁজ তেল কেনে, তাহলে কত টাকা বৌশ পড়ছে-__ এসব 
খুকুকে বোঝাবে সাধ্য কার! হয়'তা বলবে, ওই কটা টাকা বছরে বাঁচাতে এতদর 
হাঁটা, কোনও মানে হয়? তোমার পা পুরো ভাল হয়েছে? হয়ান, খোঁড়াচ্ছ 
_দোঁখ? নতুন ডান্তারের মতন একটু ছয়ে, বে*কে দেখতে চায় খুকু । 

ময়লা পায়জামাটা অপরাধীর মন তুলে ধরে যতীন মেয়েকে কাটা দাগটা 
দেখায় । এখনও কাঁচা, আশপাশের চামড়ায় কালশিটের দাগ । এখন তো পায়ে 
ব্যথা নেই, ব্যথা কেবল সিখঁড় দিয়ে উঠতে, তবু মেয়ে বলবে- খোঁড়াচ্ছ ! কী 
আর বলতে পারে ষতীন, জোর যার মুলক তার ! 

তুম এখানে দাঁড়াও । 

হুকুম দিয়ে মেয়ে চলে যায়। যতানের গলা থেকে একটা কাতর নিষেধ 
বেরোতে গিয়েও নেরোয় না। পাগলটা ট্যাঁক্স-ফ্যা'ক্ ডাকতে গেল নিশ্চয়ই । 
ও কি জানে, এই পা দিয়ে আর এইভাবে কত 'হিল্ি-দিল্ি করে বেড়াচ্ছে 
যতাঁন ! মেয়ের উড়ন্ত আঁচল, গম্ভীর খোঁপা, কালো ব্লাউজের ওপর গ্রীবার 
শ্যামল রঙে দিকচক- করে ওঠা হারখান, চোখে বেশ লাগে যতীনের ওর 
হাঁটার মালিটার ভাঙ্গি । নাঃ, মেয়েটা বেশ স্মার্ট হয়ে উঠেছে বলতে হবে। 
কেমন যতীনকে দাঁড় করিয়ে এগয়ে গেল ! ইজের আর টেপফ্রক পরা ন্যাড়া- 
মৃশ্ডি এই খুকু হারিয়ে গিয়ে কী নাকালই না করোছিল যতীন আর 
সোহাগকে ! ও যখন 'ফরে এল তখন নাকের শিকান, চোখের জল, কাজল- 
ফাজল সব গালে লেপে-প*ছে একাকার । 

মাছমিছি ট্যাক্সি করালি, এইটুকু পথ তো হে*টেই যাই ! মিনমিন করে 
যতীন বলে। বলে পিছনে ঘাড় হোলিয়ে বসে সে ট্যাঁক্সির ভেতরে ছুটে আসা 
এলোমেলো হাওয়ার স্বাদগন্ধ পায়। ভালই তো লাগছে । চেনাশোনা এই 
পথঘাট, গাল, সনেমার পোস্টারের পাশ দিয়ে বহু দশক সে এমন ঝড়ের 
মতন যায়ান। বাঁড়র দিকে না ঘুরে ট্যাক্সি আরও এগোয় । এবার যতীনের 
চিন্তা হয়, কোথায় যাচ্ছে মেয়েটা ? 

দরে দুরে থাকে । স্কুলের চাকাঁরতে বছর দশেক হয়ে গেলেও যতীনের 
চোখে মেয়ে আজও নিতান্ত নাবালকা । চন্দননগরের তেলোনপাড়ায় একটা 
বাঁড় ভাড়া নিয়েছে, ওই স্কুলেরই আরও দুজন 'দাঁদমাঁণর সঙ্গে ভাগ করে। 
অল্প একটু জাম নিয়ে একতলা বাঁড় । বাইরে প্লাস্টার হয়ান । লেবুর গাছ, 
পেপে, লঙকা, জবাফুল সব মিলোমশে বাড়ছে । লম্বা ছহাটতে, গরমে, 
পুত্জায় বাবা-মা-র কাছে এসে থাকে । অন্য সময় কোনও ঠিক নেই ৷ দুমদাম 


১৩৯ 


করে বিনা নোটসে আসছে-যাচ্ছেঃ কখনও মাসে দুবার, কখনও দুমাসে 
একবার ৷ একরাত থেকেই, পরের দিন ভোরে দৌড় দিল হয়তো । বাসে, ট্রেনে 
ডেল প্যাসেঞ্জার ওর পোষাবে না, চাকারতে ঢোকার িছাদনের মধ্যেই 
বুঝে গোছল খুকু ॥ 

দূরে থাকে বলেই ওর প্রাতি মমতার ভাগটা একটু বোশ কি যতানের ! 
নিজেরই অগোচরে সে কতবার অন্যমনস্কভাবে কচুর শাক নিয়ে এসেছে ?কংবা 
চালতে ৷ মাছের মাথা সোহাগকে দিয়ে রাতে ভাঁজয়ে দ্ঁদন ধরে বাস রেখে 
দিয়েছে । অথবা সন্তা পেলাম বলে দুম করে সমন্ধের মুখে একটা ছাঁচি- 
কুমড়ো । কে জানে, খুকু হঠাৎ এসে পড়ে যাঁদ ! 

বিয়েটা দিতে পারলাম না। এই বয়সে ছেলে-মেয়েতে কোল ভরে থাকার 
কথা, ডান হাতটা খাল খাল" 

কঈ 'বিড়াবড় করছ, বাবা ? 

বলাছ, তোর 1বয়েটা ?দতে পারলাম না ! 

বয়ে আবার কেউ দেয় নাক, ফোঁস করে ওঠে মেয়ে, আম বিয়ে করলে 
তো হবে। 

এই নিয়ে বছর ছ"সাত আগে পর্যন্ত কত টানাটান, কান্নাকাটি, ভাতের 
থালা ঠেলে উঠে যাওয়া । যতীন মাঝেমধ্যেই ঝাকয়ে উঠত, নরম মনের 
সোহাগ নিঃশব্দে চোখের জল ফেলেছে । আর মেয়ে সাঁপনীর মত ফ?সেছে। 
একবারই মাত্র কনে দেখা পার্টির সামনে হাতের ওপর চিবুক রেখে বসতে 
হয়েছে খকুকে, তারপর আর নয়। যেটুকু করার, এরপর থেকে মনখের 
কথাতেই সেরেছে যতীন । 

ঠিক আছে, মেয়ে দেখতে এলে পোস্টকাডে" জানয়ে দেব--বলে দরজার 
কাছ পর্যন্ত ষতীনকে এাগয়ে দিয়েছে ওরা । 

প্রতিবারই গলা পাঁরজ্কার করে 1নয়ে, তারপর খাটো করে বলা £ আমার 
মেয়ে প্রণাতির গায়ে একটা সাদা দাগ আছে--একটাই দাগ, বাড়ছে না । গত 
পাঁচ বছরে বাড়োন । কোনও সংক্রমণের সম্ভাবনা নেই, ডান্তার বলেছে । তবে 
আপনাদের জানিয়ে দেওয়া উচিত বলে মনে কার। 

প্রথমবার, খুকুর চাকার নেওয়ার অনেক আগে, সাঁতরাগাছির ওরা 
এসোঁছল। সেই শেষ দেখা । ছেলেটির নাম ছিল অশোক-_-অশোকই তো, 
নাক ? যাওয়ার আগে ওর কাকা যতীনকে আড়ালে ডেকে [নিয়ে বলেছিল, 
মেয়ে আমাদের মোটামাট পছন্দ হয়েছে । আর খাঁলিহাতে মেয়েকে পাঠাবেন 
না যে তা আপনাদের দেখেই বুঝেছি । তবে ওই দাগটা বললেন না, চোখে 
তো পড়ল না, যতটুকু দেখোঁছ-_তাই একট: দেখব ভাবাঁছ । না না, আপনারাও 
থাকুন না__আপাঁন, আপনার স্ত্রী, আম আর অশোক, অশোকের বাবা । 
আমার বন্ধু আছেন ডাক্তার, 1স্কন স্পেশালিস্ট । 

না, যতীনের হাত ওঠোঁন সেই মুহূর্তে । কোনও খারাপ গালাগালও 
দেয়নি । যেহেতু বাপ হয়ে দাগটা সে নিজে আজও দেখোন, তাই বলে অন্য 


১৪০ 


লোকের এন্তিয়ার নেই না আছে, এই গড় তকেঁর সমাধান করতে না পেরে 
নিজেকে ভীষণ দুর্বল বোধ করোছিল যতন, গলা গিয়ে আওয়াজ বেরোয়নি । 
অনেকক্ষণ পর, জীবনে সেই একবারই যতীন বলোছল, আম আপনাদের 
1চ1ঠ দিয়ে জানাব । 

সেদিন রাতে ন্যাড়া-ছাতে অনেকক্ষণ ধরে ঘুরেছিল যতীন । মুহমর্হু 
বাঁড় খাচ্ছিল। এতক্ষণ ওপরে ছিল-যে ভয় পেয়ে সোহাগ আর খুকুও 
ওপরে চলে এসেছিল শেষ পরযন্ত। কে জানে, হয়ত এত পণ চেয়েছে বা 
সোনা, ছাদ থেকে লাফিয়ে-টাফয়ে পড়বে নাক লোকটা ! ছেলে অলক 
অথবা টুল ঘুমিয়ে পড়েছে । িশীড়র মুখে দাঁড়ানো মা ও মেয়ে দুজনকে 
দেখল যতীন । কয়েক মুহৃত" পরেই ওদের গ্তব্ধ করে ?দয়ে রাতের বুক চিরে 
যতশনের প্রেত বলে উঠোছিল, ওরা তোমার দাগটা দেখতে চায়, মাগো ! 

বাবা ! 

চাপা আর্ত উচ্চারণ । নিমেষে চোখ দুটো জলে ভরে উঠোৌছল খুকুর । 
নিঃশব্দে [পড় দিয়ে নেমে দ্রুত কলতলায় ঢুকে দরজা বন্ধ করে দিয়োছল 
মেয়েটা । যেন একযুগ পরে যতঈনের হাত ধরোছিল সোহাগ । কঠিনভাবে 
বলেছিল, চল-__নিচে চল । আমার মাথার 'াব্য, আর কোনওাঁদন মেয়ে 
দেখাব না। 

সেই শেষ। 

আজ ১৯৯৭ সালের ১৭ই আগস্ট । এখনও পথে ছেড়া ফ্ল্যাগ ইতগ্তত 
পড়ে । ফেস্টুন হাওয়ায় লটপট করছে । অনেক জায়গায় পতাকা নামানো 
হয়ান এখনও | স্বাধীনতার পণ্চাশ বছরের উৎসব চলবে আরও মাসখানেক । 
জলসা, সভা, আলোচনাচক্র, স্বাধীনতা সংগ্রামীদের পাঁজাকোলা করে তুলে 
এনে সংবর্ধনা । গত দহ:-রাত ধরে যতশীনদের পাশের গাঁলতে হান্দ গান 
বেজেছে লাগাতার । সোহাগ ঘুমোতে পারোন, তারই মধ্যে ছে'ড়া-ছেণ্ড়া 
ঘুমিয়ে নিয়েছে যতীন । 

এই তুই কোথায় যাচ্ছিস বল: তো ? 

দু” মানটে আসাছ। লেক মাকেটের কাছে ট্যাক্স থেকে নেমে গেল মেয়ে । 
একটু এগিয়ে ফুলের দোকানে দরাদাঁর করছে। মিটার চালু। যতনের 
বৃকের মধ্যেটা টেনশনে হাঁসফাঁস করে । খাঁনক পরে ফিরে এল খুকু । হাতে 
একগোছা রজনীগন্ধা আর গোলাপ কলাপাতায় মোড়া, আর কণ যেন বুকের 
কাছে চেপে ধরা । 

দ্যাখো, ভাল গন্ধ না বাবা ! যতীনের খুব নাকের কাছে এনে ধরেছে 
ফুলগুলো । বৃদ্ধ বলীবর্দের মত ঘোঁং করে যতীন । ওর ঘোলাটে দুই চোখে 
অন্য ভাবনাঁচন্তা । 

এসব কেন কনতে গোল ! আমাদের বাঁড়তে ফুল রাখার জায়গা আছে 
নাকি ? 

এগয়ে গিয়ে, ট্যাক্সি ঘুঁরয়ে আবার বাজারের মুখে । যতাঁন গম্ভীরভাবে 


১৪৯ 


বলল, খুকু, এটা একট: বাড়াবাড়ি হয়ে যাচ্ছে_মিটার উঠছে কল্তু। 
ট্যাক্সিওলা পেছনে তাকায়ও না, এত 'নার্বকার_ যেন সে খাল ওই মেয়েরই 
হুকুম নেবে, আর কারও নয় । 

আঃ বাবা, আসাঁছ এক্ষযীন ! বলে বাজারের গেটের ভিতর ঢুকে মায়ে 
যায় রোদের হলুদ । 

এত বেলায় মাছ কোখেকে পোল ? 

সনাতন্কে বলে গিয়েছিলাম সেই কবে, রেখেছে আমার জন্য । আাডভান্স 
'দিয়োছিলাম ৷ অসময়ের ফুলকাঁপও কিনেছে । একটা নয়__একসঙ্গে দুটো । 

গাকর্‌কর: করে যতীনের | কী বলনে ? সাঁত্যই তো, ইলিশের কিলো 
একশ পণ্চাশ ছাড়ানোর পর বহাাদন ইলিশ-মুখো হয়াঁন যতীন । কালো 
[জরে, কাঁচা লঙকা, সর্ষেবাটা দিয়ে ঝাল । কোলের মাছের ভিমটা আগে থেকে 
থালার এক কোণে সারয়ে রাখা-_সবশেষে একটুখানি গরম ভাত দিয়ে মুছে 
নেওয়া যায় । তাই বলে খুকুর কি এমনভাবে টাকা ওড়ানো উচিত ! না বাবা 
হয়ে যতীনের সেটা দেখা উচিত বসে ! যতাঁন নিজে খেয়েদেয়েই বৌরয়েছে। 
দশটার মধ্যে সে ও সোহাগ দুপরের খাওয়া সেরে নেয় । ওবেলার ডাল- 
তরকার রাঁধা আছে। রুঁটটা খাল করে ানীলেই হবে। এখন আবার 
সোহাগকে মাছ কুটে, ধুয়ে রাঁধতে হবে অবেলায় ৷ তা রাঁধবে সোহাগবালা । 
মেয়েকে দেখেই আহনাদে গলে জল হবে । মোটেই আপাত্ত করবে না । তোলা 
উনুনে আঁচ নিষে গুজ-গুজফসফুস্‌ গজ্প হবে মা-মেয়েতে । 

মিষ্টি কেনা হল সামনের দোকান থেকে । 

যতীন এতক্ষণে হাল ছেড়ে দিয়েছে । মিটারের দিকে তাকালে বুক ধড়ফড় 
করবে, তাই ওদকে তাকাচ্ছে না আর। 

আচ্ছা টুলুটাকে ডেকে আনলে হয় না? এক বছরের কাছাকাছি হয়ে 
গেল, খোকা আসে না । এসপ্ল্যানেড-দমদম সোজা মেক্রো হয়ে গিয়ে ষতীনের 
[হম্মৎ বেশ বেড়েছে । না-আসুক ছেলে, খবর পৌছতে তো আধঘণ্টা, যাঁদ 
তেমন কু হয়। খোকাও তো বাপের বেটা । নকল পা আর ক্রাচের 
ভরসাতেই দাপিয়ে বেড়ায় শহর, আঁফিস, বাজার । বাঁ হাঁটুর নিচে পেছন 
থেকে থু নট ি-র গুল এসে লেগোঁছল । বের করার তরসয়াঁন, তার 
আগেই পাুঁলসহাজত থেকে জেলহাঙ্গত। গ্যংগ্রণ হয়ে মরে যেতে পারত 
টুলুটা_মরেনি, অর্ধেক পা খোয়া গেল। তাও জেল থেকে বোরয়ে ল' 
পড়েছে । এম এ করেছে ডাকযোগে । এই চাকরিটা ভাগ্যস পেয়ে গেছিল 
দু-তিন আফসে হাতবদল হয়ে, তাই চলছে । এখন বাঁড়তে [িউশাঁনও করে, 
সণ্চাহে তিনাদিন। 

ওই আর এক পাগল ! অদ্ভূত আভমান ! এতাঁদন পরে কভাবে জানতে 
পেরে গেছে, ক বন্ধু আশুতোষ বাঁড় বয়ে এসে বলে গেছে, যতন আর 
আশুতোষ স্যার কীভাবে সেরাতে থানায় দৌড়ে গেছেন, কণভাবে যতন 
দু'হাতে পায়ের জুতো দুটো চেপে ধরোছিল ও-সর--এই এতাঁদন পর মানে 


৯৪৭ 


হয় কোনও ! টাকা শোধ দেবে না আশু, তাই 'নয়ে কথা-কাটাকাটি, তারপর 
এই- আশুর কি উচিত হয়েছে ওভাবে শোধ তোলা ? 

বাইশ বছর পর এই কথার কণ মানে আছে এখন ! 

পল্লব আর অর্ণব দুজনেই পুীলসের গুলিতে মরেছিল-হ্বদয়নাথ স্যারের 
দুই ছেলে । হরিশ পাকের পাশ দিয়ে নুয়ে পড়ে, রান্তা হাতড়ে হেটে যেতেন 
মাস্টারমশাই, হেটেছেন মারা যাওয়ার আগের 'দিনাঁট পর্যন্ত । খোকা জেল 
থেকে বেরোবার পর একাঁদন রাস্তায় দেখা হয়ে গোছল । প্রণাম করতে পারোন 
টুল, হাত দুটো কাছে এনে বুকের, ঝঠুকেছিল কেবল । না না, ঝংকো না, 
বেঁচে-বর্তে থাক, এমনিই আশীবদি করাছ, বলোছিলেন হৃদয়নাথ, আমার 
ছেলে দুটোকে কেউ কখনও “বেচে থাকো? বলোন বাবা ! 

মাস্টারমশায়ের চেয়ে তো যতাঁনের বরাত ভাল । বেচে-বর্তে আছে টুল । 
এখন তো ইউরোপের বুকের ওপর প্রাতিদিন সীমান্ত সব ভাঙছে-গড়ছে, 
রাশিয়া হাওয়া মিলিয়ে গেল, অথচ অলক ওই অদ্ভূত অকারণ রাগে বাবা- 
মা'র কাছে আসা বন্ধ করেছে । মানিমর্ডারে টাকা পাঠাবে অথচ আসবে না। 

খুকু আম মাছ কিনল, ফুলকাঁপও, সন্ধেবেলা রান্নার জাঁকজমক একটু তো 
হবেই । মাছভাজার, ভাতের গন্ধ বেরলে টুলুর কথাও মনে পড়বে যতীনের- 
পড়বেই । সোহাগবালা বেশ বুদ্ধি ধরে । বোধহয় জানত খুকু আজ আসবে । 
বাপ-মেয়েকে একসঙ্গে দেখে বুঝে নিয়েছে কিছু একটা ব্যাপার । ট্যাক্সি থেকে 
দুজনে নামল । মেয়ের হাতে ফুল, মিন্টর বাঝ্স। যতীন একহাতে মাছের ও 
তেলের থলে নিয়েছে, অন্য হাতে কাগজে মোড়া রাঙা গামছাটা । সোহাগ বড় 
বড় চোখে তাকিয়ে ভাছে । এলাহ ব্যাপার ! 

ঘরে এসে আবার মায়ের ওপর চোটপাট, ও কি, শেষে এই ন্যাতা শাঁড়টা 
পরলে ! না না, তসরটা বার কর বলাছি ! 

ওরে দাঁড়া দাঁড়া, এই গরমে ! এই তো ভাল । কাচা, হীস্ব্রি করা তাঁতের 
শাঁড়, পাড়ের রওটা জাঁমতে লেগেছে, তাই" 

সোহাগের িশাথতে নতুন ীস'দুর, কপালে লাল টিপ, ২ব্র দিকে তাকিয়ে 
কেমন বিহহল বোধ করে যতীন | ঘ্যাঁচ করে রজনশীগন্ধাগুলো কাঁচতে ছোট 
করে একটা পেতলের ঘটিতে দ্রুত সাঁজয়ে ফেলল খুকু, লাল গোলাপের 
সঙ্গে মাশয়ে ৷ সাদার গা ঘেষে রক্তিম, যেন কাঁড় ও কোমল-মধ্যম পাশা- 
পাঁশ। কলাপাতায় মোড়া রজনশগন্ধার মালা বার করে একটা থালায় 
সাজায় । 'মন্টির বাঝ্সটাও খুলেছে । 

যতন যেন সদ্য আসা আতা, হাঁ করে তাঁকয়ে আছে। 

এই যে বাবা, ধরো-_এই মালাটা পরাবে মাকে বুঝেছ, কই ধরো ! 

আনাড়র মত সন্ত মালাখান হাতে য়ে যতীন একবার সোহাগের 
শদকে, একবার মেয়ের দিকে তাকায় । খুকু হাসছে । সোহাগের মুখেও বেশ 
দুষ্টু দুষ্টু হাসি। তাই ব্ীঝ বলোছল, আজকের দিনে গামছা এনো 
একখানা ! বেশ ! যতীন খেয়ালই করোন। 





১৪৩ 


ওই কপাল, ওই অকলঙ্ক 1টপ, ওই মৃত্যুঞ্জয় হাঁস--ও ি আজকের ? 
ঘষা কাচের ওপর জমে থাকা বাষ্পকে যেন অলীক হাতে মুছে 'দচ্ছে, আন্ত 
আন্তে যতশনের সামনে ফুটে উঠছে লত্জামাখা এক কশোরী মুখসামান্য 
লম্বাটে, চাপা নাক, ভাসা ভাসা কাজল পরা দু-চোখ, কপালের চন্দন মুছে 
এসেছে, সারা শরশীরে সঙ্কোচ আর ন্রাস। গতকাল সন্ধেতে বয়ে হয়েছে। 
বেনারসীর বড় শখ ছিল বুঝ, তাঁতের একটা লাল শাঁড়ই শেষ পযন্ত 
কপালে জুটেছে। কুসুমাডঙে ভাল করে না হতেই তোলপাড় হয়ে উঠেছে 
চারদিক । পাড়ায় শোরগোল, চাপা কান্না_-পালাও, পালাও ! কালরাত্তর 
কাটোন, ফুলশয্যা তো অনেকদ:র, যতশীনরা সেই পালাতে আরম্ভ করেছে। 

কাঁদন আগে থেকেই কানাঘুষো, ফিসফিস চলাছিল। এক ধরনের চাপা 
উত্তেজনা । যতাঁনরা তব্‌ এখান থেকে যাওয়ার কথা ভাবোন। সব হিসেবের 
গরমিল ছাপিয়ে স্বাধীনতা দিবস এক সহস্বাদহ উন্মাদনা এনে দিয়ে ছিল। 
বুকে জেদ বাসা বেধোছল মানুষের । খাজা নাঁজমুঁদ্দন কলকাতা থেকে 
ঢাকা রওনা হলেন, ধকধক- স্টিমারের মাথায় মুসলিম লিগের ফ্ল্যাগ । নদীর 
দু-ধারে মানুষ আনন্দে চিৎকার করেছে, পাঁকন্ভান 1জন্দাবাদ বলেছে । গানে, 
দ্লোগানে মাতোয়ারা পথঘাট । অথচ পাঁকন্তানের জাতীয় পতাকা ওড়োন 
ঢাকা শহরেও । নাম বদলে গেছে দেশের, যাক | যাবে না যতটনরা । এখানেই 
মাটি কামড়ে পড়ে থাকবে । এমন ধানজাঁম, আম-ডুমুর, বাঁশঝাড়__সব ছেড়ে 
পালানো ! অথচ ষোলই আগস্ট বিকেল থেকেই কেমন যেন আশির ভাব, 
মানুষ পাগলের মতন ঘর ছাড়তে আরম্ভ করেছে । সীমান্তের দিকে ছিল 
চলেছে হাঁটাপায়ে, ট্রেনে, নৌকায় । বিয়ে চুকে যাওয়ার পর পাশের বাঁড়র 
বুড়ো তাহের জেঠা নিজেই এসে যতশনের বাবাকে বলে গেলেন, ভট্টাচার্য 
মশায়, ঘরে কচ বউ--যতীঁনকে বলুন এবার যেন কলকাতা চলে যায়! 

ঝিকরগাছা থেকে কলকাতার ট্রেন, সে কি গুতোগংাঁতি ভিড় ! ছাতেও 
মানুষ--িকাথক কষছে মানুষে । তোরঙ্গের ওপর দুজনে কোনওমতে বসে 
সারারাত জেগে এসেছে । শ্রাবণ মাসের শেষ দনাঁটতে বয়ে, আর কালরান্রর 
রাতে, ভাদ্রের মুখে ঘর ছেড়েছে দুজন । সোহাগের মুখের দিকে তাকানোর 
অবস্থা নেই তখন যতশনের | 'ানজের বুকের ধুকধুক শব্দ কানে তালা 
ধরাচ্ছে । ট্রেনে বসেই দেখা যায়, আলপথে মানুষ হাঁটছে, ছেলে-বুড়ো, 
ঘোমটা-টানা বউ, মাথায় বাকা-প্যাটরা-যা পেরেছে সঙ্গে নিয়েছে । যেভাবে 
পারছে, সেভাবে পালাচ্ছে ৷ সশমান্তে লুট চলছে নাক, মেয়েদের ইজ্জত 
যাচ্ছে । কচি বউাঁটকে কোনওমতে বাঁচিয়ে নিয়ে কলকাতায় পেশিছতেই হবে 
যতাীনকে । বাবা-মা, কাকা-কাকণীমা রইল ভিটেতে । তারা কবে আসবে কেউ 
জানে না। বাইশ বছরের বর, পনের বছরের বউ | জীবনটা আরম্ভ হতে-না- 
হতেই কেন্্ন দু-টুকরো হয়ে গেল ! ভাবলে আজও যতানের বুকের মধ্যেটা 
ফাঁকা হয়ে যায়। স্লেটের সব লেখা-জোকা ন্যাতা 'দয়ে মুছে দিল কেউ যেন। 
তারপর কলুটোলায় পসতৃতো ভাইয়ের একচিলতে বাসায় জীবন আরম্ভ। 


১৪৪ 


বারান্দায়, রান্নাঘরে শোয়া । 'ঁসমার খোঁটা উঠতে-বসতে, বিপিন একা হাতে 
আর কত ট্ানবে, একটা আলাদা বাসা দেখ যতীন! 

কতাঁদন পর্যন্ত যতীন নিবোধের মতন ভেবেছে, এ দেশ তার না। এখানে 
ঘাকে ভাড়াটে বলে, বাঙাল বলে লোকে, যাঁদও তাদের শহরে ভাষায় কোনও 
বাঙালে-টান নেই। কতাঁদন বাজারে ছোট মাছ বাছতে গিয়ে বোনাসবাবুৃদের 
রুক্ষতায় অপমানিত যতীন চোখ ভরে নিজেদের টলটলে 'খিড়কি পুকুরের কথা 
ভেবেছে । শরতের ভোর রাতে গিশউালর গন্ধ তাকে কতবার তব টানে 
সীমান্তের ওপারে টেনেছে । উঠোনের মাঝখানে সেই শিউলি গাছটা ছিল! 
তারপর সময়ের নানা বাঁক ঘুরে রোদে-জলে ঝরাপাতার মতন হলুদ হয়ে 
যতীন ভট্চাজ একদন বুঝেছে যে, এখানকার মাটিতে শিকড় না গাড়লে, 
এ জীবনে ডালপালা মেলা হবে না তার! 

সাত্যই 'ক পূর্ববঙ্গে কোনও ভবাঁষ্যৎ ছিল যতীনদের ? ওই তো তিরিশ 
[বঘে ধানজাম, ইটের দেওয়াল, খড়ের চাল দেওয়া হাত-পা-ছড়ানো একটা 
বাঁড়, ব্যস্‌। খুড়তুতো-জেঠতুতো মিলিয়ে ওরা ছ'ভাই ভাগাভাগ করে ক 
খেত, কোথায় যেত এতাঁদনে £ তাও তো কলকাতার ফুটপাথে জীবন আরম্ভ 
করতে হয়ান যতশীনকে । ইন্টারামিডিয়েট পাস করোছিল, চাকারর বাজার এত 
খারাপ ছিল না, তাই একরকম টিকে গেছে । 

এই তো কলকাতা, যতীনের নিজের জায়গা । এখানেই ওর ছেলে রাম্টর 
কাঠামোর খোলনলচে বদলাতে গিয়ে পেছন থেকে গুলি খেয়োছিল। অর্ধেক পা 
খুইয়ে আজ সে সভদ্র নাগারক বনে গেছে । এখানেই খুকুর হবু খুড়*বশুর 
ওর শরীরের অদেখা দাগ দেখতে চেয়োছল । হ্যাঁ, শিকড় গেড়েছে তো, 
ডালপালাও মেলেছে যতণন ভট-চাজ, কিন্তু আশ্মিমঙ্জায় আজ তার কী গম্ভীর 
ব্যথা! পথ চলার কী দুর্হ ক্লান্তি তার রক্তের ভিতর ! আজও একখানা 
নিজের ঘর কোথাও নেই যতাঁনের । বাঁড়ওলার লোক রাউণ্ডে এলে শীতের 
দিনেও ঘেমে ওঠে যতীন--এই বুঝি উঠে যেতে বলল তাদের ! দেড়খানা ঘর, 
একফাল বারান্দা, চিলতে রান্নাখর ধোঁওয়ায় কালো, ন্যাড়া ছাদ । এইটুকু 
যতানের রাজ্যপাট । 

কই বাবা, দাও ! 

মেয়ের ডাকে জেগে ওঠে যতীন । একটা নঃ*বাসকে নিজের মধ্যে গুটিয়ে 
নিতে 'নতে সে হঠাৎ বুঝতে পারে, তার ভারতবর্ষেরই মতন খখাড়য়ে, বুকে 
হেটে রন্ত পায়ে কখন সোহাগ ও সে অর্ধেক শতাব্দী পৌরিয়ে এসেছে । 

গলায় মালা, তন্তপোষে বসা সোহাগকে সন্দেশ ভেঙে মুখে দিতে গেল 
যতীন, ব্যগ্র সোহাগ একটু আলতো হাঁ করে ম:খখানা এগিয়ে আনে। 
দু'জনের সমন্বয়ের অভাবে সন্দেশ ভেঙে সোহাগের কোলে পড়ে যায়। কুঁড়য়ে 
আবার ওর মুখে দেবেই বলে যতীন স্ত্রীর খুব কাছে আসে আর তখনই 
সে দেখে, তাঁতের শাঁড়র সাদা জাঁম এক ফোঁটা চোখের জলকে কেমন 'নাঁবড় 
তেষ্টায় শুষে নচ্ছে। 


১৪ 
৮ন্দনরেখা--১০ 


জম্ম ক্ুন্বে আনবে 


এই, একটা না ভীষণ মুশাঁকল হয়েছে! 

কণ ব্যাপার ? 

দুধ এনে সবে বাঁড় ঢুকৌছ, গা থেকে মাথার চুল থেকে খাটালের কাদার 
গন্ধ মেলায়ান, পাজামার ওপর কোঁচকানো শার্ট । আমাদের আধভেজানো 
সদর দরজার সামনে তাঁতের নীল ডুরে শাঁড়পরা সদ্য ঘুমভাঙা দোলা, 
ঘুমন্ত চর্ণ-কুন্তল কপাল আঁকড়ে আছে, সারা মুখে ছটফট করছে হাস। 

কণ ব্যাপার ? 

এখানে বলা যাবে না-ধ্যাং, বাইরে চলো ! 

নিঃশব্দে ভেতরে গিয়ে, পাসমাণ সবে উঠেছে, ওকে একটু আসাঁছ বলে, 
দরজা ভেজিয়ে বৌরয়ে পড়োছিলাম । 

অক্্রোবরের শেষ, পাকের ঘাসগুঁল ভেজা ভেজা, শহর এখনও ভাল করে 
আড়ামোড়া ভাঙোন । এই সময় দোলার বাঁড় ছেড়ে বোৌরয়ে আসা দৃ্টিকটু 
এ পাড়ায়, তবে ও কোনও নিয়মকানুন মানে না সবাই জানে । আমার বুকের 
মধ্যে হৃৎপিণ্ড উঠছে-নামছে । ভেজা বোণিতে আমার সামনে পা ঢেউ করে বসে 
হাঁটুতে মাথা গংজে হাসতে হাসতে দোলা বলোছিল, আসলে তোমাকে না: 
ভীষণ ভালবেসে ফেলোছ ! 

এতে মুশকিলের কী আছে ? 

ভালবাসা এরকম একফালি রোদের মত, সামনে এসে পড়লে ক করতে 
হয় আমায় কেউ শেখায়নি । মুখারাবন্দর মত দুই করতলে তুলে নেওয়া__ 
উঠহ্‌, সে সহজ নয় দোলা, আম তো তোমাকে কবে থেকেই *** 

মানে সেই কখন থেকেই *** 

হাঁসিটাকে হঠাৎ ডানার মত গুটিয়ে ফেলে সেই ঈশবরী আবার মানবী 
হয়ে গেল । আঃ, কিচ্ছু বোঝো না । সামনের মাসে চলে যাচ্ছি বলেই তো 
মুশাঁকল। চলন্ত ট্রামে লাঁফয়ে উঠতে গিয়ে অথবা লিফটের কলাপাঁসব্ল্‌ 
গেট ঝড়াক- করে বন্ধ হয়ে যেতে দেখে কতবার ভেবোছি, দোলা যাঁদি ওইভাবে 
কথাটা না বলত সৌদন ! 

শীতের হলুদ পাতার মত শানবাঁধানো রাষ্তার ওপর পা ঘষটে ঘষটে বহু 
বছর পর আমি বাঁড় ফিরছিলাম, এমন সময় দোলা আমায় ডাকল । িছু- 
ডাক নয়। এমনিতে 'দিনে-দুপুরে কী ভরসম্ধেবেলা চমকে বহুবার পেছন 
ফিরে দেখোছ। রা-হু-ল ! ওর অলীক কণ্ঠস্বর ভিড়াক্রান্ত ফুটপাথ থেকে 
ছুটে বোরয়ে এসেছে 1কংবা সটান নেমে এসেছে নিয়নসাইনের অক্ষরব্ত্ত 
থেকে । দোলার হাঁসিরে কাটা ঘুড়র উল্লাসে হেলে পড়তে দেখেছি আকাশের 


৯৪৬ 


কাঁধে। বর্ষায় জলে-ভরা খানা-খন্দ জামাকাপড় বাঁচিয়ে পেরবার সময় আমার 
চেতনায় এসে আচমকা ধাক্কা দিয়েছে দোলার শরীরের দিব্য সৌরভ । বণ্ড়াশ- 
গাঁথা মাছ যেমন কলপলোকের মায়া দেখতে গিয়ে জলতল ছেড়ে কয়েক লহমার 
জন্য উঠে যায় ; তারপর অথৈ নীল আকাশ, ঝকঝকে রোদ তার চৈতন্যকে 
লাঞ্ছিত, বরবাদ করে ছেড়ে দেয় ; সব শেষে পাড়ে-দাঁড়ানো মান্ষগুলো এঃ হেঃ 
চারাপোনা বলে বড়শি খুলে হাসতে হাসতে আবার তাকে জলে ফেলে দেয়। 
দোলা আমাকে মায়াস্বর্গ থেকে নির্বাসন দেওয়ার পরও বহুদিন আমি সেই 
ক্ষাণকের দেখা রোদ-চমকানো-আকাশ, সেই মায়া ভুলতে পারনি । বারবার 
ক্ষতগদীলর ওপর আঙুল বলয়ে দেখোছ, নাঃ, ব্যথা আর নেই, দাগগুলো 
রয়ে গেছে কেবল । আহত তরুণ পোনার মতন জলখেলায় ফিরে যেতে হয়েছে 
আমায়, কন্তু দোলা আমাকে ছাড়েনি । নানাভাবে, নানা ছলাকলায় ডেকেছে, 
নাস্তানাবুদ করে ছেড়েছে । চিঠির উত্তর না দিয়ে, আবার মাঝরাতে ফোনে 
ডেকে তুলেছে--এই, কী করছ ? না এমাঁনই, দেখালাম ঘুমোচ্ছ িনা-_-বলে 
হেসে ফোন রেখে দিয়েছে । সারারাত জেগে আম ভেবোছি__এই রে, ওর নম্বরটা 
[দল না তো। মানে ওই নম্বর না পাওয়া পর্ধন্ত দীঘঘাদন দোলার কণ্ঠস্বর 
শোনার কোনও রান্তা থাকবে না আমার | মানে ওই শিমুল পাহাড় বা 
রাজগাঙ্গপুর জাতনয় কোনও জায়গায়, িনকোড না 'দয়েই চিঠি ?লখতে হবে 
আমাকে, কয়লার হীঞ্জনের ধুলো, ভেণ্ডর গাঁড়র ঘাম__সব কিছ খেতে খেতে 
সেই চিঠি আঠার ?দন 'কংবা আড়াই মাসে ভাস্বরের অফসের 'রাঁসিট ক্লাকের 
কাছে পৌঁছবে । বহুদিন, বহাঁদন হয়ত কোনও খবর নেই, সাড়াশব্দ নেই, 
তারপর একাদন নেয়ে আর বউকে কলকাতার ট্রেনে তুলে দিয়ে বাড় ফিরে 
দেখলাম, আমাদের বসার ঘরে লাল-কালো টোবল ঢাকাটার ওপর 1বকেলের 
লালচে রোদ, তার ওপর টানটান শুয়ে ঘুমোচ্ছে সেই মেয়ে ! হলুদ রঙা 
খামের মধ্যে পেঁয়াজের খোসা কাগজে বড় অক্ষরে দু*পাতা লেখা আর 
একমুঠো বকুল খামের 1ভতর । আভমানে আমার বুক চুরমার হয়ে যায়। 
চিঠিটা না পড়েই দলা পাকিয়ে ফেলে আবার দুহাতে ২।ন্তর কার টোবিলের 
ওপর রেখে । ফুলগুলো নাকের কাছে ধরে ঘ্রাণ নেই । কী জান, দোলার 
চুলের গন্ধ কোনও ছলে এর মধ্যে লুকিয়ে আছে কিনা ! ওদের ফেলে দিতে 
বড় মায়া লাগে । বোন-চায়নার 'পারচে খাবার ঘরের জানলার তাকে রেখে 
শুতে যাই। ঘুমের মধ্যে এক আঁস্থরতা জাগ্নে। দোলা যেন ওই ঘরে আমার 
জন্য একা অপেক্ষা করছে । ফুলগুলোকে মাথার কাছে এনে রাখতে হয়। 
দোলার ওপর ভীষণ রাগ হয়, আক্রোশ বোধ কাঁর, কম্ট পাই: 

অনেক দন পর আজ বাঁড়র গেটে দাঁড়য়ে আমার বুকের মধ্যে কী যেন 
ছলাৎ করে উঠল । ফুলবনী থেকে বাঁলগুড়ার পথে হাল্কা জ্যোৎস্নায় রান্তা 
ছেড়ে শালবনে ঢুকে যাওয়ার আগে একবার সঙ্গী প্রো ভাগীরথণী কনহার 
বলে উঠোছল, একট দাঁড়ান, সাপ আছে-_বলে দুহাত জড়ো করে তাল 
বাজয়োছল। 


১৪৭ 


কী করে বুঝলে কন্হার় যে সাপ আছে ? 

আজ্ঞে আমরা জঙ্গলের কঞ্জ, সাপ ধারেকাছে থাকলে আমাদের শরীরের; 
মধ্যে জানান দেয় । 

লেটার বক্সের ভেতরে শয়ে দোলার নীল চিঠি সেইরকম আমার আত্মাকে 
কোনও আদম সঙ্কেতে স্পর্শ করল । প্রায় এগার বছর পর লিখেছে দোলা । 
পাড়ায় এই মুহূর্তে লোডশোঁডং। রোমলা ওপরের বারান্দায় বসেছিল 
মোড়াতে, রোলংয়ে চিবুক । একে পথ চাওয়াই বলা যায় । মাসাঁতনেক আগে 
লোব্লাড প্রেসার হয়ে আঁফসে মাথা ঘুরে পড়ে গিয়েছিলাম । সেই থেকে ও 
আমাকে আঁফসের বাসেই আসতে বাধ্য করেছে চেনা-শোনা লোকের সঙ্গে 
থাকবে, দরকার হলে ডান্তার কিংবা হাসপাতাল""'বাস যেখানে থামে, সেই 
গাঁলমুথ থেকে বাড়ির নিচ পর্যন্ত পঞ্চাশ মিটার মত রান্তা বারান্দায় বসে 
রোমলা আমার চলে যাওয়া, 'ফিয়ে আসা দেখে । স্ট্রিট লাইটটা জবলছে। 
অল্প হ্যালোজেন আলোয় পড়ার চেম্টা করলাম চিিটা। ওপর থেকে টচের 
বৃত্তাকার আভা এসে পড়ল নীল কাগজে । রো'মিলা হেসে বলল, পড় পড়, 
আম আলো ধরাঁছ । আমার করতালে উদ্ভাস, ওপরে অন্ধকার বারান্দায় 
দাঁড়ানো রোমলার মুখের চারপাশে দুঃখের মত কাঁপতে থাকা কাঁচা-পাকা 
চুলগল- এই দুই দৃশ্যের বপরশতমুখী ম্োত আমাকে ছংয়ে যেতে যেতে, 
বলে, রাহুল, তুমি সুখশী হবে না এ জাবনে ! 

চিঠি পড়া শেষ করে মুখ তুলে বললাম-__-দোলা যেতে লিখেছে । 

রোমিলার অবয়ব দেখা যায় না। ওর গলা সুদূর বনাণুল থেকে হাওয়ার, 
মত ঘুরতে ঘুরতে ভেসে আসে- যাবে 2 যাও না, সেই রঙ্গন পাহাড়ি না? 
ট্রেন আছে ? 

না, ট্রেন নেই । শালতোড়ায় নেমে বাস ধরতে হয় । ট্রেকার, জপও পাওয়া 
যায় ভাড়াতে । শালতোড়া অবাঁধ হাতিয়া প্যাসেঞ্জারে চলে যাব। 

আলো এলে আমার জন্য চা গরম করে এনে রোমিলা বলে-জান, আজ 
মিতুলেরও চিঠি এসেছে । জানুয়ারতে আসবে । 

বাঃ, কই দোখ! আম হাত বাড়াই । তুল আমাদের মেয়ে । সদ্য বিয়ে 
হয়েছে । নতুন সংসার । আগামী আশ্বনের মধ্যেই আমার আর রোমলার 
মাঝখানে টলমল করে হামা দিতে আসবে এক শিশু । 'মিতুলের সন্তান । 
মায়া, উদ্বেগ আমাকে কয়েক মুহূর্ত আচ্ছন্ন করে রাখে । অথচ রোিলা চিঠি 
আনতে পেছন ফিরতেই আমার বুকের মধ্যে ধক ধক করে ওঠে রাতচেরা 
ইঁঞ্জনের শব্দ । আকণ্ঠ জ্যোৎস্নায় ডুবে থাকা এক লেবেলক্লাশং, পাঁখরা, 
দোলার নিরাভরণ হাত £ রাহুল, দোলা বলে, তোমাকে কত দিন দোখ না। 
মাঝরাতে ঘুম ভেঙে বুঝি আমার ভেতরটা কাগজের মত সাদা হয়ে যাচ্ছে, 
ভয় হয়, শেষে কি এই তেষ্টা নিয়েই চলে যেতে হবে ? তুমি আসবে, আসবে 
তো ? এই শেষবার, আর কোনওাঁদন তোমাকে জ্বালাতন করব না, প্রামস ! 
আমরা দহ'জনে একবুন্ত'উসখানে যাব। কোথায় বল তো? মিতুলের হাতের 


৯৬ 


অক্ষরগুল বুকের কাছে জড়ো করে এনেও আম মনে মনে বাঁল, এই শেষবার 
তো? প্রামস করছ কিন্তু! নিজের করতল নাকের কাছে এনে ঘ্রাণ নিই, আঃ 
কোথায় সেই বকুলগঞ্জ ! 

হ্যাঁ, প্রায় পেয়েই তো 'গিয়োছলাম দোলাকে। একাঁট ভোররাতের স্বপ্নবং 
সে আমার করতলগত হয়েই এসোৌছল । বিয়ের দিনক্ষণ ঠিক করারই যা বাকি 
ছল । ভাস্বর ওকে ছেড়ে চলে যাওয়ার পর কেবল রেশম আর দোলা । 
'দোলার নাভাস ব্রেকডাউনের মত অবস্থা । 

একা, কাতর, রাগী দোলা অন্ধের মত আমাকেই ডেকেছিল। রঙ্গন 
্পাহাঁড়তে পাহাড়ের খাঁজে বসানো ওদের প্রাসাদোপম বাঁড় হা-হা করছে 
হেমন্তের হাওয়ায় । ভাস্বর কলকাতা চলে গেছে। বিবাহবিচ্ছেদ চাইবে । 
রেশম এই সব হাহাকার উৎখাতের মধ্যে টলমল করে বাঁড়ময় ঘুরে বেড়াচ্ছে । 
আমাকে দেখে বাঁঘনীর মত দৌড়ে এসে কাঁধে মাথা রেখোঁছল দোলা । ওর 
এলোমেলো কোঁকড়া চুল আমার বুকে । চোখের জলে জামার বুক ভিজিয়ে 
শদয়ে কয়েক ঘণ্টার মধ্যে আমাকে নিয়ে এক দুরম্ত ঘাঁর্ণির মধ্যে নেমে 
'গয়েছিল। আমার বেকারত্ব তখন সবে ঘুচেছে। নতুন চাকার ফার্গসন 
আ্যাগ্রো ইপ্ডাস্ট্রজ-এর হেড আঁফস থেকে তার এসে আমার কলকাতার বাসায় 
জমছে । কেউ অবশ্য ওখানে আমাকে খুজে পাচ্ছে না, আম রঙ্গন পাহাঁড়তে । 
আঁম, দোলা আর রেশম । দোলা, রেশম আর আম | ভাস্বর বিচ্ছেদ চাইবে । 
দোলা চ্যালেপ্ত করবে না। আম আর দোলা ঘুরে বেড়াচ্ছি। জঙ্গল ভেঙে, 
চোরকাঁটা ভেঙে কাহ্নপুবা পাহাড়ের টিলায় চড়ে দেখলাম, চারাদকে রাশি 
রাশি মেঘ, মেঘে অদৃশ্য নিচের পাঁথবী | সূর্যান্তের আলো লাল রঙে রাঙিয়ে 
দিয়েছে মেঘরাজকে ৷ একাঁট কালো বিন্দুর মত মেঘসমুদ্রে ভাসমান পাহাড় 
চূড়ায় দোলা আর আমি । দোলা তার বিশাল ঢেউয়ের মত বাঁড়র সব কিছ, 
ফেলে রেখে নিজের, রেশমের জিনিসপন্র গোছাচ্ছে__বইপত্র, রেকড“ ক্যাসেট, 
জামাকাপড় । আমরা কলকাতায় যাব । দোলা বটল গগ্রন পছন্দ করে না বলে 
আমি ফ্ল্যাটের পর্দা, দরজার পাপোশ আমূল বদলাব ঠিকই করে ফেলোছ। 
এমন সময় এক সম্ধ্যেবেলা ভাস্বর ফিরে এল । যেন কিছুই হয়নি, এইভাবে 
ীনজের ঘরে ঢুকল । দোলার দিকে জলভারনত অপরাধ-মাখা চোখে চাইল, 
জাঁড়য়ে ধরে বলল £ ক্ষমা কর, আর ভূল হবে না। 

দোলার দুই কাঁধে হাত রেখে, ওর চেয়ারের পেছনে সাদা-কালো ছাবর 
মত সটান দাঁড়িয়ে গম্ভীরভাবে বলল-_তুই চলে যা রাহ্‌ল, আর আঁসস না। 

সেই রাতেই চলে এসোৌছিলাম । 

দোলা শোবার ঘর থেকে বেরোয়াঁন ৷ ওর রুদ্ধ কান্নার শব্দ নিজের চওড়া 
কাঁধ '্দয়ে আড়্যল করে দাঁড়িয়ে ভাস্বর বলোছিল-_আয় রাহুল, তোকে 
স্টেশনে ছেড়ে দিই । আম দোলার বদলে ঘুমন্ত রেশমের কপালে চুমো খেয়ে 
হাঁটতে হাঁটতে ঘোরানো পথ পোঁরয়ে স্টেশনের 'দকে চলে গগয়োছলাম । 
ভাস্বৰের সঙ্গে কথা বালান । ফোলা ঠোঁটে সজীব বড়শির দাগ, আম স্বর্গ 


১৪৯১ 


থেকে নির্বাসিত হয়ে অন্ধকার নদীতে আবার আছড়ে পড়োছ। সে রাতে 
কীভাবে পায়ে হে+টে শালতোড়ার আঁভমুখে রওনা হয়েছিলাম, এখন মনে 
নেই। দীর্খ পনের ?কলোমিটার রাস্তায় অনেক কিছ ঘটে যেতে পারত । 
বন্য ভালুকী এসে পেশল থাবা রাখতে পারত মাথায়, ধানক্ষেতে চাপ চাপ 
অন্ধকারের মত দাঁড়িয়ে থাকতে থাকতে হঠাৎ আকুমণ করতে পারত হাতির 
যৃথ, অথবা কোনও মোলায়েম ডাকাতিতে আমার সর্বস্ব লুটে যেতে পারত-_ 
কিছুই হয়নি । আমি নরাপদ অক্ষত দেহে শালতোড়া পেখীছে ভোরের ট্রেন 
ধরেছিলাম | কাঠের ঠাণ্ডা বেণিতে শুয়ে ঠকঠক করে কাঁপতে কাঁপতে বুঝতে 
পারছিলাম, পায়ের দিক থেকে বিশাল এক জবর এসে আমাকে জাঁড়য়ে ধরছে । 
মাথাটা পাথরের জাঁতার মত ভার- আম ছি কোনওঁদন কলকাতা পেশীছব 
এ জীবনে ? বহু বছর আম এক আগ্রাসী আতঙ্কে কাঁটয়োছি। দাঁড়, রেজর, 
ছুরি, কাঁচ-_এই সব এলোমেলো, খোলা পড়ে থাকতে দেখলেই ভয়ে দ্রুত 
তুলে 'নয়ে ফেলে 'দিয়ে আসতাম । দরকারের সময় হাতের কাছে না পেয়ে 
আবার রাগ হত, ছটফট করতাম । 

এইভাবে নিজের সঙ্গে যুদ্ধ করতে করতে একদিন দেখলাম, অন্ধকার 
পুড়ঙঈের মুখ আলো হচ্ছে, আকাশের দিকে পিঠ করে রোমলা দাঁড়িয়ে 
আছে । রোমলা সেই সময় যথাসাধ্য চেষ্টা করোছিল আমার বুকের ক্ষত- 
গুলিকে ভরাট করে দিতে | দাবানলে জহলে-যাওয়া বনের মধ্যে কোথায় একটি 
পাতা, একটি ফুল বেচে আছে-_রোমিলা খজে বার করার চেষ্টা করাছল। 
বাইরের ঝড় এসে যে জানলাগুলকে সজোরে বন্ধ করে দয়োছিল, রোমিলা 
সেগুলিকে ভেতর থেকে খুলতে চেম্টা করাঁছল | এইভাবেই দিন গেছে, মিতুল 
এসেছে, আমি ফাগ্ঠুসন ছেড়ে ধাপ বদলে অন্য সংস্থায় ঢুকোছি। দোলা আমার 
রস্তে রয়ে গেছে । রোমিলা ওই রঙ্গন পাহাঁড়র নবাসন-বৃন্তান্ত জানত। 
আম পুরোটা নিজে না বললেও, আমার বন্ধুদের কাছ থেকে নানাভাবে শুনে 
একটা ঘটনার কোলাজ তৈরি করতে পেরোছিল আন্তারক চেণ্টায়। রোমলা 
যা জানত না তা হল, জ্ঞানচক্ষু খুলে যাওয়ার পরেই যে সৌন্দর্য আমাকে 
আচ্ছন্ন করেছিল, তার নাম ছিল দোলা । সেই আঁচ্ছির বয়সে আম অন্য 
কাউকে দোখাঁন, অন্য কিছ জানতে ইচ্ছে কারান, সিনেমা দেখে নাইট-শো 
থেকে ফিরে ঘুমোতে গিয়োছ । সারারাত দোলার কথা, টুকরো টুকরো হাঁস 
আসা-যাওয়া করেছে । ভাসানের দিন কাতিকের ময়রের পেখম থেকে 
একরাশ পালক ছিড়ে দোলাকে দিতে গিয়োছলাম বলে খোকনদা লাঁর থেকে 
নামিয়ে দিয়েছিল আমাকে । আমার চারিদিকে হাজার হাজার প্রসাদলোভী 
াকলাবলে হাত, অজ্টমীর দিন দোলা ওর ছিপছিপে শরীর, ফর্সা, কৃশ হাত, 
কপালে ঝাঁপানো চুল নিয়ে ভিড় ঠেলে এগোতে পারত না বলে, প্রসাদের 
বারকোশ দুহাতে মাথার ওপর তুলে ধরে আম চেশচয়ে ওকে ডাকতাম । 
আমাদের বাঁড়র পেছনের 'ানজন বাই লেনে দোলারা থাকত । ওদের বাঁড়র 
সামনে সারা বছর হলুদ রেণু-মাখা মায়া ছাঁড়য়ে দাঁড়িয়ে থাকত একটা 


৬১৫০ 


গুলমোহর । দ্রানস্লেশনের খাতা অথবা গ্রামার বই দোলাকে দেব- এই 
আছলায় ওই গ্রাছের নিচে সম্ধেবেলা দাঁড়িয়ে থেকেছি । কড়া নেড়োছ। 
এক্ষুনি দোলা বোরয়ে আসবে । অনেকগুলি ফ্রক, তবু নিজের আদ্যাক্ষর 
লেখা হলদ-রঙা ফ্রকটাই বার বার পরত দোলা । এইভাবেই আমার অবচেতনে 
কোথাও এক টুকরো রোদের মত হলুদ কুচি গেঁথে গিয়েছিল সেই কৈশোরেই। 
আম যাঁদ ক্লাসের ফাস্ট বয় না হতাম, দোলা আমার সঙ্গে এমনভাবে . মিশত 
কি? ভাল ছেলেদের একটা রাসায়ানক নিজস্বতা থাকে, তাদের কাছে 
মেয়েদের বর্ম পরে ঘোরা-ফেরা করতে হয় না। দোলার স্ই বারো বছর বয়সের 
[বিশ্বাসের মর্ধাদা দতে আকৈশোর আমাকে নিজের আগুন লুকিয়ে ফিরতে 
হয়েছে । দোলার সঙ্গে আলাপ কাঁরয়ে দে। কবে দার? ধূর্ত দুই নেকড়ে 
আর শেয়ালের মত আবচ্ছেদ্য মধু শরাফ আর ভ্রাদব বাঁঝ্ম অনেক দিন ধরেই 
আমার পেছনে লেগোঁছল । ওরা দু'জনেই আমার চেয়ে বড়, স্বজ্প পারিচিত, 
অথচ দোলাকে আমি চিনি বলে প্রায়ই ডেকে কথা বলে-এ কথা বুঝতে 
পারি । আলাপ কাঁরয়েও দিলাম একদিন । মধুর বাপের ফানণচারের ব্যবসা । 
ও পকেটে তাড়া-তাড়া নোট 'নয়ে ঘুরে বেড়ায় । আমাদের সবাইকে আইসক্রিম 
খাওয়াল। দোলাকে পরপর দহ"কাপ ভ্যাঁনলা । পরের দিন, পরের পরের 
দিনও দোলাকে দেখোঁছ ওদের মাঝখানে লাঁফয়ে লাঁফয়ে হাঁটছে । পার্কের 
চারধারে কালো তের মত ষে রাগ্ভাটা পাতা ছল সেইটা ধরে । ফোয়ারার 
ভাঙা রোলং ঘে£ষে দাঁঁড়য়ে আমি ওদের গমনপথের দিকে চোখ রেখোঁছলাম । 
আমার চোখ জবালা করছিল । দোলার রেশমি চুল ঘাড়ের ওপর লাফিয়ে 
লাফিয়ে উঠছে, উঃ এত কথাও বলতে পারে মেয়েটা! অনবরত হাত-পা 
নাড়ছে । ব্রাদব বাক্স হাসতে হাসতে মাথা পেছনে হোলিয়ে দিচ্ছে । দু"সপ্তাহ 
পরে একদিন ম্লানভাবে গিয়ে দোলাদের নীল দরজার কড়া নাড়লাম । ওকে না 
দেখে হাঁপিয়ে উঠোছিলাম আমি । পার্কে আসে না। রাস্তায় দোখ না! দরজা 
একটুখানি ফাঁক করেই দোলার মা--এখন যাও, দোলার শস্+ম ভাল নেই বলে 
বন্ধ করে দিয়োছলেন । এই মাঁহলা চাকার করতেন । সানগ্লাস চোখে 'দয়ে 
আফসে যেতেন বলে আপামর জনতা গুঁকে ঘুরে-ীফরে দেখত । দোলা ভাল 
নেই । কেন? ভাল হয়ে উঠে প্রথম দেখায় পাকের এক কোণায় আমার ওপর 
ঝাঁপিয়ে পড়োছিল দোলা । মুঠো-মুঠঠো চুল টেনে ব্যথা করে দিয়েছিল কপালে । 
জলভরা চোখ দিয়ে আমাকে মেরোছিল-াঁবাঁচ্ছ'রি, অসভ্য রাহুল, কেন তুমি 
ওই ছেলে দুটোর সঙ্গে আমার আলাপ কাঁরয়ে দলে ? জানো, ওরা ি 
করেছে ? 

রাইকিশোরীর সদ্যোদ্ভিন্ন বুক দটির জোর করে ঘুম ভাঙাতে গিয়েছিল 
ওই দুই জানোয়ার, ভাঙা গুমাটির দেওয়ালে দোলাকে চেপে ধরে । খুনসুটি 
করে, পরে শাঁসয়ে_ মাকে বলে দেব বলে। এক 'দিন নয়, পর পর সাত 'দন। 

আম পুরোটা শুনতে পারাঁন। দোলা, আম জানতাম না, ভূল হয়ে 
গেছে_-$ই বলে অন্ধের মত দৌড়ে চলে এসোছ। মধুকে পাইনি । সোঁদন 


৯৬১৯ 


গিবকেলে ব্রীদবকে কলেজের পাশের রান্তায় দেখে আম মাঁরয়ার মত ওকে 
মারতে গিয়েছিলাম । তার পর ঠোঁটের ওপরে সেলাই, ভাঙা চশমা, রক্তমাখা 
শার্ট নিয়ে অনেক রাত করে বাঁড় ফেরা । হুল:স্থুল । ভ্রাদবের অন্য বন্ধুটি, 
নাম জানতাম না, বেশ ভাল ঘংঁষ চালায় । রোমিলা মাঝে মাঝে ঠোঁটের ওপর 
ওই কাটা দাগটাতে হাত দেয়_এটা কিগো? গোঁফের জন্য বাইরে থেকে 
দেখা যায় না। একটুখানি সমচ্যগ্র মাংসাঁপন্ড ওখানে আজও উচু হয়ে 
দাঁড়য়ে আছে । যখন আম ভেবোছ, আকাশে উড়োছি, তখনও আম আসলে 
দোলার করতলের রাস্তিম পাঁরমণ্ডলে ঘুরাঁছ ! 

অনেক-আনক দূর থেকে আমি ডাকলাম- দোলা, এই দোলা ! উত্তরে 
এল না। 

ও কাচের বইরে তাঁকয়ে আছে । জ্যোতস্নায় পাশ্ডুর আকাশ । বহু দে 
দিগন্ত ঘে*ষে কেরাশ্ডমাল পাহাড়ের সিলনযয়েট । কণ বন্য চাঁদের আলো 
আজ ! ওই পাহাড়ের পায়ের তলায় এক নদী আছে- শঙ্খ । এত দূর থেকে 
তাকে দেখা যায় না, তার প্রাণ পাওয়া যায় না, কিন্তু সে আছে । লেবেল 
ক্রুশংয়ের বাঁয়ে পড়ো একটা লাল দোতলা বাঁড় । তার জানলা দিয়ে সবৃজ 
ক্ষ্যাগ মরণাপন্বভাবে ঝুলে আছে । এইমান্র গুম গুম শব্দ তুলে হেটে গেছে 
গম্ভীর, সবুজ এক দর্ঘ মালগাঁড় | এক্সপ্রেস গাঁড় আসবে, সেই জন্য এখন 
ক্লুশিং উঠবে না নাকি। ড্রাইভার গাঁড় থেকে নেমে একটু দরে গিয়ে 'বাঁড় 
ধারয়েছে । গাঁড়র মধ্যে আমি আর দোলা । আজ থেকে অনেক বছর আগে 
আম, দোলা ও রেশম এখানে এসোৌঁছলাম | অনর্গল কথা বলতে বলতে গাঁড়র 
মধ্যে ঘুমিয়ে গিয়েছিল রেশম | ওর ঝাঁকড়া চুলে-ভরা মাথাটা দোলার কোলে, 
পা-দুটো আমার কোলের ওপর । 

লেবেল ব্লশিং ছাঁড়য়ে ক্ষয়ে-যাওয়া রান্ভাটা জনকপুরের মোড় ছাঁড়য়ে 
ডানাদকে বে*কে গেছে । ডানাদকে ঘুরলে প্রথমে ঝূনঝুনওয়ালার কাচ 
ফ্যা্তীরর লম্বা হাতাধরা দেওয়াল । তার পর অনেকটা কাঁচা পথ, দুপাশে 
ঝোপঝাড়, বাবলা ও শিরীষের গাছ ঝুকে পড়েছে । শেষে পথটা 'নার্বকার 
একটা 'টলার মাথায় উঠে গেছে । সেই পথ বেয়ে টিলায় চড়ে আমরা গোল 
গম্বুজ দেওয়া ভাঙা রাজবাঁড়র চত্বরে গিয়ে পেশীচেছিলাম । রাজবাঁড়র 
দোতলার ছাদ থেকে শঙ্খনদীকে আবার দেখা যায় । 

শঙ্খনদীর পুরনো ব্যারেজ রাজা ত্রিবক্রম সিংহর আমলে সতেরশ বাইশে 
বানানো । ধপধপে জ্যোৎস্নায় 'নার্বষ সাপের খোলসের মত পড়ে থাকা নদশ 
আমাদের দিকে অকস্মাৎ তাঁকয়োছিল । রেশম খেলা করে বেড়াচ্ছে এখানে 
ওখানে_- ভাঙা বাঁড়, নিচু ছাদ- পড়ে না যায়, আর দোলা বার বার ওকে 
দেখার জন্য নদীর ধার থেকে মুখ ফেরাচ্ছল | রাতের বাতাসে উড়ে যায় চুল 
ওর কপালে মূখে । সাদা খোলের শাঁড়তে দোলার চন্দনরঙ্ের শরীরকে মনে 
হচ্ছিল এক অশরীরণ গাছ । সেদিন লেবেল ক্রাশংয়ে বেশ িছক্ষণ দাঁড়াতে 
হয়েছিল আমাদের । দুই ট্রেনের মাঝে প্রায় পনের মানটের মত রাত । তবু 


১৫৭ 


বুড়ো জোঁদ গেটম্যান দরজা খুলবে না_-নিয়ম নেই । তাতে অবশ্য আমাদের 
কোনও অসুবিধে হয়ান । আম ও দোলা দু'জনেই তখন ভবিষ্যৎ নিয়ে স্বপ্নে 
খেলা করাছ। 

ড্রাইভার 'বাঁড় শেষ করে এসে গাঁড়র গিয়ারে হাত রাখল । 

এক্সপ্রেস তো যায়ান এখনও, গেট খুলছে কী করে! মালখান, আমাদের 
চালক মুখ 'ফারয়ে হাসল । 

পাঁচটা টাকা হাতে দিতেই গেট খুলে দিল। 

যাক, তবে পীচশ বছরে এইটুকু বদলেছে । 

নদশর দিকে তাকিয়ে দোলা বলে উঠল- রাহুল, তোমার মনে আছে, 
রেশম খেলে বেড়াচ্ছিল ওখানে ! ওই তো, ওদিকটায় । তখন তুমি ছিলে, 
ভাস্বর ছিল, রেশম ছিল । আজ কেউ নেই আমার । তন বছর আগে ভাস্বর 
মারা গেছে। রন্তচাপ, হার্টে ম্যাঁসভ আাটাক আঁফসেরই মধ্যে । রেশম 
িলাডেলাফয়া থেকে ছুটে এসোছিল, মাসখানেক কাঁয়ে ফরে গেছে । ওর 
বরের গ্রিন কার্ড। ওই বা কতাঁদন থাকবে ! দোলা যে কোথাও যাবে না এই 
রঙ্গন পাহাড় ছেড়ে । এই পাহাড়, শঙ্খনদী, রঙ বদলাতে থাকা অরণ্য-_ 
এদের দিকে চেয়েই ওর জীবন কেটে যাবে । 

আম, রোমিলা, মিতুল-_ আমরা কলকাতাতেই থাকব । সকালে ঠাণ্ডা 
দুধে কনফ্রেক্স, রাতে 'স্টরিওতে ওয়েস্টার্ন ক্লাসকাল । মিতুল জানুয়ারিতে 
এলে ওকে চেকআপে নিয়ে যাব । রোমিলাকে গাঁড়য়াহাটে দুপুর-শাপংয়ে 
ছেড়ে আমার গাড়ি অন্যমনস্ক এলোমেলো ঘরে বেড়াবে । দোলার পাশে খুব 
কাছে দাঁড়য়ে আমি ওর চুলে হাত রাখলাম । ওর শরারের ঘ্রাণ নিলাম । 
অথচ স্পশে“র ইচ্ছা জাগল না। আমাদের দু'জনের মাঝখানে যে আনবনীয় 
সাঁকোটি আছে তার অন্য প্রান্তে গিয়ে নিঃশব্দে দাঁড়য়ে রইলাম । যৌবনে 
দোলার হাতের আঙুলগ্ীলির জন্যও কী রন্তরাঙা স্পৃহা ছিল আমার! কী 
তশর আকাঙ্ক্ষা ছিল ওর সমন্তভ শরীরের জন্য ! তা» মনে হয়, কেবল ওর 
মনাঁটকে ছ:য়েই আম বাকি জীবনটা কাটিয়ে দিতে পার । 

নদীর দিক থেকে মুখ 'ফাঁরয়ে দোলা আমার দিকে চাঁদের আলোমাখা 
মুখখাঁন তুলে ধরে বলল-_তুমি কবে আসবে রাহুল ? আর বোশ দিন নেই 
_-দশ বছর, বড় জোর কুঁড়ি ! এ জন্ম তো ফুরিয়ে এল, ক বল? 

শঙ্খনদীর রেলাব্রজের ওপর দিয়ে ট্রেন যাচ্ছিল । থামগালকে আগে 
আগে ছয়ে যাচ্ছিল ইঞ্জনের আলো, পেছনে হাঁটাছল অন্ধকার । 

আমার হঠাৎ মনে হল, ওপরে কোথাও যেন রোমলা দাঁড়য়ে । হাতে 
বাতি, আলো-ছায়া মাখা মুখের চারপাশে রুূপোি তারের মত চুল। 

রোমিলা বলল-_যাবে ? যাও না--আঁম আলো ধরাছ। 


১৬৩ 


€কল্রল্ষী 
সুজাতা মুখ নিচু ক'রে বসেছিল । টেবিলের ওপর কার চায়ের কাপের দাগ, 
কলমের কাঁলতে আঁকা হরফ, ছুরি দিয়ে নাম লেখার চেম্টা-এই সব 
দেখছিল । পুরোনো টোবিল। সুজাতার বাঁ হাত খাল, সুদ-শ্যভাবে তার 
ওপর পাতিয়ে রাখা । ডান হাতে দু'গাছ প্লেন সোনার চুঁড়। তাও হাত 
খালি রাখলে মা 1খটাখট করে বলে । বাঁ হাতে কেবল একাঁট পুরোনো হাত- 
ঘাঁড়। মাসখানেক আগে সে নখ রেখে গোলাপণ নখরঞ্জনী লাগিযোছল। 
এখন রং উঠে গিয়ে অসুন্দর বিবর্ণ প্রেক্ষাপট পড়ে আছে । আন্ন আসার 
আগে এটুকু তার িমূভার দিয়ে মুছে আসা উচিত ছিল--ভাবল সুজাতা । 
আর তক্ষুণি তার বড় দুঃখ হল, নিজের অদৃস্টের ওপর দারুণ আভমান-_ 
এই 'কি নখের রং নয়ে ভাবাব সময় ? 

পাশ থেকে, সুজাতা শুনতে পাচ্ছিল, উদ্বেল ভূশীড় সামান্য এীগয়ে দিয়ে 
নেপাল বসাক একনাগাড়ে বলে চলেছে, তা হলে বলুন স্যার, কমন ম্যানের 
কী অবস্থা! আমাদের কোনো গসকুরাট নেই । কেস করার মত মশলা নেই, 
আপাঁন বলছেন? অথচ মেয়েটি, কী বলব, দেখতেই পাচ্ছেন- ইয়াং মেয়ে, 
সারারাত ঘুমোতে পারে না, ভয়ে চমূকে ওঠে, এই বুঝি" 

সুজাতা ভূর কুচকে নেপালের দিকে তাকাতেই সে থেমে গেল । গলা 
ঝেড়ে নিয়ে আবার হাঁ করতে যাচ্ছিল, তরুণের মেজমামা গম্ভীর গলায় 
বললেন-_কছ্‌ একটা করুন । আপ্রয় ঘটনা ঘটে গেলে তো আফসোস ছাড়া 
আর কিছ? করার থাকে না। 

সুজাতার ঠোঁট হাসল না, হাসল দুই চোখ । এবং হাঁস চাপার চেষ্টায় 
তার ডান গালে টোলের আভাস দেখা দল । 

এই আঁফসারটি যাঁদ জানতে পারেন, মূল আঁভযুস্তের মেজমামাই 
স,জাতাকে এখানে নিয়ে এসেছেন, তাহ'লে ? 

শানু আর তাঁড়ং সুজাতাদের পাড়ার দুই বেকার সমাজসেবশ নেপালের 
পেছনে দাঁড়িয়েছিল । মালমশলা নেই, জোলো কেস--তাদের সব উৎসাহ উবে 
গেছে এতক্ষণে । দুজনে চটি ঘষে যাওয়ার জন্য উসখুস্‌ করছে ?কছ-ক্ষণ 
থেকেই । 1কল্তু এরকম একটা জংশনে বৌরয়ে যাওয়াও সোজা নয় । 

সেকেন্ড আফসার পুলক বিশ্বাস গা-ঝাড়া দিয়ে বসে ঘাঁড় দেখলেন, 
তারপর সদ্য ঘুম ভাঙা বেড়ালের মতন শরীর টানটান করে হাত দুটো 
মাথার ওপর শেকল করে তুলে বললেন_ আপাততঃ একটা প্রোটেকশনের 
ব্যবস্থা করাছি, ওয়াচ য়াখা হবে-_স্টেশনে ডায়েরী তো হ'ল । তারপর দরকার 
বুঝে কেস করা যাবে । মিহির, কেম্টকে ডাক তো ? 


১৫৪ 


একটি মাঝবয়েসপী লোক বনবেড়ালের মত শিকার? ভাঙ্গতে দরজার পাশ 
দয়ে ছায়ার মত সরে গেল । খাড়া নাক, গর্তে বসা চোখ, মাথার চুল ভাঁটার 
সমুদ্রের মত কপাল ছেড়ে চলে যাচ্ছে । ছিটের শার্টের নিচে পাজামা পরা । 
পুলক ব*বাস উঠে দাঁড়য়ে পিঠচাপড়ানো হাসিতে সুজাতাকে বললেন, কেন্ট 
সেন আপনাকে এসকর্ট করবে সারা দন, এবার নিশ্চিন্ত ? 


চোখ দুটো ছোট করে অন্তরঙ্গ হবার চেস্টা ক'রে কেন্ট সেন বললো, এটা 
ছেড়ে দন না, পরেরটায় যাবো । 

সুজাতা ঘাড় নাড়ল--এই 'নয়ে তিনটে ছাড়লাম । আমার দেরণ হয়ে 
যাচ্ছে । আমি যাচ্ছি, আপাঁন বরং পরেরটায় আসুন । 

যাঃ, তা কখনো হয়! এত িভড়-ঠেলাঠোলতে এাঁদক ওদক গাল 
বোঁরয়ে গেলেই*** 

কাল থেকে আপনার পস্তলটা বাঁড়তে রেখে আসুন । এত বাস ছাড়লে 
আমার চলবে না ! 

সুজাতা প্রায় দৌড়ে গিয়ে আগে বাসে উঠল । কেম্ট সেন তার অব্যবাহত 
পেছনে জায়গা করতে গিয়ে গুতো খেল, পিছিয়ে গেল-_এবং রয়েই যেত 
রান্তায়, যাঁদ বাস একট: এঁগয়েই এক মাঁহলার চশংকারে আবার না দাঁড়াতো । 
একট ছোট মেয়ে পড়ো-পড়ো অবস্থায় পাদাণনতে আটকে ছিল। 

যেন কোমরে বাত অথবা টিউমার" এই ভাবে 'িম্তলটাকে আগলে সামান্য 
বেঁকে কেম্টকে দাঁডাতে দেখে সজাতা ভীষণ ক্লান্ত বোধ করল । ও সোজা 
হয়ে রান্তার ঈদকে তাকিয়ে দাঁড়ালো, যেন কেউ কোনোভাবে বুঝতে না পারে 
কেস্টর সঙ্গে ওর সংম্রব আছে । 

খানিকক্ষণ পরেই একটা গণডগোলে ওকে ফিরে তাকাতেই হল । 

উল্টোদকে লোডজ সাঁট খাল হয়োছল একটা । তাতে বসে পড়েই 
সূজাতাকে ডেকেছে-_এই যে এঁদকে আসুন, জায়গা আছে। 

সামনেই এক প্রৌঢ়া আড়ম্টভাবে দাঁড়য়ে। সঙ্গের যুবকটি গাট্রাগোট্রা, 
গ্রালে কাপাঁলিক-মার্কা দাঁড় । 

এক থাপ্পড় মারব, উঠুন শীগৃগির_ ইয়ারের জন্য জায়গা রাখা হচ্ছে! 
সামনে লোডস দাঁড়য়ে ! 

হে ভগবান ! সুজাতা একেবারে লঙ্জায় মরে গিয়ে বাইরে তাকিয়ে রইল । 
লোকটা যেন তাকে না ডাকে আবার । 

ওভাবে জায়গা রাখতে কে বলোছল ? 

নেমেই সুজাতা ধমক দল তার দেহরক্ষীকে । 

আম জায়গা না রাখলে কে রাখবে ? আপনার দেখাশোনা, ভালমন্দ সবই 
তো এখন আমার । 

কথা শুনলে গা জহলে যায় ! 

রা করে আগে আগে হাঁটাছল সুজাতা । বাড়ীর কাছে অব্ুর মিত্র লেন 


১৫৬ 


যেখানে কাশীনাথ সেন স্ট্রীটে মিশেছে, সেখানে সন্ধের হ্যালোজেন আলোর 
আভা মেশা অন্ধকারে একটা লোককে দাঁড়িয়ে থাকতে দেখে ওর ব.কটা ছ্যাঁৎ 
করে উঠল । ছোট ছোট করে ছাঁটা চুল, আভাসে মনে হয় বাঁলষ্ঠ চেহারাই, 
মাঝাঁর হাইট, একটা হাত প্যাণ্টের পকেটে ঢোকানো, পেছন ফিরে দাঁঁড়য়ে 
আছে ওদের দিকে*** 

ওর পকেটে কী? 

তরুণের একগাদা বখে যাওয়া বন্ধুবাম্ধব--কেউ জুয়ার ঠেক চালায়, 
'কেউ শেয়ারের দালাল করে। তাদেরই কেউ ক সুজাতাকে ওয়াচ করছে? 

লোকটা আচমৃকা পেছন ফিরতেই সুজাতা দু'পা পিছিয়ে গেল। ওর 
হাতের মুঠো ঠাণ্ডা, সারা শরীর ঠক ঠক করে কাঁপছে । সেই অবস্থাতেই 
মরীয়ার মত পেছনে তাকাল সুজাতা । হাজার হোক, একটা পুরুষমানুষ 
সঙ্গে । রোগা-পটকা হলেও বুড়োহাবড়া নয় একেবারে । তার ওপর কোমরে 
একটা 'পিশ্তল, প্রয়োজনে সেটা চালাতেও পারবে [নিশ্চয় । 

তাকিয়ে দেখল, কেম্ট নেই । গাঁল ফাঁকা । লোকের যাতায়াত নেই বিশেষ 
এই জায়গাটাতেই কারণ অন্ধ গাল। লোকটা কি ভোজবাজর মতন উবে 
গেল, না, পাঁলয়ে গেল ভয়ে 2 নাঃ, পুলক বিশ্বাসকে কালই গিয়ে ধরতে 
হবে- বদলে অন্য কাউকে দন ! 

এই সময়েই কাশীনাথ সেন স্ট্রীটের 'দক থেকে আসতে দেখা গেল 
কেন্টকে। গোঁফে জল লেগে । একগাল হেসে যেন ভবভার মোচনের দায় থেকে 
মস্তি পেয়েছে এমন মুখ করে বলল, আঃ, বন্ড তেম্টা পেয়োছিল-_- চলুন । 

দাঁড়য়ে থাকা লোকটার অন্য হাতে একটা চেন, চেনের শেষপ্রান্তে একটা 
টোরিয়র তুরতুর করে মাঁট শঃকতে শ£কতে ঘুরপাক খাচ্ছে । লোকটার শরীর 
কুকুরটাকে আড়াল করে ছিল এতক্ষণ । 

কেন্ট সেন বাড়ীর দরজার কাছ থেকে ফরে গেল। 

মাবধানে থাকবেন, রাতে কাউকে দরজা খুলে দেবেন না যেন, কেমন 
তো? ভারী মায়াভ'রে বলে যাবার সময় । ওর ডীদ্বগ্ন মুখ চোখ দেখে 
সুজাতার হাসি পায় । হাসি চেপে রাখতে গিয়ে গালের টোলটা বোরয়ে 
পড়ে । 

সদর দরজা বন্ধ করে ঘরে ঢুকে দেখে ওর আড়াই বছরের ছেলে বুবুনকে 
ঘুম পাড়াতে গিয়ে নিজেই ঘুমিয়ে পড়েছেন সুজাতার মা। 

বুবুনের একটা হাত খাটের বাইরে ঝুলছে । 

রাতাঁদনের কাজের মেয়েটি দরজা খুলে দিয়েই আবার ঘুমোতে চলে 
গেছে। 

সবাই ঘুমোয়, কেবল সুজাতা-ই 'বানিদ্র। 

আয়নায় নিজের চোখের নিচে গাঢ় হয়ে আসা কাল দেখে সুজাতা-_ 
ক্লান্ত মুখ, তেল না দেওয়া শুকনো খড়ের মতন চুল । 

নতুন 'বয়ের পর চোখমহখের অবস্থা অনেকটা এইরকম হয়ে থাকত । 


১৫৬ 


তরহণের সঙ্গে বাঁড় ছেড়ে পালিয়ে এসে 'বিয়ে করোছল সুজাতা । কণী 
ভালবাসা তখন তাদের, দুজনে দুজনকে চোখে হারায় । ক্রমশ দিন গেছে, 
তরুণ বদলেছে, ভাবগাঁতক পালটেছে ভালবাসার ৷ পাঁচবছর পর আজ আবার 
সেই তরুণের হাত থেকে পালিয়ে বাপেরবাড়ীতে ঢুকেছে সুজাতা । ভাগ্যস্‌ 
বাপের বাড়ীর দরজা খোলাই ছিল আর চাকারটা ছিল ! নাহলে যে কী 
হ'ত! ওঁদক থেকে উড়ো চিঠি আসে, আঁফসে উড়ো ফোন। তরুণ নাকি 
নজর রাখছে । কী যে লাভ হচ্ছে ওর নজর রেখে, তরুণই জানে । বাবা ঝেঁচে, 
নেই, সুজাতা কিডন্যাপড্‌ হ'লে কানাকাঁড়ও ঠেকাবে না বাড়ীর লোক। 
ভ্রাগের নেশায় আম্টেপৃন্ঠে জাঁড়য়ে গেছে তরুণ । আঁফস যাওয়াও বন্ধ করেছে 
মাস ছয়েক হ'ল। মালের কাঁড়র জন্য এখন সে ঘাঁটবাটি দেওয়ালঘাঁড়-_ 
এমন কি সাঁড়াশি পেলেও বেচে দিতে পারে । বছর দুয়েক হ'ল সুজাতা একাঁট 
পয়সাও দেয় না। এখন তো প্রশনই ওঠে না আর । তব কত রাত ঘুমোয়ন 
সুজাতা- রাতে যাঁদ জানলার বাইরে কেউ এসে দাঁড়ায়, যাঁদ কেউ কড়া 
নাড়ে হঠাৎ! একটিও পুরুষমানুষ নেই এ-বাড়ীতে | হায় ! কপাল চলেছে 
সুজাতার সঙ্গে সঙ্গে, নইলে এত লোক থাকতে কেন্ট সেন-এর উদয় হবে কেন ? 

কত দেরী হয়ে গেল বেরোতে ! 

কেম্ট এসেছে সাড়ে নটারও পরে । একটুখানি অপ্রাতভ হাঁস মাজশারনের 
মতন সারা গালে মাখানো । 

ইস্‌, কী করলেন বলুন তো! এত দেরী করে? তিনটে ব্লশ পড়লে 
আজকাল হাফ: স-এল হয়, জানেন ? 

একট: 'িধাঁড় মাছ এনেছিলাম যে আজ ! খোসা ছাড়িয়ে ধুয়ে ভাজতেই 
এক ঘণ্টা । ঘাড়ের কাছে একটা কালোমতন সৃতো থাকে জানেন তো চিংঁড়র, 
সেটা আবার বার না করলে""" 

চলুন চলুন, দের হয়ে যাচ্ছে! 

সুজাতা কাঁব্জ উল্টে ঘাঁড় দেখে দৌড়োতে থাকে ত্স্তা হাঁরণশীর মতন-_ 
আপনাদের দেশে কি কালোঁজরে ফোড়ন দেয়, না পাঁচফে.এ৬ন-_কেম্ট পেছন 
পেছন আসছে কথা বলতে বলতে, মাঝে মাঝে হাতটা তুলে নাকের সামনে ধরে 
গন্ধ শকে নিচ্ছে । 

আমাদের জানেন তো, মানে আমার বাবার আর কি, একশো িঘে ধান- 
জাঁম ছিল সুন্দরবনের কাছে, ধানবনেই চিধাঁড় হত এত যে খেয়ে 'বালয়ে থই 
পাওয়া যেত না আর! এখন চাল্লশ টাকা কোঁজ মাছ িনতে জান বোরয়ে 
যাচ্ছে! 

সেই জমির কী হ'ল ? 

দৌড়োতে দৌড়োতেই জিজ্ঞেস করেছে সুজাতা । 

এক্সচেঞ্জে তো আমরা জমি পেলাম এই নরাঁসংহপ:রের কাছে, বুঝলেন-__ 
সেই জাম হাঁতয়েছে আমার মেজ জ্যাঠার দুই ছেলে । আমি আর দাদা তো 
গোড়া থেকেই কলকাতায় । এখন মামলা চলছে কোর্টে 'সাবল কেস, ফয়সালা 


১৬৭ 


হ'তে হ'তে আম বুড়ো হয়ে যাবো । প্রত্যেক বছর ধানকাটার সময় ঝগড়া । 
আমার দুই জ্যাঠতুতো ভাই মহা বদমাশ, বাপের লেঠেল ছিল এক জমানায় । 
এখন ছেলেরা মন্তান পোষে । মাঝেমাঝেই ধমক দেয়, মামলা তুলে না নিলে 
খতম ক'রে দেবে ! 

তুলবেন নাক মামলা ? 

পাগল ! 

আফসের কাছে পাঁকি-লটের মাঝখানটায় একটা বড় গাছ, তার ?নচে 
বসে পড়ে যত্ব করে একটি 'বাড় ধরায় কেস্ট। স্নেহভরে হেসে বলে, যান যান, 
মন দিয়ে কাজ করুন । আমি আছি এখানে, দেখাঁছ শুনাছ। সুজাতার সঙ্গে 
[ডিউাঁট হবার পর থেকে কেন্টর দুপুরগুলোয় অফুরন্ত অবসর | উকিলের 
কাছে টুক করে চলে যাওয়া যায়। কেন্ট সেনের তাদ্বর তো আছেই-- 
ব্যাপারটা যাঁদ শুনানর স্টেজে এনে ফেলা যায় আর মাস দুয়েকের মধ্যে, তবে 
বছর খানেকের মধ্যেই জাজমেণ্ট হয়ে যাবে নিশ্চয়ই ! 

তরুণের তরফ থেকে টোলফোন, হাতচিঠি আসা বন্ধ হয়ে গেল 
আচমকাই । শরীর খারাপ হয়ে পড়ায় জোরজার করে ওর দাদা নাকি 
হাসপাতালে ভার্ত করে এসেছে তরুণকে । 

মেজমামা, তরণেরই, একাদন এসে ঘুরে গেছেন এর মধ্যে । চা খেতে 
খেতে বলেছেন_আঁম কবে থেকে বলাছি, তোরা শুনাছাল না! কেমন 
ইমৃপ্যান্ী হ'ল দ্যাখ ! 

সুজাতার গালে স্বাস্থ্যের আভা ফিরেছে, চোখের নিচের কাল ধীরে ধীরে 
ফিকে হয়ে আসছে । আজকাল সে আঁফস যাওয়ার আগে আয়নার সামনে 
ঘুরে-ফিরে নিজেকে দেখে নেয়, নিপুণ হাতে সোজা িশীথ কেটে নুন 
বাঁধে, কোনো শাঁড় পর-পর দুদিন পরে যায় না। 

ছটার মধ্যেই ঘুম থেকে ওঠা । সকাল আটটায় বুবুনের সারাঁদনের দুধ 
ও খাবার নানা বোতল ও কৌটোর ভরে 'ফিজে রাখে, পাঁউরুঁট টোস্ট করে, 
তার পর রুট-তরকারী বানিয়ে টাফনবক্সে ভ'রে নিজের ও কেম্টর জন্য। 
বাইরের খাবার খেয়ে কেন্টর অম্বলের মতন হয়ে যায় সন্ধের দিকে, আবার 
ওকে 'নজে বাঁনয়ে আনতে হ'লে সকালে এক ঘণ্টা দেরী করবে, তাই এই 
ব্যবস্থা সুজাতাই চালহ করেছে । এতে দুজনেরই সবধে । 

শবস্তীর্ণ মানের পেছনে সূর্য অন্ত যায়। শ্রাবণের দিন শেষ । সারা সকাল 
বৃম্টর পর মেঘভাঙা হলুদ আলোয় ভরে গেছে পথঘাট । আঁফস ছ:টির পর 
উপচে পড়ছে ভড়। 

কী যে পাগলের মতন সময় বাঁচানোর জন্য দৌড়োয় মানুষ ! এই ঠেলা- 
ঠোঁল, পাসের বাস্কে ওভারটেক করা! তারপর জ্যামে জাঁড়য়ে পেখচয়ে 
সবার আটকে থাকা__এই সব ভালো লাগে না সুজাতার ! 

আঁফিস থেকে বেরোনোর পর সে যেন টেকা মেরে দেহ থেকে ঝেড়ে ফেলে 
দিতে চায় ফাইলের গম, দেও্যরাভল জো পানের পিকের দাগ, যাবতীর 





১৫৬৮ 


সাংসারক আবর্জনা ৷ কেন্ট বসে বসে পুরোনো কাগজ পড়ে একটা গাছের 
1নচে, সুজাতাকে দেখে হেসে উঠে দাঁড়াল, বলে, গম্ধ পাচ্ছেন ? 

কীসের ? 

কীসের আবার! আরে ভেজা মার, বাঁম্টর সোঁদা গম্ধম! চলুন 
হেটে হেটে এগোই । দুজনে হাঁটিতে হাঁটিতে বাসরান্তা ও ট্রামলাইন পোরয়ে 
আনমনে ঘাসের মধ্যেকার পায়ে-চলা-পথ ধরে চলতে থাকে সেই হল্‌দ আলো 
মেখে । সুজাতার আজ এ্যানুয়াল ইনক্রিমেন্ট মঞ্জুর হয়েছে, অং পণচিশ 
টাকা মাইনে বাড়ল । এসট্যাবালশমেণ্ট-এর নূপেনকে কম তেল দিতে হয়েছে 
এর জন্য ? তাও সেই সবচেয়ে আগে পেল, নংপেন তাকে একাদিন সিনেমায় 
নয়ে যেতে চেয়োছল, গার্বতা সুজাতা যায়াঁন তবুও | তেল-নুন-মাখা সেদ্ধ 
মটর দুই ঠোঙা হাতে ?নয়ে কেম্ট আপনমনে বকবক করতে করতে চলেছে । 

কাগজপন্র সব রোডি- বুঝলেন, পানুদা (কেম্টর উকিল ) বলছে হিয়ারিং 
করিয়ে দেবে পুজোর আগেই । আর হিয়ারিং হয়ে গেলে জাজমেন্ট-এর জন্য 
চুপচাপ ওয়েট করব । এসব কেস তো আর চট করে ফুরোবার নয় ! তারপর 
এ্যাপল আছে-ফয়সালা হতে হতে পেনশন নেবার সময় হয়ে যাবে আমার । 

দুটি লোক [িছংক্ষণ থেকেই ওদের পেছনে আসাঁছল, সুজাতা বা কেন্ট 
কেউই দেখোন । 

একজন রোগা, ছাইরঙা সফারাী পরা, মাথায় মাহ করে ছাঁটা চুল, তাকে 
দেখতে অনেকটা কম্যাণ্ডো গোছের, আরেকজন আদ্দর পাঞ্জাঁর-পাজামা 
পরা, মোটা পৃথুল, বিরাট কাঁচাপাকা জুলাঁপ । ষড়যন্ত্রকারী দুই নেকড়ে 
ও ভালুকের মতন এরা সুজাতার আঁফসের সামনে একটি মারুতি হাজার-এ 
অপেক্ষা করাঁছল । তারপর গাঁড় রেখে পিছু ধাওয়া করেছে । 

হয়তো মানুষ বাতাসে বারুদের গন্ধ পায়, তাই একসময় আচমকা পেছন 
িরেই কেম্ট তাদের দেখল, তার মুখ থেকে কথা বেরোল না, যেন ভয়ে পাথর 
_হাত-পা ঠকঠক করে কাঁপছে । কেম্টর কোমরে আজ কেবল খোল, পিস্তল 
নেই ! 

সুজাতা একটু এগিয়ে গোছল । 

বলাছল, নৃপেন কেমন বদমাশ সেই কথা । কছূক্ষণ কোনো সাড়া না 
পেয়ে সে-ও পিছনে তাকাল, কেম্টর ভয়-পাওয়া পশুর মতন মুখচোখ দেখল । 
তারপর ভশত কণ্ঠে শুধোল, কী ব্যাপার ? 

সফারী ততক্ষণে প্যান্টের পকেটে হাত ঢুকিয়েছে। দেখতে পেয়ে 
অতাঁকতে কেন্ট সুজাতাকে জাঁড়য়ে ধরে গাঁড়য়ে গেল ঘাসের ওপর । সোঁদা 
ঘাস, বৃম্টির গন্ধে চন্মনে- সুজাতা নিঃ*বাস ফেলারও সময় পায়নি । 
বারুদ ধোঁওয়া, ঘাসের ওপর দিয়ে পাঁলয়ে যাওয়ার শব্দ এবং তার কনুই-এর 
ওপরে বাঁ হাতে অসহ্য যন্ত্রণা | গালটা কেবল চুমু খেয়ে বৌরয়ে গেছে । 

কেম্ট ঘাসের ওপর শুয়ে । চোখ বন্ধ। ভয়ে মরেই গেছে যেন। তার 
সাদাটে মুখের দিকে তাকালে এই কথাই মনে হতে পারে, 'কম্তু অন্যাদকে সে 


১৫৯ 


গ্রব্ভাধে সুজাতার কোমর জড়িয়ে রেখেছে দুহাতে । ফোমরের ওপয়্ 
কেম্টর আঙুলের শিরা-ধমনীর দপ্‌্দপ: শোনা যাচ্ছে। 

ডান হাতে আঁচিল সামলে সুজাতা নিজেকে ছাড়াতে চেষ্টা করল-_ছাড়ুন, 
অসভ্য কোথাকার ! 

ওরা কি গেছে? চোখ বম্ধ অবস্থাতেই কেন্ট শুধোল তার ঘাসের বিছানা 
থেকে। 

হ্যাঁ। সুজাতার ভীষণ কষ্ট হচ্ছিল, সেই সঙ্গে অপমান-বোধও। 

কেন্ট দু-এক লহমা অপেক্ষা করে নিঃশব্দে উঠে বসে নিজের ফোলও 
ব্যাগ থেকে ফাস্ট এইড-এর সরঞ্জাম বার করল--টিংচার, তুলো, গজ, 
ব্যাণ্ডেজ, একটা ছোট কাঁচি। 

দোখ, হাত দোখ ! 

নিপুণভাবে ক্ষতের ওপর ব্যাপ্ডেজ বাঁধতে বাঁধতে বলল- এই চাকরিতে 
আসার আগে কম্পাউগ্ডাঁর করতাম । কিছ? ভাববেন না, কাল সকালেই 
একটা এফ. আই* আর, করে দেব। আপনি তো আমার আপনজন- একেবারে 
মন খারাপ করবেন না। মাঝেমাঝেই অমন হয়-_পেটের দায়ে চাকরি। ফাস্ট 
এইড সব সময় সঙ্গেই রাখ ! 

ব্যাণ্ডেজটা মন্দ বাঁধোন কেম্ট। একট; টাইট অবশ্য, নিচে ক্ষতটা ছটফট 
করছে। করুক। সুজাতা বাঁ হাতটা বুকের কাছে ধরে আগে হাঁটতে হাঁটিতে 
কেম্টকে সম্নেহে বলল- পেছনে আসুন আমার ।